(মহাপ্রভুর ভূমিকা নিয়ে জিজ্ঞাসার উত্তরের শেষাংশ।)
….. সেইসময় গৌড়বঙ্গের শাসনকর্তা ছিল হোসেনশাহ। অনেকের ধারণা আছে হোসেন শাহ বোধ হয় খুব উদার প্রকৃতির মানুষ ছিল—কিন্তু তা নয়। আর শুধু হোসেন শাহ‌ই বা কেন—যে কোনো মুসলমান শাসকই হিন্দুদের ব্যাপারে কি করে উদার হবে ? তাদের পক্ষে সব ধর্মের প্রতি উদার থাকা সম্ভবও নয় ধর্মীয় বাধ্যবাধকতা এবং অনুশাসনের কারণে। মুঘল সম্রাট আকবর যেটুকু উদারতা দেখিয়েছিল_ সেটা ছিল রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে। আর দারাসুকোর মধ্যে যেটুকু উদারতা লক্ষ্য করা যায় সেটা সম্ভব হয়েছিল ওনার সুফী পরম্পরায় দীক্ষা নেওয়ার জন্য। সুফীরা উদার, কোনো ধর্মমতেরই তারা বিরোধ করে না।

যাইহোক, গৌড়বঙ্গে তখন চরম অরাজকতা! পরপর ক্রীতদাসরা বাংলার সিংহাসনে বসছে। হাবসী অর্থাৎ আবিসিনিয়ার অধিবাসীরা তখন ক্রীতদাস হিসাবে মুসলমান শাসকদের সাথে আসতো। বিশাল এবং শক্তপোক্ত শরীরবিশিষ্ট হাবসীরা অস্ত্রশিক্ষা করে সম্রাটদের দেহরক্ষী হিসাবে কাজ করতো। এরাই তৎকালীন সম্রাটদেরকে মেরে পরপর বাংলার সিংহাসনে বসে বাংলায় একটা চরম অরাজক অবস্থা সৃষ্টি করেছিল। হোসেন শাহ তখন বিহারের সাসারামে, সাধারণ সৈন্য হিসাবে join করে নিজের চেষ্টায় ও বুদ্ধিমত্তায় সেনানায়কের পদে উন্নীত হয়েছিল। একেবারে ছোটো বয়সে হোসেন গৌড়ের অধিকারী সুবুদ্ধি রায়ের ক্রীতদাস ছিল।সুবুদ্ধি ছোটবেলা থেকেই হোসেনকে ভালোবাসতো, তাকে লেখাপড়া শিখিয়েছিল, অস্ত্রশিক্ষা দিয়েছিল। কিন্তু সেই হোসেনই একটু বড়ো হয়ে সুবুদ্ধি রায়ের কনিষ্ঠতম স্ত্রীকে বের করে নিয়ে বিবাহ করেছিল। তৎকালীন সময়ে জমিদার বুদ্ধিমন্ত ও সুবুদ্ধি রায়ের অধীনে যে সৈন্য ছিল তার সাহায্যেই গৌড়বঙ্গে হাবসী বিদ্রোহ দমন হয়েছিল। বিদ্রোহ দমন হবার পরে হোসেন গৌড়বঙ্গে ফিরে আসে। সুবুদ্ধি রায় ও বুদ্ধিমন্ত এমনই উদারপন্থী মানুষ ছিল যে, তারা হোসেন শাহের হাতে সুরক্ষিত গৌড় তুলে দিতে কোনো আপত্তিই করলো না। 

 দ্যাখো, ইতিহাস বলছে বাঙালী হিন্দুরা কখনোই বেইমানি করে নি। ইচ্ছা করলে ওরা হোসেনকে ঢুকতে না দিতে পারতো বা মেরে ফেলতেও পারতো কিন্তু তা তারা করেনি। হোসেন কিন্তু সিংহাসনে বসেই সুবুদ্ধি রায়ের উপর চরম অবিচার করেছিল। তবে বুদ্ধিমান হোসেন ব্যাপারটা থেকে শিক্ষাও নিয়েছিল, ও তার দেহরক্ষীদেরকে এবং সৈন্য বিভাগের কর্তাপদে বাঙালী সেনানায়েকদের নিয়োগ করতো--অবাঙালীদেরকে নয়।

 যাইহোক, এখানকার রাজা হবার পর হোসেন শাহ কিন্তু মহাপ্রভুর ঐ ভীষণ জনপ্রিয়তা বা তাঁকে কেন্দ্র করে যে গণ আন্দোলন গড়ে উঠছিল__এইটা ভাল চোখে দেখেনি। ও-ই চাঁদকাজী, জগন্নাথ রায়, মাধব রায় (জগাই, মাধাই) ইত্যাদিদের নির্দেশ দিয়েছিল যাতে মহাপ্রভুকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলন ভেঙে দেওয়া হয়। জানোতো _মহাপ্রভু কিছুটা হোলেও এখানকার শাসকদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়েই নবদ্বীপ ত্যাগ করেছিলেন কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, বেশীদিন নবদ্বীপে থাকা মানেই তাঁর followers-দের উপর অত্যাচারের পরিমাণ বাড়বে। তিনি উড়িষ্যায় যাবার পরও কিন্তু হোসেন শাহ মহাপ্রভুর বিরোধিতা করতে ছাড়েনি। কলিঙ্গরাজ যখন মহাপ্রভুর শিষ্যত্ব বরণ করলো, তখন গুপ্তচর মারফৎ এ খবর হোসেনের কানে পৌঁছালৈ। হোসেন শাহ প্রথম থেকেই মহাপ্রভুর গতিবিধির উপর কড়া নজর রাখছিল। এই ঘটনার পর ও ভাবলো মহাপ্রভু হয়তো কলিঙ্গরাজের সৈন্য সাহায্য নিয়ে গৌড় আক্রমণ করবেন । আর তা করলে এখানকার জনগণের বা ছোটো ছোটো রাজাদের একটা support তো তিনি পাবেনই। এই ভয়ে ভীত হয়ে হোসেন শাহ কলিঙ্গরাজের শ্যালক অর্থাৎ ওখানকার সেনাপতির সাথে বিভিন্ন চুক্তি করতে লাগলো। কলিঙ্গ সেনাপতিও মহাপ্রভুর প্রতি বিরক্ত ছিল- —কারণ তার ধারণা ছিল _উনিই (মহাপ্রভূ) রাজার মাথা খারাপ করে দিয়েছেন, তাকে শিষ্য করে নিয়েছেন। রাজার এখন আর রাজকার্যে মন নেই, শুধু ‘হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ' করে আর কি করলে মহাপ্রভু সন্তুষ্ট হ'ন, কত ভালোভাবে তাঁর সেবা করা যায়, সেই নিয়েই রাজা ব্যস্ত_দেশের মানুষের কি হবে সেদিকে খেয়াল নেই। ফলে কলিঙ্গ সেনাপতি গোবিন্দ বিদ্যাধর হোসেন শাহের ষড়যন্ত্রে সামিল হোলো।

এদিকে পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের পাণ্ডা-পুরোহিতরা তো মহাপ্রভুর উপর বিরক্ত ছিলই। এই ভাবেই সাতে পাঁচে মহাপ্রভুর মহাজীবনের উপর একটা বিরাট বিপর্যয় ঘনীভূত হয়েছিল।।