জিজ্ঞাসু–একটু আগে বিভিন্ন গুণসম্পন্ন ব্যক্তির কথা বলছিলেন—তা এই ভিন্ন ভিন্ন গুণসম্পন্ন ব্যক্তির সাধনপথ বা পন্থা কি পৃথক ?
গুরুমহারাজ—পথ আর পন্থা বা উপায় এক কথা নয়। উভয়ের উদ্দেশ্য পৃথক। উপায় ভিন্ন হতে পারে কিন্তু পথ একটাই। যদি রাজার সাথে দেখা করতে চাও তাহলে রাজপথ ধরেই যেতে হয়, অন্যপথে গেলে চলবে না। তবে ঐ উদাহরণটা স্থূল অর্থে, সূক্ষ্ম অর্থে মধ্যম মার্গ অর্থাৎ সুষুম্নাপথই পথ। উপনিষদে রয়েছে “নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।”
সত্ত্ব, রজঃ, তমঃ—এই তিন গুণবিশিষ্ট মানুষ সমাজে রয়েছে, ফলে ঈশ্বরলাভে ইচ্ছুক ব্যক্তিদের মধ্যেও তিন প্রকারের মানুষই থাকবে । তিন প্রকারের অর্থে- যারা সত্ত্বগুণ প্রধান তারাই সাত্ত্বিক, তবে এদের মধ্যে কিন্তু অপর দুটি গুণও রয়েছে কিন্তু সেগুলি সত্ত্বগুণ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এইভাবে রজোগুণপ্রধান ব্যক্তিগণ রাজসিক এবং তমোগুণ- প্রধান ব্যক্তিগণ তামসিক—এইরূপ ধরা হয়। সাত্ত্বিক ব্যক্তিরা সাধারণত বিচারপ্রধান হন, এঁরা বিবেক পরিচালিত বুদ্ধির সহায়তায় কাজ করেন। সমাজের খুব একটা ক্ষতি এঁদের দ্বারা সচরাচর হয় না। এঁদের জ্ঞানমার্গ—এই মার্গে সিদ্ধরা জ্ঞানী বলে বিবেচিত হন। এঁদের উদ্দেশ্য আত্মতত্ত্ব বা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ। রাজসিক ব্যক্তিগণ ইচ্ছাপ্রধান হ’ন, এঁরা অভ্যাসযোগের দ্বারা চরম লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যান—এঁদের যোগমার্গী বলা হয়, সিদ্ধ হলে এঁরা যোগীরূপে পরিগণিত হ’ন, এঁদের উদ্দেশ্য পরমাত্মার সঙ্গে ব্যক্তিরূপ জীবাত্মার মিলন। তামসিক ব্যক্তিগণ ভাবপ্রধান হন, এঁদের ভাব-উচ্ছ্বাস বেশী থাকে। ভক্তিযোগই এঁদের উপায়, ভক্তিযোগে সিদ্ধ হলে এঁরা ভক্তশ্রেষ্ট হ’ন, ভগবানের সঙ্গে সাযুজ্যলাভই এঁদের উদ্দেশ্য। তবে বিশুদ্ধ সত্ত্বগুণী আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরাও সমাজে রয়েছেন, যাঁদের মধ্যে সত্ত্ব ছাড়া বাকী দুটি গুণের কোন ক্রিয়া থাকে না। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যেমন কার্বনই কয়লা আবার হীরা। আর কয়লার খনিতেই হীরা পাওয়া যায়। কয়লা যদি একবার হীরায় পরিণত হয়ে যায় তখন তার মধ্যে আর ময়লা থাকে না। এটাও প্রায় সেইরকমই হয় ।
আর ত্রিগুণাতীত অবস্থাকে পরমহংস অবস্থা বলা হয়। এই অবস্থায় যে কোন ব্যক্তি তা তিনি যে কোন ভাবে মানুষই হোননা কেন, পরমহংস যেন সবার ভাবের ভাবী, তিনি যেন সবার আপন —কাউকেই তিনি উপেক্ষা করেন না। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ নিজে এইরূপ অবস্থায় ছিলেন। তিনি এই অবস্থাটি বোঝাতে একটি সুন্দর গল্প বলেছিলেন—একটি ধোপার কাপড়ে রঙ করার জন্য বিভিন্ন রঙ- গোলার গামলা ছিল। যে কোন খরিদ্দার তার কাছে আসত আর যে কাপড়ে যে রঙ করার জন্য সে বলত — ধোপা তার সঠিক গামলায় কাপড়টিকে ডুবিয়ে চাহিদামত রঙ করে দিত। এক ব্যক্তি অনেকক্ষণ ধরে ধোপার এই অদ্ভুত কাজকর্ম লক্ষ্য করছিল। সবাই চলে গেলে সেই ব্যক্তি ঐ ধোপার্টির নিকট গিয়ে তাকে বলল, “আমি বিশেষ কোন একটা রঙ চাই না—তুমি নিজে যে রঙে রেঙেছ, আমাকে সেই রঙে রাঙাও।” তাই দেখা যায় পরমহংসের সব গুণই রয়েছে কিন্তু তিনি কোন গুণের অধীন নন—এটাই ত্রিগুণাতীত অবস্থা। তবে কথা হচ্ছে —যে গুণের অধিকারীই হও না কেন তাতে কিছু যায় আসে না কিন্তু নিজ-নিজ স্বভাব বা প্রকৃতি অনুসারে ঈশ্বরে মন রেখে কর্ম করে যাও । “কর্ম হোক তোমার ধ্যান, ধ্যানে ভর করুক জ্ঞান আর জ্ঞানের সিংহাসনে বিরাজ করুক প্রেম।”—এটাই ধর্মবিজ্ঞান। এই ক্রমকে জীবনে আচরণ করতে পারলেই মানবজীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য সফল হবে।