জিজ্ঞাসু—ইউরোপে ঠাণ্ডা বেশী বলেই কি লোকে মাংস বেশী খায় আর আমাদের এখানে কেমন খাদ্য খাওয়া উচিত ?

গুরুমহারাজ—হ্যাঁ, মাংস আর মদ অর্থাৎ প্রোটিনজাতীয় খাদ্য আর অ্যালকোহল বা wine শীতপ্রধান দেশে শরীরকে চাঙ্গা রাখতে সাহায্য করে। তবে আধুনিক বিজ্ঞানীরা দেখছে যে, ভারতবর্ষের আর্য- ঋষিরা যে নিরামিষ আহার গ্রহণের কথা বলে গিয়েছিলেন সেটাই যথার্থ। ইউরোপীয় বিজ্ঞানীরাও বর্তমানে নিরামিষ আহারের জয়গান গাইছে, ওরা বলছে প্রাণিজ প্রোটিন অপেক্ষা উদ্ভিজ্‌জ প্রোটিন শরীরের পক্ষে হিতকর। প্রাণিজ প্রোটিনে যে uric acid রয়েছে তা শরীরের পক্ষে খুবই অনিষ্টকারী। ভারতীয় আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে একে বিপাক-বিষ বলা হয়েছে। তাই এখানে তোমরা যারা আমিষ খাবার খাও বা খেতে বাধ্য হও তারা কতকগুলো সতর্কতা নেবে তাহলে আমিষজাতীয় দ্রব্যাদির uric অ্যাসিড আর অতটা ক্রিয়াশীল হবে না। মাছ রান্না করার আগে সেগুলিকে কেটে ও ভালোভাবে ধুয়ে – বেছে নিয়ে অন্তত ১৫-২০ মিনিট নুন এবং হলুদ মাখিয়ে রেখে দিতে হবে। আর টাটকা মাছ না ভেজে কাঁচাই ঝাল বা ঝোলে ফেলে রান্না করতে হয়। বাসি-পচা মাছ একদম না খাওয়াই ভালো। অবশ্য ইলিশ মাছ টাটকা পাওয়া যায় না, বরফ দেওয়া ইলিশ মাছ বাছার সময় ফুলকা এবং লেজের মাঝখানটা কেটে বাদ দিতে হয়। মাংস রান্না করতে হলে মাংস ভালো করে ধুয়ে নিয়ে কিছুটা টকদই এবং কাঁচা পেঁয়াজবাটা মাখিয়ে খানিকক্ষণ রাখতে হয়। এইভাবে প্রাণিজ প্রোটিনের বিপাক-বিষ নষ্ট করা যায়। আর উদ্ভিজ্জ প্রোটিনে সাধারণত uric acid না থাকায় মানুষের শরীরের পক্ষে এগুলি খুবই উপকারী। আর্যঋষিরা ভারতীয়দের খাদ্য বোঝাতে গিয়ে বলেছিলেন —পত্রম- পুষ্পম্‌-ফলম-নালম্-কন্দম্। পরবর্তীকালে ভারতবর্ষে বারবার বিদেশী অনুপ্রবেশ ঘটেছে, ফলে ভারতীয় খাদ্যরীতির ঘটেছে পরিবর্তন। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীতে যেভাবে মারাত্মক ব্যাধি মানুষের সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে তা সত্যিই ভয়ঙ্কর। সুতরাং প্রতিটি সমাজ-সচেতন এবং স্বাস্থ্যসচেতন ব্যক্তির উচিত ভারতীয় জলবায়ুর অনুকুল খাদ্য গ্রহণ করা। বিশেষত নিরামিষ আহার গ্রহণকারীর মারাত্মক রোগ-ব্যাধি হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। তাই শরীর সুস্থ রাখতে এবং নীরোগশরীরে দীর্ঘজীবন লাভ করতে নিরামিষ আহারের কোন বিকল্প নেই। উগ্র ঝাল-মশলাযুক্ত খাবার খেলে মানুষের মানসিকতাও উগ্র হয়, ধীরে ধীরে স্বভাবটাই উগ্র হয়ে যায়। এইভাবে অত্যধিক উত্তেজনাপ্রবণ ব্যক্তি যৌবনের শেষভাগে নানান ক্ষয়জাতীয় রোগে ভোগে । অথচ নিরামিষভোজী মানুষের শরীর সুস্থ থাকায় মনও ধীরে ধীরে শান্ত হয় ফলে তার শান্তস্বভাবে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, অর্থাৎ এদের অন্তঃক্ষরা গ্রন্থিসমূহের সাম্যভাব বজায় থাকে। এই কারণেই এদের রোগ-ব্যাধিও কম হয় আবার এরা সাধারণত দীর্ঘায়ুও হয়।

জিজ্ঞাসু—কিছুদিন আগে (১৯৯০ খ্রীষ্টাব্দে) আপনি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরে এলেন, কিভাবে গেলেন এবং ওখানকার কিছু কথা যদি দয়া করে বলেন ?

গুরুমহারাজ—আমার চলাফেরা যা তোমরা দেখ, এর কোনটিই কিন্তু আমার ইচ্ছায় নয়, সবই মা জগদম্বার ইচ্ছায়। তাঁর কাজে তিনি আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আমি এখান থেকে বেড়াতে যাইনি। ওখানকার কিছু সংস্থা আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গিয়েছিল। ফলে ভারত-সরকার আমাকে মাত্র হাতখরচ হিসাবে ২০ ডলার নিয়ে যাবার অনুমতি দিয়েছিল। আমার সাথে ছিল নরওয়ের আলদালের ব্রহ্মকুল শান্তিবু আশ্রমের বিয়ন পিটারসন। অবশ্য বিয়ন এখানকার ভক্তও বটে। যে বিমানে আমরা এখান থেকে গিয়েছিলাম সেটা মস্কো হয়ে যায়। ওখানে flight পাল্টে আমাদের অন্য বিমানে উঠতে হবে। এইরূপ ঠিক আছে কিন্তু সেই বিমানে ওঠার সময় আমাদের দু’জনের টিকিট যদিও পরপর নম্বরের, তবু ঘটনাটা এমন ঘটে গেল যে, সেই বিমানটায় মস্কো থেকে যতজন যেতে পারে তার মধ্যে আমারই শেষ নম্বর, অর্থাৎ বিয়ন এবং তার পরের নম্বরের যাত্রীদের জন্য অন্য বিমান, সেটা আবার অন্য রাস্তা দিয়ে নরওয়ে যাবে। তার মানে হচ্ছে আমি নরওয়ের অসলো বিমানবন্দরে নামার কয়েকঘণ্টা পর বিয়ন সেখানে পৌঁছাবে। যাইহোক এসব সমস্যার থেকেও বড় সমস্যা হ’ল কি, আমার ব্যাগটা ছিল ভারী ফলে সেটা ছিল বিয়নের কাঁধে। আর ওর হাল্কা ব্যাগটা আমার কাঁধে। সর্বনাশ ! যদি বিমানবন্দরে check হয়, তবে হয়তো মহামুস্কিলে পড়ব। ওদের দেশের যা কড়া আইন তাতে হয়তো ঢুকিয়েই দেবে হাজতে। সাত-পাঁচ চিন্তা করতে করতে আমি একাই ঐ বিমানে উঠে পড়লাম, নীচে থেকে শুধু শুনতে পেলাম বিয়ন হাত নেড়ে বলছে, “চিন্তা করো না, কয়েকঘণ্টার মধ্যেই আমিও আসছি।”

যাইহোক অস্‌লো (Oslo) বিমান বন্দরে নেমে ভাবছি কি করা যায় ! বিয়নের ব্যাগটা নিয়েই পায়চারি করছি। সবাই Main gate দিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, আমার তো কোন উপায় নেই। বেরোতে গেলেই ধরবে, তাই পায়চারি করা ছাড়া আর করিই বা কি । কেননা যদিও বা বাইরে যেতে পারি কিন্তু সঙ্গে তো টাকা-পয়সা বেশী নেই আর বিয়নের বাড়ীর ঠিকানাও ভালো জানতাম না। সুতরাং বিয়নের অপেক্ষায় কয়েকঘণ্টা বিমানবন্দরে যা হোক করে কাটাতেই হবে। হঠাৎ মনে হল যেন মা বলছেন, “তুই কি চিন্তা করছিস্, তোর আবার স্বদেশ-বিদেশ কি ?” তখন ভাবলাম— তাইতো আমার আবার বিদেশ কি ! পৃথিবী গ্রহটাই এখন আমার বিচরণক্ষেত্র। মনে হতে লাগল বনগ্রাম আর নরওয়ের অসলো যেন এ-ঘর আর ও-ঘর। আর ঠিক তখনই একজন বিমানবন্দরের কর্মী আমার পরিচয় জিজ্ঞাসা করল। সমগ্র ইউরোপ ঘুরে বেড়ানোর সময় আমি গেরুয়া পোশাক অর্থাৎ গেরুয়া লম্বা পাঞ্জাবী অথবা গেরুয়া আলখাল্লা পরে ঘুরেছি। দেখেছি ওখানকার মানুষ হয় আমাকে ভারতীয় সন্ন্যাসী বলে চিনেছে অথবা আরবের কোন মুসলমান যাজক বলে মনে করেছে। যাইহোক ঐ ব্যক্তি আমার পরিচয় জানতে পেরেই বলে উঠল, “আরে আমি জানতাম তো বিয়নের সঙ্গে আপনি আসছেন। কিন্তু বিয়ন আপনার সাথে না থাকায় ভালোই মজা হোল, আমি আপনাকে Staff- gate দিয়ে বাইরে বের করে দিচ্ছি, ঠিকানাও দিয়ে দিচ্ছি আপনি ওর বাড়ী চলে যান। আমি duty সেরে আপনার সাথে দেখা করব। আর বিয়ন এলে ওর সাথে মজা করব।”

এবার তো বিমানবন্দরের বাইরে এলাম। ভিতরে একরকম আবহাওয়া আর বাইরে সে কি ঠাণ্ডা ! আরও কম তাপমাত্রা, হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা আর তেমনি বাতাস। মনে হোল ভিতরে তবু ভালো ছিলাম, এবার কি করি ? হঠাৎ একটা গাড়ী থেকে একজন মুখ বার করে বলে উঠল, “আপনি কি পরমানন্দ ? ইণ্ডিয়া থেকে আসছেন ? তাহলে চলে আসুন !” ওরা ছিল আন্নাশ্রী আর টুলাইফ। ওরা জানতো যে, আমরা আসব। বিমান land করার পর ওরা wait করছিল যদি আমরা নামি, তাহলে lift দেবে। Oslo বিমানবন্দর থেকে বিয়নের বাড়ী মুশ অর্থাৎ যেখানে ওর বাবা-মা থাকেন, সেখানকার দূরত্ব প্রায় ১৫০ কিমি, আর গাড়ীতে আমাদের পৌঁছতে খুব অল্প সময় লাগল মাত্র ১ ঘণ্টা মতো। ইণ্ডিয়ায় একথা বিশ্বাস করা শক্ত। ওখানকার main রাস্তাগুলো এত সুন্দর, আর এত চওড়া যে, ভাবতে পারবে না। চারটে বা পাঁচটা করে lane রয়েছে আসার জন্য আবার যাবার জন্যও অতগুলি। এক একটা lane-এ গাড়ীর speed ভিন্ন, speed পরিবর্তন করে যে কোন lane-এ ঢোকা যায়, কিন্তু সেই lane-এর speed maintain করতে হবে। না হলেই accident হবে। আর accident না হলেও fine হয়ে যাবে মোটা টাকার। আন্নাশ্রীরা প্রায় ঘণ্টায় ৮০ কিঃমিঃ মতো বেগে গাড়ী চালাচ্ছিল। অন্যান্য গাড়ি যখন পাশের lane-গুলো দিয়ে pass হচ্ছিল তখন শুধু “সুঁই” করে একটা শব্দ হচ্ছিল আর একটা আবছা আলো চকিতে দেখা যাচ্ছিল। ওকে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম রাস্তাগুলো one-way হওয়ায় accident বড় একটা হয় না কিন্তু এত high speed-এ যদি একবার accident হয় তাহলে কিন্তু সাংঘাতিক ঘটনা ঘটে। একটা accident মানেই একসঙ্গে ৫০ থেকে ৬০টা গাড়ীর accident হওয়া। প্রথম ধাক্কা খাওয়া গাড়ীটি অনেক উঁচুতে উঠে যায় তারপর সেটি যে lane-এ পড়ে সেখানে পর পর high speed-এ থাকা গাড়ীগুলো এসে ধাক্কা মারে। আর প্রথমকার গাড়িটা প্রকৃত অর্থেই চিঁড়েচ্যাপ্টা হয়ে যায়। তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে কাজে লাগিয়ে ওরা রাস্তাঘাট তৈরী করেছে আর গতিও বাড়িয়েছে, শুধু যন্ত্রেই নয়— জীবনেরও। কলকাতার জ্যাম্‌-জট্ ঠ্যাঙানো মানুষ চিন্তাই করতে পারবে না যে, কি গতিতে গাড়ি ছোটে ! আর ওরা ট্রেনে চেপে enjoy করতে যায়, সখ মেটাতে যায়, নিজের car এ সব কাজকর্ম যা কিছু সারে। ওদের Inter-European train বা Euro Rail রয়েছে যা সমস্ত ইউরোপের দেশগুলোতে cover করে। কিন্তু তবু দেখলাম জার্মানীর শান্তি (ফ্রেড্ররিকা) নিজের গাড়িতে করেই নরওয়েতে আমার সাথে দেখা করতে এসেছিল। আর আসবে নাইবা কেন—রাস্তা এত ভাল যে, একটুও jerking হয় না, তুমি স্বচ্ছন্দে যে কোন বই বা খবরের কাগজ পড়তে পড়তে গাড়িতে যেতে পারো, কোন অসুবিধা হবে না।

যাইহোক কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বিয়নের বাড়ী পৌঁছে গেলাম। ওর বাবা-মা বাড়ীতেই ছিলেন, ওঁরা জানতেনও যে আমরা আসব। কাজেই অভ্যর্থনা করে আমাদের ভিতরে নিয়ে গেলেন। শীতকালটা ওদের ওখানে Indoor life। কারণ বাইরে – 20°c. থেকে –40°c পর্যন্ত তাপমাত্রা নেমে আসে। আর summer-টা আমাদের এখানকার শীতকালের মতো। ঘরের ভিতরে দেখলাম বেশ comfort – able। ওদের বেশীর ভাগ ঘরই কাঠের তৈরী। ইট-কংক্রিট হলেও ভিতরে কাঠ দিয়ে আবরণ করে নেয়। কারণ কাঠ হচ্ছে তাপের কুপরিবাহী, বাইরের তাপমাত্রাকে ভিতরে আসতে দেয় না। তাই ঘর অপেক্ষাকৃত গরম থাকে। বিয়নের বাবা-মা আমাদেরকে একটু গরম গরম চা-কফি খাওয়ালেন, এতে শরীরটাও বেশ চাঙ্গা হ’ল। এরপর টুলাইফরা বিদায় নিয়ে চলে গেল। ওখানকার প্রতিটি মানুষই খুব ব্যস্ত —এত fast life ওদের যে, চিন্তা করতে পারবে না। Programme না করে অকারণে ওরা সময় নষ্ট করতে পারে না। ওই যে বিমানবন্দরের লোকটি অথবা টুলাইফরা সকলেই পরে পরে আমার সঙ্গে এসে অনেকক্ষণ করে সময় কাটিয়ে গেছে। যেহেতু ঐ দিন ওদের ওখানে আসার কোন programme করা নেই তাই কেউ বেশী সময় নষ্ট করতে পারবে না। সেটা করতে গেলে হয়তো এতটা কাজের ক্ষতি হবে যে, একসপ্তাহ কাজ করেও তা পূরণ করতে পারবে না। ওদের দেশের এইরকমই system l

যাইহোক টুলাইফরা চলে যাবার পর আমি বিয়নের বাবা-মার সাথে নানারকম গল্প করতে লাগলাম। বিয়নের বাবা বেশ মজাদার লোক, India সম্বন্ধে বেশ খোঁজ-খবরও রাখেন ফলে আলাপ খুব দ্রুত জমে গেল। এদিকে রাত্রি ১০টা — ১০-৩০মিঃ হয়ে গেল কিন্তু যেন মনে হচ্ছে বাইরে আলো আলো ভাব। কাচের জানালা দিয়ে বাইরেটা দেখা যাচ্ছে যদিও ঘরে আলো জ্বলছিল। আমি প্রথমটায় অতটা খেয়াল করিনি। বিয়নের জন্য খানিকক্ষণ অপেক্ষা করার পর আমরা রাত্রির খাওয়া সেরে যে যার ঘরে শুতে গেলাম। আমার ভালো ঘুম হ’ল না, কিছুক্ষণ পর জেগে দেখি বাইরে আলো, ফলে আমি উঠে পড়ে হাত-মুখ ধুয়ে বাইরে tea-table-এ অপেক্ষা করতে লাগলাম। একি রে বাবা ! কেউ যে আর ওঠেই না ! বৃদ্ধ-বৃদ্ধা তো খুব ঘুমায়-বেলা দুপুরে উঠবে না কি ! এইসব ভাবতে ভাবতেই হয়তো আমার কথা ভেবেই ওনারা উঠে এলেন—বললেন “Good morning”। আমি মনে মনে ভাবলাম morning তো কখন হয়ে গেছে তবু বললাম “Good morn- ing !” ওনারা এবার আমাকে হাসতে হাসতে বললেন এত সকাল- সকাল উঠেছ কেন ? এখন তো ভোরও হয়নি। মুহূর্তের মধ্যে আমার স্মৃতিতে খেলে গেল—ওঃ তাই তো আমি এখন নরওয়েতে রয়েছি, উত্তরমেরুর কাছাকাছি। এ দেশটা ‘The land of midnight Sun —নিশীথ সূর্যের দেশ। ওখানে রাত্রিবেলাতেও বেশ ভালোই আলো থাকে—আলোটা কেমন জান তো ম্লান অথচ পরিষ্কার আলো, তুমি পড়াশোনা করতে পারবে সেই আলোয় এবং মোটামুটি বাইরের সবকিছু স্পষ্টই দেখতে পাবে। সুতরাং আমার তো ভ্রান্তি আসাই স্বাভাবিক। সারাজীবনইণ্ডিয়ায় কাটিয়েছি—জীবনে প্রথমবার এই অভিজ্ঞতা। তখন উনি বললেন আমরা ঘড়ি ধরে একটা নির্দিষ্ট সময়কে মধ্যরাত্রি মনে করে বিছানায় শুয়ে পড়ি। রাস্তাঘাটে দোকানপাটও সেইরকমভাবে বন্ধ থাকে। যদিও বাইরে আলো কিন্তু রাস্তাঘাট বন্ধ, বাজার বন্ধ আবার নির্দিষ্ট সময়ে সবাই ঘুম থেকে ওঠে, দোকান খোলে, ছেলে-মেয়েরা স্কুলে যায় —বেশ মজার ব্যাপার। তবে আমার ঐ একটা দিনই অসুবিধা হয়েছিল। পরে আমি ঐ ব্যাপারে নিজেকে অভ্যস্ত করে নিয়েছিলাম। সকালে চা খাওয়া আমাদের শেষ হয়েছে এমন সময় বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত বিয়ন এসে হাজির। ও বিমানবন্দরে নেমে আমাকে প্রচুর খুঁজেছে—পায়নি। ভয়ে বাড়িতে টেলিফোনও করতে পারেনি। অনেক খোঁজাখুঁজির পর বিমানবন্দরে ঐ কর্মীর সাথে দেখা। ও বলেছে যে, আমি স্বামী পরমানন্দকে বাইরে বেরিয়ে যেতে সাহায্য করেছি এবং তোমার বন্ধুর গাড়িতে করে তোমার বাড়িতে চলে গেছেন। তারপর ও বাড়ীতে আমাকে বেশ আয়েশ করে বসে থাকতে দেখে যেমন অবাক এবং নিশ্চিন্ত হল তেমনি আমাকে রাগও দেখাল। আমাকে বলল, “বিদেশ-বিভুঁই জায়গা, এখানকার আইন-কানুন আলাদা, যদি কোন বিপদ হোত, তুমি আমার নির্দেশ মানলে না কেন ?” আমি বললাম আমি মায়ের নির্দেশে চলি, মা আমাকে বলল —“পরমানন্দ, অপেক্ষা করার সময় নেই—জীবনকাল সংক্ষিপ্ত, যা করার দ্রুত করতে হবে। বেরিয়ে পড়—ঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে যাবি।” ফলে আমিও বেরিয়ে পড়লাম। দ্যাখো তোমার একটু উদ্বিগ্নতা হোল বটে কিন্তু আমি তো ঠিক পৌঁছে গেছি। Fresh হবার পর ওর রাগ ভাঙলে ও আমাকে বলল “সত্যিই তুমি অদ্ভুত—আর তোমার ব্যাপারে কখনও উদ্বিগ্ন হব না।”

বিয়নের বাড়ী থেকে আমরা ‘ব্রহ্মকুল শান্তিবু’ আশ্রমে গেলাম, ওটা আলদাল নামে একটা জায়গায়। ওখানে বহু পূর্বে আনন্দ আচার্য নামে একজন ভারতীয় (বাঙালীও বটে) সন্ন্যাসী আশ্রম করে ছিলেন। তাঁর ইচ্ছা ছিল ওখান থেকে গোটা পৃথিবীতে শান্তির বাণী ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু মানুষ যা ভাবে, তা কি হয় ! ওনার মৃত্যুর পর সুযোগ্য উত্তরসূরির অভাবে আশ্রমটা ফাঁকাই পড়েছিল। এদিকে নরওয়ে গভর্ণমেন্টের চার্চ বা অন্য ধর্মস্থানসংক্রান্ত আইন রয়েছে। কিন্তু আশ্রমসংক্রান্ত কোন আইন নেই। ফলে জায়গাটি নিয়ে ওখানকার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও নানান ঝামেলায় ছিল। তারপর বিয়ন ভারতীয় আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে যখন ঐ আশ্রমের দায়িত্ব নিতে চাইল তখন ওখানকার মিউনিসি- প্যালিটিও হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। সেই থেকে ঐ আশ্রমটির এখন বিয়নের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ওখান থেকেই নরওয়েতে যে Peace – Univers sity হবার কথা রয়েছে, তার কাজ শুরু হয়েছে। নরওয়ে যাবার আমার অন্যতম উদ্দেশ্যও ছিল এটাই। ব্রহ্মকুল শান্তিবু আশ্রমের যিনি প্রতিষ্ঠাতা অর্থাৎ আনন্দ আচার্য তাঁর একটা ইচ্ছা ছিল নরওয়ের ঐ স্থানকে কেন্দ্র করে গোটা বিশ্বে শান্তির বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক। তিনি কিছু কাজও করে গিয়েছিলেন এই ব্যাপারে। তাঁর লেখা বিভিন্ন বই রয়েছে ইংরেজী ও নরওয়েজিয়ান ভাষায়, যেগুলি পাঠ করে ওখানকার মানুষের মনে একটা প্রভাব পড়ে। তাছাড়া এমনিতেই দেখবে নরওয়েবাসীরা শান্তিপ্রিয় মানুষ। বিশ্বের যে কোন প্রান্তে শান্তি-প্রস্তাব বা ঝামেলা মেটানোর ব্যবস্থা করতে সবার আগে ওরা ছোটে। বহুপূর্বে নরওয়েবাসীরা যুদ্ধপ্রিয় ছিল, কিন্তু বর্তমানে ওরা খুবই শান্তিপ্রিয় জাতি। আর হিমালয়ের পরিবেশের সঙ্গে নরওয়ের বিভিন্ন স্থানের পরিবেশ খুবই মেলে, বিশেষত Peace – University যেখানে হচ্ছে মাউন্ট্ থর্ণ (Mt-throne) নামক পাহাড়কে ঘিরে। ওখানে গেলেই তোমার মনে হবে হিমালয়ান পরিবেশে এসে পড়েছ। গ্লোম্মা নদী উচ্চ অববাহিকার গঙ্গাকে মনে পড়ায়। এইসব দেখে নিশ্চয়ই আনন্দ আচার্যের খুব ভালো লেগেছিল এবং বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার কথা মাথায় এসেছিল। তবে নরওয়ে যাবার পর আমারও খুব ভালো লেগেছে। মহাভারতের সময় থেকে বা তারও আগে থেকে ওদের সঙ্গে ভারতবর্ষের যোগাযোগ ছিল। মহাভারতে দেশটিকে ‘উত্তরকুরু’ নামে অভিহিত করা হয়েছে। ওখানকার মানুষগুলোকে বলা হত ‘হয়গ্রীব’ জাতি। ‘হয়’ মানে ঘোড়া, ওদের গ্রীবা খুব উন্নত ছিল বলে এইরূপ নামকরণ হয়েছিল। মহাভারতের যুদ্ধে ওরা কৌরবপক্ষে যোগ দিয়েছিল এবং প্রচুর ঘোড়া সরবরাহ করেছিল।

তবে আমাদের বর্তমানের ইউরোপ নিয়ে কথা হচ্ছিল। উন্নত দেশগুলি যেমন নরওয়ে, জার্মানী, ফ্রান্স, ইংলণ্ড, ইতালি, সুইডেন, সুইজারল্যাণ্ড ইত্যাদি সকলদেশেই material science-এর উন্নতি এবং তার ব্যবহারিক প্রয়োগ দেখলে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না ! Ma chine বিশেষত computer-কে কাজে লাগিয়ে ওরা manual labour- কে এখানকার থেকে সহস্রগুণে কমিয়ে এনেছে। কারণ ওসব দেশে ১০০% লোক শিক্ষিত হওয়ায় labour problem অর্থাৎ physical work করার লোক কোথায় ? যে কোন Super Market-এ গিয়ে তুমি দেখবে যে, সেটি maintain করছে একটি বা দুটি লোকে। তোমার পছন্দসই মাল নেবার পর একটা নির্দিষ্ট স্থানে রাখলেই তা automati- cally packed হয়ে চলে আসছে আর bill-ও চলে আসছে একেবারে হাতে। এবার শুধু counter-এ payment করতে পারলেই হ’ল। তাই বলে ঐ সহস্র সহস্র মালের মধ্যে কিছু চুরি করতে পারবে না। Closed-circuit T.V-র মাধ্যমে সবকিছু record হয়ে যাচ্ছে—একটু উল্টো-পাল্টা হলেই ধরে ফেলবে। যে কোন Railway Station-এর টিকিট counter-এ হয়তো কোন কর্মীই নেই। নির্দিষ্ট পয়সা ঢোকালে আপনা-আপনিই টিকিট বের হয়ে আসবে। এবার gate-এ ঐ টিকিটটা একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ঢোকালে তবেই gate খুলবে, অন্যথায় নয়। ভিতরে ঢুকে তুমি আবার ঐ টিকিটটা পেয়ে যাবে। আমাদের দেশে পাতালরেলে কিছুটা এইরকম উন্নত ব্যবস্থা করার চেষ্টা চলছে তবে ওদের দেশের মতো এতটা নিখুঁত হওয়া মুস্কিল। ওদের যেমন উন্নত অত্যাধুনিক ব্যবস্থা তেমনি দেখলাম সরকারকে ফাঁকি দেবার বা ঠকাবার মানসিকতাও কম। আর মানসিকতা থাকলেও ওরা তা করতে পারে না। শাস্তির ভয়ে। উন্নত দেশগুলোয় শাসনব্যবস্থা এত কড়া ও disciplined যে, অন্যায়কারীর এতবেশী অর্থনৈতিক শাস্তি হয় যাতে ওরা বড় একটা অন্যায় করতে চায় না।

নরওয়েতে কয়েকদিন থাকার পর যখন আমার বেশ কয়েকজন বন্ধু হয়ে গেল তখন ওরা আমাকে একেবারে North pole- এর কাছাকাছি ‘হামারফেক্টের’ দিকে বেড়াতে নিয়ে গেল। ওখানে তখন তাপমাত্রা মাইনাস 50°c, ঐ অঞ্চলে বেশীর ভাগ লোক ‘স্কী’ (skee) করতে যায়। নরওয়েতে এমনিতেই লোকসংখ্যা কম, গোটাদেশে মাত্র 40/45 লক্ষ মতো। আবার একদম ঠাণ্ডা অঞ্চলগুলোতে লোকসংখ্যা আরও কম। মাইলের পর মাইল শুধু বরফ আর বরফ। ফলে ওখানে যত ইচ্ছা ‘স্কী’ কর। ওদের দেখাদেখি আমিও ‘স্কী’ করতে চাইলাম, ওরা রাজি হলনা। বলল—না শিখে এই এলাকায় ‘স্কী’ করা খুবই risk-এর। যারা একদম নতুন তারা স্পীডে প্রায়ই পড়ে যায় আর পড়লেই কোমর কিংবা ঘাড় ভেঙে যায়। আমি বললাম : ‘আমার নিজের risk, দাও তো স্প্রীং-এর জুতো আর stick-দুটো তারপর দেখা যাবে।’ প্রথমটায় একটু অসুবিধা হ’ল, তারপর একদম ওদের মধ্যে যারা সবচাইতে expert তাদের সাথে ‘স্কী’ করতে করতে বহুদূর চলে গেলাম। আবার নিরাপদে ফিরেও এলাম। ওরা একটু অবাক হ’ল, আমি বললাম আমার পূর্ব পূর্ব জীবনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তবে জানো—যে কোন জিনিস শিখতে আমার বেশী সময় লাগে না, ছোটবেলায় যখন সাইকেল চালানো শিখি তখন একচান্সেই শিখে- ছিলাম। মোটর সাইকেলে যখন হাত দিই তখন কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তা আয়ত্ত করেছিলাম, আবার যখন মোটর গাড়ির steering-এ হাত রাখলাম তাও কয়েকঘণ্টার মধ্যেই ওর সমস্ত function করায়ত্ত হয়ে গেল। যে কোন foreign language কয়েকদিনের মধ্যেই শিখে নিতে পারি এবং সেই ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারি। আর ইতালিয়ান ভাষার যেহেতু প্রাচীন ল্যাটিন ও সংস্কৃতের সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে, ফলে ওটা শিখতে আমার মাত্র কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছিল। যে কোন মানুষও এটা করতে পারে। আসল ব্যাপার হচ্ছে concentration of mind, যে মানুষের মনের একাগ্রতা যত বেশী, কর্মদক্ষতা তার তত বেশী। কোন বিষয়ের উপর প্রভুত্ব করতে গেলে তোমাকে সেই বিষয়ের উপর 100% concentration দেওয়া প্রয়োজন। এইভাবে যার যেটুকু বা যত পারসেন্ট মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা, সে ততটাই সেই ব্যাপারে জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এবার কথা উঠতে পারে যে, concentration বা মনোযোগ বাড়ানো যায় কি করে ? হ্যাঁ, এর একমাত্র উপায় ধ্যানের গভীরে ঢোকা। সকাল-সন্ধ্যা ব্রাহ্মমুহূর্তে নির্দিষ্ট আসন ও প্রাণায়াম করে পবিত্র চিত্তে শান্তভাবে নির্জনে বা নীরবতার মধ্যে বসে ধ্যানাভ্যাস করতে হয়, তাহলেই মনোযোগের ‘পারসেণ্ট’ বাড়তে থাকবে। এইজন্যই তো ছোটবেলা থেকেই আমি কোন না কোন নির্জনস্থান যেমন শ্মশান, কবর-স্থান অথবা জীর্ণ বা ভেঙে যাওয়া পরিত্যক্ত মন্দিরকে বেছে নিতাম ধ্যান-অভ্যাস করার জন্য।

যাইহোক, নরওয়ের সবচাইতে সুন্দর, নয়নাভিরাম দৃশ্য হ’ল মেরুজ্যোতি। ওটা দেখতে এত beautiful লাগে যে, ভাষায় বর্ণনা করা মুস্কিল। মেরুপ্রদেশে পৃথিবীর magnetic induction-এ আয়নমণ্ডলের আয়নগুলি ক্ষণে ক্ষণে আকর্ষিত হয় এবং ঐ রকম ঘটনা ঘটে। এত বিচিত্র বর্ণের আলোকছটায় আকাশ ক্ষণে ক্ষণে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে যে, তোমার মনে হবে এই মনোহর দৃশ্যের দিকে শুধু তাকিয়েই থাকি। ওরা হঠাৎ করে ওখানে নিয়ে গিয়ে ভেবেছিল আমাকে অবাক করে দেবে। তাই আমার কাছে ওরা জানতে চাইল আমার অনুভূতি। আমি শুধু বললাম, ‘সুন্দর’। পৃথিবীগ্রহের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরাশির মধ্যে মেরুজ্যোতি নিশ্চয়ই অন্যতম সুন্দর দৃশ্য।

নরওয়েতে ওরা সবচাইতে মুস্কিলে পড়েছিল যখন আমি বললাম আমি কোন ভাষণ বা lecture দেব না—আমি তোমাদের সকলের সাথে আলোচনা করব। তোমরা যাদের খুশি আমন্ত্রণ কর তাদের সাথে আমার জিজ্ঞাসা-উত্তরের আসর হবে। এটাই ভারতীয় ঋষি-পরম্পরা পদ্ধতি। উপনিষদ সমেত বেদাদি শাস্ত্রসমূহ এইভাবেই উদ্‌গীত হয়েছে। ঋষি পরম্পরায় শিক্ষাদান এই পদ্ধতিতেই চলে এসেছে।সর্বোপরি শিক্ষাদান ও গ্রহণের এটাই সর্বোৎকৃষ্ট পন্থা। কিন্তু মুস্কিল হ’ল ওদের দেশে তো outdoor sitting করাই যায় না। ভারতবর্ষের আবহাওয়ায় ফাঁকা মাঠে Pandel খাটিয়ে অথবা গাছতলায় চাটাই পেতে ধর্মালোচনা করা যায়। আর ওখানে সবই Indoor, তার ফলে দোকান, গাড়ি, মার্কেট, অফিস, স্কুল প্রভৃতি সবই air-conditioned। সুতরাং ওরা auditorium ভাড়া করল, সেখানেই আমাদের আলোচনা চলত। আর রাত্রে কারও বাড়ীতে বা শান্তিবু আশ্রমে ঘরোয়া পরিবেশে নিজেদের মধ্যে আলোচনা হত । ওদেশে এই ব্যাপারটা নতুন, ওখানে টিকিট কেটে auditorium-গুলোয় লোকে ভাষণ শুনতে যায়। কিন্তু ঘরোয়া পরিবেশে জিজ্ঞাসা-উত্তর ব্যাপারটা ওদের একদমই নেই। ফলে দু’চারদিনের মধ্যেই মানুষগুলোর সঙ্গে আমার একটা অন্তরঙ্গতা গড়ে উঠল। ওরা বলল যে, ওদের ধারণা ছিল যে, ধর্মালোচনা শুনতে গেলে টিকিট কেটেই শুনতে হয় আর টিকিটের মূল্য যত বেশী বক্তৃতার quality ততই ভালো, মজাটা বোঝ একবার। বিয়ন, টুলাইফ এরাও অবশ্য প্রথমটায় চেয়েছিল যে, আমি ভাষণ বা বক্তৃতা দিই যেহেতু ওটাই ওদের দেশে চলে। কিন্তু আমি পরিষ্কার বলে দিয়েছিলাম যে, আমি বক্তৃতা বিক্রি করব না তাতে যদি কোন লোক না আসে তাহলে তোমরা তো রইলে। কিন্তু উল্টোটাই হ’ল—প্রচুর লোক তো এলই এবং তাদের অধিকাংশই ধীরে ধীরে নিকটজন হয়ে গেল—বন্ধু হয়ে গেল। তারাই আবার আমাকে বিভিন্ন Institute-এ আমন্ত্রণ করে নিয়ে যেতে লাগল। একটা Institute-এ post-graduate level-এ একটা course আছে যেখানে বিভিন্ন দেশের দর্শন, সমাজ-ব্যবস্থা, ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা হয়। বিভিন্ন class-এ বিভিন্ন teacher-রা ভিন্ন-ভিন্ন subject পড়ান। কিভাবে খবর পেয়ে ঐ Institute আমাকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে গেল হিন্দুদর্শন এবং বৌদ্ধ- দর্শন সম্বন্ধে কিছু বলার জন্য। হিন্দু সন্ন্যাসীর থেকেও বৌদ্ধসন্ন্যাসীকে দেখলাম ওরা বেশী চেনে। ফলে ওরা অনেকেই আমাকে বৌদ্ধসন্ন্যাসী বলে সম্বোধন করেছিল। যাইহোক ঐ দিন আমি প্রায় ৬/৭ ঘণ্টা টানা বিভিন্ন Section-এ গিয়ে আলোচনা করলাম। এই ঘটনাটায় ওদের student এমনকি teacher-রাও এতটা বিস্মিত হ’ল যে, ওরা সেটা আমার কাছে প্রকাশ না করে পারল না। ওরা বলল, “বিভিন্ন Uni- versity-র student-রা এখানে পড়তে আসে। এরা বেশীর ভাগই Research-scholar. ফলে যে কোন section-এর teacher-রাই অনেক সময় নানান প্রশ্নে নাস্তানাবুদ হয়ে যান আর আপনি একজন সন্ন্যাসী হয়ে এতগুলো ভিন্ন ভিন্ন section-এ ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ের উপর এত নিখুঁত বলে গেলেন এবং বিভিন্ন জিজ্ঞাসার উত্তর দিলেন যে, ছাত্ররা অভিভূত এবং আমরাও অভিভূত !” এই বলে তারা কিছু টাকা আমাকে দিতে এল। আমি অসম্মত হওয়ায় ওরা খুবই দুঃখিত হ’ল এবং বলল যে, ওদের University-র একটা নিয়ম রয়েছে যে, বিনা পারিশ্রমিকে কোন class করানো যায় না। ফলে যেহেতু ৫/৬ টা class হয়েছে, অতএব সঙ্গে সঙ্গে নির্দিষ্ট টাকাটাও allot হয়ে গেছে।

এক বছরের মধ্যে আমাকে ইউরোপের ১৬টা দেশ ঘুরতে হয়েছে। ওসব দেশে জিনিসপত্র এত high-price যে, ভালোমতো income না থাকলে মানুষ খেতে পাবে না। সেইরকম দেশগুলোতে আমি একবছর কাটালাম এবং ষোলটা দেশে ক্রমাগত এ প্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত ঘুরলাম—কি যে কষ্টসাধ্য ব্যাপার তা কল্পনা করতে পারবে না ! এমন হয়েছে যে, হয়তো পরের দিন কোথাও যাবার কথা অথচ পয়সা নেই, সবাই চলে যাবার পর দেখা গেল একটা packet পড়ে রয়েছে আর তাতে কিছু dollar রয়েছে। সামনা-সামনি দিলে যদি নিতে অস্বীকার করি তাই প্রণাম করার সময় পাশে রেখে দিয়ে চলে গেছে। কোন দেশে যাবার আগে বিমানে টিকিট কাটার পয়সা নেই। হঠাৎ আগের দিন কেউ একজন এসে জিজ্ঞাসা করল, “আপনার কি টিকিট কাটা হয়ে গেছে ?” আমি যেই বললাম, ‘না হয়নি’। অমনি সে আনন্দের সঙ্গে টিকিট কাটার দায়িত্ব নিয়ে নিল এবং এও বলল যে, যদি আমি না নিই তাহলে খুবই দুঃখিত হবে। এইরকম কতই বা উদাহরণ দেবো। তবে এইরকম ক্ষেত্রে কিন্তু বেশীরভাগই কোন না কোন সহৃদয় মহিলা এগিয়ে এসেছেন। মা জগদম্বা আমাকে বলেই দিয়েছিলেন, “তোর কোথাও কোন অসুবিধা হবে না, আমি সবসময় তোর সাথে আছি’। ফলে আমি কখনও উদ্বিগ্ন হইনি, জানতাম যে কোন ভাবে যে কোন সমস্যার সমাধান হবেই। তবে মায়ের ইচ্ছায় মাতৃরূপিণীরাই অর্থাৎ মহিলারাই আমাকে সব চাইতে বেশী সাহায্য করেছেন বা আমার পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন।