জিজ্ঞাসু—ইতালির Marco বলে যে ছেলেটা এসেছিল ওর চেহারা কি সুন্দর !

গুরুমহারাজ—ইতালির কারারায় ওর সাথে আলাপ হয়েছিল। ছেলেটা খুবই ভালো তবে ওর স্ত্রী ‘এমেনা ওর তুলনায় কত ছোট, আমাদের এখানে হলে লোকে বলত, “সাজন্ত হয়নি”। কিন্তু ওরা দুজনেই খুব ভালো। Marco ওখানকার Black-belt। ওদের একটা Judo- ক্যারাটের ক্লাব রয়েছে। ওখানে একদিন একটা sitting-এ আমি ভারতীয় Martial Art সম্বন্ধে কথা বলছিলাম। ভারতীয় বৌদ্ধ সাধু-সন্তরাই ভারতীয় Martial Art-কে বিশ্বের দরবারে নিয়ে গেছে। প্রথমে তিব্বত, চীন, জাপান হয়ে বিভিন্ন জায়গায় যায়। ভারতীয় বৌদ্ধ ভিক্ষুরা যখন চীনে ধর্মপ্রচারের জন্য গিয়েছিল তখন হাঁটাপথে তিব্বত হয়ে চীনে গিয়েছিল। সেইসময় চীনে চরম অরাজক অবস্থা চলছিল। চারিদিকে খুনোখুনি, লুটতরাজ। মানুষ খেতে পেত না, ফলে এসব করে দিনাতিপাত করত। প্রথম দিকে বহু বৌদ্ধ ভিক্ষু মারা যান। পরে ওরা ভারতীয় Martial Art রপ্ত করে নেয়, তারপর ধর্মপ্রচারে যায়। ফলে দেখবে এখনও সাওলিন, নিন্জা ইত্যাদির গুরুরা সাধুর ন্যায় পোশাক পরেন আর ‘সাওলিন টেম্মল’ তো ধর্মীয় স্থানই—সেখানকার আবাসিকরাও সাধু।

যাইহোক আলোচনা চলাকালীন Marco হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে আমাকে challenge করল, বলল, “আপনি যা বলছেন তাতে বোঝা যাচ্ছে যে, ক্যারাটে, কুফু ইত্যাদি সবকিছুই ভারতীয় সাধুরা বিশ্বকে শিখিয়েছে, তা আপনিও তো একজন ভারতীয় সাধু, আপনি কি কিছু জানেন, না বাজে বকে যাচ্ছেন ?” ওর সরাসরি বক্তব্যে আমি কিছুটা অবাক হলেও ইউরোপীয়দের স্বভাব আমার জানা। তাই বললাম, “জানি বইকি ?” ও বলল, ‘তাহলে উঠে আসুন, দেখা যাক আপনি কি জানেন!’ আমি উঠতে যাচ্ছি ওখানকার আমার বন্ধুরা বলল, ‘যাবেন না গুরুজী, Marco এখানকার Black belt”, আমি বললাম, ‘Black – ই হোক আর White-ই হোক challenge যখন accept করেছি, তখন তো যেতেই হবে।’ যারা বসে ছিল তারা সরে গিয়ে জায়গা করে দিল, শুরু হোল মারামারি। ও ক্যারাটে আর কুফু জানে কিন্তু আমি প্রয়োগ করলাম তাই-চি—তাই-চি-র woman style। এতে প্রতিপক্ষের সমস্ত আক্রমণ প্রতিহত করা যাবে বা এড়িয়ে যাওয়া যাবে আর তারই ‘মার’ তাকেই ফিরিয়ে দেওয়া যাবে। কিছুক্ষণ ও বৃথা চেষ্টা করে গেল, তারপর একটা kick করতে গেল যেই অমনি আমি একটা বিশেষ প্যাঁচে ফেলে দিলাম, তারপর position নিতেই ও surrender করল। তারপর ওর সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল। দীক্ষাও নিল। ইতালিতে ও খুব সঙ্গ করেছে আমার। সমস্ত কাজ ফেলে সব ক’দিন সঙ্গে থেকেছে। ওর কি চেহারা দেখছিস, জার্মানীর একজন ভক্ত শিমন্ ক্র্যাফট্ যদি কখনও আসে, তাহলে ওর শরীর দেখবি ! সত্যিই Martial Art-এর ideal চেহারা।

জিজ্ঞাসু—তবে ইউরোপের মধ্যে সবচাইতে সভ্য দেশ ফ্রান্স— তাই নয়কি ?

গুরুমহারাজ—আর বোলো না ফ্রান্সের কথা! প্রথমবিশ্বের দেশগুলির যত শহর আছে তারমধ্যে সবচেয়ে নোংরা Paris । ওদের ভাষা, সাহিত্য, শিল্প সব কিছুই ভারতীয় চোখে অশ্লীল। আবার দেখো, ফরাসীরা প্রচণ্ড আত্মগর্বী-অহঙ্কারী, নিজেদেরকে খুবই উন্নত ভাবে। অপরদিকে জার্মানীদের দেখো কি সাংঘাতিক পরিশ্রমী জাতি, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানীর শহর বলতে কিছু ছিল না কিন্তু ওরা কিছুদিনের মধ্যেই সবকিছু নতুনভাবে বানিয়ে নিয়েছে। আর নিজেদেরকে এমনভাবে এই ক’বছরে গড়ে নিয়েছে যে, বর্তমানে ওরা প্রথমবিশ্বের যে কোন দেশের সঙ্গে পাল্লা দিতে পারে বা তাদেরকে টেক্কাও দিতে পারে। জার্মান এবং জাপান দেশপ্রেমিক জাতি। চরম সঙ্কটকালেও এরা মাতৃভূমি ত্যাগ করে না। আর এরা কিন্তু সাম্রাজ্যবাদী নয়। হিটলার বিভিন্ন দেশ আক্রমণ করেছে কিন্তু সে দেশগুলোর রাজত্ব কায়েম করার জন্য নয়—অন্য কারণে। ইউরোপের অন্যান্য দেশ বারবার মার খেয়েছে জার্মানীদের হাতেই। এখনও ফ্রান্সের ভয় জার্মানীকেই, বিশেষত দুই জার্মানী এক হওয়ার পর ওদের ভয়টা বেড়েছে।

জিজ্ঞাসু—আপনি ফ্রান্সকে পাত্তা দিচ্ছেন না কিন্তু স্বামী বিবেকানন্দ ফ্রান্সের খুবই প্রশংসা করেছিলেন।

গুরুমহারাজ—কি আশ্চর্য! সেটা ১০০ বছর আগের কথা। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে সবকিছুই বদলে যায়। তাছাড়া স্বামীজী যা বলে গেছেন আমি কি তার repetition করব নাকি ? আমি তোমাদের মৌলিকচিন্তা করতে শেখাই—কোন বাঁধাবুলিতে আটকে থাকতে তো বলি না। আমি ইউরোপের বিভিন্ন দেশ ঘুরেছি। সেসব দেখে আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে যেটা সত্য সেটাই তোমাকে বললাম। দেখো সব্য, তোমার ফরাসীজাতির প্রতি প্রীতি রয়েছে, সুতরাং ফরাসীজাতির সম্বন্ধে nega- tive কিছু বললে তোমার একটু খারাপ লাগবেই, তাই বলে তো আমি সত্য কথা বলতে পিছপা হব না, তাতে তুমি যতই দুঃখিত হও বা তোমার যতই খারাপ লাগুক।

জিজ্ঞাসু—ইউরোপের দেশগুলোয় তাহলে জীবনযাপনের খরচাও খুব বেশী ?

গুরুমহারাজ—ইউরোপের সব দেশে নয়, First world বলতে যেগুলিকে বোঝায় সেগুলিতে খরচা খুবই বেশী। কিছু ইউরোপের দেশ যেমন বোসনিয়া, রোমানিয়া – ওখানে অভাব রয়েছে, বোসনিয়ায় ভিখারিকে আস্তাকুঁড় থেকে কুকুরের সঙ্গে ভাগ করে খাবার খেতে দেখেছি। তবে প্রথম বিশ্বের দেশগুলোয় যেমন ব্যাপক খরচা তেমনি ব্যাপক income করার রাস্তাও রয়েছে। কোন কাজই ওখানে হেয় নয়, আর যে কোন কাজেই প্রচুর রোজগার। আমাদের এখানেই ইতালি থেকে যে সব ছেলেরা আসে তারা সকলেই শিক্ষিত কিন্তু ওদের বেশীর ভাগই আপেল season-এ বাগানে আপেল কুড়োনোর কাজ নেয়। এতে ওরা প্রাকৃতিক পরিবেশে ফাঁকা জায়গায় কয়েকমাস থাকার সুযোগ পায়। হাল্কাকাজ, খাবার ফ্রি, অবসর সময় ধ্যান করে—ভগবৎ প্রসঙ্গ করে। কিন্তু এই কাজ করে ওরা এত টাকা পায় যে, নিজেদের খরচ চালিয়ে ওরা ঐ টাকায় প্রতিবছর India-য় এসে এক-দেড় মাস কাটিয়ে যেতে পারে।

তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলি থেকে যে সমস্ত ছেলে ওখানে পড়াশোনা করতে যায়, তাদের যে কি বিশাল খরচ ভাবতে পারবে না ! সব Guardian-দের পক্ষে তো অত খরচ জোটানো সম্ভব হয় না ফলে ছেলেরা part-time-এ বিভিন্ন হোটেল বা রেষ্টুরেন্টে কাজ করে। ওখানে বেশীর ভাগ জায়গায় self-servicing প্রথা। অর্থাৎ counter থেকে নিজের খাবার নিজে আনো আবার খাওয়া হয়ে গেলে নির্দিষ্ট বেসিনে plate পৌঁছে দাও। কিন্তু কোথাও হয়তো এই system নেই বা কেউ খাবার হুকুম করে আনিয়ে নিতে চায় তখন ঐ ছেলেগুলি service দেয়। এরা Hotel-এর staff নয় কিন্তু হোটেল মালিক খদ্দেরের কাছ থেকে যখনই পয়সা নেয়, তখন service-charge কেটে নিয়ে সঙ্গে সঙ্গে ওদেরকে দিয়ে দেয়। এইভাবে কয়েকটা ছেলে এক-একটা hotel বা restaurant-এ প্রতিদিন কয়েকঘণ্টা duty করে ভারতীয় মুদ্রায় মাসে প্রায় ১০-১৫ হাজার টাকা রোজগার করে। এদের বাড়ী থেকে বাবা-মা হয়তো বহুকষ্টে নিজেরা না খেয়ে ১০-১২ হাজার টাকা মাসে পাঠায় আর বাকী টাকাটা এরা নিজেরাই রোজগার করে নেয় –নাহলে পড়াশোনা, থাকা-খাওয়ার খরচ চালাতে পারবে না। বিভিন্ন স্থানে এইরকম কর্মরত বেশ কিছু ভারতীয় ছাত্রদের সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল। ওরাই আমাকে এইসব কথা বলছিল।

আরবদেশগুলিও খুব ধনী। আমাদের দেশের বহু ছেলে ওই দেশগুলিতেও কাজ করতে যায়। শিক্ষিত- অশিক্ষিত নির্বিশেষে সবরকম লোকই যায়। অনেকে Contract-এ যায়—যে এতবছর কাজ করতে হবে এত টাকা মোট বেতন। বিভিন্ন Diploma Holder বা Junior Engineer-রাও যায়। কিন্তু ওখানে গিয়ে হয়তো দেখা যাবে –শেখেদের বিশাল বাগানবাড়ীর মালির দায়িত্ব নিয়ে থাকতে হবে বা বিভিন্ন বাগানে বা project-এ ঘাস বা জঞ্জাল কাটার দায়িত্ব নিতে হবে অথবা দারোয়ানগিরি বা দারোয়ানদের বড়বাবু হয়ে থাকতে হবে। কিন্তু তাতে কি, ভারতীয় মুদ্রায় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা প্রতিমাসে রোজগার। Contract শেষে দেশে ফিরে আসে প্রচুর টাকা নিয়ে। আর এসে বলে যে, অমুক কোম্পানীর বিরাট ইঞ্জিনীয়র ছিলাম। এখানকার লোকেরা তার রোজগার শুনে বা খরচের বহর দেখে বিশ্বাসও করে নেয়। যাইহোক কথাটা হচ্ছে যে, ধনী দেশগুলির Economic Stan- dard যে কোথায় পৌঁছেছে, তা তৃতীয় বিশ্বের দৃষ্টিতে দেখলে ঠিক বোঝাই যাবে না। সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ভোগ-বিলাসের উপকরণ জোগাতে জোগাতেই ওদের রোজগারের মাত্রাকে বাড়াতেই হয়। তাই ভেবোনা যে, ওরা অত রোজগার করে আর বসে বসে খায়-কেউ বসে থাকতে পারবে না। রোজগার করতেই হবে—না হলে standard বজায় রাখতে পারবে না, অসুবিধায় পড়বে।

জিজ্ঞাসু—ভোগ-বিলাস বা status বলতে কিরকম বলতে চাইছেন ।

গুরুমহারাজ—বললাম তো তৃতীয় বিশ্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে বা ভাবলে বুঝতেই পারবে না যে, standard একটা family-র In- come-ই বা কত আর খরচই বা কত ? ওখানে একটি family-র সকলেই চাকরি করে, সকলেরই নিজস্ব গাড়ী (car) আছে। একজন মধ্যবিত্তর জীবন বলছি—সকালে alarm-এ ঘুম ভাঙল। ঘর Air- Conditioned, বিছানা—স্প্রীং এর গদি, চাদর, ঘরে পুরু কার্পেট, দেওয়ালে বিভিন্ন painting, দামী আসবাবপত্র। হাই-তুলে উঠে switch টিপল তো দেওয়াল থেকে একটা basin বেরিয়ে ওর বিছানার সামনে দাঁড়াল, সেখানে tooth paste, brush ইত্যাদি। গরমজল-ঠাণ্ডাজলের আলাদা প্যাচ ঘুরিয়ে দাঁতমাজা, মুখ ধোওয়া হয়ে গেল। এবার switch টিপল কফি-pot, কফি, ইত্যাদি সরঞ্জাম চলে এল। গরমজলে কফি তৈরী করে একটা sandwich দিয়ে খেয়ে নিল। ঘর ঝাঁট দিতে হয় না, vacum-cleaner চালিয়ে দিলেই ঘরের সমস্ত ধুলো-বালি সাফ হয়। বাথরুম-পায়খানায় জলপর্যন্ত দিতে হয় না। পায়খানা করার পর টিসু পেপার দিয়ে পিছনটা মুছে নেয় আর vacum cleaner দিয়েই সব পরিষ্কার করে নেয়। এরপর আরও শুনবে ? Remote এর switch টিপে দরজা খুলল, remote-এর switch টিপে গ্যারেজের দরজা খুলেগাড়ী বের করল, তারপর গাড়ীতে উঠে remote-এর সাহায্যেই চালিয়ে নিয়ে চলে গেল office-এ।

এই যে জীবন তবুও তা ছকে বাঁধা—কর্মময়। তাই বেশীরভাগ ইউরোপীয়রাই ছ’দিন টানা কাজ করার পর weekend কাটাতে যায় কোন sea beach বা যে কোন জায়গায়। ওরা বলে নাকি এতে ওরা আবার একসপ্তাহ কাজ করার energy পায়। মধ্যবিত্ত ভারতীয়দের জীবনের সঙ্গে ঐ যে জীবনের কথা বললাম ওর কতটুকু মিল পাবে বলো তো ?

জিজ্ঞাসু – আপনি গ্রীসেও গিয়েছিলেন ?

গুরুমহারাজ—হ্যাঁ, গিয়েছিলাম। গ্রীকরা নিজেদেরকে Hallas বলে, ইংরেজদের দেওয়া নাম গ্রীকরা পছন্দ করে না। গ্রীক সভ্যতাও খুবই প্রাচীন। গ্রীকদের mythology বা ওদের দেবদেবীর সঙ্গে ভারতীয় দেবদেবীর খুবই মিল। ফলে এটা অনুমান করা যায় যে, প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি সুদূর অতীতে গ্রীসে প্রবেশ করেছিল। আর গ্রীস থেকেই সেই সভ্যতা ইউরোপের বিভিন্ন অঞ্চলে পৌঁছায়। ভারতীয় দেবী দুর্গার সাথে ওদের দেবী এথেনার মিল রয়েছে। দেবী এথেনার নাম অনুসারে ওদের এথেন্স নগরী, আমাদের যেমন দুর্গার নাম অনুসারে দুর্গাপুর, দুর্গানগর। দেবী মিনার্ভা ঠিক যেন আমাদের দেবী সরস্বতী। বিভিন্ন দেবতার সাথেও একই রকম মিল খুঁজে পাবে। বর্তমান গ্রীসদেশের অধিবাসীদের মধ্যে একটা অদ্ভুত sentiment লক্ষ্য করলাম North Greece আর South Greece sentiment. North-এর লোকেদের ওরা barbarian বলে। তৎকালীন ম্যাসিডন যেহেতু বর্তমানে south- west তুরস্কে পড়ছে, ফলে আলেকজাণ্ডারকে ওরা ‘Alexander the Barbarian’ বলে। ভাবো একবার – আমরা বলি Alexander the Great । আর খোদ গ্রীসের লোকেরা বলছে উল্টো। এখানে ব্যাপারটা কি বলো তো—South Greece-এর লোকেরা শান্তিপ্রিয়, ওরা কখনও সাম্রাজ্যবাদী ছিল না। ক্রীট দ্বীপের সঙ্গে ওদের দীর্ঘ রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছিল বটে কিন্তু ওরা ইউরোপের অন্যান্য অংশে রাজত্ব কায়েম করেনি। স্বামীজী যখন জাহাজে গ্রীস থেকে ক্রীটে যাচ্ছিলেন তখন ওনার দর্শন হয়েছিল যে, কয়েকজন ভারতীয় বৌদ্ধসন্ন্যাসী সমুদ্র থেকে প্রকট হয়ে ভারত থেকে ইউরোপে সংস্কৃতি ও ধর্মপ্রচারের ইতিহাস বলেছিলেন। কার্য-কারণসূত্রে ঐ একই পথ আমাকেও জাহাজেই যেতে হয়েছিল। স্বামীজীর ঐ ব্যাপারটা তখন খুব মনে পড়ছিল। স্বামীজী এর পরই তাঁর ভক্ত-শিষ্যদের কাছে hints দিয়েছিলেন যে, খ্রীষ্টধর্ম আসলে বৌদ্ধ ধর্মেরই পরিবর্তিত রূপ ছাড়া আর কিছুই নয়। তবে আমার সেরকম কিছু ঘটেনি। আমি যে জাহাজটিতে যাচ্ছিলাম সেটি ছিল। প্রমোদতরণী। ইউরোপ-আমেরিকার তরুণ-তরুণী বা লোকজনেরা একটু প্রকৃত অর্থেই আয়েশ বা enjoy করার জন্য ঐ সব জাহাজে কয়েকদিন কাটায়। বিলাসের সামগ্রী কি নেই জাহাজে, বার, রেষ্টুরেন্ট, ডিস্কোথেক্, ক্যাসিনো, Indoor Games, Swimming pool সবই রয়েছে। আমি জাহাজে ওঠার পর থেকেই কয়েকজন প্রাণচঞ্চল, উচ্ছল যুবক-যুবতীকে লক্ষ্য করছিলাম, যারা শুধু নেচেই চলেছে, হৈ-হৈ করছে, মদের ফোয়ারা ছোটাচ্ছে আর সদা-সর্বদা লাফালাফি করছে। ওদের মধ্যে বেশিরভাগ সাদা তবে কয়েকজন ছেলেমেয়ে কালোও ছিল। আমি তো সবকিছু এড়িয়ে সারাদিন এবং রাতের বেশিরভাগ সময় জাহাজের deck-এ একা-একা কাটাতাম, ওরা এ ব্যাপারটাও লক্ষ্য রেখেছিল। একদিন সন্ধ্যায় ‘ডেকে’ বসে সাগরের সুন্দর দৃশ্য দেখছি, হঠাৎ ওরা হয়ত বদমায়েশি করার জন্যই “Here’s the guy” বলে আমার কাছে চলে এল। তারপরই একজন আমাকে সম্বোধন করে বলল “Hi-guy”। দেখো আমেরিকান অসভ্য culture। সম্বোধনটা পর্যন্ত অসভ্য। ‘guy’ শব্দটা ব্যবহার হত ‘হিপি’ কালচারের সময়, ‘সমকামী’ বা Homosexual-দেরকে ‘guy’ বলে সম্বোধন করা হত। সেই শব্দটা এখন ওরা সামাজিক করে নিয়েছে বা যে কাউকে সম্বোধন করার জন্য ব্যবহার করছে। যাইহোক, এবার শুরু হল ওদের জিজ্ঞাসার পর জিজ্ঞাসা – ‘আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কোথায় যাচ্ছি, কেন যাচ্ছি, সঙ্গে কোন মেয়ে নেই কেন ?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। আমি যতটা সম্ভব ভদ্রভাবে উত্তর দিতে শুরু করলাম। এতে ওরা থামবে কেন—আমি একা জেনে ওরা আবদার করে বসল। “তাহলে চল আমাদের সঙ্গ দেবে”। ওদের একটা জিনিস খুব ভালো লাগল যে, ওরা ভীষণ free। যা বলার সরাসরি বলে দেয়—রাখঢাক্ করে কুঁথিয়ে কথা বলে না। আমাকে বলল, “শোন, তুমি প্রায় আমাদেরই বয়সী, কাজেই তুমি আমাদের বন্ধুরই মত, সুতরাং এস নাচি-গাই, স্ফুর্তি করি।” ইউরোপের প্রায় সবদেশেই এই freeness ব্যাপারটা লক্ষ্য করেছি। আমাদের এখানকার ছেলে-মেয়েদের মতো জড়তা একদমই নেই। ছোট ছোট ছেলেমেয়ে আমাকে ‘Hi Paramananda!’ বলে সম্বোধন করেই shake hand করত। সে যাইহোক ওদের এসব কথা শুনে আমি বললাম, তোমরা যখন আমার বন্ধু তাহলে কিছুক্ষণ এখানেই বস, তারপর না-হয় ওদিকে যাওয়া যাবে। ওরা বসল, তারপর আমি ভারতবর্ষ এবং ভারতবর্ষের culture সম্বন্ধে ওদের বিস্তারিত বলতে লাগলাম। এখানকার সমাজজীবন, ধর্মজীবন সমস্ত আলোচনা চলতে লাগল। যারা গত ২৪ ঘণ্টায় কোথাও আধঘণ্টা স্থির থাকেনি— তারা কমপক্ষে ৩-৪ ঘণ্টা ওখানে বসে থাকল। আমি ওদেরকে বেশী করে বলেছিলাম ভারতীয় আদর্শ নারীদের কথা—তাদের ত্যাগ, তিতিক্ষা, সংযম-ধৈর্যের কথা এবং আজও ভারতীয় সমাজের পতিব্রতা নারীরা, সাধারণ গৃহবধূরা কিভাবে তাদের স্বামী-পুত্র-পরিবার নিয়ে সুখীজীবন কাটায় সেই কথা। আর বলেছিলাম, সাধু-সন্ন্যাসীদের ত্যাগ-ব্রতের কথা, ব্রহ্মচর্য পালনের কথা, ওরা শুনতে শুনতে হাঁ হয়ে গেল। ওদের বয়স ২০-২১ বছর বা কারও বয়স ২৪-২৫, এই সময়ের মধ্যে ওরা কোথাও এইরকম জীবনের কথা শোনেনি বা পড়েওনি। ওদের ধর্মযাজকদের মধ্যে ব্রহ্মচর্যের ব্যাপারটা কিছুটা রয়েছে কিন্তু বিলাস-ব্যসন, ভোগ, ঐশ্বর্য, ক্ষমতা এগুলোর তো কমতি নেই। তাই পাতার কুটীরে অরণ্যচারী অথবা গুহাবাসী সন্ন্যাসী বিশ্বশান্তির কামনায় জীবনপাত করছে শুনে ওরা সত্যিই অবাক হয়ে গিয়েছিল। বলল এই সব জীবনের কথা তাদের Education-এ বা Academic course-এ পড়ানো হয় না। আর মেয়েগুলি আশ্চর্য হয়ে গেল যখন তারা শুনল যে, ভারতের বেশীর ভাগ নারী আজও সারাজীবন মাত্র একটা পুরুষকে নিয়ে সংসার- জীবনযাপন করে। ওরা বলল যে, “আমরা এটা কল্পনাও করতে পারি না যে, সারাজীবনে মাত্র একজন পুরুষ । How is it possible ? We like to visit India just to see that poor Indian girls! Oh! It is unbelievable, how poor they are !” এরপর ওরা চলে গেল, আর আমাকে বিরক্ত করেনি কারণ যেহেতু ওরা জেনে গেল যে, আমি একজন Monk এবং ঐ ভোগের জীবন আমার জন্য নয়। এইগুলো ওদের ভালো দিক। আমাদের এখানে আবার অন্যরকম মানসিকতা, বোঝার চেষ্টাও করবে না আবার পাশ থেকে tonting করে বিরক্ত করবে। আর ওরা দেখো যতক্ষণ আমাকে জানেনি বা বোঝেনি ততক্ষণ disturb করার চেষ্টা করেছে কিন্তু যেই বুঝল আর বিরক্ত করল না।