জিজ্ঞাসু—আপনি তো ইংলণ্ডও গিয়েছিলেন, ওখানকার কথা কিছু বলুন ?
গুরুমহারাজ—ইউরোপের মধ্যে সবচাইতে সংরক্ষণশীল (Con- servative) হ’ল ইংরেজ জাতি। ওরা প্রচণ্ড ধূর্ত আর খুবই সন্দেহপরায়ণ। ওদেশে যাবার পর থেকে কতবার যে আমাকে একই জিজ্ঞাসার সম্মুখীন হতে হয়েছে তার ঠিক নেই। জিজ্ঞাসাটা হচ্ছে— ‘আপনি কেন এসেছেন? এবং আপনার উদ্দেশ্য কি ?’ এবার ইংল্যণ্ডের সবলোকই যে খারাপ বা সকলেই একইরকম এমন তো হয় না—তবে বেশীরভাগের কথা বলছি। সবসময়ই সবদেশে, সবস্থানে ভালো-মন্দ সবরকম লোক থাকে। ব্রিটিশরা যখন এদেশ শাসন করছিল তখন এখানকার উচ্চপদস্থ কর্মচারীরা কোন ভুল করলে ওদেশে তার বিচার হোত। আইন-ব্যবস্থাটা প্রথম বিশ্বের সবদেশেই খুবই উন্নত এবং আইন কার্যকরী হয় যেটা এদেশে হয় না। যারজন্য মানুষও খুবই সচেতন। যেখানে- সেখানে নোংরা ফেলে না, parking zone ছাড়া গাড়ী parking করে না, খাদ্যে ভেজাল মেশায় না, যে কোন জিনিস খাঁটি ও সুন্দরভাবে বানানো, ট্রেন, বাস নিয়মমতো সঠিক সময়ে চলাচল করে। এ সবের জন্যই আইন রয়েছে। কোন কারণে আইন ভাঙলে heavy punishment বা জরিমানা হয়, যেমন গাড়ী ভুল parking করলে বা ভুলভাবে drive করলে তোমাকে গাড়ীটাই বেচে fine দিতে হবে ! খাদ্যদ্রব্য ঠিকমতো quality-র না হলে কোম্পানীটাই উঠিয়ে দিতে হবে—এইরকম। ফলে মানুষ সচেতন। এদেশেও আইন আছে কিন্তু ঠিক ঠিক প্রযোজ্য হয় না, ঘুষ দিয়ে পার পাওয়া যায় ৷
ইংল্যাণ্ডকে দেখে মনে হ’ল ওরা যেমন গোটা বিশ্বকে শোষণ করেছে, অত্যাচার করেছে—এখন যেন প্রকৃতি তার শোধ তুলছে। ওখানকার একটা Universityও আর আধুনিক বিশ্বমানের নয়। ওখানকার ছেলেরাই আমেরিকা বা জার্মানীতে পড়তে যাচ্ছে। ওরা যেমন ভারতবাসীকে তিন টুকরো করে ভারত, পাকিস্থান, বাংলাদেশ (পূর্ব- পাকিস্থান) বানিয়েছে তেমনি গ্রেট ব্রিটেন ভেঙে ব্রিটেন, স্কটল্যাণ্ড ও আয়ারল্যাণ্ড হয়ে গেছে। এখানে যেমন ভারত-পাকিস্থান-বাংলাদেশের মধ্যে ভালো সম্পর্ক নেই ওখানেও তেমনি স্কটল্যাণ্ড ও আয়ারল্যাণ্ড ঘোর ইংলণ্ড বিরোধী। ভাবতে পারবে না যে, ইংলণ্ড-সংলগ্ন ঐ টুকু টুকু দুটো দেশ এতটাই ইংরেজ-বিরোধী যে, ওরা ছোট থেকে ইংরেজী ভাষাটাই শেখে না (যেখানে ইংরাজী International Language)। ওরা নিজেদের মধ্যে ‘স্কটিশ’ বা ‘আইরিশ’ ভাষা বলে আর আন্তর্জাতিক ভাষা হিসাবে ইতালিয়ান বা ফ্রেঞ্চ শিখে নেয়। ইংরেজী, ফ্রেঞ্চ এবং ইতালিয়ান এই তিনটিই বর্তমানে আন্তর্জাতিক ভাষা, যে কোন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এই তিনটি ভাষায় announce হয় বা Instructions দেওয়া হয়। একমাত্র রাশিয়া ছাড়া ইউরোপের যে কোন জায়গায় এই তিনটে ভাষা জানা থাকলেই তোমার কোন অসুবিধা হবে না।
অর্থনৈতিকভাবেও ইংলণ্ড এখন ধুঁকছে, ফলে বাধ্য হয়ে আমেরিকার তাঁবেদারি করছে। নানান সামাজিক সমস্যা—বেকারত্ব বাড়ছে, সামাজিক নানান বৈষম্যের শিকার এখন ইংলণ্ড। তবে মার্গারেট থ্যাচার (তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী) মহিলা হিসাবে ভালো, ওনার নেতৃত্বের প্রতি বেশীর ভাগ মানুষের আস্থা রয়েছে দেখলাম। আমাদের আশ্রমের দীক্ষিত ব্রায়ন খুবই ভালো ছেলে—ওখানে আরও কিছু ভক্তরা রয়েছে। ইংলণ্ডের বিভিন্ন শহরে আলোচনা হয়েছে। বহু মানুষ আগ্রহী হয়ে আমাকে আমন্ত্রণ করে বাড়ি নিয়ে গেছে। ওখানেই এক দম্পতিকে দেখলাম যারা Iscon-এর দীক্ষিত। পুরুষটি ধুতি-পাঞ্জাবী ও মহিলাটি লালপাড় সাদা সুতির শাড়ি পরে। আমাকে মাটিতে আসন পেতে purer বাঙালী খাবার খাইয়ে দিল। বগি থালায় ভাত, বিভিন্ন বাটিতে ডাল, শুক্তো, পোস্ত এমনকি চাটনি পর্যন্ত। ভাবো একবার, সুদূর ইংলণ্ডে বসে যেন মনে হ’ল বাংলার কোন পর্ণকুটীরে মা-বোনের হাতের রান্না খাচ্ছি। ইউরোপে থাকাকালীন আমার ভালো করে খাওয়াই হোত না। ওদের সব খাবারই তো আমিষ আর আমিষ মানে যে কিসের মাংস তার তো কোনো ঠিক নেই। বেশীরভাগই পেষ্ট করা মাংস – আমরা যেমন tooth paste ব্যবহার করি, ঠিক সেইরকম tube থেকে paste করা মাংস বলল করে বের করে যে কোন খাবারে মিশিয়ে ওরা খায়। এমনিতে হোটেল বা রেস্তোরাঁয় যে মাংস পাওয়া যায় সেগুলোর মধ্যে roasted baked, smoked, অথবা boiled-ই বেশী। আমাদের এখানকার হোটেলগুলোর মত মাংসের ঝোলরান্না কোথাও পাবে না। ওরা শুধু দেখে খাদ্যের খাদ্যগুণ বা প্রোটিন-কার্বোহাইড্রেট-ফ্যাটের পরিমাণ এবং সেখান থেকে যত ক্যালোরি উৎপন্ন হবে ও সেটা তার শরীরে কতটা কার্যকরী। ওরা সাধারণত সেই অনুযায়ী খাদ্য খায়। তবে festival বা occasion-এর কথা আলাদা। আর-মশলার ব্যবহার প্রায় নেই বললেই চলে, সুতরাং জিভের taste ব্যাপারটা ছোটবেলা থেকেই তেমন তৈরী হয় না। তাই roasted বা baked খেতে কোন অসুবিধা হয় না। আর সঙ্গে আছে বিয়ার বা মদ।
ওদের দেশে দেখলাম বনেদী লোকেদের প্রায় সকলেরই বাড়ীতে basement-এ wine জারানো রয়েছে। পূর্বপুরুষের সময় ধরে ‘জার’- গুলি (বেশীরভাগ কাঠের পিপের মতো) রয়েছে—এক-একটা ফুরোলেই ওরা আবার processing করে cover-up করে রাখবে। এইভাবে এক-একটা বাড়ীতে ১০০-১৫০ বা হয়তো ২০০ বছরের পুরোনো ‘ওয়াইন’ রাখা রয়েছে। একজন বৃদ্ধের সঙ্গে আলাপ হ’ল, উনি যৌবন বয়সে কিছুদিন India-য় officer হিসাবে কাজ করে গেছেন। ওনার নেমতন্ন রক্ষা করার জন্য যখন বাড়ী গেলাম তখন উনি basement থেকে ওনার দাদুর আমলের wine বের করে আনলেন এবং বললেন যে, ওখানকার রীতি হচ্ছে যে, বিশেষ সম্মানীয় ব্যক্তিদের প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান দেখানোর একটা অন্যতম শর্ত হ’ল সবচাইতে পুরোনো মদ দিয়ে তাঁকে অভ্যর্থনা জানানো। আমি সন্ন্যাসী এবং ভারতীয় সন্ন্যাসীদের প্রতি ওঁর ধারণা রয়েছে, তাই তিনি আমাকে গ্রহণ করার অনুরোধ করলেন এবং বললেন যে, একই টেবিলে বসে একসাথে পানীয় গ্রহণ না করাটাও নাকি ওঁদের চোখে ভীষণ অপমানকর ।
বৃদ্ধ ভদ্রলোক খুবই আলাপী। উনি বর্তমান ভারতবর্ষের খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে খবর নিচ্ছিলেন। আমি সেই সময়কার কথা তুলতেই আবেগে ওনার কণ্ঠরুদ্ধ হয়ে গেল। উনি বললেন, ‘জানেন ব্রিটিশরা একের তিন ভাগ পৃথিবী নিজেদের করায়ত্ত করেও কোন গৌরব লাভ করেনি কিন্তু যখন ভারতবর্ষ ব্রিটিশের কব্জায় এ’ল তখন সমস্ত ইংলণ্ড জুড়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে উৎসব হয়েছিল। সবাই বুঝেছিল যে, এতদিনে ইংলণ্ড বলার মতো কিছু একটা করেছে। আবার জানেন—যেদিন ১৯৪৭ খ্রীষ্টাব্দে শেষ ব্রিটিশ জাহাজটা ভারতবর্ষ থেকে ইংলণ্ডে পৌঁছাল সেদিন ছিল ইংলণ্ডের ইতিহাসে সবচাইতে কালোদিন, দুঃখের দিন। গোটা ইংলণ্ডবাসী সেদিন কেঁদেছিল, সত্যি সত্যি চোখের জল ফেলেছিল। বেশীরভাগ বাড়ীতে সেদিন রান্না হয়নি, বহুদিন পর্যন্ত মানুষ এই শোক ভুলতে পারেনি। আমি জিজ্ঞাসা করলাম পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্ত জয় করেও এতটা আনন্দ না পাওয়া আর ভারতবর্ষ অধিকার করে এতটা আনন্দিত হওয়ার পিছনে কারণ কি ? উনি বললেন পৃথিবীর অন্যান্য দেশগুলোর আছেটা কি, যা কিছু প্রাচীনত্ব, গৌরব, সংস্কৃতি, পুরাতত্ত্ব— যা কিছু বিজ্ঞানের খোরাক—এ সবই তো ভারতের। ভারতের হাতে লেখা পুঁথি ইংরেজরা যে কত জাহাজ ভর্তি করে এদেশে এনেছে তার খোঁজ রাখেন ? এখন যদি ভারতবর্ষ নিয়ে কোন ভারতবাসী research করতে চায় তাকে authentic প্রমাণ খুঁজতে British Museum-এ আসতে হবে। ভারতবর্ষের পুঁথিগুলি ইউরোপের পণ্ডিতমহলে খুব কদর ছিল, তাই বহুমূল্যে এইসব পুঁথি বিক্রি করে ইংরেজরা যেমন দু’পয়সা রোজগার করেছে, তেমনি ইউরোপের নবজাগরণের আগে এবং পরে এইসব পুঁথি ইউরোপে একটা বিরাট ভূমিকা নিয়েছিল।
যাইহোক ভদ্রলোক মজাদার মানুষ, বয়স প্রায় ৮০ ছুঁইছুই হলেও বেশ উচ্ছল ও প্রাণশক্তিসম্পন্ন, ওনার সাথে আলাপ করে আমারও খুব ভালো লেগেছিল। লণ্ডন শহরে প্রচুর লোকের বাস, কিন্তু বড় একটা জ্যাম-জট হয় না, disciplined. ব্রায়ন এই নিয়ে প্রায়ই আমাকে ঠাট্টা করে, “ওঃ তোমাদের কলকাতা–আর বোলোনা আধঘণ্টার রাস্তা চারঘণ্টা লাগে।” ঘটনা ঘটল কি, আমি ওখানে থাকতে থাকতেই একদিন west-minister bridge-এ জ্যাম্ হল। ওদের News channel গুলো খুবই উন্নত, সঙ্গে সঙ্গে ব্যাপারটা telecast করতে লাগল। আমি ব্রায়নকে বললাম, “দ্যাখো, আমার সঙ্গে সঙ্গে jam-ও তোমার শহরে ঢুকেছে।” T.V-তে ব্যাপারটা ও নিজেও দেখছিল এবং বলল, সত্যি পরমানন্দ ! এটা দেখে আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছি যে, হঠাৎ করে West-minister bridge- এ জ্যাম হ’ল কি করে ? তবে দ্যাখো, এটা India নয়, এটা ইংলণ্ড, এক্ষুনি—কয়েকঘণ্টার মধ্যে এর বিধি-বন্দোবস্ত হয়ে যাবে।
ঘটনাটা ঘটেছিল কি, সেই সময় সলোমন রুশদি ‘Satanic Verses’ বলে একটা বই লিখেছিল। গোটা বিশ্বে এই বইটার প্রতিবাদে মুসলমান সমাজ পথে নেমেছিল, বইটাতে একটা গল্পে মামুদ নামে যে চরিত্র রয়েছে তার সঙ্গে নাকি হজরত মহম্মদের জীবনের মিল পাওয়া গেছে এবং সেখানে তাঁর জীবনকে সঠিকভাবে না দেখিয়ে বিকৃতভাবে দেখানো হয়েছে—এরই প্রতিবাদ। পাকিস্তান, ভারত, বাংলাদেশ সহ বিশ্বের প্রায় সমস্ত দেশের মুসলমানেরা এই বইটি ban করার জন্য প্রতিবাদে মুখর হয়েছিল। কোন কোন দেশ আবার সলোমন-এর মৃত্যুর ফতোয়াও জারি করেছিল। শোনা যায় ভারত এবং পাকিস্তান থেকেও নাকি খতম বাহিনী বেরিয়ে পড়েছিল। যাক্ সেসব কথা, ওখানে যে মিছিলটি বেরিয়েছিল তা ঐ রুশদির বই এর প্রতিবাদে। হাজার দশেক মুসলমান হাতে ব্যানার, প্লাকার্ড নিয়ে মিছিল করে West minister bridge cross করে লণ্ডন শহরে ঢুকছিল, ওখানে তো স্লোগান চলে না—এটা রাষ্ট্রীয় আইন। প্রতিবাদ মিছিলে তোমার বক্তব্য plackard banner-এ লিখে মানুষকে জানাও, কোন স্লোগান বা মাইকিং চলবে না। কিন্তু কি সাংঘাতিক ওদের প্রশাসনিক তৎপরতা আর মন্ত্রি পরিষদ-এর কি তাৎক্ষণিক bold step । সঙ্গে সঙ্গে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মার্গারেট থ্যাচার জরুরী meeting ডাকলেন এবং সিদ্ধান্ত হয়ে গেল আর সঙ্গে সঙ্গে step নিল পুলিশ-প্রশাসন। সব থেকে অবাক করার ব্যাপার ছিল ওদের মুখ্য সমস্ত T.V-channel-গুলি, যেগুলি তাদের সমস্ত programme বাতিল করে শুধু cabinate meeting, মন্ত্রী পরিষদের তৎপরতা, প্রশাসনিক পদক্ষেপ ইত্যাদিকেই show করতে লাগল। একবার মিছিল দেখায় আর একবার ওইসব। আর বারবার announce করছে যে, meeting চলছে, এক্ষুনি মার্গারেট থ্যাচার জনগণের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখবেন। ফলে মানুষ T.V. খুলে অধীর আগ্রহে বসে ও আছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্থাৎ মাত্র আধঘণ্টার মধ্যে মার্গারেট থ্যাচার ভাষণ দিলেন। তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত ভাষণে বললেন – সলোমন রুশদি একজন ব্রিটিশ নাগরিক—ব্রিটিশ সরকার মনে করে না যে, তার বইটি banned করার কোন প্রয়োজন রয়েছে। সুতরাং এর বিরুদ্ধে কোন মিছিল, প্রতিবাদ—এগুলি রাষ্ট্রের বিরোধিতা। ব্রিটিশ সরকার কোন রাষ্ট্রদোহীকে দেশে থাকতে দিতে চায় না। তাই, হয় প্রতিবাদকারীরা রাষ্ট্রের প্রতি মর্যাদাবান হয়ে রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে মেনে নিন অথবা এই দেশের বাইরে গিয়ে অন্য কোন দেশ থেকে এর বিরোধিতা করুন। যারা British নাগরিকত্ব cancel করে অন্যত্র যেতে চান তাদের সমস্ত ব্যবস্থা করে দেওয়া হবে। —ব্যস, এইটুকুই যথেষ্ট, দলে দলে পুলিশবাহিনী বেরিয়ে গেল এবং মিছিলের কাছে গিয়ে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের টেপ-রেকর্ডিং শুনিয়ে দিল এবং মিছিলকে মাত্র দশমিনিট সময় দেওয়া হল–ফিরে যাবার জন্য। দশ মিনিটের মধ্যেই মিছিল অনেকটা ফাঁকা হয়ে গেল, যেগুলো হ’ল না তাদের যে কি দুর্দশা হোল তা আর কহতব্য নয়।
যাইহোক ব্ৰায়ন আমাকে বলল – দেখলে তো পরমানন্দ—এটাই ইংলণ্ড ! সত্যি ওদের প্রশাসনিক ব্যবস্থা বা পুলিশি ব্যবস্থা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। আমাদের এখানে তো মানুষ পুলিশকে অবিশ্বাস করে, ঠাট্টা করে, গালাগালি দেয় আর ওখানে মানুষ পুলিশকে ভরসা করে। পুলিশরাও মানুষের সেই বিশ্বাস বা ভরসার মর্যাদা রাখার চেষ্টা করে।
ইউরোপীয়দের একটা জিনিস আমাদের ভারতবর্ষের সঙ্গে একদম মেলে না, সেটা হল আতিথেয়তা। ওরা যদি তোমাকে dinner-এ নেমতন্ন না করে, তাহলে তোমার সামনেই ওরা গরগর করে খাবে কিন্তু তোমাকে খেতে অনুরোধ করবে না, ওরা যদি তোমাকে রাত্রে থাকার আমন্ত্রণ না করে তাহলে বাইরে যতই বিপর্যয় হোক বা যতই অসুবিধা থাক্ তোমাকে টা-টা জানিয়ে গৃহস্বামী ঘুমোতে যাবে। আবার তোমাকে হয়তো আটটার সময় dinner-এ নেমতন্ন করা হয়েছে, তুমি যদি সাড়ে আটটার আস, দেখবে ওরা খেয়ে মুখ পরিষ্কার করে বসে আছে । তোমাকে অবশ্য খেতে দেবে কিন্তু বাড়ির কেউই না খেয়ে তোমার জন্য অপেক্ষা করে বসে থাকবে না। এর একটা কারণ অবশ্য এটা হতে পারে যে, ওরা সময়জ্ঞানকে খুবই মূল্য দেয়—যেটা ভারতবাসীরা আদৌ দেয় না। ফেরার পথে শেষকালে আমি এলাম রাশিয়ায়। মস্কো বিমানবন্দরে নেমে আমি শহরটা ঘুরতে গেলাম—৭০ বছর ধরে মার্কসীয় আদর্শে গড়ে ওঠা সমাজতান্ত্রিক দেশ রাশিয়া। কিন্তু তার রাজধানী খোদ মস্কো শহরেই যে সব দৃশ্য দেখলাম তা যথেষ্টই বেদনাদায়ক। দেখলাম মানুষগুলো রাস্তায় মাথা নিচু করে হাঁটছে—মাথা তুলতেই যেন ভুলে গিয়েছে। রুটির দোকানের (Ration shop) সামনে দীর্ঘ মানুষের ‘কিউ’ ; সবাই পেটভরে রুটি-মাংস (তা সে যে কোন পশুর বা পাখীর মাংসই হোক খাদ্যগুণসমৃদ্ধ হলেই হোক) পাবে ঠিকই কিন্তু এইভাবে তা সংগ্রহ ! খোদ মস্কোতেই যদি এই দৃশ্য হয় তাহলে গ্রাম-গঞ্জগুলির কি অবস্থা হবে একবার ভেবে দেখো ! মস্কো ঘুরে ওখান থেকে সোজা দমদম বিমান- বন্দরে নামলাম, কিন্তু নেমে আমার একটা ব্যাগ আর পেলাম না ! ওতে আমার প্রায় ১৫০টি লেখা কবিতা ছিল, যেগুলো ইউরোপের বিভিন্ন স্থানে অবসর সময়ে বসে লিখেছিলাম। এছাড়া একটা বই হয়ে যেতো এমন Manuscript ছিল। আর ভারতীয় মুদ্রার ৮০০০ টাকার মতো বই ছিল। দুষ্প্রাপ্য সব বই – কনফুসিয়াসের লেখা, ইউরোপীয় সুফীদের লেখা বা সুফীবাদের উপর গবেষণামূলক কিছু বই যেগুলো ইউরোপের বিভিন্ন Library ঘুরে আমি সংগ্রহ করেছিলাম আমাদের বনগ্রাম পরমানন্দ মিশনের Library-তে রাখার জন্য। এই ধরণের প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য সব বই থাকবে আর পরবর্তীকালে বহু কৃতি ছাত্র বিভিন্ন গবেষণার কাজে এই Library-তে আসবে। আমি এখানেও অনেক ভক্তদের বলেছি যদি তারা কোথাও প্রাচীন দুষ্প্রাপ্য Manuscript বা গ্রন্থ পায়, তাহলে যেন তারা বনগ্রাম মিশনের Library-তে তা পাঠিয়ে দেয়।
যাইহোক, দমদমে নেমে আমরা ব্যাগটার জন্য নানারকমভাবে চেষ্টা করলাম কিন্তু বিশেষ কোন ফল হ’ল না। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ শুধু একটা স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে বলল যদি পাওয়া যায় তাহলে আপনাকে খবর পাঠানো হবে অন্যথায় একটা Compensation দিয়ে দেওয়া হবে । বিমানের system-টাই হচ্ছে ওখানে luggage তুমি সঙ্গে নিয়ে যেতে পারবে না। Luggage-এর জন্য আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে, তোমাকে রসিদ দিয়ে দেওয়া হয় আর তুমি বিমানে ওঠার আগে নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যাগটা রেখে দিলেই বেল্টের সাহায্যে luggage তোমার আগেই বিমানে পৌঁছে যাবে। আবার নামার পর তুমি নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষা করবে, তোমার ব্যাগ বা luggage যখন নেমে আসবে সেটিকে তুমি নিজেই নামিয়ে নেবে আর রসিদ দেখিয়ে তা তোমারই কিনা Confirm করে নেবে। আমিও একই কায়দায় মস্কোতে ব্যাগগুলো দিয়ে দিয়েছিলাম। আমার মোট তিনটে Bag ছিল–দুটো বড় আর একটা ছোট। দুটো Bag নেমে এল কিন্তু ওটি আর এল না। আমার ধারণা, Moscow-তে সবারই Bag ওরা চেক্ করে। আমার Bag-এ যেহেতু কাগজপত্র ও মূল্যবান গবেষণামূলক কিছু বই ছিল তাই ওরা ওই ব্যাগটাকে সরিয়ে ফেলেছিল, পরে missing বলে চালিয়ে দিয়েছিল।
আমার এত পরিশ্রমের লেখাগুলি চলে যাওয়ায় মনটা একটু প্রথমে খারাপ হয়েছিল—বিশেষত স্বরূপানন্দের জন্য। ও যেভাবে আমাকে লেখার জন্য পীড়াপীড়ি করে তার থেকে কিছুদিন আমিও রেহাই পেতাম। কিন্তু এরকম একটা ঘটনা ঘটে গেল। তখন আমার মনে পড়ে গেল গুরুদেব স্বামী বাউলানন্দের কথা। তিনিও পপি পাহাড়ে বসে কাজের অবসরে মানুষের জন্য কিছু তত্ত্ব লিখেছিলেন। সমস্ত লেখা সম্পন্ন করে মানুষের কল্যাণে কিছু করা গেছে এই ভেবে খুশি খুশি মনে উনি ওই Manuscript-গুলিকে ঝরনার ধারে রেখে স্নান করতে নেমেছেন। স্নান করতে করতেই হঠাৎ তিনি দেখলেন দমকা হাওয়ায় তাঁর এতদিনের পরিশ্রমের ফসল একটা একটা করে উড়ে জলে পড়ে ভেসে যাচ্ছে তিনি প্রথমটায় হতচকিত হয়ে দ্রুত উঠে এসে বাকীগুলি রক্ষা করার চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাঁর অন্তরাত্মা থেকেই এর উত্তর ভেসে এল—এই জগতে কে কতটুকু কাজ করবে, কে কতটা মানবকল্যাণ করবে, কার দ্বারা কিভাবে তা সম্পন্ন হবে, সে সবই তো মায়ের হাতে ! তাহলে ব্যক্তিগতভাবে হারানো জিনিসের জন্য হাহাকার করাই তো মূর্খতা ! তিনি এরপর আর কলম ধরেননি। তবে আমার ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব হবে না—স্বরূপানন্দের ‘চরৈবেতি’ রয়েছে যে !