জিজ্ঞাসু—হাজার বছরের অন্ধকার, আলো জ্বাললেই পরিষ্কার কথাটি কি সত্যিই মানুষের ক্ষেত্রে খাটে ?
গুরুমহারাজ—ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ এই ধরণের উপমা দিয়ে- ছিলেন, কথাটি উপনিষদের। ঠাকুরের বিশেষত্ব এটাই—অতি সহজ, সরল, সাধারণ উপমার সাহায্যে বেদ-বেদান্তের শিক্ষা দিতেন। এটা Art, ভগবানের Art. এখানে যে আলোর কথা বলা হয়েছে তা জ্ঞানালোক। “তমসো মা জ্যোতির্গময়” – অজ্ঞান অন্ধকার থেকে জ্ঞানালোকের দিকে নিয়ে যাবার প্রার্থনা করা হয়েছে। কিন্তু কে নিয়ে যাবে—নিজেকেই যেতে হয়। ভগবান বুদ্ধ সংকল্প করে বোধিবৃক্ষের নিচে বসলেন,
‘ইহাসনে শুষ্যস্তু মে শরীরম্
ত্বগস্থিমাংসং প্রলয়ঞ্চ যাতু ৷
অপ্রাপ্য বোধিং বহুকল্পদুর্লভাং
নৈবাসনাৎ কায়মতশ্চলিষ্যতে ॥’
—‘অর্থাৎ এই আসনেই আমার শরীর শুষ্ক হউক, ত্বক, অস্থি, মাংস প্রলয় হউক, বহুকল্পদুর্লভা বোধিলাভ না করিয়া আমি আর এই আসন হইতে বিচলিত হইব না।’
রাজার ছেলে গৌতম কখনও তো কষ্ট সহ্য করেনি। পথশ্রমে, যারা ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় আর নির্বাণলাভের আকুলতায় দেহ বড়ই শ্রান্ত ছিল। কয়েকদিন ঐ ভাবে একাসনে ধ্যানের গভীরতায় মনকে নিবদ্ধ করার চেষ্টার ফসল উঠতে লাগল। মন চেতনার গভীরে হুহু করে ডুবে যাচ্ছে আর উঠে আসছে সমুদ্রমন্থনের ফসল, শেষে নির্বিকল্প বা নির্বাণলাভ হল। এইভাবে গৌতমের শুরুটা হ’ল ভবিষ্যৎ চিন্তা দিয়ে অর্থাৎ যতক্ষণ জন পর্যন্ত না নির্বাণলাভ হয়…ইত্যাদি। আর শেষটায় কি হ’ল জানো অতীত চিন্তা। চেতনার গভীর থেকে—নির্বিকল্প বা নির্বাণ অবস্থা থেকে স্থূলে ফিরতে চাইছে, তখন শরীর permit করছে না, প্রাণসংকটকাল উপস্থিত – হ’ল গৌতমের, গড়িয়ে পড়ে গেল তাঁর দেহ। শরীরে মন আসতেই বুঝতে পারলেন, একটু পানীয় জল হলেও এই মুহূর্তে তাঁর দেহরক্ষাহয়। মাত্র কয়েকহাত দূরে নৈরঞ্জনা নদীর মধুর কুলুকুলুধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তিনি চাইলেন গড়িয়ে গড়িয়েও যদি তীর অবধি যাওয়া যায়, কিন্তু শরীর অবশ হয়ে গেছে—কোন অঙ্গই সাড়া দিল না। গৌতমের মনে পড়ল অতীতে তাঁর রাজবাড়ীতে কত অন্ন, কত জল, কত দাসদাসী, পরিবেশন করার কত লোক আর আজ এই বিজনকাননে নিভৃতে নিরালায় একাকী সেই রাজকুমারের চোখে আঁধার নেমে আসছে। প্রাণ যায় যায়। এইরূপ ভাবনা হতেই নাকে এল সুজাতার নিজের হাতে তৈরী কৃষ্ণগাভীর দুধ আর বাসমতী চাল ও সবরি কলা দিয়ে তৈরী পায়েসের গন্ধ।
সুজাতা ঐ গ্রামেরই মেয়ে, সহজ সরল বালিকা। এক-একজন মেয়ে থাকে দেখবে—যারা গ্রামের ছোট ছোট বালকদের দিদি। হয়তো তাদের আপনার জন নয়, তবু যেন সে তাদের একান্ত আপন। তাদের যত অভিযোগ-অনুযোগ সেই দিদিটিকে ঘিরে। আর দিদিও যেন সকলের ভরসাস্থল, সান্ত্বনাস্থল। সুজাতা এই রকমই একজন বালিকা। গ্রামের রাখাল বালকেরা জঙ্গলে গরু চরাতে যেতো আর তারা বনের ফল-ফুল পেড়ে এনে বা কুড়িয়ে এনে দিদিকে দিতো। দিদি সবাইকে জুটিয়ে নৈরঞ্জনা নদীর ধারে গিয়ে মাটির ঠাকুর তৈরি করতো, ফুল দিয়ে মালা গেঁথে গেঁথে মনের মতো করে ঠাকুরকে সাজাতো, বনফল দিয়ে ভোগ দিতো আর বনফুল তুলে রোজ সেই ঠাকুরের পুজো করতো। দিনের পর দিন সেই গ্রাম্য সরলা বালিকা আর একদল সরলমতি বালকের এই খেলাই চলছিল। হঠাৎ একদিন ছেলেরা খবর দিল দিদিকে যে, গভীর বনের মধ্যে নদীর ধারে একটা ঝাকুমাকু গাছের তলায় দেবতার মতো এক সাধু এসে ধ্যানস্থ হয়ে বসে আছে। কেন কে জানে একথা শুনেই আকুল হয়ে উঠল সুজাতার মন, চরম ব্যাকুলতায় সে ছুটে যেতে চাইল তার চির আকাঙ্ক্ষিতের দর্শনে কিন্তু সে যে মেয়ে ! সমাজের অনুশাসন তাকে তা করতে দিতে পারে না। তাই সে রাখাল বালকদের দু’বেলা পাঠাতো, খবর রাখত, সাধুবাবা কি করছে, কোন প্রয়োজন আছে কিনা তা জানার জন্য। কিন্তু রাখাল বালকেরা খবর দিতো যে, সাধুবাবা ধ্যানস্থ হয়ে চুপচাপ স্থির, নিস্পন্দ হয়ে বসে আছে। কিন্তু যেদিন সে শুনল সাধুবাবার শরীর খুবই জীর্ণ হয়ে গেছে আর গড়িয়ে পড়ে গেছে, সে আর স্থির থাকতে পারল না। স্নান সেরে নিজের হাতে গোরু দোহন করে টাটকা দুধ আর ঘরের বাসমতী চাল দিয়ে পায়েস তৈরি করে, তার তার সাথে গাছের সুপক্ক সবরি কলা (যা গরম পায়েসে পড়লে ননীর মত গলে যায়) দিয়ে একটা পাত্রে রাখল এবং তার উপর আর একটা পাত্র চাপা দিয়ে সুজাতা দ্রুতপায়ে বেরিয়ে গেল নৈরঞ্জনার তীরে সেই স্থানে, যেখানে ভগবান বুদ্ধ তখন মৃত্যুপথযাত্রী।
সুজাতার নিবেদিত পায়েসের গন্ধ নাকে পৌঁছাতেই ভগবানের শরীরের ইন্দ্রিয়সকল আবার ক্রিয়াশীল হয়ে উঠল—ভগবান বর্তমানে ফিরে এলেন। তারপর তিনি সুজাতাকে বললেন, “বৎসে ! এইমাত্র আমি জ্ঞানলাভ (অর্হত্ব) করেছি –তোমাকে আমি তা প্রদান করব। আগে একটু জল ও তোমার নিবেদিত পরমান্ন খেয়ে প্রাণরক্ষা করি।”
এই দ্যাখো, এই যে ঘটনাটা ঘটল—এটাই হাজার বছরের অন্ধকার—আলো জ্বলতেই আলোকিত হওয়া। রাজকুমার সিদ্ধার্থ বা গৌতমীর পালিত পুত্র গৌতম “বুদ্ধ” হলেন। তাহলে যেটা বলছিলাম তিনি আসনে যখন সংকল্প করে বসলেন তখন সেটা ছিল ভবিষ্যতের রঙীন কল্পনা, চেতনার গভীরে ডুব দিয়েও প্রাণসংকটকালে এল অতীতের গৌরবময় স্মৃতি, এ দুটোকেই অগ্রাহ্য করে যখন তিনি বর্তমানে স্থিত হলেন তখনই অর্হত্ব লাভ হ’ল । প্রকৃতপক্ষে এটাই জ্ঞান যে, অতীত বা ভবিষ্যৎ নয়—নিত্যবর্তমানই আছে। আর নিত্যবর্তমানে থাকা মানুষই অতীত বা ভবিষ্যৎ দেখতে পান বা তার কথা বলতে পারেন। এঁদেরকেই কালদ্রষ্টা বলা হয়েছে। কোন বস্তুর 4th dimension হচ্ছে ‘কাল’ বা “time’। কাল বা time-এর রহস্য নিয়ে বর্তমানের বিজ্ঞানী হকিন্স কিছু গবেষণা করেছে কিন্তু তা সম্পূর্ণ নয়। কালজ্ঞানের রহস্যই কালীরহস্য। মহাকালই কালীকে জানেন, তাই কালদ্রষ্টা যাঁরা, তাঁরা মহাকালস্বরূপ। যাইহোক কোন বস্তুর অস্তিত্ব মানেই তা “কালে রয়েছে। যদি কোন বস্তু সৃষ্টি হল, স্থিতিলাভ করল এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত হ’ল কিন্তু তা এত কম সময়ের মধ্যে ঘটল যা তুমি time দিয়ে ধরতে পারলে না, তাহলে কি ঐ রকম কোন ঘটনাকে তুমি ব্যাখ্যা করতে পারবে ? বলা হয়েছে পরিদৃশ্যমান জগৎ ‘কালে’র দ্বারা বিধৃত রয়েছে। কিন্তু কোন ঘূর্ণায়মান বস্তুর কেন্দ্র বরাবর যদি তুমি অবস্থান – কর তাহলে ঐ বস্তুর ঘূর্ণনজনিত যে ব্যাপ্তি বা বিস্তার তা তোমাতে থাকবে না। ঘূর্ণায়মান বস্তুর বিভিন্ন অংশের গতির জন্য time দরকার কিন্তু তার centre of gravity যে particular pin point-এ, সেখানে ঘূর্ণনের time গণ্য হবে না। সেই point-ই ঘুর্ণনের মূল যা পুরো * ঘূর্ণনকে control করছে, দেখছে, কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে স্থির। static কিন্তু প্রচণ্ড dynamic, আবার dynamic কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে static, এটাই নিত্যবর্তমান অবস্থা। জ্বলন্ত দীপশিখা, এটা যখন তুমি দেখছ ততক্ষণে কিন্তু পলিতার জ্বালানি জ্বলে শেষ হয়ে গেছে আবার * নতুন জ্বালানি সেই স্থানে সরবরাহ হয়ে পরবর্তীকালের শিখা সৃষ্টি করছে। কিন্তু চোখ ধরতে পারছে না, ভাবছে স্থিরভাবে একই শিখা বোধহয় জ্বলছে। তাহলে যেটা বর্তমানে দেখছি তা অতীতের ফসল এবং যার ক্রমাগত পরিণতি ঘটছে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে। এই যুক্তিতে ভগবান বুদ্ধের মৃত্যুর বহুবছর পরে বৌদ্ধরা ‘বর্তমান’কে নস্যাৎ করে দিচ্ছিল, তখন আচার্য শঙ্কর ওদের যুক্তিজালের মাথায় মুগুর মারলেন। তিনি বললেন শিখা মিথ্যা, দীপ মিথ্যা, বর্তমান মিথ্যা কিন্তু এই যে দীপশিখা, তার অতীত, তার ভবিষ্যৎ এগুলি দেখছে কে, এগুলি জানছে কে, এগুলি বিচার করছে কে ? ‘আত্মা’, সেই ‘বিজ্ঞাতা’–যা নিত্য, শাশ্বত, সনাতন। তিনিই নিত্য যে করছে, সেই বর্তমান, তিনিই ‘কাল’কে জানেন, সমস্ত কিছুকেই জানেন। একে জানাই আত্মজ্ঞান, আর এটাই বৌদ্ধদের ‘অর্হত্ব’লাভ। অন্নময়, প্রাণময়, মনোময়, বিজ্ঞানময় ও আনন্দময়—এই পঞ্চকোষ নিয়ে যে তিন প্রকার শরীর রয়েছে, সেই ত্রিশারীরিক রহস্য ভেদ করতে হবে বিবেকের সহায়ে। সত্য কি—এটাই জিজ্ঞাসা হোক, তারপর বিবেকের সাহায্যে বিচার কর। এটা কি সত্য—না নয়, তাহলে তাকে পরিত্যাগ কর। এইভাবে ‘নেতি’ ‘নেতি’ বিচার করতে হবে অর্থাৎ এটা নয়, ওটাও নয়। বিবেকের সাহায্য ছাড়া সঠিক বিচার হয় না, তাই বিবেক বিচারের দ্বারা ‘নেতি’ ‘নেতি’ করতে করতে এগোতে হবে। পেঁয়াজের খোসা ছাড়াতে ছাড়াতে যেমন বহিরাবরণ সমস্ত খুলে প্রকৃত মুকুল বা প্রাণকে পাওয়া যায়, তেমনি শরীরের পঞ্চকোষ বিবেকের দ্বারা ভেদ করে প্রকৃত জ্ঞান লাভ করা যায়। আর প্রকৃত জ্ঞান বা পরাজ্ঞান লাভই হল হাজার বছরের অন্ধকার আলো জ্বালতেই আলোয় আলোকময়।