জিজ্ঞাসু–স্থূলবস্তু যেমন দেখা যায় তেমনি সূক্ষ্মবস্তু বা বিষয় কি দেখা যায় ? অনেকে ভূত-প্রেত দেখে শুনতে পাই— তাই জিজ্ঞাসা করছি।

গুরুমহারাজ–স্থূলবস্তু বলেই যে সব চোখে দেখা যায়—এমন তো নয়। বাতাস দেখতে পাও ? মনও স্থূলবস্তু, মনকে দেখতে পাও ? কিন্তু জেনে রাখো যে, সত্যই এসব দেখা যায়। মনেরও রঙ আছে, বিভিন্ন মানুষ, বিভিন্ন তাদের মনের রঙ, আর প্রতিটি রঙ দেখা যায়, চেনা যায়। আর সেই রঙ দেখে বলা যায় কে কি ধরণের মানুষ। মানুষের চিন্তা ধরা যায়, তুমি কি ভাবছ হুবহু বলা যায়, এমন কি তুমি বহুদূরে বসে চিন্তা করছ, তাও জানা যায়। স্থূলজগতে তো অনেক বাধা তাই স্থূল জগৎ যেন ঘিঞ্জি, সংকীর্ণ। সূক্ষ্মজগৎ আরও wide ফলে চেতনা সেখানে আরও অনেক গতিশীল। আর কারণ-জগৎ-এর রহস্য অবগত হলে স্থূল জগৎ যেন তোমার হস্তমলকবৎ। মনোময় কোষের উপর নিয়ন্ত্রণ এলে যেমন মনের ক্রিয়া জানা যায়, তেমনি বিজ্ঞানময় কোষের উপর নিয়ন্ত্রণ আনতে পারলে অপরের চিন্তা ধরা যায়।

পাতঞ্জল যোগভাষ্যে রয়েছে কোন যোগী যদি আসন, প্রাণায়াম ইত্যাদি অষ্টাঙ্গিক যোগমার্গ অবলম্বন করে নিষ্ঠা সহকারে যোগাভ্যাস করে তাহলে তার কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ ঘটতে থাকে। কুলকুণ্ডলিনী যখন মূলাধারে ক্রিয়াশীল থাকে তখন পৃথ্বীতত্ত্ব বা গন্ধ তন্মাত্রার বোধ হয় অর্থাৎ এই তন্মাত্রার রহস্য অধিগত হয়। এই অবস্থায় অতি সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম বস্তু বা বিষয়ের গন্ধ পাওয়া যায় এবং গন্ধ বিচারের দ্বারা সেগুলির গুণ বা অবস্থা নির্ণয় করা যায়। এই অবস্থায় কোন যোগী কাছাকাছি প্রেতযোনি ঘুরে বেড়ালে তার গন্ধ পেতে পারেন বা তার existence টের পান। কুলকুণ্ডলিনী যখন স্বাধিষ্ঠানে ক্রিয়াশীল থাকে তখন বরুণতত্ত্ব বা রস তন্মাত্রার বোধ হয়। এই অবস্থায় যোগীর দৈহিক শক্তির বিকাশ ঘটতে পারে, যে কোন প্রকার খাদ্য হজম করার ক্ষমতা জন্মায়, Sexual ability অনেক গুণে বাড়ানো যায় ইত্যাদি নানান সামর্থ্য আসে। কুলকুণ্ডলিনী মণিপুরে স্থিত হলে রঙবীজ বা বায়ুতত্ত্ব অধিগত হয়। এই অবস্থায় শব্দ তন্মাত্রার বোধ হয়। দূরশ্রবণ, বহুদুরে শব্দ- প্রেরণ ইত্যাদির যেমন ক্ষমতা আসে তেমনি সুক্ষাতিসুক্ষ্ম জাগতিক বা মহাজাগতিক শব্দসমূহের রহস্য অধিগত হয়। পশু-পাখির আওয়াজ শুনে তাদের ভাষা বোঝা যায়, এমনকি তাদের সাথে যোগাযোগ করা যায়। কুলকুণ্ডলিনী অনাহত চক্রে স্থিত হলে অগ্নিতত্ত্ব বা রূপতন্মাত্রা অধিগত হয়। এই অবস্থায় সূক্ষ্ম কেন, সূক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম বস্তু বা বিষয়কেও প্রত্যক্ষ করা যায়, দূরদর্শন হয়। এখানে বসে হাজার মাইল দূরের কোন ব্যক্তি ও বস্তুর সম্বন্ধে বর্ণনা দেওয়া যায়। এই অবস্থায় যোগী প্রেতযোনির রূপ প্রত্যক্ষ করতে পারেন। কুলকুণ্ডলিনী বিশুদ্ধচক্রে ক্রিয়াশীল হলে সুক্ষ্মতত্ত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়, এই অবস্থায় সাধারণত যোগী স্কুলে কথা বললে ভগবৎ প্রসঙ্গই করে থাকেন। কিন্তু তিনি সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম ব্যক্তি বা বিষয়ের সাথে কথা-বার্তার বিনিময় করতে পারেন। আজ্ঞাচক্রে কুলকুণ্ডলিনী স্থিত হলে যে কোন identity-কে চেনা যায়। ব্যক্তি হলে তার কয়েক জন্মের একটা ঘনীভূত রূপ দেখে তাকে identify করা যায়। যে কোন সুক্ষ্মবস্তু, দূরের বস্তু বা ব্যক্তির সাথে communication করা যায়। এই stage-এর উপরে যিনি, তিনিই ভূতনাথ। তিনি এ সব কিছুই পারেন আবার সকলকে উদ্ধার করতেও পারেন।

আমার ঘরে T.V. রয়েছে, অনেক সময় রাত্রে আমি TV. দেখি, দেখতে দেখতে ঘুমিয়েও যাই। শুনতে পাই কেউ যেন বলছে, “বাবা, T.V.-টা বন্ধ করে দাও।” তাকিয়ে দেখি জানালার বাইরে নানান spirit (প্রেত)-রা রয়েছে। আমি বলি, “তোরাই বন্ধ করে দে।” কিন্তু ওরা তা পারে না। কি মজার ব্যাপার দ্যাখো—ওরা শুনতে পাচ্ছে, দেখতে পাচ্ছে, enjoy-ও করছে কিন্তু touch করতে পারছে না বা হাত-পা দিয়ে কোন কর্ম করতে পারছে না। অনেকেই আমাকে প্রেতযোনি নিয়ে জিজ্ঞাসা করে—সত্যিই কি প্রেতযোনি আছে না এসব মিথ্যা ? আরে মিথ্যা হবে কেন ? স্থূলদেহ—সূক্ষ্মদেহ। স্থূলদেহের মৃত্যু ঘটছে অর্থাৎ শরীরটা ক্রিয়াশীলতা হারাচ্ছে কিন্তু চেতনার তো মৃত্যু ঘটেনি, কামনা-বাসনা সম্বলিত চিত্ত রয়ে যাচ্ছে। এটাই সূক্ষ্মদেহ, সেখানে ২৪ তত্ত্বের মধ্যে পাঞ্চভৌতিক শরীর বাদে বাকী ১৭ তত্ত্ব রয়ে যাচ্ছে। সুতরাং মৃত্যুর আগে মানুষটা যা ছিল, যে রকম ছিল মৃত্যুর পর সেই চেতনাতেই রয়ে যাচ্ছে। ভালো মানুষ ভালোই থাকছে, খারাপ মানুষ বদমায়েশি মনোভাব নিয়ে থেকে যাচ্ছে। তবে অপঘাতে মৃত্যুর ক্ষেত্রে তার মৃত্যুকালীন যন্ত্রণাটা continue করে, তাই সদাসর্বদা কষ্ট পায়। আর যতদিন না তার পূর্বশরীরের আয়ুষ্কাল সম্পূর্ণ হয়, ততদিন ঐ যন্ত্রণা ভোগ করে। এইজন্যই বলা হয় ‘আত্মহত্যা মহাপাপ’। জন্ম যেমন তোমার হাতে ছিল না, মৃত্যুও তোমার হাতে নয়। সময়ের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এটাই natural নিয়ম। কোন বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত কষ্ট বা ব্যাধিজনিত কষ্ট ভোগ করছে অথচ মারাও যাচ্ছে না। আবার দেখা যায় young ছেলে-মেয়ে অল্প রোগ- ভোগ করেই দুম্ করে মারা গেল। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে—এটা ঈশ্বরের কেমন বিচার ? কিন্তু ঐ যে বললাম জন্ম বা মৃত্যু প্রকৃতির অধীন। কারণ প্রতিটি জীবন তো জীবনচক্রের সমাহার। তুমি একটা জীবনের কয়েকটামাত্র বছর দেখে বিচার করছ —কিন্তু ঐ ব্যক্তির পূর্বাপূর্ব জীবনসমূহ এবং সেই জীবনসমূহের কর্মসমূহের কি কোন জ্ঞান তোমার রয়েছে ? তাহলে একটি বৃদ্ধ বা বৃদ্ধা কেন দীর্ঘদিন কষ্ট পাচ্ছে কি করে বুঝবে ? তার পরবর্তী শরীর গ্রহণের ক্ষেত্রপ্রস্তুত না হওয়া পর্যন্ত তার পুরোনো শরীর পাত হচ্ছে না। শরীর ছাড়ার পর সুক্ষ্ম অবস্থায় কিছুকাল থাকারও স্থান আছে, তারও নিয়ম আছে, সেখানেও হিসাব রয়েছে। এসবগুলি fulfill না হওয়া পর্যন্ত তো জায়গাই হবে না তো মানুষটা মরবে কি করে ? এবার যদি জোর করে মারা হয় বা আত্মঘাতী হয় তাহলেই প্রকৃতিবিরুদ্ধ কর্ম হ’ল, যা অন্য principle-এ পড়ে গেল, আর অকারণ কষ্টের জগতে কিছুকাল বিচরণ করতে লাগল। আবার একটা principle সেই কষ্টদশা থেকে তাকে মূলস্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে আসে—এ ভাবেই চলছে।

Spirit-দের উচ্চ অবস্থা ও নিম্ন অবস্থা বলতে মানুষ হিসাবে ব্যক্তিটি শুদ্ধ সাত্ত্বিক না ঘোর তামসিক জীবন-যাপন করতো সেটাই নির্ণীত হয়। দেখেছি কোন বর্গাকার field-এর ঈশানকোণে নিম্ন চেতনার spirit-রা দাঁড়াতে পারে না, তারা নৈঋতে দাঁড়ায়। মাঝামাঝি চেতনার spirit-রা বায়ুকোণ পছন্দ করে। বনগ্রামের ন’কাকাদের বাড়ীর কলতলাটা ঈশানকোণে। তাই ওখানে ঢুকতে না পারলেও পাঁচিলের বাইরে থেকে প্রায়ই পচা-ভাগাড়ের অথবা বোকাপাঁঠার গায়ের মতো গন্ধ পাওয়া যায়। কিন্তু উচ্চ চেতনার spirit-রা ঈশানকোণে থাকতে পারে। আমাদের আশ্রমে প্রথমে ভুল করে ঈশানকোণে পায়খানা করা হয়েছিল। আমি বনগ্রামে ফিরে আসতেই বিভিন্ন উন্নত soul-রা আমাকে complain করতে থাকল। পরে সেগুলো ভেঙে সেখানে ঠাকুরঘর বানানো হল, এখন আর অসুবিধা হয় না। মানুষের ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটে, এখানে বিভিন্ন ধরণের এবং বিভিন্ন চরিত্রের মানুষ আসে। তারা যখন আসন গ্রহণ করে বা বসে তখন তাদের বসার স্থান নির্বাচন এবং বসার ভঙ্গিমা দেখেই তারা কে কোন চেতনায় আছে তা বুঝতে পারা যায়। আমার এখানে সাধারণত মেয়েরা ডানদিকে বসে আর বাঁ দিকটায় ছেলে বা পুরুষদের বসতে বলা হয়। এমন মানুষ আছে যারা বারবার আসছে –দেখছে আমার সামনে ডানদিকটায় মেয়েরাই বসে আছে, কিন্তু সে ঠিক ওদের মাঝখানে একটু ফাঁকা জায়গা দেখে বসার চেষ্টা করে। আরে ব্রহ্মজ্ঞান পরে হবে আগে তো কাণ্ডজ্ঞান হোক্। আধ্যাত্মিক আলোচনা শুনে বা সৎসঙ্গ করে কি লাভ হবে যদি চেতনার বিকাশ না হোল ? অনেককে দেখেছি যখন হালকা হালকা কথা হচ্ছে তখন বেশ অংশগ্রহণ করছে, মজা পাচ্ছে কিন্তু যেই তত্ত্ব আলোচনা শুরু হোল অমনি হাই তুলতে তুলতে ঘুমিয়েই গেল। মস্তিষ্ক নিতে পারছে না, ছোটবেলা থেকে brain-cell-গুলো ঠিকমতো খোলেনি—তাই উন্নত চিন্তা গ্রহণ করতে পারছে না, তবে আমি বৃথা বাক্যব্যয় করি না—হাতুড়ি মেরে ঢোকানোর মতো মস্তিষ্ককোষে print করে দিই। ফলে এ জন্মে কাজ না হলেও পরবর্তী শরীরে ঐ বীজাকারে থাকা তত্ত্ব ফুল-ফল সমন্বিত বৃক্ষে রূপ নেবে। পরবর্তী শরীরের চেতনা উন্নত হবে।