জিজ্ঞাসু—লক্ষ্মী-সরস্বতীর মধ্যে নাকি চিরকালীন বিবাদ রয়েছে ! লক্ষ্মী থাকলে সরস্বতী হয় না আবার বিদ্বান বা শিক্ষিতদের লক্ষ্মী হয় না ?
গুরুমহারাজ—এমন কথা কে বলেছে ? “বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী”—লক্ষ্মীপুত্র অর্থাৎ ব্যবসাদারদের হাতে অর্থের বা সম্পদের প্রাচুর্য, আবার সরস্বতীর উপাসক—বিদ্বান বা শিক্ষিত ব্যক্তিরাও সাধারণত চাকরি করে বা তারা সাহিত্য, শিল্পকলা, সঙ্গীত ইত্যাদি থেকেও অনেক অর্থ উপার্জন করে। সুদূর অতীতে এই দুই-এর মধ্যে একটা ফারাক্ ছিল। বর্তমানে তা আর প্রায় নেই বললেই চলে। এখন একজন সিনেমা-আর্টিষ্ট, খেলোয়াড়, সঙ্গীতকার ও সঙ্গীতশিল্পীর তো প্রচুর রোজগার। বড় বড় ব্যবসাদারদের মতই রোজগার। শিক্ষিত ব্যক্তিরা চাকুরি করছে আবার সুযোগমতো দু’হাতে ঘুষ নিয়ে প্রচুর টাকার মালিক হচ্ছে। আজকের ভারত সরকারের বড় বড় I A. S বা I. P. S officer বা আমলাদের টাকা কত আছে তা তারা হয়ত নিজেরাও জানে না। বর্তমানে নেতারা আর দুর্নীতিপরায়ণ officer-রাই তো টাকা বিদেশী ব্যাঙ্কে রাখে। ব্যবসাদাররা রোজগার বেশী হলে ব্যবসা বাড়ায়। একটা কারখানা থেকে দুটো বা আরও বেশী কারবার করে। আরও বড় জায়গায় চলে গেলে আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবসা করে। বড় বড় ব্যবসাদাররা কখনও ব্যাঙ্কে টাকা জমা রাখতে চায় না, তারা ব্যাঙ্ক থেকে টাকা ধার নেয়—আর ব্যবসা বাড়ায়। সেই অর্থে দেশের ব্যবসাদারদের থেকেও দুর্নীতিগ্রস্ত এই বুদ্ধিজীবী লোকেরা দেশের পক্ষে বেশী ক্ষতিকর। ব্যবসাদাররা এই ধরণের শিক্ষিত লোকেদের হাত করে নিয়ে তাদেরকে কিছু পয়সা দিয়ে বহু দুর্নীতিযুক্ত কাজ করিয়ে নেয় । দ্যাখো না যে কোন বিজ্ঞানী তো মানবকল্যাণের নিমিত্তই বিভিন্ন আবিষ্কার করে। কিন্তু ব্যবসাদাররা তাদের শেখায় সেই আবিষ্কারগুলো কিভাবে negative field-এ কাজ করবে সেটা আবিষ্কার করতে। এরফলে ঐ বিজ্ঞানীরা প্রচুর টাকা পায়, সম্মান পায়, বিভিন্ন award রয়েছে— এগুলোর রহস্য জানো! এগুলো সবই ব্যবসাদারদের দ্বারা পরিচালিত। বড় বড় আন্তর্জাতিক ঔষধ কোম্পানীগুলো সবসময়ই চাইবে জগতে রোগ-ব্যাধি বেশি হোক—এটা তো স্বাভাবিক। তারা সবাই জগৎকল্যাণ করছে নাকি ? এরজন্য কোন বিজ্ঞানীকে ধরে নতুন রোগজীবাণু আবিষ্কার করতেও এরা পিছ পা হয় না। কিছুদিন আগে পর্যন্ত তোমরা শুনছিলে যে, মাতৃদুগ্ধ শিশুদের পক্ষে ভালো নয়। ফলে নানান গুঁড়ো দুধের কোম্পানী ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে গেল। তারা বেশ কিছু ব্যবসাও করে নিল। এরপর আবার বলছে মাতৃদুগ্ধের কোন বিকল্প নেই। ব্যবসা-দাররা যেমন বলতে বলে একদল রাজনৈতিক নেতা, বুদ্ধিজীবী বা বিজ্ঞানী অথবা ডাক্তাররা প্রচুর টাকার বিনিময়ে সেই কথাগুলো বিভিন্ন seminar-এ বক্তব্য রাখে, না হয় article লিখে বিভিন্ন jour- nal-এ ছাপিয়ে দেয়। এরা Media কেও ব্যবহার করে। ঐ article- গুলো highlight করার জন্য Media-কে পয়সা দেয়। সাধারণ মানুষ আর কি বোঝে ? সেগুলোকেই সত্যি বলে মনে করে আর বিশ্বাস করে।
আমাদের বাংলায়—বিশেষত বর্ধমান, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, নদীয়া ইত্যাদি জেলায় কিছুদিন আগে পর্যন্ত প্রচুর তেওড়া বা খেসারি হোত । এটা বিনাচাষে হয় আর কম পরিশ্রমের ফসল। এতে অন্যান্য অনেক ডাল অপেক্ষা বেশী পুষ্টিগুণ রয়েছে—প্রোটিনের পরিমাণ সবচাইতে বেশী। এখন দেখবে এই তেওড়ার চাষ একদম কমে গেছে। এর কারণ কি জানো—মুগ, মুসুর, মটর, ছোলা ইত্যাদি ডালগুলো অন্যান্য রাজ্য থেকে পশ্চিমবঙ্গে আমদানি হয়। খেসারির প্রচুর production, এই ডাল-এর দামও কম আবার পুষ্টিগুণও বেশী, তাই এখানকার গ্রামাঞ্চলের লোকে এই ডালটাই ব্যবহার করতো, অন্য ডাল বিশেষ কিনত না। কিছু অসাধু ব্যবসাদার এই ব্যাপারটা দেখে কিছু ডাক্তার বা কৃষি-বিজ্ঞানীকে দিয়ে কিছু article লিখিয়ে দিল, যাতে খেসারির সম্বন্ধে উল্টোপাল্টা মন্তব্য রয়েছে। বলা হোল এ ডাল খেলে কুষ্ঠব্যাধি হয়, এটা মনুষ্যখাদ্যই নয়—এটি গোখাদ্য। ভাবো একবার! এতকাল ধরে এখানকার মানুষ পুরুষানুক্রমে এই ডাল ব্যবহার করে এল, কোনদিন কিছু হোল না, আর দু-একটা article আর Media যেই প্রচার করে দিল, সমস্ত মানুষের মধ্যে যেন “সাজো-সাজো” রব পড়ে গেল—খেসারি খাওয়া চলবে না—আমদানী করা দামী ডাল খাও । আর সরকারী ব্যবস্থার কথা না তোলাই ভালো। Top to bottom দুর্নীতিপরায়ণ। হয় প্রত্যক্ষ না হয় পরোক্ষভাবে দুর্নীতিকে মদত দিচ্ছে, সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবে নাকি ! কোটি কোটি মানুষ পিলপিল করছে। যারা এদের কাছে উপেক্ষার পাত্র। দু-চার হাজার বা দু-চার লাখ জনগণ মরে গেলেই বা কি ! এদের মৌরসি পাট্টা থাকলেই হোল। তারপর বিদেশি বাড়ী, বিদেশি ব্যাঙ্কে টাকা এসব তো রয়েছেই। সরকারের পতন হলে বা গদি উল্টালেও সাতপুরুষ বসে বসে খাও। সুতরাং সরকার বা সরকারী ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের কল্যাণের ব্যাপারে উদাসীন। প্রকৃত জাতীয়তাবাদী বা মানবপ্রেমী সরকার বা সরকারী আমলারা থাকলে এরকম অপপ্রচার কখনও হয় না। এখনও ডালের বেসন কিন্তু খেসারিরই হয়। যে কোন ডালের বেসনে এই বেসন মিশিয়ে বিক্রি হয়। তাতে দোষ নেই—ডাল খেলে দোষ। আমি দেখেছি এই ডালের খোসায় একধরণের element আছে যা মানবশরীরের সামান্য ক্ষতি করে। কিন্তু এই ডাল রান্না করার আগে একটু গরমজলে ফুটিয়ে জলটা ফেলে দিলেই আর কোন অসুবিধা থাকে না, আরামসে খাওয়া যেতে পারে। দেখবে আগামীদিনে এই ডাল আবার মানুষের গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে।