জিজ্ঞাসু—আপনার এখানেও তো বিরাট পরিবার – যেন ছোট পরিবার থেকে বড় পরিবারে আসা ?
গুরুমহারাজ—সংসারের সঙ্গে আশ্রম বা মিশনকে গুলিয়ে ফেলো না। এখানে কোন আসক্তির সম্পর্ক নেই। সংসারে স্ত্রী, পুত্র, পরিবার- পরিজন, পিতা-মাতা ইত্যাদি সকলে সকলের প্রতি আসক্ত থাকে, প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের দেওয়া-নেওয়া বা চাওয়া-পাওয়ার শর্ত থাকে। এখানে কিন্তু তা নেই, এখানে যে সমস্ত সাধু-ব্রহ্মচারী দেখছো, তারা ত্যাগব্রত অবলম্বন করেই এখানে এসেছে। আত্মদর্শন বা পূর্ণতা- প্রাপ্তি তাদের অভীষ্ট লক্ষ্য। সুতরাং জাগতিক চাওয়া-পাওয়া থাকলে সে আদর্শ সন্ন্যাসী বা ব্রহ্মচারী হতে পারল না। তারজন্য আবার সংসারে ফিরে যাবার রাস্তা খোলা রয়েছে। কেউ ব্রহ্মচারী হলে সেকি আর সংসারে ফিরতে পারবে না ! তা নয়, কিন্তু এটা তার ক্ষেত্রে বিরাট পরাজয়। জগতের আকর্ষণকে তুচ্ছ করে একদিন যে ত্যাগৱত গ্রহণ করেছিল, প্রকৃতির অমোঘ নিয়মকে তুচ্ছ করে উজানে চলার হিম্মৎ দেখিয়েছিল–হয়ত কিছুকাল চলেছেও। কিন্তু কালস্রোতে সে ভেসে গেল –দুর্বলতার কারণে ফেঁসে গেল। তবে আবার পরবর্তী শরীরে সে চেষ্টা করবে। কিন্তু যারা প্রকৃতপক্ষে ত্যাগরতকে অবলম্বন ক’রে তীব্র বৈরাগ্য সহায়ে আশ্রমজীবন-যাপন করছে, তার জগৎ থেকে পাবারই বা কি আছে আর চাইবারই বা কি আছে ? আর আশ্রমের অনাথ ছেলে যারা আছে, তাদের সাথেও আশ্রমিকদের কারও কোন আসক্তির সম্পর্ক নেই। এরা বড় হয়ে নিজ নিজ বাড়ীতে ফিরে যাবে। তখন রোজগার করে তার নিজের সংসার প্রতিপালন করবে। আশ্রম আশা করে না যে, তারা বড় হয়ে আশ্রমকে টাকা পাঠাবে। যদি ওদের মধ্যে কেউ বিবেকবান থাকে, সে তার অতীতকে স্মরণ করে নিশ্চয়ই আশ্রমের জন্য কাজ করবে। হয়তো ওদের মধ্যে থেকে অনেক সাধু-সন্ন্যাসীও হবে। আশ্রমের কাজের ভার নেবে।
তাই আশ্রমের পরিবার বড় পরিবার কিন্তু সংসারের পরিবার নয়। আমাদের পূর্বাশ্রমের পরিবারও সেই অর্থে বড় পরিবার ছিল, আমরা অনেক ক’জন ভাই-বোন, বাবা-মা, পিসিমা। আমি কিন্তু ছোটবেলা থেকেই একা। পথে-প্রান্তরে ঘুরে বেড়িয়েছি—একা একা । ছোটবেলায় যখন গভীর রাত্রে গ্রামের বিভিন্ন স্থানে ঘুরতাম তখন একজন সঙ্গী ছিল—আমার বয়সেরই একটা মেয়ে (মা জগদম্বা)। পরে সে আমাকে কিছুদিনের জন্য জগৎ দেখাতে একলা ছেড়ে দিয়েছিল। কখনও হেঁটে, কখনও ট্রেনে ও বাসে চেপে কোথায় না গেছি। হাঁটতে হাঁটতে হিমালয় ঘুরে, তিব্বত ঘুরে, জম্মু-কাশ্মীর দিয়ে পাকিস্তান, সেখান থেকে আফগানিস্তান হয়ে ইরাক, ইরান, তুরস্ক পর্যন্ত পায়ে হেঁটে ঘুরেছি। পথের সাথী ছিল ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু রাস্তা চলাকালীনও মনে করতাম আমি যেন একটা পরিবারের সদস্য। সেই পরিবারটা ছোট পরিবার না বড় পরিবার তা তোমরা যারা পণ্ডিত আছ তারা ঠিক করবে। আমার মনে হোত সূর্য আমার পিতা আর ধরিত্রী আমার মাতা। তাই সূর্য আমাকে পথ দেখাতো, উত্তাপ দিত, খাদ্য দিত। তার প্রখর দীপ্ত পৌরুষ দেখে আমার মনে হোত সূর্য পিতা। আর মাটি-মায়ের কোলে আমার রাতের পর রাত কেটে গেছে। স্নেহময়ী জননীর মমতায় মাটি-মা আমাকে আশ্রয় দিয়েছে, ঘুম পাড়িয়েছে, নিবিড় শান্তি দিয়েছে। মাটির স্নিগ্ধতা আমাকে গর্ভধারিণী মায়ের কথাই মনে করাতো। ধরিত্রী মাতার জল, বাতাস সবই যেন মনে হোত মায়ের স্নেহের স্পর্শ। আর ভগ্নি চন্দ্র বা চাঁদকে মনে হোত আমার আদরের বা স্নেহের বোন। ওর স্নিগ্ধ আলো, সেটা যেন মনে হোত ছোট বোনের স্পর্শ। তার কলঙ্করঞ্জিত সুন্দর মুখ আমার বড় ভালো লাগত। বলতো এই পরিবারটা ছোট না বড় ?
পরবর্তীকালে যখন আমার বিবাহ হল বা বলা চলে গুরুদেবের পৌরোহিত্যে বিবাহ দেওয়া হল তখন আবার এক পরিবার আমাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠল। যেখানে ‘সাধনা’ আমার স্ত্রী। যার সাথে দীর্ঘদিন ঘর করতে করতে দুটি সন্তান হ’ল, তার মধ্যে একটি পুত্র ও একটি কন্যা। পুত্রটির নাম জ্ঞান, আর কন্যাটির নাম ভক্তি। এই সংসার নিয়ে সুখ-দুঃখে মিলেমিশে আমার ব্যক্তিগত জীবন কেটে যাচ্ছিল। তারপর মা জগদম্বার নির্দেশে বনগ্রামে এই আশ্ৰম হ’ল। সেখান থেকে আবার বিভিন্ন শাখা আশ্রম হল, তোমরা সকলে এলে, আরও কতজন আসবে। অনেকে পরমানন্দকে ভালোবাসবে, তার জন্য চোখের জল ফেলবে। আবার অনেকে গালাগালি দেবে। পরবর্তীকালে দেখবে অনেকে পরমানন্দকে নিয়ে ব্যবসা করছে। কেউ নাম ভাঙিয়ে, কেউ অন্যভাবে পয়সা রোজগার করছে। পরমানন্দের ছবি নিয়ে ক্যালেণ্ডার করছে আবার সেই ক্যালেণ্ডার রাস্তায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, নর্দমায় পড়ে পচছে। এটাই জগৎ, এই জগৎজ্ঞান যার হয়েছে সে জগতের বিষয় নিয়ে মাথা ঘামায় না। স্থূল শরীরটাকেই পাত্তা দেয় না তো মৃত্যুর পরের স্মৃতি। আমার গুরুদেব রামানন্দ অবধূতজীর শরীর ছাড়ার সময়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ‘আপনার শরীরের কিভাবে সৎকার হবে ?’ উনি বলেছিলেন, “স্থূল শরীরটার আবার কি সৎকার, একে কেন্দ্র করে যে লীলা করল, সে এই শরীরটা থেকে যা নেবার নিয়ে নিয়েছে, এবার এই মড়া খোলটার যা কিছু হোক তাতে কিছু আসে যায় না। স্থানীয় সাধুরা একে দাহ করুক বা জলসমাধি দিক কিংবা টান মেরে ছুঁড়ে ফেলে দিক তাতে কোনকিছুই যায় আসে না।” দেখেছো, জ্ঞানীব্যক্তির জগৎ সম্বন্ধে বা জাগতিক বিষয় সম্বন্ধে কত অনীহা ! সাধারণ মানুষ যেগুলির জন্য হাহাকার করে, লালায়িত হয়, জ্ঞানীরা সেগুলিকে তুচ্ছাতিতুচ্ছ জ্ঞান করেন—চরম অবহেলায় প্রত্যাখ্যান করেন। তিরস্কার-পুরস্কার সবেতেই সমভাবাপন্ন। “দুঃখেষুনুদ্বিগ্নমনাঃ সুখেষু বিগতস্পৃহঃ”। জ্ঞানীরা সুখে উল্লসিত ও দুঃখে কাতর হন না। পরমহংসস্থিতি আবার আরও মজার—চরম দুঃখে হাহা করে হাসছেন, বিরাট রাজ্যের ধ্বংস্তূপে, রণাঙ্গণে যেখানে হয়তো লক্ষ মানুষের রক্তাক্ত শব পড়ে রয়েছে, সেখানেও তিনি নৃত্য করছেন, উল্লাস করছেন কারণ সর্বদা সর্বক্ষেত্রেই তিনি মায়ের লীলা দর্শন করছেন। নিত্যে স্থিতি আর দর্শন করছেন লীলা। এ বড় অদ্ভূত রহস্য। তাঁদের কাছে “ব্রহ্ম সত্য জগৎ মিথ্যা”। –এখানে মিথ্যা অর্থে অনিত্য বা লীলাজগৎ। নিত্যে স্থিত হয়েই জগতের লীলার আস্বাদন হয় অন্যথায় এ জগৎ জ্বালাময়। লোকে বলে, “কৃষ্ণের লীলা আর জীবের জ্বালা”–ঠিকই বলে। শিব জগৎ-রহস্য বুঝতে পেরে সব পরিত্যাগ করে ছাই-ভস্ম মেখে শ্মশানবাসী হয়ে গেলেন। আর তখনই তার পিছু পিছু মা দুর্গা, লক্ষ্মী- সরস্বতী, কার্তিক-গণেশ গিয়ে হাজির। একটু আগে তোমরা বলছিলে না লক্ষ্মী-সরস্বতীর ঝগড়ার কথা। এখানে দ্যাখো, যদি তুমি শিব হও তাহলে তোমার পিছু পিছু লক্ষ্মী-সরস্বতীর সহাবস্থান হবে। এটাই জগৎ রহস্য ! যতক্ষণ তোমার মধ্যে জাগতিক বিষয়সমূহ ভোগ করার স্পৃহা রয়েছে, কামনা বা আসক্তি রয়েছে, ততক্ষণ কিছুটা পাওয়ার সুখ আর বাকীটা না পাওয়ার জ্বালা। রোগ-ব্যাধি, শোক- দুঃখের জ্বালাই জ্বালা। একটু ভোগের জন্য একরাশ ভোগান্তি। কিন্তু যেই তোমার মধ্যে বিবেক জাগ্রত হল, বৈরাগ্য এল, জাগতিক বিষয়াদি আলুনি বোধ হতে লাগল, ব্যস্–জগতের ঐশ্বর্য্য, ভোগ-সম্পদ তোমার পিছু পিছু ঘুরঘুর করবে। তবে সাবধান, ফেঁসেছ কি মরেছ ! হলুদ মেখে স্নান করলে যেমন কুমীরের ভয় থাকে না তেমনি গুরুর কাছে শিক্ষাগ্রহণ করে—নিরাসক্ত হয়ে সাধন করলে আর অতটা পতনের ভয় থাকে না। পতন বলছি বলে আবার মনে কোর না যে, কোন স্থান থেকে পড়ে যাওয়া। একটা অগ্রগতি রুদ্ধ হওয়া। কুলকুণ্ডলিনীর যে ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত ছিল সেটা থেমে যাওয়া বা সেখান থেকে নেমে আসা। আবার শুরু হতে পারে সচেষ্ট হলেই। আমি বহু সাধককে দেখেছি যৌবনের উন্মাদনায় হয়ত পদস্খলন হয়েছিল, কিছুদিন চলা থেমে গিয়েছিল কিন্তু প্রৌঢ় বয়স থেকে আবার পূর্ণোদ্যমে শুরু করে পরিণত বয়সে চরম আধ্যাত্মিক উন্নতি করেছে। লোকনাথ বাবার জীবনেও এ রকম ঘটনা ঘটেছিল কিন্তু পরবর্তীজীবনে সাধন করতে করতে তিনি নিজেই শিবস্বরূপ হয়ে গেলেন। সুতরাং “সাধু সাবধান”। সর্বদা সাধুকে সাবধানে থাকতে হয়। চলার পথে ছোটখাটো ভুল হলেও মাভৈঃ। মনে করবে পড়ে গিয়ে গায়ে একটু ধুলো-কাদা লেগেছে। ধুলো ঝেড়ে আবার উঠে পড়ো—নতুন উদ্যমে গুরু নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে এগিয়ে যাও। নিশ্চয়ই তোমার অভীষ্ট পূরণ হবে।