জিজ্ঞাসু—মহেশযোগীর বিদেশে খুব নামডাক, প্রায়ই কাগজে বিজ্ঞাপন দেখা যায়—উনি বিদেশে নানা ধর্মালোচনা করছেন, ভারতীয় যোগ ও চিকিৎসা বিদেশে চালু করছেন—উনি কি প্রকৃত ঈশ্বর-প্রেরিত চাপরাশপ্রাপ্ত মহাপুরুষ ?

গুরুমহারাজ—কি মুস্কিল! তোমরা এমন জিজ্ঞাসা কর যে, উত্তর দিতে হলে সেটা ব্যক্তিগত আক্রমণ হবে বা সাধুর সমালোচনা হয়ে যাবে। তোমার অত খোঁজে কাজ কি ? তাঁর যেটুকু ভালো সেটা গ্রহণ করো তাহলেই হবে। কোথা থেকে খবরের কাগজে একটা বিজ্ঞাপন দেখলে আর মনে মনে তখনই স্থির করলে যাই বনগ্রামে— স্বামী পরমানন্দের কাছে এই কথাটা জিজ্ঞাসা করি। কি হবে বল – উনি যদি প্রেরিত পুরুষই হন তাহলে তুমি গিয়ে কি ওনার সাথে দেখা করবে অথবা তিনি তোমায় মোক্ষ-মুক্তি দিয়ে দেবেন ? আমি সুইজারল্যাণ্ডে ওনার আশ্রমের একটা শাখায় গিয়েছিলাম, যেখানে এখন উনি বেশীরভাগই থাকেন। আশ্রমে ঢুকতেই যা chart দেখলাম তাতে তোমার মত ব্যক্তির অর্থসঙ্গতি নিয়ে মহেশযোগীর কৃপালাভ করা আর এ জীবনে হবে না। সাধারণ দীক্ষা ১০০০ ডলার, বিশেষ দীক্ষা ৫০০০ ডলার, যোগ দীক্ষা ১০০০০ ডলার এইরকম সব মূল্য উল্লেখ করে chart টাঙানো আছে। হুহু করে বিদেশীরা সেখানে যাচ্ছে আর যোগদীক্ষা নিচ্ছে। সুইজারল্যাণ্ড পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোর মধ্যে আবার সব চেয়ে অর্থনৈতিকভাবে উপরের সারিতে। ওখানে ২/১ কাঠা জায়গার যে কি প্রচণ্ড দাম তা কল্পনা করতে পারবে না! সেই রকম একটা জায়গায় অতবড় আশ্রম আর কি সুন্দর সাজানো-গোছানো, কত টাকা থাকলে যে এটা করা যায় তা তুমি কল্পনাও করতে পারবে না !

তবে মহেশযোগী ভারতের জন্য ভাবেন। উনি ভারতীয় গাছ- গাছড়ার বিদেশে চাহিদা বাড়াচ্ছেন, ভারতীয় ডাক্তার, ইঞ্জিনীয়ার বা সাধারণ কর্মীদের ওদেশে নিয়ে যাচ্ছেন, আবার বিভিন্ন ধর্ম-সম্মেলন ভারতে করতে চাইছেন যাতে বহু বিদেশী এদেশে আসে এবং এখানকার বিদেশী মুদ্রার তহবিলটা একটু বাড়ে। কিছুদিন আগেও উনি দিল্লীতে একটা সেমিনার করবেন বলে এসেছিলেন – প্রায় ৪০ খানা বিমান দিল্লীর ‘পালাম বিমানবন্দরে ৭ দিন ধরে ছিল। এদের landing fee, park- ing fee ইত্যাদি ছিল বিরাট অংকের টাকা। এবার অতগুলো বিমানে যতলোক এসেছিল সবাই ৭ দিন দিল্লীতে বিভিন্ন hotel-এ থেকেছিল ও কেনাকাটা করেছিল অর্থাৎ বলতে পারো ভারতসরকারের কাছে এরা ছিল লক্ষীস্থানীয় লোক ।

জিজ্ঞাসু—আধ্যাত্মিকতার ক্ষেত্রে উন্নতি ঘটলে মানুষের স্বভাব বা মানসিকতা কেমন হয়ে যায় ?

গুরুমহারাজ— দেখ, আধ্যাত্মিকতা বা যোগবিজ্ঞান মানুষকে দুর্বল করে তোলে না। অনেকের ধারণা “ধম্মকম্ম করা” মানেই কাঁদা আর বিনিয়ে বিনিয়ে কথা বলা, না তা নয়। ধর্মাচরণ বা আধ্যাত্মিক অনুশীলন মানুষকে শক্তিশালী করে তোলে। আর তার ফলেই ত্রিবিধভাবেই—শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক বলে বলীয়ান হয়ে ওঠে যোগী। অণিমা-লঘিমাদি সিদ্ধি তখন তার করায়ত্ত, সাধারণ মানুষ কি করে তার সামনে দাঁড়াতে পারবে ? আর যদি মহিমাশক্তি লাভ হয়। তাহলে তো সে নিজেকেই ঈশ্বর ভাবতে শুরু করবে। পৃথিবীতে বহু ভগবান আমদানি হবার পিছনে এটাই কারণ। একটা particular জায়গায় পৌঁছে সাধকের মনে হয়, সেই সর্বশক্তিমান। কারণ এই অবস্থায় ঈশিতাশক্তির মহিমার প্রকাশ ঘটে যায়। ফলে সে নিজেকেই ঈশ্বর ভাবতে শুরু করে। ঠাকুরের (শ্রীরামকৃষ্ণ) কৃপায় হৃদয়ের একবার ঐ রকম অবস্থা হয়েছিল। হৃদয় দেখল তার মামা ও তার—দুজনেরই জ্যোতির্ময় শরীর, দুজনেরই চরণ মাটি স্পর্শ করছে না, ভিতরে শক্তি, আনন্দ ও প্রেমের হিল্লোল বইছে। হৃদয় তাড়াতাড়ি মামাকে বলে উঠল, ‘ও মামা ! আমরা তো এ লোকের মানুষ নই গো— তাহলে এখানে আর থাকা কেন, চল জগৎ উদ্ধার করি গে!’ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ দেখলেন হৃদয়কে divine touch দিয়ে তো মহামুস্কিল হ’ল। আবার তিনি হৃদয়ের হৃদ্দেশ স্পর্শ করে শান্ত করে দিলেন। অবশ্য ঠাকুরের কথা স্বতন্ত্র, কারণ অষ্টসিদ্ধিই যাঁর করায়ত্ত তিনি নিজেই যে শুধু সিদ্ধ হন তা নয়, তিনি অপরকেও সিদ্ধি দিতে পারেন। কিন্তু সাধারণভাবে সাধক যখন একটা একটা স্তর অতিক্রম করে এগোতে থাকে, আর একটু একটু শক্তি বা সামর্থ্যলাভ হতে থাকে, তখন একসময় সে এই শক্তির মোহে পড়ে যায়। সাধকের কি কথা, বড় বড় ধনী, ক্ষমতাবান ব্যক্তি, রাষ্ট্রনায়ক ইত্যাদিদের মধ্যেও এই ধরণের মানসিকতা তৈরী হয়, তারা অপরকে দিয়ে নিজের জীবনী লেখাতে চায়, কিছু কীর্তি স্থাপন করে মানুষের কাছে অমর হয়ে থাকতে চায়। কিন্তু চালাকি দিয়ে কি কার্যসিদ্ধি হয় ? সাধারণ কর্মসমূহ সম্পন্ন হলেও আধ্যাত্মিক জগতের নিয়মকে লঙ্ঘন করা কখনই সম্ভব নয়। কালী যার উপর প্রসন্ন, ‘কাল’ বা time তাকেই পাত্তা দেয় আর তার নামই কালের বুকে বহুকাল স্থান পেয়ে যায়। ভগবান শ্রীকৃষ্ণকে কত সমালোচক কত কথাই বলেছে—রাখাল, অশিক্ষিত, গোরু চরাত আর মেয়েদের সাথে ফষ্টিনষ্টি করতো, নিজে অন্যায়কারী আবার অপরকে অন্যায় করাতে বাধ্য করাতো ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু সেইসব সমালোচকরা ইতিহাসে কোথায় ? আর ভগবান শ্রীকৃষ্ণ কতকাল মানুষের হৃদয়াসনে বসে পূজা পাচ্ছেন। আজও মানুষ শ্রীকৃষ্ণকীর্তন করছে, স্তব-স্তুতি ও প্রার্থনা করছে—নিশ্চয়ই তারা ফলও পাচ্ছে। যুগ যুগ ধরে কোটি কোটি মানুষ একজন কাল্পনিক ব্যক্তিকে মেনে আসছে অথচ বিনিময়ে কিছু পাচ্ছে না—এটা তো হতে পারে না। বরং উল্টোটাই হয়—‘ডাকার মত ডাকলে’ আজও তাঁর সাড়া পাওয়া যায়, তাঁর দেখা মেলে। ভক্তির চূড়ান্ত পর্যায়ে তাঁর দর্শন, স্পর্শন, প্রেম- আলাপন সবই হয়। জয়দেব গোস্বামী কদম্বখণ্ডীর ঘাটে অজয়ের তীরে কৃষ্ণ দরশন করেছিলেন। বাউল তাই লিখল, ‘এখনো সেই বৃন্দাবনে বাঁশী বাজেরে, / বাঁশীর সুরে যমুনার জল উজান বহেরে।’ বলা হয়েছে, “অদ্যাবধি সেই লীলা করে গৌর রায়, কোন কোন ভাগ্যবানে দেখিবারে পায়।” কিন্তু এখানে এই “ভাগ্যবান’টি হঠাৎ হয়ে ওঠেননি। তিনি নিজেকে তিল তিল করে তৈরী করেছেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষা করেছেন শবরীর ন্যায়। তবে একদিন সহসা শুনেছেন নূপুরধ্বনি। সুতরাং তত্ত্বসমূহ শুনতে বা পড়তে একরকম কিন্তু যখন তা practical করবে, তখনই ঠিক ঠিক ধরতে পারবে তত্ত্বের প্রকৃত স্বরূপ।