জিজ্ঞাসু—মানুষ নিজের চেষ্টাতে কি আধ্যাত্মিক উন্নতি বা পূর্ণতা অর্জন করতে পারে না ?

গুরুমহারাজ—দূর পাগল ! এতদিন যাওয়া-আসা করছিস, অনেক কিছুই তো শুনলি, শিখলি কিন্তু ধারণাতে আনতে পারছিস কই ? Conception-টাই আনতে পারছিস না তো perception কি করে হবে ? দ্যাখ এই বিরাট বিশ্বব্রহ্মাণ্ড গ্রহ, নক্ষত্র, নীহারিকা মণ্ডল ইত্যাদির সম্মিলিত রূপ। আর মানুষ সে তুলনায় কত ক্ষুদ্র—’ -ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র, তার চেষ্টা আবার তুলনায় কত ক্ষুদ্র। তাহলে সেই ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র চেষ্টা দিয়ে যদি সে এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড বা বিরাটের রহস্য জানতে চায় তাহলে কতজন্ম লেগে যাবে তা একবার ভেবে দেখ ! তাই এখানে প্রয়োজন হয় গুরুর। তিনিই গুরু যিনি সেই বিরাটের রহস্য অবগত, যাঁর বিরাট, হিরণ্যগর্ভ ও ঈশ্বর, এই যে ক্রম—এই ক্রমের রহস্য ভেদ হয়ে গেছে। সুতরাং যিনি লক্ষ্যে পৌঁছেছেন তিনিই দিতে পারেন লক্ষ্যের সন্ধান, যিনি পূর্ণত্বের স্বাদ পেয়েছেন তিনিই পারেন অপরকে পূর্ণত্বের পথে নিয়ে যেতে। গুরু হচ্ছেন আধ্যাত্মিক পথের friend, philoso pher and gide. তুই মানুষ সম্বন্ধে কি ভাবিস—মানুষের মধ্যে সবাই কি খুব একটা কেউকেটা! হয়তো কতকগুলো degree রয়েছে, হয়তো শরীর খুব বলশালী বা ধনবান অথবা রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে—তা কি হয়েছে ? এরা সকলেই তো প্রকৃতির অধীন। শক্তিমান কখন শক্তিহীন হবে, ধনবান কখন ধনহীন হবে, রাজনৈতিক ক্ষমতার কখন অবসান হবে—এসব এরা কি জানে ? জীবনে কখন রোগ-শোক-মৃত্যু আসবে এরা কি ওয়াকিবহাল? তাহলে কিসের শক্তিমান, এরা তো প্রকৃতির হাতের পুতুল ! এ জীবনে শক্তির অহংকার দেখাচ্ছে অত্যাচার করছে, পরের জন্মে পঙ্গু হয়ে জন্মাচ্ছে, এ জীবনে ধনের দুরোপযোগ করছে—পরের জন্মে ‘বাবু দুটো পয়সা দাও’ বলে ভিক্ষা চাইছে—এগুলো কি শক্তিমান ! এরা প্রকৃতির দাস, কিছু পাচ্ছে আবার সেটা হারিয়ে হাহাকার করছে। যিনি প্রকৃতিকে জয় করেছেন তিনিই শক্তিমান। যিনি চিত্তকে সমাহিত করে ধ্যানের গভীরে ডুব দিয়ে রত্নরাজি আনতে পেরেছেন, তিনিই ধনী। স্ব-প্রকৃতিকে বশ করে বহিঃপ্রকৃতিকে বশীভূত করে যিনি জগৎকে শিক্ষা দিচ্ছেন তিনিই যথার্থ সমাজনেতা ও সমাজশিক্ষক।

সাধারণ মানুষ কি করবে –বেচারা! পায়খানা-পেচ্ছাপ চাপলে বেশীক্ষণ স্থির থাকতে পারে না ছুটে বেড়ায়, প্রাকৃতিক এই যে নিম্নগামী বেগ, একে ধারণ করাই মানুষের কাছে মুস্কিলের ব্যাপার। এরপর রয়েছে রিপুসমূহের বেগ, তারমধ্যে আদিরিপু কামের বেগ অত্যন্ত প্রবল। লোকশিক্ষাই বল আর যাই বল – স্বামী বিবেকানন্দকেও তো কামের বেগ প্রশমনের জন্য জ্বলন্ত আঁচের উপর বসে পড়তে হয়েছিল। তা এই দুরন্ত বেগকে প্রশমনের ক্ষমতা সাধারণ মানুষের কোথায় ? তবে এ সব কিছুই control করা যায়—যে কোন বেগকেই ধারণ করা যায় অভ্যাস বা অনুশীলনের দ্বারা। কিন্তু বই পড়ে বা লোকমুখে শুনে কোন অভ্যাস করা আর গুরুর কাছে বসে, গুরু নির্দেশিত পথ অবলম্বন করে অনুশীলন করা—দুটোর মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। মহাভারতের অত বীরদের মধ্যে একমাত্র character একলব্য, যে মনে মনে দ্রোণাচার্যকে গুরুকরণ করে অস্ত্রশিক্ষায় সিদ্ধিলাভ করেছিল। একলক্ষ্য তাই একলব্য। এরূপ হওয়া মুখের কথা নয়—ঐ দু’একজন, সবাই পারে না। সাধারণ মানুষকে অধ্যাত্মমুখী হতে হলে সাধুসঙ্গ বা সৎসঙ্গ দ্বারা আগে বিবেকের জাগরণ ঘটাতে হবে, মনকে নির্মল করতে হবে, তারপর ধীরে ধীরে গুরুকরণ করে যোগাভ্যাস করতে থাকলে তবেই একে একে সদগুণা- বলীর প্রকাশ ঘটতে থাকবে। তখনই ধৈর্য, সংযমাদি রক্ষাকবচ যা সাধককে জাগতিক লোভ, মোহাদি থেকে রক্ষা করবে। শরীর ও অন্তঃকরণ নির্মল না হলে, শুদ্ধসত্ত্ব না হলে এই শরীরে আধ্যাত্মিক বেগ ধারণ করা কি সম্ভব ? গঙ্গার যখন মর্তে অবতরণ হল তখন তার বেগধারণ করার ক্ষমতা হল একমাত্র মদনভস্মকারী মহাদেবের।

প্রসুপ্ত কুলকুণ্ডলিনী যখন জাগ্রত হয়ে ধীরে ধীরে এক-একটি চক্র ভেদ করে করে উপরে উঠতে থাকে তখন শরীরের যে কি অবস্থা হয় তা যার হয়েছে সেই জানে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বললেন, “এ যেন কুঁড়ে ঘরে হাতি ঢোকা।” সবকিছু লণ্ডভণ্ড করে দেয়। এই শরীরই ভেঙেচুরে অন্য এক শরীরে রূপ নেয়। মনের ও শরীরের গ্রন্থি বা গিঁট সকল খুলে যায়—সাধক সহজ-সরল হয়ে যায়। বাউল গানে আছে, “এই মানুষে সেই মানুষ আছে।” আজ্ঞাচক্রে স্থিত মানুষ সত্যিই যেন অন্য মানুষ হয়ে যায়। শাস্ত্রে আছে মানসসরোবরে কাক ডুব দিলে রাজহংস হয়ে যায়। এই সেই মানসসরোবর। আজ্ঞাচক্রে স্থিত হলে সাধকের পূর্বাপূর্ব সমস্ত জীবনের কালো ধুয়ে যায়, শুদ্ধসত্ত্ব‘ভগবৎ কাজে ব্যবহারোপযোগী তনু-মন তৈরী হয় আর এই অবস্থাতে জগত্রহস্য, জীবনরহস্য অবগত হয়ে সাধক চুপ হয়ে যান। তখন শুধুই আস্বাদন আর আস্বাদন। এই অবস্থায় তিনি স্বাধীন, প্রকৃতি তখন আর তাঁর পথ আটকায় না। “বন্ধন খুলে দিয়েছি, যা কিছু কথা ছিল বলে দিয়েছি – যারে যাবি যদি যা।” দ্যাখো বাউল গানে-গানে জগৎ ও জীবনের সব রহস্যই ফুটিয়ে তুলেছে। তাই বাউলগান শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।

জিজ্ঞাসু—মানুষের উপকার করা কি ভালো ?

গুরুমহারাজ—উপকার করতে যেয়ো না, সেবা করতে পারো। শিবজ্ঞানে জীবসেবা। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সময়ে তখন দক্ষিণেশ্বরে বিভিন্ন বৈষ্ণবরা আসত আর তারা ‘জীবে দয়া” “জীবে দয়া’ ইত্যাদি খুব বলত। তুমি যেমন বলছ ‘উপকার’– সেইরকম আর কি। তা ঠাকুর একদিন ভাবস্থ অবস্থায় বিড় বিড় করে ঐ কথাকটা উচ্চারণ করেই বলতে লাগলেন – “জীবে দয়া’– দূর শালা ! তুই দয়া করার কে ? বল ‘শিবজ্ঞানে জীব সেবা”। জীবের সেবা করতে পেরেই যেন সে ভাগ্যবান—এটাই সেবকের ভাব। যাইহোক সেখানেউপস্থিত ব্যক্তিগণের মধ্যে নরেন্দ্রনাথও ছিল, সে বাইরে এসে অন্যান্য গুরুভাইদের বলেছিল— “এই যে মহাবাণী আজ আমি ঠাকুরের শ্রীমুখ থেকে শুনলাম যদি কখনও ঈশ্বর আমাকে সুযোগ দেন, তাহলে আমি পৃথিবীময় এই বাণী প্রচার করব।” পরবর্তীকালে স্বামীজী প্রচার করলেন, “বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর ? জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” আর শুধু তিনি প্রচারই করলেন না—“রামকৃষ্ণ মিশন” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সেবামূলক কাজ শুরু করে দিলেন। সেইসময় মুর্শিদাবাদের ও দিকটায় নিদারুণ অন্নকষ্ট চলছিল মানুষের। একে তো অনাবৃষ্টি তার উপর আবার প্লেগরোগ শুরু হয়েছিল – ঘুরতে ঘুরতে ঠাকুরের এক শিষ্য অখণ্ডানন্দ মহারাজ সেখানে হাজির হলেন এবং একটা ছোট আশ্রম বানিয়ে মানুষের সেবায় লেগে গেলেন। নিরন্ন মানুষের জন্য অন্নসত্ৰ খুলে দিলেন তিনি, চিকিৎসারও ব্যবস্থা করলেন পীড়িতদের। তারপর ওখানে ‘সারগাছিতে’ অনাথ আশ্রম গঠন করে সেবা করতে লাগলেন। কিন্তু যেভাবে খরচ শুরু হল সে হারে পয়সার জোগান ছিল না বলে তিনি স্বামীজীকে চিঠি লিখেছিলেন। চিঠির উত্তরে স্বামীজী সেই গুরুভ্রাতাকে শুধু সাহায্য নয় এত সাবাশ দিয়েছিলেন যে, তাঁকে নিজের থেকেও বড় আসনে বসিয়ে দিয়েছিলেন।

আর তুমি যে অর্থে বলছ, “মানুষের উপকার” এটায় প্রত্যুপ- কারের আশা থাকে। তুমি কারও উপকার করলে বিনিময়ে সে যদি তোমার প্রতি ভালো ব্যবহার না করে বা তোমার মতের বিরুদ্ধাচরণ করে তখন তুমি তাকে, “অকৃতজ্ঞ” “বেইমান” বলে গালাগালি দেবে। সমাজে এটাই বেশী দেখা যায়, সেবা কিন্তু তা নয়। আর সেবক ভাবে যে, সে সেবা করার সুযোগ পেয়েই ধন্য। ধূপ যেমন নিজেকে পুড়িয়ে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে পরিবেশে সুগন্ধ ছড়ায় তেমনি প্রকৃত সেবক, প্রকৃত প্রেমিক নিজের সমস্ত সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে, প্রত্যাশা বা প্রতিদানের আশা ত্যাগ করে, জীবজগতের কল্যাণে কাজ করে যান। এটাই কর্মযোগের নিষ্কামকর্ম। মানুষ তো সাধারণভাবে অজ্ঞান। সে জানেই না কোনটা ভালো আর কোনটা খারাপ। তুমি হয়তো ভাবছ ঐ লোকটার এই উপকার করলেই বোধহয় ভালো হয় কিন্তু পরিণামে খারাপ হয়ে গেল। এবার দায়টা কে নেবে ? এই দায়টা পরোক্ষভাবে হলেও তোমার উপরেই এসে পড়বে। সমাজে এরকম বহু উদাহরণ পাবে, যেখানে পাড়ার কোন অল্পবয়সী বৌদি হঠাৎ বিধবা হয়ে হয়ত অথৈজলে পড়ল। কোথায় তার স্বামীর অফিস, কি কাগজপত্র জমা দিতে হবে, কোথায় দরখাস্ত করতে হবে কিছুই জানে না, তার উপর পাড়ার বদমায়েশদের কুনজর, মেয়েটি বড়ই আতান্তরে পড়ে গেল । এইবার তার এই চরম সংকটে পাড়ার কোন সহৃদয় যুবক বৌদির উপকার করার জন্য এগিয়ে এল। সে নিঃস্বার্থভাবে বিভিন্ন অফিস- আদালতে ছোটাছুটি করে, বিভিন্ন লোকের হাতে-পায়ে ধরে, পাড়ার ছেলেদের নিয়ে organize করে কিছু টাকাপয়সা তুলে বিভিন্ন ভাবে বৌদির উপকার করতে লাগল। দু-এক বছর পর যখন বৌদির চাকরি হল বা হয়তো বাড়ীও হল তখন দেখা গেল সেই যুবকটি বৌদির সঙ্গে ফেঁসে গেছে, তারই সাথে সংসার করছে। এবার এই ঘটনাটা বিশ্লেষণ করো, এখানে ছেলেটি যখন প্রথম এগিয়ে এসেছিল তখন কিন্তু তার অন্তঃকরণে কোন পাপ ছিল না, নিঃস্বার্থভাবেই অপরের উপকারার্থে সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিল। কিন্তু যেহেতু সাধনার দ্বারা – সাধুসঙ্গের দ্বারা তার অন্তরের ময়লা পরিষ্কার হয়নি, বিবেকের জাগরণ ঘটেনি তাই ঐ কাজের পরিণতি এমন ঘটে গেল। তাহলে বলো এই উপকারের লাভ কি ? এতে তো লোকসানই হবে।

তাই উপকার করা নয়, দয়া করা নয়, পারো তো সেবা কর। আর এটাও জেনে রাখবে কোন সৎসংঘের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যদি সেবা করো বা কোন সদগুরুর নির্দেশে সেবা করো তাহলে কোন ভয় নেই। কারণ স্বামী বিবেকানন্দ সেবক-কর্মীদের উদ্দেশ্য করে অভয়বাণী দিয়ে গিয়েছিলেন যে, ‘যদি সমাজের কর্ম করতে করতে তোদের অধোগতি হয়—তোরা যদি নরকেও যাস, সেখান থেকে আমি তোদের চুলের মুঠি ধরে তুলে নিয়ে আসবো।” সুতরাং তোদের কোন ভয় নেই, “বহুজনহিতায়” কাজ করতে গিয়ে যদি তোরা ফেঁসেও যাস তোদেরকে গুরুকুল রক্ষা করবেন। তবে যদি ‘আত্মেন্দ্রিয় প্রীতি’র জন্য ফাঁসো তাহলে মহামায়ার জগতে মায়ার বন্ধনে জড়িয়ে যাবে।

আমাদের আশ্রমের এক ভক্তের কথা বলি শোন, সে তার স্ত্রীর প্রতি খুবই অবিচার করত। নিজে একটু-আধটু নেশাও করত আর স্ত্রী প্রতিবাদ করলে তাকে মারধর করত। কার্যোপলক্ষ্যে আমাদের মিশনের এক সন্ন্যাসী তার বাড়ী গিয়ে হাজির। তার স্ত্রী খুবই সমাদর করে সন্ন্যাসীর আহারাদির ব্যবস্থা করেছে। তারপর বিশ্রামের সময় সে তার বর্তমান অবস্থা ও স্বামীর দুর্ব্যবহার ইত্যাদির কথা বিস্তারিতভাবে সন্ন্যাসীকে কাঁদতে কাঁদতে জানাতে থাকে। সন্ন্যাসী স্বভাবতই এসব কথা শুনে বিচলিত হয়ে পড়ে এবং মেয়েটির প্রতিও চরম সহানুভূতিশীল হয়ে পড়ে। পরে গৃহস্বামী অর্থাৎ এই মেয়েটির স্বামী গৃহে ফিরে এলে সন্ন্যাসী নানা শাস্ত্র-পুরাণের উল্লেখ করে এবং আমার নানান বক্তব্যের reference দিয়ে লোকটিকে বোঝাতে শুরু করে। পরে স্ত্রীর গায়ে হাততোলা বা মারধর করাটা কত অপরাধ এটাও বোঝায়। লোকটিও অপরাধ স্বীকার করে। সে বুঝেছে দেখে সন্ন্যাসীটি ঐ বাড়ী থেকে চলে আসে।

এতক্ষণ যে ঘটনাটা ঘটল তাতে মনে হতেই পারে যে, সন্ন্যাসীটি ঐ পরিবারের একটা বিরাট উপকার করল, কিন্তু ব্যাপারটা কতদূর গড়াল শোন। সন্ন্যাসী চলে যাবার পরই ঐ ব্যক্তির মনে দারুণ আত্মগ্লানি এল। সে ভাবল যে, “আশ্রমের সাধুরা আমার সমস্ত ঘটনা জেনে ফেলবে, আবার গুরুমহারাজও সব শুনবেন, তাহলে আমি আর আশ্রমে গিয়ে মুখ দেখাতে পারবো না। তার চেয়ে আমার এই প্রাণ রেখে আর লাভ নেই।” সে জানতো আশ্রমের সন্ন্যাসীটি আশ্রমের কাজে বেরিয়েছে ফলে আশ্রমে ফিরতে দু-চার দিন দেরি হবে। তাই সে ভাবল, “এই ফাঁকে গিয়ে গুরুদেবকে প্রণাম করে আসি, তারপর আত্মহত্যা করবো।” আমি কুঠিয়ায় দুপুরে বিশ্রাম করছি—হঠাৎ ও এসে হাজির। কেমন যেন উদভ্রান্ত ভাব, আমি বললাম— ‘বল তুই কি বলবি’। 3 কেঁদে ফেলল আর সব কথা বলে ফেলল। তখন আমি আবার ওকে নানারকমভাবে বুঝিয়ে-সুজিয়ে বাড়ী ফেরত পাঠালাম। এখন তো ও ভালো হয়ে গেছে—স্ত্রীর সাথে সুন্দর ঘরসংসার করছে। কিন্তু কথা হোল ঈশ্বরের ইচ্ছায় ছেলেটি এখানে এল তাই, না এসে যদি ও sui- cide করেই বসত তখন কিন্তু তার সমস্ত দায়টি ঐ সন্ন্যাসীর ঘাড়ে চাপতো। সে বেচারা কিন্তু কিছুই জানে না, ও জানে একজন সাধু হিসাবে তার যা করা দরকার ও তাই করেছে। তাহলে কথা হচ্ছে যে, এখানে ভুলটি কোথায় হল ? ভুলটি হয়েছে সন্ন্যাসীর, সে বুদ্ধির দ্বারা ঘটনার বিচার করেছিল, বিচার যখন বিবেকের দ্বারা করা হবে তখন আর ভুল হবে না। কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ এটা সাধারণত আমরা বুদ্ধি দিয়েই বিচার করি, এই জন্যই ভালো করতে গিয়ে খারাপ হয়ে যায়।

শাস্ত্রে বলেছে সাধুসঙ্গ কর আর সর্বদা সৎপ্রসঙ্গ বা হরিকথা আলোচনা কর। সর্বদা হরিকথা কইতে কইতে বিবেকের জাগরণ হয় আবার সাধুসঙ্গে সাধুর কাছে সদা-সর্বদা হরিকথা শুনতে শুনতেও প্রসুপ্ত বিবেক জেগে ওঠে। বিবেক যেন তলোয়ার আর বুদ্ধি যেন তলোয়ারের খাপ। উপর থেকে শুধু খাপটাই দেখা যাচ্ছে—খাপটা ঘুরিয়ে যদি কোপ মারো তাহলে কিন্তু কাটবে না শুধু আঘাত লাগতে পারে। কিন্তু খাপ থেকে যেই হাতল ধরে টেনে তলোয়ারকে বাইরে বের করলে অমনি ওর ঝকঝকে ‘ধার’-এ আলো পড়ে যেন ঝলমল করে উঠল। এবার সেটাকে দিয়ে যে কোন লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করো, কার্যোদ্ধার হবে। তবে শুধু বিবেক জাগলেই হবে না, এবার অভ্যাসযোগ অর্থাৎ নিয়মিত সময় করে সাধন করে যেতে হবে। চিত্তে ময়লা জমতে দিলে হবে না। ঘটি যেমন রোজ না মাজলে চকচকে ভাব নষ্ট হয়ে যায় তেমনি নিয়মিত সাধন করা একান্ত প্রয়োজন। ছোটবেলায় একটা গল্প তোমরা প্রায় সকলেই শুনেছিলে রূপকথার গল্প, মরণকাঠি-জিয়নকাঠি।

‘গল্পটা হচ্ছে এক রাজকন্যাকে রাক্ষসেরা ধরে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাদের প্রাসাদে বন্দিনী করে রেখে দিয়েছিল। সেই রাজকন্যাকে তারা একটা সোনার পালঙ্কে শুইয়ে রেখে দিত আর তার শিয়রে থাকতো দুটো কাঠি, একটা সোনার কাঠি বা জিয়নকাঠি আর অপরটা রুপোরকাঠি বা মরণকাঠি। সোনার কাঠি ছুঁয়ে দিলেই রাজকন্যা জেগে উঠত আর রুপোর কাঠি ছুঁলেই রাজকন্যা আবার ঘুমিয়ে পড়তো। এইবার রাজকন্যাকে উদ্ধার করতে এল রাজপুত্র। সে জানতো জলের তলায় কৌটোর মধ্যে আছে রাক্ষসদের প্রাণভোমরা। তাকে এক ডুবে তুলে এনে মারতে পারলেই প্রাসাদের সহস্র রাক্ষস মারা যাবে এবং রাজকন্যা উদ্ধার হবে।’ এবার রূপকাকারে গল্পটির মধ্যে যে আধ্যাত্মিক রহস্য রয়েছে তা বলছি শোন। এখানে বিবেক হল রাজকন্য। কামনা- বাসনার আবর্তে জীব যখন ফেঁসে যায় তখন বিবেক সুপ্ত থাকে। কামনা- বাসনা-আসক্তি যেন মরণকাঠি। সাধুসঙ্গরূপ জিয়নকাঠির সংস্পর্শে এলে প্রসুপ্ত বিবেক জেগে ওঠে। কিন্তু অনুশীলন না থাকলে পুনরায় কামনা-বাসনা সাধককে গ্রাস করে, তাই রাজকন্যা আবার ঘুমিয়ে পড়ে। এইবার spot-এ আসছে রাজপুত্ররূপী সদগুরু। তিনিই সদগুরু, যিনি সাধনার গভীরে ডুব মেরে ব্রহ্মবিদ্যা আয়ত্ত করেছেন। যা আয়ত্ত হলে সহস্র ফণা কালনাগিনী বা thousand faculties of mind stuff শক্তিহীন হয়ে পড়ে, কামনা-বাসনাদি রিপুসকল, অষ্টপাশাদি বন্ধন-সমূহ অতিক্রম করা যায়। তাই জীবের সদগুরু লাভ হলে আর ভয় থাকে না। রাজপুত্র একবার রাক্ষসপুরীতে ঢুকলে যেমন রাজকন্যাকে উদ্ধার করবেই, তেমনি সদগুরু একবার শিষ্যের হাত ধরলে তিনি তাকে মোহগর্ত থেকে ঠিক বের করে আনবেনই। এখানে শিষ্য কি করবে ? না শুধু শ্রদ্ধাবান হবে আর গুরুর প্রতি শরণাগত হয়ে নিরন্তর প্রার্থনা করবে:-   “অসতো মা সদ্‌গময়

তমসো মা জ্যোতির্গময়

                                                                             মৃত্যোর্মা অমৃতং গময়।”