জিজ্ঞাসু—অনেক স্থানে এক বীজমন্ত্র সকলকে দেওয়া হয়, এতেই কি সকলের মোক্ষলাভ হয় ?

গুরুমহারাজ–তোমরা এখানে দীর্ঘদিন যাওয়া-আসা করছ, অনেক কথা শুনছ, কিন্তু মনঃসংযোগ করে শোন না আর যা শোন সেগুলিরও নিদিধ্যাসন কর না বলে বিশেষ কিছু ধারণাও হয় না। আমি বারবার তোমাদের বলি যে, সবার জন্য এক ফর্মুলা নয়। আধ্যাত্মিক জগতে সবার এক ক্ষুরে মাথা কামানো যায় না। পৃথক পৃথক ব্যক্তির জন্য পৃথক পৃথক বিধান আর এখানেই সদগুরুর প্রয়োজনীয়তা, যিনি শিষ্যের প্রকৃতি বুঝে সেই অনুযায়ী বীজ বপন করতে পারেন। আর যেমন উপযুক্ত জমি বা ক্ষেত্র ছাড়া উপযুক্ত ফসল হয় না তেমনি উপযুক্ত আধার ছাড়া গুরু উপযুক্ত সাধন-পদ্ধতি দেন না। পৃথিবীতে যত প্রকারের সাধন রয়েছে তার মধ্যে তুমি সমস্ত সাধককে তিনটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারো—জ্ঞানী, ধ্যানী ও প্রেমী। বুদ্ধি বা বিচার প্রধান লোকের জন্য জ্ঞানযোগ, চিন্তা বা মনপ্রধান ব্যক্তির জন্য ধ্যানযোগ বা রাজযোগ, ভাব বা হৃদয়প্রধান ব্যক্তির জন্য ভক্তিযোগ। এবার কে কোন মার্গের অধিকারী সেটা গুরু ছাড়া আর কে বলবে বল দেখি। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন— ঢেঁাড়ায় ব্যাঙ ধরলে ব্যাঙেরও কষ্ট, টোড়ারও কষ্ট, কিন্তু জাতসাপে ধরলে তিনডাকে শেষ। ব্যাপারটা হচ্ছে খাদ্যটা খেতে হয়তো বিষাক্ত সাপটির কিছু সময় লাগবে কিন্তু বিষক্রিয়ায় যে ব্যাঙটির মৃত্যু হবে এটা অবধারিত।

এইভাবেই একমাত্র সদগুরুই শিষ্যকে বলে দেন তার কি প্রকৃতি, আর তার কোন ধরণের যোগ অভ্যাস করা দরকার। শ্রদ্ধা ও নিষ্ঠা সহকারে গুরুর নির্দেশ follow করলে ধীরে ধীরে শিষ্যের অজ্ঞানতা অপসারিত হয়—সে জ্ঞানালোকের দিকে এগিয়ে যায়। এইজন্যই গুরুর প্রণামমন্ত্রে বলা হয়েছে, “অজ্ঞানতিমিরান্ধস্য জ্ঞানাঞ্জন শলাকয়া।” অর্থাৎ যিনি জ্ঞানাঞ্জন শলাকার সাহায্যে অজ্ঞান-অন্ধকার দূর করে দেন। কোন কারণে গুরুর মন্ত্র নির্বাচনে ভুলও হতে পারে, একে মন্ত্রবৈরী বলে। সাধকের প্রকৃতি অনুযায়ী মন্ত্র নির্বাচন না হয়ে অন্য প্রকৃতির মন্ত্র নির্বাচিত হয়ে গেলে শিষ্যের চরম ক্ষতি হতে থাকবে। তার মন চঞ্চল হয়ে যাবে, শরীরের বিভিন্ন স্থানে ব্যথা-যন্ত্রণা শুরু হবে, শরীর দুর্বল হবে, কামবেগ প্রবল হতে পারে, এমনকি পাগলামির লক্ষণও প্রকাশ পেতে পারে। এইজন্য শুধু দীক্ষা নিলেই হয় না—গুরুর সাথে মাঝে মাঝেই যোগাযোগ থাকা দরকার। গুরু শিষ্যের এই অবস্থা দেখেই বুঝতে পারেন তার কর্তব্য কি ? কিছুদিন নিজের কাছে রেখে মন্ত্র পরিবর্তন ও কিছু ক্রিয়ার পরিবর্তন করে দিলেই শিষ্যের সমস্ত অসুবিধা দুর হয়ে যাবে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের সময়ে হরিশের এইরকম লক্ষণ প্রকাশ পেয়েছিল। সারদা মা ঠিক করে দিয়েছিলেন।

জিজ্ঞাসু—শরণাগতি থাকলেই কি জীবের ভগবৎ কৃপা হয় ?

গুরুমহারাজ—‘শরণাগতি’ ভগবানের কৃপাপ্রাপ্তির অন্যতম উপায়। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন জীবের শরণাগতি ছাড়া পথ নেই। “হে জীব শরণাগত হও’। কিন্তু শরণাগত হলেই যে সঙ্গে সঙ্গে তাঁর কৃপা হয়ে যাবে তার কোন মানে নেই। আর শরণাগতি মানে কিছু না করে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকাও নয়। জীব শরণাগত হয়ে সদগুরু নির্দেশিত কাজ করতে থাকলে বা প্রার্থনা করে চললে — তিনি প্রসন্ন হয়ে জীবকে কৃপা করে থাকেন। সুতরাং কৃপার জন্য তাঁর শরণাগত হয়ে অপেক্ষা করতে হয়। আর শরণাগতি প্রথম অবস্থায় সবার হতেপারে না আর মুখে শরণাগত বললেই শরণাগত হওয়া যায় না। পূর্ণ শরণাগতি অবস্থা একেবারে শেষের অবস্থা। শাস্ত্রে রয়েছে পরিপূর্ণ শরণাগত হতে পারলে ঈশ্বরের কৃপালাভ করা যায়। তা সেটা কি তুমি মনে করছ সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে ‘মা”মা’ করে একটু কাঁদলেই হবে। তবে এতে কিছু কাজ হবে, কিন্তু পরিপূর্ণ হবে কি ? জ্ঞান এবং বৈরাগ্যের চরম অবস্থায় আসে পূর্ণ শরণাগতি। জ্ঞানযোগ, রাজযোগ, ও কর্মযোগের শেষ অবস্থায় পৌঁছালে তখন সাধক বুঝতে পারে শরণাগতিই শেষ কথা। তখন তার মনে হয়, ‘আরে দুর ? এতকিছু না করে শুধু শরণাগত হয়ে থাকতে পারলেই তো হোত ?’ কিন্তু এটি হবার নয় ! নিজেকে প্রস্তুত না করে কেউ পূর্ণ শরণাগত হতে পারে না। পূর্ণ শরণাগতির উদাহরণ দিতে গিয়ে অনেকে শিশুর উল্লেখ করেছে। কিন্তু আমি দেখেছি শিশুর মধ্যেও কপটতা আছে, লোভ আছে তাই শিশুর মতো সরল বা শরণাগত হলেও হবে না। গর্ভস্থ শিশুর ন্যায় শরণাগত হতে পারলে তবেই তুমি যে কৃপার কথা বলছিলে তা লাভ হবে। গর্ভস্থ শিশু নিজে আহার করে না, নিজে শ্বাসকার্য চালায় না, নিজে রেচন করে না, সম্পূর্ণভাবে মায়ের উপর নির্ভরশীল হয়ে হেঁটমুণ্ডে ঊর্ধ্বপদে পরম নিশ্চিন্তে ভগবৎ ভজনের মুদ্রায় থাকে। এইরূপ হতে পারলে আর ঐ অবস্থায় থেকে সাধন-ভজন করতে পারলে অতি অবশ্যই কৃপা পাওয়া যাবে। পূর্ণ শরণাগত অবস্থায় মানুষের জন্য মা সদাই ব্যস্ত। তিনি সর্বদা সর্বাবস্থায় তাকে লক্ষ্য রাখেন। আমার জীবনে কয়েকবারই এমন হয়েছে যে, আমার দেহবোধ নেই, আমি মায়ের কোলে লীলাজগতের রহস্য ভেদে আত্মস্থ হয়ে পথ হাঁটছি অথবা কাজ করছি, ঝামেলা হয়েছে, বিপদ হয়েছে কিন্তু মা হাত ধরে পার করেছেন না হয় যে ভাবেই হোক রক্ষা করেছেন। একবার হিমালয়ে যমুনোত্রী যাবার পথে একটা বিরাট খাদের উপর দিয়ে চলার সময় জগদম্বা হাত পেতে পেতে আমার পদক্ষেপকে ধারণ করে আমাকে পার করে দিয়েছেন। কাদার মধ্যে নাক-মুখ গুঁজে কয়েকঘণ্টা পড়েছিলাম শম্ভুপুরে, কিছু হয়নি। উঁচু থেকে দু’বার পড়ে গেলাম—একবার চলন্ত বাসের ছাদ থেকে, আর একবার ইলেকট্রিক high tension লাইনের pole-এর মাথা থেকে। দুটো ক্ষেত্রেই তেমন কিছু হয়নি। কিভাবে রক্ষা পেয়েছিলাম তা সত্যিই রহস্য ! এইভাবেই তুমি যদি ঠিক ঠিক শরণাগত হতে পারো তাহলে তোমার অভীষ্ট পূরণ না হওয়া পর্যন্ত মা তোমাকে রক্ষা করবেনই করবেন।

ঈশ্বরের ইচ্ছায় গুরুকুল থেকে পাঠানো মহাপুরুষের শক্তিতেই সাধক রক্ষা পায়। বিজয়কৃষ্ণ গোস্বামীকে কয়েকবারই পাহাড়ের নীচে পড়ে যাওয়ার সময় লোকনাথ ব্রহ্মচারীজী রক্ষা করেছিলেন। এইরকম বহু সাধুর জীবনে বহু ঘটনা রয়েছে, যাঁরা কোন না কোন উপায়ে চরম সংকটেও রক্ষা পেয়েছেন। যদি বল সাধারণ মানুষকে এঁরা তাহলে রক্ষা করেন না কেন ? এর উত্তর হল উপর থেকে কোন নির্দেশ না পেলে এঁরা কিছু করতে পারেন না। তবে যাঁরা লোককল্যাণ করার জন্য চাপরাশ পান তাঁরাই শুধু সাধারণ মানুষের জন্য কাজ করতে পারেন। ঠিকমতো বলতে গেলে একটা অবস্থা রয়েছে সেখানে এই জগৎ যে অনিত্য তা সর্বদা বোধ হয়। সুতরাং সেই অবস্থা থেকে অনেকেই “জগদ্ধিতায়” কাজও করতে চান না। এটা কর্মবিমুখতা বা কর্মবিমুখ অবস্থা নয়, এটা একটা এমন অবস্থা যা প্রচণ্ড dynamic কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে স্থির। আর এই অবস্থা থেকে নেমে যিনি সমাজের কাজ করতে চান, তাঁকে ঘিরে প্রথমে প্রচণ্ড আনন্দের জোয়ার বয়ে যায়— সকলে তাঁকে দারুণভাবে সম্বর্ধনা করেন। সকলের ভালোবাসা, শুভেচ্ছা নিয়ে তিনি সমাজের কাজ করতে আসেন। ফলে এই অবস্থায় তিনি বিপদে পড়লে গুরুকুল তাঁকে রক্ষা করবেন বই কি। যতক্ষণ না তাঁর নির্দিষ্ট কর্ম শেষ হয় ততক্ষণ তো সমস্ত দায়-দায়িত্ব তাঁদের। এর যেন কোন দুর্ভাবনাই নেই—এই যে অবস্থা এটাই পূর্ণ শরণাগতি অবস্থা। আর এই অবস্থায় তিনি এতটাই নিশ্চিত, এতটাই অভয় যে, কোন কাজ যা সাধারণ মানুষের কাছে অসম্ভব, তা তাঁর কাছে easy। আর তিনি বিরক্ত হয়েও যদি কিছু যাচ্ঞা করেন সঙ্গে সঙ্গে তা fulfil হবে। দক্ষিণ ভারতের মীনাক্ষী মন্দিরের পাশে থাকতেন বীরব্রহ্ম গারু, উনি একবার মা মীনাক্ষীর কাছ থেকে আগুন চেয়েছিলেন। বহু মানুষের সামনে মা জ্যোতির্ময়ীরূপে আবির্ভূত হয়ে ওনাকে আগুন দিয়েছিলেন। এইটা শরণাগত অবস্থা। শুধু মুখে শরণাগত শরণাগত বললে কিছু হয় না। প্রকৃত শরণাগত হও। অন্তত মন-মুখ এক করে বল, “মা আমি শরণাগত !” মনকেও তো নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছ না, শুধু ছুটে বেড়াচ্ছে, তাহলে প্রাণকে ধরবে কি করে ? তাই তন-মন-প্ৰাণ এই তিন টান এক টান না হলে কি অধরাকে ধরা যায়। ওসবে কাজ নেই সোজা রাস্তায় এস। “অধরাকে ধরবি যদি ধরার চরণ ধর”—যাঁকে ধরতে পারছ তাঁকেই ভালো করে ধর। তিনিই তোমাকে ঈশ্বরের কৃপালাভের রাস্তা বাতলে দেবেন। যতক্ষণ না অভয়পদ প্রাপ্ত হোচ্ছ, ততক্ষণই ভয়, শংকা, সংশয়। একবার যো সো করে পরমানন্দসাগরে পড়ে গেলে আর ভয় নেই। কাক রাজহংস হয়ে উঠে আসবে। তখন “রূপে করবে ঝলমল”। কিন্তু বাউল প্রথমেই বলেছে-“কাঁচা হাড়িতে গো হাঁড়িতে রাখিতে নারিলি প্রেমজল”। সুতরাং কাঁচা হাঁড়ি বা যোগ-সাধনহীন দেহে আধ্যাত্মিক শক্তি রাখতে পারবে না। হাঁড়ি পাকা করো সাধনের দ্বারা, গুরুর নির্দেশমত চলে তোমার শরীর-মনকে শুদ্ধ করো, পবিত্র করো, নিশ্চয়ই তাতে জোয়ার-ভাটা খেলবে, ঈশ্বরের মহিমা অনুভূত হবে। আর তখন সাধক আরও অগ্রসর হবার অনুপ্রেরণা পাবে। এই ভাবে চলতে চলতে একদিন ঠিক লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে। যেখানে দেখবে : ‘আনন্দ প্রতিষ্ঠিত — পরমেশ্বরের করুণা অপার।’

জিজ্ঞাসু—আপনি তো সবই জানেন, সবকিছুই পারেন তাহলে এমন কিছু আমাদের দিয়ে দিন, যাতে করে এখানে বসে বসেই আমরা ব্রহ্মজ্ঞান লাভ করে ফেলি। আমাদেরকে অত ঝামেলার মধ্যে ফেলতে চাইছেন কেন ?

গুরুমহারাজ—এই রকম করে কথা বলছ কেন দিদিমণি ? ব্রহ্মবিদ্যা দেবার জিনিস নয়—এটা অর্জন করে নিতে হয়। আর আমি তো বারবার তোমাদের বলেছি অধ্যাত্মজগতে কোন back door নেই। এখানে সামনের দরজা দিয়েই আসতে হবে –হয় বীরভাবে নয় ধীরভাবে। কিন্তু সামনে দিয়েই আসতে হবে। তুমি পূর্ণ হলে সেটা জগতে দৃষ্টান্ত থাকবে যে ! এটা দেবার জিনিস নয়—সাধন করতে করতে আধার প্রস্তুত হলে আপনা আপনিই হুহু করে অধ্যাত্মশক্তি তোমার মধ্যে প্রবেশ করবে। হঠাৎ তুমি আবিষ্কার করবে তোমার মধ্যে অনন্ত জ্ঞানরাশির ভাণ্ডার, অনন্ত প্রেমের প্রবাহ ও অফুরন্ত জগদ্ধিতায় কর্মের প্রেরণা রয়েছে।

তাই তুমি যা পেতে চাইছ আগে তার সম্বন্ধে ধারণা বা con- ception তৈরী করো, তারপর সেই ধারণাকে পাকা করো। এরপর perception-এর কথা আসবে। আচ্ছা আমি যদি তোমাকে জিজ্ঞাসা করি—তোমার নিজের সম্বন্ধে কি সঠিক ধারণা আছে ? বলতো—তুমি কে বা কি ? তুমি কি Three dimensional figure মাত্র তুমি কি শরীর, না তুমি মন-বুদ্ধি-চিত্ত-অহংকার –কি তুমি ? তুমি কি অন্নময় কোষ, প্রাণময় কোষ, মনোময় কোষ, বিজ্ঞানময় কোষ অথবা আনন্দময় কোষ ? বিচার করো দিদিমণি । তোমার অন্তঃকরণে দূঃখ রয়েছে, অশান্তি রয়েছে, অভাব রয়েছে অর্থাৎ এককথায় অজ্ঞানতা রয়েছে। তাইতো তুমি কিছু না কিছু পেতে চাইছ। তাহলে বিচার করে দেখো এই দুঃখ বা অশান্তির মূল কারণ কি ? জানো – বিষয়-বাসনাই দুঃখ বা অশান্তির হেতু। চিত্ত যেন দর্পণ বা আয়না। কোন কিছু ধ -ধরো এই যে জবাফুল বা গোলাপফুল এগুলি তো দর্পণে নেই, কিন্তু যেই এগুলিকে তুমি দর্পণের সামনে ধরবে, অমনি দর্পণে তাদের দেখতে পাবে। যদিও দর্পণে যেটা দেখছ সেটা প্রকৃত নয় ওটা প্রতিবিম্ব, কিন্তু হুবহু একইরকম দেখতে পাবে। তাহলে বিচারটা কি, না দর্পণে কখনই কোন গোলাপফুল বা জবাফুল ছিল না, এখনও নেই কিন্তু যেটা দেখছি সেটা একটা প্রতি- বিম্বিত অবস্থা, আসলটা দর্পণের সামনে রয়েছে। এবার আসলটাকে দর্পণের সামনে থেকে সরিয়ে নাও-প্রতিবিম্বগুলি vanish । তেমনি তোমার চিত্তরূপ দর্পণে জাগতিক বিষয়সমূহের প্রতিবিম্বিতরূপ দেখছ । আর সেগুলিই নানারকমভাবে তোমার মনে দুঃখ বা অশান্তি সৃষ্টি করছে, আর এতেই তুমি দুঃখ বা অশান্তি পাচ্ছ বা ক্লেশ পাচ্ছ। এইজন্যই জ্ঞানীরা বলেছেন, মানুষ অজ্ঞান-অন্ধকারে নিমজ্জিত। কারণ যা আদপেই নেই—যার প্রতিবিম্ব রয়েছে মাত্র, তার জন্য দুঃখ বা শোক করা আহাম্মকি নয় কি ? এ সবই ভ্রান্তি আর এটাই মায়া। ‘মা’ অর্থে ‘না’ আর ‘য়া’ অর্থে ‘হ্যাঁ’। যা সত্য নয় তাকেই সত্যি বলে বোধ হচ্ছে বলেই একে মায়া বলা হয়। তাই এই জগৎকে বলা হয় মহামায়ার জগৎ। তবে আর একটি মায়া রয়েছেন- যোগমায়া। তাঁর সঙ্গে যোগ আশ্রয় করে এই জাগতিক মায়ার বাঁধন ছিন্ন করা যায়। তাই যোগমায়াকে আশ্রয় করেই উপনিষদের একটা গল্প বলছি শোন-এক ভেড়ার পালে এক আসন্নপ্রসবা সিংহ ঝাঁপ মেরেছিল শিকারের আশায় কিন্তু কোন কারণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে তার মাথা পাথরের সঙ্গে ধাক্কা খায় এবং বাচ্চা প্রসব করেই সে মারা যায়। সিংহশিশুটি ঐ ভেড়ার পালের সঙ্গেই বড় হতে থাকে। কালক্রমে সিংহটি পূর্ণবয়স্ক হয়ে গেল কিন্তু সে ঐ ভেড়াদের সঙ্গেই ঘাস-পাতা খায় আর তাদের পিছু-পিছুই বেড়ায়। একদিন বনের রাজা পশুরাজ সিংহ দূর থেকে এই দৃশ্য দেখল এবং সে ভেড়ার পালে লাফিয়ে পড়ল। এতে সব ভেড়ার সাথে ঘাস-পাতা খাওয়া সিংহটিও ভয়ে পালাচ্ছিল। তখন পশুরাজ তার ঘাড় ধরে তাকে এক সরোবরের ধারে নিয়ে এল এবং সেই স্বচ্ছ সলিলে তার অবয়ব দেখাল। তারপর নিজের অবয়ব দেখিয়ে বলল, তুইও যা, আমিও তাই’, তখন সিংহটি ভালো করে প্রতিবিম্ব আর পশুরাজকে দেখে সিদ্ধান্ত করল তাইতো “ও-ও যা, আমিও তাই’। পশুরাজ বলল, ‘ঘাস-পাতা খাচ্ছিস আর ভেড়ার মতো ‘ভ্যা”ভ্যা’ করছিস কেন ? সিংহগর্জন কর—এই দ্যাখ কি করে গর্জন করতে হয়।” পশুরাজ ‘ঘাম’ করে গর্জন করল। ছোট সিংহটিও তার দেখাদেখি দু-একবারের চেষ্টায় মৃগেন্দ্র গর্জন করে উঠল। তখন পশুরাজ ওকে ছেড়ে দিয়ে বলল : “এবার যা আর তোর ভ্রম হবে না, সিংহ হয়ে তুই মেষ সেজেছিলি, এখন থেকে “তুই যা, তাই হলি।” উপনিষদ্ বলেছে : ‘তত্বমসি’—তুমিই সেই ৷

এইভাবে অজ্ঞান অবস্থাই জীব অবস্থা, জ্ঞান হলেই মৃগেন্দ্র অর্থাৎ শিব অবস্থা। সিনেমায় যেমন দেখায় যে, আকাশ থেকে একটা জ্যোতি নেমে এসে সাধককে আলোকিত করল, তারপর সে জ্যোতির্ময় মহাপুরুষে পরিণত হল—এ রকমটা কিছু হয় না। সাধকের শারীরিক বা অন্যান্য তেমন কিছু বাহ্যিক পরিবর্তনও হয় না আবার কিছু সংযোজনও হয় না। কথায় বলে না যে, ও রকমটা হলে কি দুটো শিং গজাবে না তিনটে লেজ গজাবে ? সত্যিই এ রকম কিছু হয় না। শুধু যা আছে —তারই ঠিক ঠিক ‘বোধ’ হয়, একে বলা হয় ‘স্ব-স্বরূপের বোধ। বিবেকচূড়ামণিতে শংকর বললেন, বিবেকের দ্বারা পঞ্চকোষ ভেদ করে কোষাতীত হতে পারলে তবে পূর্ণতা আসে। রুদ্রগ্রন্থি বা আজ্ঞাচক্র ভেদ করলে আধ্যাত্মিক রাজ্যে প্রবেশাধিকার মেলে। এই যে কথাটা বললাম এটা নতুন ঠেকলেও এটাই ঠিক। আজ্ঞাচক্রের নিচে জীব আর ওপরে শিব। কিন্তু শিবেরও রাসমঞ্চে প্রবেশাধিকার নেই। এ থেকে বোঝা যাচ্ছে আজ্ঞাচক্র ভেদ হবার পরও পূর্ণতা আসে না। প্রকৃতপক্ষে সেখান থেকে সহস্রার পর্যন্ত আরও সাতটি ধাপ রয়েছে। এটিই যথার্থ আধ্যাত্মিক রাজ্য। এর নিচের রাজ্যটা তো অজ্ঞান অবস্থায় ভ্রমণ। আর এই রাজ্যে সজ্ঞানে ভ্রমণ। তাই এই যাত্রাপথের পরতে পরতে শুধু আনন্দ আর আনন্দ। এখানকার এক-একটা ধাপ অতিক্রম করা মানেই ঈশ্বরের এক-এক মহিমাশক্তির স্বাদ আস্বাদন করা এবং তার সাথে সাথে সেই শক্তি অর্জন করা। শেষ ধাপে পৌঁছালেই ঈশ্বরত্ব। সেই বিরাট বা চিন্ময় তত্ত্ব তখন একটা ক্ষুদ্র আধারকে ঘিরে লীলা করেন। এ রহস্য বোঝা অত সহজ নয়। ওই যে বলছিলাম বিবেকের জাগরণ দরকার। বিবেক কি ? না যার দ্বারা তুমি নিজে বুঝতে পারো প্রকৃতপক্ষে ‘ঠিক’-টা কি? বিবেকহীনেরাও বুদ্ধির প্রয়োগ করতে পারে কিন্তু সেই বুদ্ধিজনিত কর্ম থেকে সমাজে অমঙ্গল ডেকে আনে। শক্তিমান যদি আবার বুদ্ধিমান ও অবিবেকী হয় তাহলে সে হয়ে যায় destructive, আর সমাজ একটা করে রাবণ বা দুর্যোধন পায়। বিবেকহীন বুদ্ধিমানকে শাস্ত্র বলেছে আহাম্মক—’মুঢ়মতি’। বিবেকযুক্ত বুদ্ধি হল সৃজনশীল-cre- ative, সেই বুদ্ধিকে বলা হয় “প্রত্যুৎপন্নমতি”। বিবেকের দ্বারা বিচার করে করে বুঝতে হয় যে, তুমি অন্নময় ও প্রাণময় কোষরূপ স্থূলশরীর নও, তুমি মন-বুদ্ধি-আদি অন্তঃকরণচতুষ্টয় নও, তুমি মনোময় ও বিজ্ঞানময় কোষবিশিষ্ট সূক্ষ্মশরীর নও, তুমি আনন্দময় কোষবিশিষ্ট কারণশরীরও নও। তাহলে তুমি কি ? – —তুমিই সেই। তুমি ত্রিগুণাতীত, পঞ্চকোষাতীত, ভাবাতীত- তত্ত্বমসি বা সচ্চিদানন্দ আত্মা- এতদূর পর্যন্ত গুরু তোমাকে সাহায্য করবেন। এবার তুমি একলা চল। তোমার বোধে বোধ হলে, তুমিই বলে উঠবে—“আমিই সেই, আমিই সেই”, “অহং ব্রহ্মাস্মি”।