জিজ্ঞাসু –আজকে আমার শরীরটা খারাপ কি পথ্য করব ?
গুরুমহারাজ– সহজপাচ্য খাদ্য খাবি। খাদ্যগ্রহণ তো শক্তিলাভের জন্য, শক্তি হারানোর জন্য তো নয়। তাই এমন খাদ্য কখনই গ্রহণ করা উচিত নয় যা হজম করতে আরও বেশী শক্তি ব্যয়িত হয়। ঐ যে ও বলল ‘শরীর খারাপ’, বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে শরীর খারাপের অর্থ হল হয় ভুঁড়ি (পেট) না হয় মুড়ি (মাথা) আক্রান্ত। ভুঁড়ি আক্রান্ত, ফলে সেইসময় stomach কে বা intestine-কে rest দেওয়া উচিত। তাই শরীর খারাপ হলে হালকা বা সহজপাচ্য খাবার খেতে বলা হয়। ডিম, মাংস বা এই জাতীয় animal প্রোটিন আমাদের এই উষ্ণক্রান্তীয় অঞ্চলের মানুষের স্বাভাবিক খাদ্য নয়। একমাত্র শারীরিক পরিশ্রম যারা করে তারা animal প্রোটিন খেতে পারে। কিন্তু কম পরিশ্রমী, অফিসে চাকরি করে, শিক্ষক, ডাক্তার এরা সহজপাচ্য খাদ্য খাবে। Animal প্রোটিন regular খেতে গেলেই ঠকবে। কিছুদিনের মধ্যেই blood-এ uric acid-এর পরিমাণ বেড়ে নানান সমস্যার সৃষ্টিহবে। বেশী পরিশ্রম করে না এমন লোকের ক্ষেত্রে মাংস হজম হতে ১০/১১ ঘণ্টা লেগে যায়, ভাত-রুটি হজম হতে ৮/১০ ঘণ্টা সময় লাগে। ভাত-রুটি তো শ্বেতসার বা গ্লুকোজ জাতীয় খাদ্য, তাতেই এই সময় লাগে ! মানুষের শরীর খারাপ হলে বা তাৎক্ষণিক শক্তির প্রয়োজনে সরাসরি গ্লুকোজ খাওয়ানো হয়, কারণ গ্লুকোজ থেকে শরীর আধঘণ্টার মধ্যেই শক্তি পেতে পারে। তবে immediate শক্তি জোগান দেবার ব্যাপারে সবচাইতে এগিয়ে রয়েছে মধু। মধু সাধারণত চেটে খেতে হয়। আমি দেখেছি মধু হাতে নিয়ে জিভের ডগায় ঠেকানোর সাথে সাথে মস্তিষ্ক কোষগুলি যেন চনমনে হয়ে উঠল। মধু জিভ থেকে stom- ach-এ পৌঁছাতে পৌঁছাতেই পুষ্টির কাজ শুরু হয়ে যায় অর্থাৎ ওটি থেকে শরীর ক্যালরি পেতে শুরু করে। মাত্র পাঁচ মিনিটের মধ্যে মধু থেকে মানুষ ওর সব energy লাভ করতে পারে।
জিজ্ঞাসু—শিরডির সাঁইবাবাই কি বর্তমানের সাঁইবাবা ?
গুরুমহারাজ—শিরডি হল মহারাষ্ট্রে, আর বর্তমানের সাঁইবাবা অর্থাৎ সত্যসাঁই হল অন্ধ্রপ্রদেশের লোক। শিরডির সাঁইবাবার অনেকদিন হল লোকান্তর ঘটেছে আর সত্যসাঁই এখনও শরীরে (১৯৯৬) রয়েছেন। তবে তুমি হয়তো যা জানতে চাইছ সেটা হল – বর্তমানের সত্যসাঁই কি শিরডির সাঁই-এর উত্তরশরীর এই তো? দ্যাখো, সেরকম আমি কিছু বলব না। আর তোমাদের তো আমি আধ্যাত্মিক জগতের নানা কথা বলেছি। শিরডির সাঁইবাবা এখনও বিদেহমুক্তি নেননি। তিনি অধ্যাত্মজগতের গুরু হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তবে সেই জগৎ হল সূক্ষ্মজগৎ। প্রয়োজনে তিনি স্থূল জগতেরও মঙ্গল করতে পারেন। আর বর্তমানের সাঁইবাবা একজন যোগশক্তিসম্পন্ন মহাপুরুষ। মানুষের কল্যাণের জন্য, আর্তের সেবায় তাঁর যে কর্ম আর কর্মের কি ব্যাপকতা, তা না দেখলে বিশ্বাসই করা কঠিন। উনি অন্ধ্রপ্রদেশের পূর্বাপূথি নামক স্থানে এবং ব্যাঙ্গালোরে বিশাল জায়গা জুড়ে কর্ম করছেন। সেখানে স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটি, মিউজিয়াম, প্লানেটরিয়াম কি নেই। সর্বোপরি রয়েছে স্বাস্থ্যবিভাগ, যেখানে খুব বড় হসপিটাল রয়েছে এবং সেখানে যে কোনরকম চিকিৎসা বিনামূল্যে করা হয়। এমনকি open heart surgery-র মতো বিশাল ব্যয়সাপেক্ষ operation-ও বিনা পয়সায় হয়। এগুলো কি ভাবা যায়। এইভাবে বহুজনহিতায় কাজ করে চলেছেন তিনি। ষড়ৈশ্বর্যবান ঈশ্বর কার মধ্যে দিয়ে কোন ঐশ্বর্য্যের বিকাশ ঘটিয়ে কি কাজ করিয়ে নেন—তা কি কেউ বলতে পারে ?
জিজ্ঞাসু—আজকের সমাজে গুণীজনের চেয়ে তো ধনীজনের কদর বেশী হয় কিন্তু তাতো হওয়া উচিত নয়। তাহলে এরকমটা হয় কেন ?
গুরুমহারাজ—’গুণীজন’ আর ‘ধনীজন’ – বেশ বললে তো দিদিমণি ! দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করে সাহিত্যের জ্ঞানটা ভালই হয়েছে। গুণী অর্থাৎ সরস্বতীপুত্র আর ধনী অর্থাৎ লক্ষ্মীপুত্র। দ্যাখো, সমাজে দু’ধরণের মানুষেরই কদর রয়েছে। বিদ্বৎসমাজে সরস্বতীপুত্রদের কদর আর জনসমাজে লক্ষ্মীপুত্রদের কদর। এই অর্থে বলতে পারো সরস্বতীদের কদর সমাজের একটা ক্ষুদ্র বা ছোট গণ্ডীতে আর বৃহত্তর সমাজে লক্ষ্মীপুত্ররা সমাদৃত। এখানে কিন্তু কথা হচ্ছে এই ধনীরা হয়তো সমাজে অন্ন-বস্ত্ৰ জুগিয়ে সমাজকে বাঁচিয়ে রেখেছে কিন্তু বিনিময়ে শোষণ, শাসন, অত্যাচারও কিছু কম করেনি। অপরপক্ষে বিদ্বৎসমাজ যেন চরম অন্ধকারে এক ঝলক আলো, চরম গুমোট আবহাওয়ায় যেন এক পশলা বৃষ্টি কিংবা মিষ্টিমধুর বাতাসের প্রবাহ। দেশের মান, সম্মান, মর্যাদা এগুলি তো বিদ্বৎসমাজই রক্ষা করে বা বৃদ্ধি করে।
সমাজে গুণীজনের বেশী বন্ধু হয় না, একজন গুণীর সাথেই তার বন্ধুত্ব হতে পারে। দেখবে political নেতাদের সাথে উদয়শঙ্কর, কি সত্যজিৎ রায়ের বন্ধুত্ব হয়নি, বন্ধুত্ব হয়েছে শিল্পপতিদের সঙ্গে। কোন নেতার কোন গুণীজনের সঙ্গে বন্ধুত্ব করে লাভ কি—কারণ পার্টি চালাতে ধর ৫০০ কোটি টাকার প্রয়োজন, কে দেবে অত টাকা ? কৌটো নড়িয়ে চাঁদা তুলে ক’পয়সা হয় ? লোকে ৫০ পয়সা একটাকা চাঁদা দেয়। সরকারী-বেসরকারী-কর্মচারীদের কাছ থেকে জোর করে কিছু টাকা কেটে নেওয়া হয়। কিন্তু তাতেই বা কি হয়, local party office- এর খরচা কুলায় না তাতে। আসল টাকাটা তো আসে কানোরিয়া, বাজুরিয়া ইত্যাদিদের কাছ থেকে। তাই ওদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে হয় —ওদের কথা শুনতে হয়। তবে গুণীজনেদের মৃত্যু হলে বা কোন ব্যাপারে তারা সম্বর্ধিত হলে কিন্তু political লোকেরা উপস্থিত থাকে, মালা পরায়। আবার তারা কোন পুরস্কার লাভ করলে হাসি হাসি মুখে এরা হাতে পুরস্কার তুলে দেয়—ব্যস্ ঐ পর্যন্তই।
বর্তমানের রাজনীতি তো আর স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতি নয়। এখনকার কোন নেতাই সাধারণ মানুষের কথা ভাবে না, আর ভাববার সময়ই কোথায় ? বড় বড় নেতাদের মাসের ১৫/২০ দিন সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত প্রোগ্রাম ঠাসা রয়েছে, তুমি appointment চাইলে তার আগে পাবে না। বর্তমানের political লোকেদের 90% opportunist (সুবিধাবাদী), 5% terrorist (উগ্ৰপন্থী), 4% anarchist (নৈরাজ্যবাদী), আর 1% Patriot (দেশপ্রেমী)। এই 1% যারা তারা আবার উপরে ওঠার chance-ই পায় না বাকী 99%-এর চাপে।
ঠিক তেমনি ধর্মজগতে দেখতে পাচ্ছি ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামায় এমন মানুষের মধ্যে 90% লোক Ritual বা আচারসর্বস্ব, 9% intellectual, এদের মধ্যে 5% শুধু বুদ্ধিচালিত আর 4% বিবেকযুক্তবুদ্ধিচালিত, আর 1% প্রকৃত Spiritual। সুতরাং বুঝতে পারছ রাজনৈতিক জগৎ ও ধর্মজগতের বেশীরভাগ মানুষেরই level প্রায় একই, তাই ওরা ধনীর কদরই করবে। আমাদের এখানেই বসে আছে দিল্লীর ভগবানজী আর সুরেশজী, ওরা কলকাতায় এক নামকরা মিশনে গিয়েছিল, ওখানকার president-এর সাথে দেখা হবার পর তিনি ওদেরকে প্রথমেই জিজ্ঞাসা করেছিলেন : “কারমে (car) আয়া হ্যায় কিয়া ?” এরা ধর্মজগতের intellectual । বিবেকযুক্ত হলে তবুও জগৎকল্যাণ হবে কিন্তু intel- lect without conscience – nonsense হয়ে যাবে।
পৃথিবী গ্রহের মানুষের মানসিকতার level-টাই অনুন্নত, তাই সর্বত্রই প্রায় একই চিত্র দেখতে পাওয়া যাচ্ছে। এযাবৎকাল মানবকল্যাণ নিয়ে শুধু নানারকম theory-ই দেওয়া হয়েছে—কাজ কতটুকু হয়েছে ? স্বামী বিবেকানন্দই প্রথম যিনি সর্বতোভাবে চেষ্টা করলেন। কিন্তু তিনি ১২জন নিষ্কাম কর্মযোগী ছেলে পেলেন না। কর্মযোগী হওয়া সোজা কথা নয়—তিলমাত্র বাসনা থাকলে কর্মযোগ হয় না, সম্পূর্ণভাবে আত্মসুখ বিসর্জন দিতে হয়। ফলে তৎকালীন মানুষ কেন, আজকের মানুষই বা স্বামীজীকে কতটা গ্রহণ করতে পেরেছে ? জগতে মন্দির, মসজিদ, চার্চ, বৌদ্ধস্তূপ প্রচুর রয়েছে, এইসব নিয়েই থাকে মানুষ—এই লোকগুলোকেই Ritual বলে। আচারের আবরণে জ্ঞান-ভক্তি চাপা পড়ে গেছে। আচারসর্বস্বতা কমলেই ভক্তি- ভাব আসবে কিন্তু তা আর হয় না। South India-য় দেখেছি ভোর থেকে বড় বড় ঢাক পেটানো হচ্ছে মন্দিরের সামনে কারণ জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম—ঢাক পিটিয়ে দেবতার ঘুম ভাঙানো হচ্ছে। ১৫ মিনিট ধরে প্রণাম করছে ঠাকুরের উদ্দেশে, কোন সংগীত নিবেদনকরা হচ্ছে, তার মধ্যে কোন মাধুর্য নেই, ঠাকুর কি করে প্রসন্ন হবেন ? সে তুলনায় অবশ্য পূর্বভারতে ভক্তিভাব রয়েছে, দেবতার ঘুম ভাঙায় কীর্তনের সুরে, যা ভৈরবরাগে গীত আর শুনতে মধুর লাগে। বিশেষত বাঙালীরা দেবতাকে প্রিয় ভাবে। গোপালভাব বা পুত্রভাব তো খুবই পাবে, কোথাও কান্তাভাব। এই বিশেষ গুণের জন্যই বাংলায় মহাপুরুষের জন্মগ্রহণও হয় বেশী।
যাইহোক কথা হচ্ছিল লক্ষ্মীপুত্রদের প্রতি সমাজের সর্বস্তরের মানুষের প্রীতির কথা। আমাদের পরমানন্দ মিশনে এখনও সেটা নেই। পরবর্তীতে হতে পারে কিন্তু যেহেতু আমি বলে যাচ্ছি তাই আমার পরবর্তীরা শিখছে। তারা আবার বলবে, ফলে তাদের পরবর্তীরা শিখবে—এইভাবে এই শিক্ষাটা এই আশ্রমে থেকে যাবে—যাতে ওরকম না হয়। আমরা Ritual নই, আমাকে যদি কেউ জিজ্ঞাসা করে : “এখানে ঠাকুর কই, মন্দির কই ?” আমি অনাথ ছাত্রাবাস দেখিয়ে বলি : “ঐ আমার মন্দির।” আর মানুষদের দেখিয়ে বলি : “এই তো জনতা জনার্দন।”