জিজ্ঞাসু:—আপনি অনেকসময় শিরদাঁড়া খাড়া করে বসার কথা বলেন—এতে নাকি মস্তিষ্কের উন্নতি হয়, কিন্তু আমরা ছবিতে দেখি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ খাড়া হয়ে বসে নাই—এটা কেন ?

গুরুমহারাজ:—হ্যাঁ আমি বলেছিলাম—শিরদাঁড়া খাড়া করে যে বসতে পারে না, জানতে হবে তার আত্মশক্তির বা ইচ্ছাশক্তির অভাব আছে। কিন্তু তাই বলে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে সবার সাথে মিশিয়ে ফেলো না। যে ফটোটায় দেখা যায়— –ঠাকুর সুখাসনে একটু ঝুঁকে বসে আছেন, ওটা ঠাকুরের মাতৃভাব। মা সন্তানকে দুধ দেবার সময় একটু ঝুঁকে বসেন। অনন্ত ভাবময় ঠাকুর ‘কে’ ছিলেন আর ‘কি’ ছিলেন __তার অন্ত পাওয়া কি অতই সহজ! তাঁর জীবদ্দশাতেই স্বামী বিবেকানন্দ আর মা সারদা ছাড়া তাঁকে কে কতটুকুই বা চিনেছিল ? সারদা মা ঠাকুরকে ‘মা জগদম্বা স্বয়ং’ বলে চিনেছিলেন। তাই ঠাকুরের মহাপ্রয়াণের পর ‘মা, তুমি কোথায় গেলে গো’—বলে কেঁদেছিলেন।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মতো অবতারবরিষ্ঠ পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ করে পৃথিবীগ্রহকে ধন্য করে গেছেন। চৌষট্টি তন্ত্রের সাধনা করলেন তিনি এবং প্রত্যেকটায় সিদ্ধ হলেন। এক-একটা আচার সম্পন্ন করতে তাঁর একদিন, দুদিন অথবা তিনদিনের বেশী লাগেনি—ভাবা যায় ! যেখানে একটা তন্ত্রের আচার করতেই এক-একজন সাধকের এক জন্ম লেগে যায় অথবা একজন্মেও অনেকে পারে না—সেখানে কয়েকদিনের মধ্যে চৌষট্টি তন্ত্রের সাধন সম্পন্ন করা এটা স্বয়ং ভগবান ছাড়া আর কার পক্ষে সম্ভব ! রামপ্রসাদ দক্ষিণাচার সিদ্ধ ছিলেন, বামদেব বামাচার (চিনাচার) সিদ্ধ ছিলেন, কমলাকান্ত বীরাচার। তাহলে সবতন্ত্রের সাধন করতে গেলে চৌষট্টি জন্ম লেগে যাবে। বহু পূর্বে মহাদেব সদাশিব এই ধরণের তন্ত্র সাধনা করেছিলেন। তাঁর পর তন্ত্র নিয়ে এত বড় re- search আর পৃথিবীগ্রহে হয় নি। মথুরবাবু, শ্রীশ্রী মা, হৃদয় আর যোগেশ্বরী ভৈরবী—যারা তাঁকে সাহায্য করেছিল তারাও ধন্য ! পঞ্চবটী ধন্য ! দক্ষিণেশ্বরের মাটি ধন্য ! এই পৃথিবীগ্রহ ধন্য ! এই অতিলৌকিক ঘটনার সাক্ষী যাঁরা ছিলেন __তাঁরা এবং যে স্থানে এই অসাধ্য-সাধন ঘটেছিল সেই স্থান চিরকাল মহিমান্বিত হয়ে থাকবে ! এখন ও মহিমান্বিত, ভবিষ্যৎ পৃথিবীর কাছেও তাই থাকবে।

ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ আরও কত ভাবের সাধন করেছিলেন, এমনকি বিভিন্ন ধর্মমতের সাধনও করেছিলেন। এসব করে তিনি জগৎকে দেখালেন যে, “সবই সত্য”। স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন—পৃথিবীতে যত ভাব আছে তাদের পূর্ণাঙ্গ রূপ হচ্ছে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ। রমণ মহর্ষি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে স্থুলভাবে দেখেননি। একবার কোনো একজন ঠাকুরের একটি ফটো তাঁকে দেখান। ভালো করে কিছুক্ষণ দেখার পর মহর্ষি রমণ বলেন, ‘এই ফটোটি এমন একজন মহাপুরুষের, যাঁর ফটো, যে কোনো ধর্মমতের মানুষ যদি ঘরে টাঙিয়ে রাখে এবং এঁকে চিন্তা করে__তাহলে তার আধ্যাত্মিক উন্নতি হবে।’ ঠাকুরকে অবতারবরিষ্ঠ বলার এটাই অন্যতম কারণ যে, পৃথিবীতে যত অবতারপুরুষ এসেছেন, তাঁদের প্রচারিত ধর্মমতগুলির অনুগামীরা ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মাধ্যমেই নিজ নিজ ধর্মগুরুর শ্রেষ্ঠ চিন্তাগুলি ধরতে পারবে। এককথায় বলা যায় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ সমস্ত অবতারপুরুষের প্রচলিত ধর্মমতের সাধকদের কাছেই বরণীয়, তাই তিনি অবতারবরিষ্ঠ।

আমি যখন হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্ত ঘুরছিলাম তখন আমার সাথে কয়েকজন মহাত্মার সাক্ষাৎ হয় । এঁদের অত্যন্ত উচ্চ অবস্থা— লোকসমাজের সঙ্গে এঁদের কোনো যোগাযোগই নাই, অথচ বহুকাল ধরে শরীরধারণ করে আছেন। এঁদেরকে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কথা জিজ্ঞাসা করেছিলাম ! ওঁরা কিছুক্ষণ চিন্তা করার পর উত্তর দিয়েছিলেন, ‘উনি হরির অবতার’ ! অনন্ত ভাবময় ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে কে চিনতে পারে বলো ? গিরিশ ঘোষ বলেছিলো – ‘ব্যাস-বাল্মিকী যাঁর বর্ণনা করতে গিয়ে হিমসিম খেয়েছেন, আমার কি সাধ্য তাঁকে বর্ণনা করি’!

তাই বলছিলাম ভগবানের সঙ্গে কখনও মানুষের তুলনা করতে যেও না, তাহলে মস্ত ভুল হয়ে যাবে।।