জিজ্ঞাসু:—স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন আমাদের দেশবাসীর শরীরের গঠন নষ্ট হওয়ার জন্য দায়ী ময়রার দোকানগুলি কিন্তু প্রাচীন ভারতেও তো ময়রা ছিল, ময়রার দোকানও ছিল, আর ভারতীয়দের শারীরিক গঠন খারাপ তো ছিল না ?

গুরুমহারাজ:—হ্যাঁ, এটা ঠিকই যে, তখন ভারতীয়দের শারীরিক গঠন খুবই ভালো ছিল। মুঘল আর খ্রীষ্টানরা আসার পর থেকেই এদেশের ময়রার দোকানগুলোর বারোটা বেজেছে। মুঘলরা আসার পর ময়রার দোকানের খাবারে রঙ মাখানো এবং সুগন্ধি দ্রব্যের প্রয়োগ বেড়ে যায়। আর ইংরেজরা আসার পর ময়রার দোকানে মুখরোচক খাবার রাখার প্রবণতা বেড়ে যায়। এগুলি সবই পেটের পক্ষে মারাত্মক। আগেকার দিনে এইসব খাবার ছিল না। তখন ময়রার দোকানে মুড়ি-মুড়কি ছাড়া মণ্ডা, মেঠাই, খাজা, গজা—এইসব বিক্রি হোতো। ছানার তৈরী মণ্ডা, কলাইবাঁটা থেকে তৈরি বোঁদে বা বোঁদের নাড়ু অথবা মেঠাই, খাজা এবং গজা__এইসব পাওয়া যেতো। আর এগুলি সব গাওয়া-ঘিয়েই ভাজা হোতো। ফলে দু-চার দিনের বাসি হোলেও মাছি(গাওয়া ঘি মাখানো খাদ্যদ্রব্যে মাছি বসে না)ইত্যাদি ক্ষতিকর কীট-পতঙ্গ এগুলি স্পর্শ করতো না। আর চট্ করে এগুলির পচনও হোতো না। ফলে বেশ কয়েকদিন দোকানের সমস্ত মিষ্টান্ন বেশ fresh থাকতো, এইসব কারণেই ময়রার দোকানের মিষ্টি মানুষের শরীরের বিশেষ কোনো ক্ষতি করতো না।

এখন মানুষের নৈতিক অধঃপতন ঘটেছে, ফলে ময়রারা পচা ছানা-পচা মিষ্টিকেও সুগন্ধি মাখিয়ে, রঙ দিয়ে আবার নতুন কোনো মিষ্টি বানাচ্ছে, আর মানুষ সেগুলিই খুশি হয়ে কিনে নিয়ে গিয়ে গপ্‌গপ্ করে খাচ্ছে। কড়াইয়ে যে তেল দিয়ে ভাজা মিষ্টি তৈরী হয়, সেটা পুড়ে পুড়ে বিষ হয়ে গেছে_ তবুও ময়রারা সেটা বদলায় না। মানুষ তো এসবই খাচ্ছে, ফলে শরীর খারাপ হবেই তো !

সর্বোপরি প্রাচীনভারতে চিনির প্রচলন ছিল না। ওটা ইংরেজরা গোটা পৃথিবীতে ছড়ালো। তখনকার দিনে ময়রার দোকানে গুড়ের ভিয়েন হোতো। চিনি তৈরীর সময় যে acid দিয়ে wash করা হয়, তা প্রচণ্ডভাবে হাড়ের ক্ষতি করে। এখনকার শিশুদের পিতা-মাতারা আদর করে তাদের মিষ্টি খাওয়াচ্ছে, আর দাঁতের এবং হাড়ের growth-এর বারোটা বাজাচ্ছে। এইভাবেই জাতীয় স্বাস্থ্যের হানি হোচ্ছে।

জিজ্ঞাসু :–আচ্ছা মহারাজ, শ্রাদ্ধকর্মে এখানে কেউ ১০ দিন, কেউ ১৫ দিন, কেউ বা ১ মাস অশৌচ পালন করে –এরূপ পৃথক পৃথক বিধান কেন ?

গুরুমহারাজ:—আমাদের বাংলায় চলে স্মার্তকার রঘুনন্দনের বিধান। স্মৃতিশাস্ত্র যেন ভারতীয় সমাজের সংবিধান। ভারতের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন স্মার্তকাররা আছেন যাঁদের বিধান সেই সমাজে চলে। যাইহোক, রঘুনন্দনের বিধান অনুযায়ী ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য ও শূদ্রদের যার যতদিন অশৌচ পালনের নির্দেশ আছে তারা সেইরূপ পালন করে থাকে। তবে বাংলার বাইরে বেশীর ভাগ রাজ্যে সাধারণ মানুষ শুধু মৃত্যুর দিনটাই অশৌচ পালন করে, সেই দিনই দাহ করে স্নান করার পর আর কোনো অশৌচ পালন করে না। কেউ হয়তো মস্তক মুণ্ডন করে, কেউ তাও করে না। এর পর দ্বাদশ দিনে(বা পনেরো দিনে, কোথাও পঁয়তাল্লিশ দিনে)শ্রাদ্ধ কর্ম করে এবং কিছু লোকজন বা ব্রাহ্মণভোজন করিয়ে দেয় ।

মুসলিমরা মৃতদেহ দাহ করে না—কবর দেয়। তবে ওদেরও অনেক অনুষ্ঠান পালন করতে হয়। মৃত্যুর পর মৃতদেহের ‘দফন-কাফন’ হয়, expert দিয়ে পেটের সমস্ত মল বের করাকে ‘দফন’ বলে এবং নতুন কাপড় কিনে এনে মৃতদেহকে ভালো করে ঢাকা দিয়ে ‘কাফন’ করা হয়। এরপর সমাধি বা গোর দেওয়ারও নানান বিধান আছে। মৃতদেহকে স্নান করাতে হয়, বিশেষ নামাজ পড়তে হয়—এছাড়া কোন্ দিকে মাথা, কোন্ দিকে পা, কে আগে মাটি দেবে, ক’আঁজল মাটি দেবে ইত্যাদি সবকিছুরই বিধান রয়েছে। এসব মিটে গেলে খাওয়া-দাওয়া হয়। এর ৪০ দিন পর হিন্দুদের শ্রাদ্ধের ভোজনের মতো নেমন্তন্ন করে লোকজন খাওয়ানো হয়।

হিন্দুদের মধ্যে বৈষ্ণবরাও মৃতদেহ মাটিতে পুঁতে দেয়—ওরা একে ‘সমাজ’ দেওয়া বলে। ওরা নুন দিয়ে সমাজ দেয়, আর প্রদীপ দেয় পিছনে। আর খ্রীষ্টানরাও কবর দেয় কিন্তু বাতি দেয় মৃতদেহের সামনে।

যাইহোক, স্মার্তকার রঘুনন্দন গৌরাঙ্গ মহাপ্রভুর সমসাময়িক ছিলেন অর্থাৎ তার মানে হোচ্ছে __দীর্ঘদিন ধরেই বাঙালীরা রঘুনন্দনের স্মৃতিশাস্ত্রের বিধান মেনে আসছে। এর মধ্যে কোন্ বিধান কতোখানি বিজ্ঞানসম্মত বা কোনটি কতোখানি গ্রহণযোগ্য, এ নিয়ে সমাজের শিক্ষিতমহলের অনেকেই মাথা ঘামায় । আর এর ফলে সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে সামাজিক-সংস্কারাদির কিছু কিছু গ্রহণ-বর্জনও হয়। কিন্তু একটা ব্যাপার লক্ষ্য করে দেখবে _ কোনো মহাপুরুষ বিশেষতঃ অবতার পুরুষেরা কখনো স্মৃতিশাস্ত্রের কোনো বিধানের বিরোধ করেন নি। আসল কথা হোলো _ এইসব নিয়ে তাঁরা মাথাই ঘামান নি। এর কারণ হোচ্ছে _আধ্যাত্মিক পুরুষরাই প্রকৃত অর্থে মুক্তপুরুষ। তাই কোনো বিধান বা বাঁধনে তাঁরা নিজেরাও আবদ্ধ ন’ন, আর কেউ আবদ্ধ হোক এটাও তাঁরা চান না। তাঁরা শুধু চান মানুষ বাঁধন কেটে বেরিয়ে আসুক, মানুষ মুক্ত হোক। কারণ মানবের পরিপূর্ণতালাভের এটাই অন্যতম প্রধান শর্ত। অপর পক্ষে সমাজপতিরা বার বার কোনো না কোনো বিধান সৃষ্টি করেছে—সমাজকে সুশৃঙ্খলে রাখার জন্য। কিন্তু যখনই যে সমাজে, যে বিধানে সমাজকে সুস্থ রাখা সম্ভব হয়নি—তা পাল্টে আবার এসেছে নতুন বিধান।
তারপর কালের নিয়মে একদিন সেটাও পুরানো হয়ে যাবে এবং পাল্টেও যাবে। এইভাবেই চলেছে সমাজের বিবর্তন।

তবে, আশার কথা এই যে, এখন দেখা যাচ্ছে সমাজনীতি ক্রমশ ভালোর দিকেই চলেছে।
আসল কথা কি জানো _ মানবসমাজের মূলে যখন রয়েছে _”মানুষ”, তখন মানুষের মনকে বিশ্লেষণ না করে শুধু সার্বজনীন কোনো নিয়মে বা বিধানে সমস্ত প্রকার মানুষকে কখনই শৃঙ্খলায় আবদ্ধ করা যাবে না, আর সবার মঙ্গলও একসাথে করা যাবে না! এমনকি একথা জোর দিয়ে বলা যায় যে, সবাই অর্থাৎ একশ ভাগ লোক কোনো একটি নিয়মকে মেনে নিতেই পারবে না _তো তাদের মঙ্গল হওয়া দূরের কথা। তাই সমাজবিধান এমন হওয়া উচিত _ যা মানুষের মনকে বিশ্লেষণ করে তৈরী হবে।

মহাভারতের যুগে কৃষ্ণনীতিতে দেখা যায় একই কর্মের জন্য সাম, দান, দণ্ড ও ভেদ এই চার প্রকারের দণ্ডের বিধান ছিল । সমাজের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র এই চার শ্রেণীর মানুষের জন্য ছিল চার ধরণের বিধান। ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির বা স্বভাবের এবং বিভিন্ন গুণসম্পন্ন মানুষের জন্য বিভিন্ন প্রকার বিধানের ব্যবস্থার কথা ঋষিদের চিন্তায় ছিল। প্রাচীন শাশ্ত্রাদিতে পাওয়া যায় যে, তৎকালীন অনেক রাজার রাজত্বে এই ব্যবস্থা লাগুও ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে system বদলে যাওয়ায় এবং সমাজের সমাজপতিদের চাপে তা চালু রাখা সম্ভব হয়নি। আগামীতে যদি কখনো এই ধরণের বিধান চালু হয়, তাহলে সেই সমাজের অবশ্যই মঙ্গল হবে।।