গুরুমহারাজ:—নিশ্চয়ই ভুল ! দেখতে ভালো অর্থাৎ রঙ ফরসা, চোখ বা মুখের গড়ন ভালো—এই সব তো ? এই দিয়ে দেবতার বা দেবীর বিচার হয় না, শাস্ত্রে রয়েছে বিভিন্ন অবতার, যেমন রাম, কৃষ্ণ ইত্যাদিরা কালো রঙের ছিলেন। আবার দেবতাদের মধ্যে যমরাজ, শনিদেব, দেবীদের মধ্যে কালী ইত্যাদি অনেকেই তো কালো_তাই নয় কি ?মানুষের এটা যে কি একটা sentiment, সবাই ফর্সা রঙকে ভালোবাসে ! কালোপাত্রের সঙ্গে বিবাহ হবে জেনে অনেক মেয়ে আত্মহত্যা করেছে—এমন ঘটনাও ঘটেছে। আবার কালো-বৌ বাড়িতে আসায় পরিবারের কেউই তার সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না—অত্যাচার করে এমন record-ও পাবে।
ইংরেজরা এদেশে আসার আগে পর্যন্ত ভারতীয়দের মধ্যে এই ফর্সা sentiment-টা এতোটা প্রকট ছিল না, যদিও পারসিক এবং গ্রীকজাতিরা যখন থেকে ভারত আক্রমণ করেছে তখন থেকেই সাদারঙের মানুষের সঙ্গে ভারতীয়দের পরিচয় ছিল। গ্রীক বা ইউনান জাতিই পরে ‘যবন’ শব্দে রূপ পায়। ফলে সাদা চামড়ার লোক হোলেই ভারতীয়রা যবন মনে করতো।
যাইহোক, বর্তমান বিশ্বে কালো-সাদা sentiment একটা বিরাট সমস্যা। এই sentiment এর কাছে ধর্মীয় sentimentও ম্লান হয়ে যায়। আফ্রিকান বা এশিয়ানরা মুসলিম হোলেও আরবীয় মুসলমানদের কাছে মর্যাদা পায় না, আবার কালোরা খ্রীষ্টান হোলেও ইউরোপ বা আমেরিকার খ্রীষ্টানরা তাদের ঘৃণা করে। ইউরোপে গিয়ে এই ব্যপারটা আমার খুবই নজরে পড়েছে। এখানেও অর্থাৎ এই পশ্চিমবাংলায় কোনো বাবা-মায়ের কালো মেয়ে জন্মালে গোটা পরিবারটাই inferior complex-এ ভোগে । তারা tension-এ পড়ে যায় এই ভেবে যে, হয়তো ভালো জায়গায় বিবাহ দিতে পারবে না। তাহলে ঐ মেয়েটার কি অবস্থা হয়—ভাবো তো একবার !
কিন্তু আধ্যাত্মিকতার উচ্চ অবস্থায় সবই কালো বা বলা যায় ঘন নীল, নীল-নীল বিস্ফার গর্ভ ঘন নীল। তাছাড়া ঐ যে বলছিলাম বিভিন্ন আদর্শস্থানীয় ব্যক্তিত্ব, যেমন রাম, কৃষ্ণ, অর্জুন, দ্রৌপদী (কৃষ্ণা), ব্যাসদেব -এঁরা সবাই কালো ছিলেন। সাধারণ মানুষ কৃষ্ণ বা কালীর ভজনা করে, আরাধনা করে কিন্তু তারা চায় যে তার ছেলে বা মেয়ে অথবা বৌমা ফর্সা হোক। কালোকে যেন অমঙ্গলের প্রতীক হিসাবে ধরে নিয়েছে। ISCON তো কৃষ্ণকে সাদাকৃষ্ণ বানিয়েছে। ইউরোপ অনেক আগেই যীশুকে সাদাযিশু হিসাবে ধরে নিয়েছে যদিও প্রকৃতপক্ষে যীশু অতোটা সাদা ছিলেন না ! তাঁর নীল চক্ষু এবং কালো চুল ছিল অর্থাৎ তিনি অনেকটা এশিয়ানদের মতো দেখতে ছিলেন। রাবণ ফর্সা ছিল অথচ রামের রঙ কালো ছিল, কিন্তু মানুষ কালোকে মানতে না পেরে সবুজ রাম বানিয়েছে—নবদূর্বাদলের রঙ।
এইভাবেই দেখা যাচ্ছে মানুষের মনে কালো সম্বন্ধে যেন কেমন একটা অছ্যুৎ ভাব কাজ করছে – সে কালোকে মেনে নিতে পারছে না। অপরদিকে মানুষ সাদাকে খুশি মনে মেনে নিচ্ছে, সেখানে গুণাগুণ বিচারের প্রয়োজন মনে করছে না_এই তো অবস্থা।
তবে বর্তমানের জীন বিজ্ঞানীরা anthropo- logy বিচার করে দেখেছে মানুষের আদিমরূপ কালো ছিল— আদিমাতাও কালো ছিলেন। পরে স্থান, কাল, আবহাওয়া, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত কারণে বা বিবর্তনে মানুষ কোথাও কালো রয়ে গেছে, কোথাও চামড়ার মেলানিনের পরিবর্তন হওয়ায় মানুষের গায়ের রঙ কটা হয়েছে।।
