জিজ্ঞাসু:—আশ্রমে একজন বয়স্কা ভদ্রমহিলা এবং অল্পবয়সী ২/১ জনকে দেখলাম, যাদেরকে দেখে মনে হোলো তারা মানসিক বিকারগ্রস্ত—এরা কি এখানে চিকিৎসার জন্য এসেছে না কি অন্য কারণে মহারাজ ?

গুরুমহারাজ:—হ্যাঁ, ঠিকই বলেছো এদের মধ্যে দু-একজন মানসিক বিকারগ্রস্ত রয়েছে ঠিকই । তবে, বয়স্কা মহিলা বলতে বোধহয় তুমি ‘ছোটমা’-কে দেখেছো, ওনার বয়স হয়ে গেছে তো_উনি বর্তমানে ঐ একরকম হয়ে গেছেন ! এখন উনি সবাইকে গালিগালাজ করেন, জানো তো__আমাকেও বাদ দেন না। উনি কিন্তু পূর্বে আমাকে সন্তানের ন্যায় স্নেহ করতেন, আর সেইজন্যই তো আমি ওনাকে ‘ছোটমা’ বলি।

জানো, উনি খুব বড় ঘরের বউ ছিলেন কিন্তু বাল্যবিধবা ও নিঃসন্তান হওয়ায় সেখানকার সম্পত্তির বিশেষ কিছু পাননি। তাই ভবিষ্যতে ওনার কি হবে–কে দেখবে এইসব চিন্তা করতে করতে ওনার মাথাটা এইরকম হয়ে গেছে। এখন ওনার মুখ থেকে যা বাক্যবাণ নির্গত হয় তা সহ্য করে ওনাকে সেবা করার লোক যে কোনো পরিবারে খুবই কম আছে। তাই তো ওনাকে আশ্রমে এনে রাখা হয়েছে, যাতে আশ্রমের ত্যাগী ছেলে-মেয়েরা ওনার সমস্ত অত্যাচার সহ্য করেও সেবা-শুশ্রূষা করতে পারে। এইরূপ সেবা ও সাধনার মাধ্যমে আশ্রমের ছেলে-মেয়েদের মঙ্গলই হবে।

আর যে দু-একজন অল্পবয়সী ছেলে-মেয়েদের কথা বলছো_ ওরা ‘সিজোফ্রেনিক বা lunatic, বাংলায় বলা যায় ‘চন্দ্ৰাহত’। আজকাল কমবয়সী ছেলে- মেয়েদের মধ্যে এটি খুবই দেখা যাচ্ছে, বিশেষত Teenager-দের মধ্যেই এই রোগের প্রবণতা বেশী। বয়ঃসন্ধিকালে হঠাৎ হঠাৎ জীবনে নানান ঘাত- প্রতিঘাত এসে যায়। এ সমস্ত মোকাবিলা করার জন্য তারা অভ্যস্ত নয়, আর তত মানসিক জোরও তৈরী হয়নি। ফলে কোনো একটা বিশেষ জোরালো ঘটনা যখন তাদের জীবনে হঠাৎ ঘটে যায় –তখন সেটা মনোজগতে এমন একটা ধাক্কা মারে যে তার action-টা Brain নিতে পারে না। এর ফলে হয় তাদের স্মৃতিভ্রংশ হয়, উল্টোপাল্টা আচরণ করে–আজেবাজে কথা বলে ফেলে, আর তখনই লোকে তাদেরকে বলে খ্যাপা বা খেপী ! কিন্তু এইসব ছেলে-মেয়েদের বাবা-মা যদি ছেলে-মেয়েদের প্রতি careful হয় এবং বাড়ীর পরিবেশ যদি অনুকূল হয়, তাহলে ছেলে- মেয়েগুলির মধ্যে এইসব সংকট দেখা যায় না।

কমবয়েসী ছেলেমেয়েদের জীবনে কোনো দুর্ঘটনা হঠাৎ ঘটে গেলেও যদি ঠিকমতো তাকে বোঝাতে পারা যায় বা ঘটনাটির প্রতিবিধান করা যায়__ তাহলে এমনটা হয় নাকি ? শুধু কমবয়েসীরাই নয়_ বয়স্ক ব্যক্তিরাও যে হঠাৎ পাগল হয়ে যায়, তারও অন্যতম কারণ এটাই অর্থাৎ হঠাৎ ঘটে যাওয়া কোনো দুর্ঘটনা এবং সেই অবস্থা থেকে তাকে বের করে আনার জন্য কোনো চেষ্টা না হ‌ওয়া! তবে বয়স্ক lunatic-দের সংখ্যা কমবয়েসী ছেলে -ছোকরার থেকে অপেক্ষাকৃত কম। কারণ বয়স্কদের জীবনের অভিজ্ঞতা বেশী, ফলে তাদের মনের জোরও বেশী থাকে। তাই তারা অনেকেই ঘটনার আকস্মিকতার রেশটা সময়ে কাটিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু Teen-aged ছেলে-মেয়েদের জীবনের অভিজ্ঞতা কম, ফলে তারা কোনো কিছুরই গভীরে যায় না_ প্রথমেই ঝাঁপিয়ে পড়ে, তারপর আকস্মিক প্রতিঘাত এলে আর সামলাতে পারেনা ! ঐ অবস্থায় তার Brain আর মোটেই ঠিকমতো কাজ করে না। দুটো সুতোয় জট পাকিয়ে গেলে যেমন টানাটানি করলে আরও গিঁট লেগে যায়—এক্ষেত্রেও তাদের Brain-এর খানিকটা সেরকমই অবস্থা হয়।

কিছুদিন আগে আমাদের আশ্রমের একজন ভক্ত তার ভাইঝিকে ঐরকম অবস্থায় এখানে নিয়ে এসেছিল। অল্পবয়স্কা মেয়েটির সবে বিয়ে হয়েছে—বিয়ের পরেই মাথাখারাপের লক্ষন দেখা দিয়েছে!

ঘটনাটা ঘটেছে কি, মেয়েটির যার সঙ্গে বিবাহ হয়েছে, সেই ছেলেটির হয়তো পাড়ায় কোনো মেয়ের সাথে বিয়ের আগে একটু ভাব-সাব ছিল। এবার ফুলশয্যার রাত্রেই পাড়ার কোনো মেয়ে বা বৌদি অথবা কোনো আত্মীয়া মেয়েটিকে সাবধান করার জন্য সেই ঘটনাটি বলে দেয়। ব্যস্ ! ফল হোলো একেবারে উল্টো ! সদ্যবিবাহিতা মেয়েটির জীবনের রঙীন স্বপ্ন ও আনন্দ-উত্তেজনার হাটে যেন বোমা বিস্ফোরণ! ওর Brain এটা মেলাতে পারলো না, ফলে বিকারগ্রস্ত হয়ে পড়লো !

যাইহোক এখানে মেয়েটিকে নিয়ে আসার পর আমি ওকে একান্তে ঘরে বসিয়ে একটা-দুটো কথা বলতে শুরু করলাম। তারপরে ওর কথার খেই ধরে এটা-ওটা জিজ্ঞাসা করতে করতে আসল ঘটনায় নিয়ে গেলাম। মেয়েটি তখন ঐকথাগুলি আমাকে বললো এবং সে যে insecured_সেই কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেললো। আমি ওকে সান্তনা দিলাম, মনে জোর যোগালাম__ তারপরেই দেখি মেয়েটি ওখানেই ঘুমিয়ে পড়লো ! আমি বাইরে বেরিয়ে ওর বাড়ির লোকজন এবং তপি(পবিত্রপ্রাণা মাতা)-কে নির্দেশ দিলাম _কেউ যেন ওর ঘুম না ভাঙায় বা কোনোরূপ disturb না করে ! ঘুম থেকে উঠে মেয়েটি একেবারে normal হয়ে গেল এবং বাবা-মায়ের সাথে বাড়ি ফিরে গেল।

যাইহোক, এইসব ঘটনার উল্লেখ করে আমি তোমাদেরকে এটাই বোঝাতে চাইলাম যে, বিশেষ বিশেষ পরিস্থিতিতে কতো সামান্য কারণে কোনো ছেলে বা মেয়ে মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে যেতে পারে। তবে এসব রোগ সারানোর জন্য Allo- pathic চিকিৎসার যে পদ্ধতি আছে অথবা Shock-therapy—এগুলি কোনোটাই মানসিক রোগীদের পক্ষে ঠিকমতো উপযোগী নয়। একমাত্র সাইকোথেরাপি, আর সেইসঙ্গে জল-নেতি সূত্র-নেতি করানো এবং জলাশয়ে অনেকক্ষণ ধরে অবগাহন স্নান করানো অনেক বেশী কার্যকরী হয়। আমাদের আশ্রমে এই ধরণের রোগী যারা আসে তাদের তো এইভাবেই treatment করা হয়। এখান থেকে কতজন যে সুস্থ হয়ে ফিরে গেল_তার ইয়ত্তা নাই। বাড়ী ফিরে গিয়ে যদি Food-habit-টা আশ্রমের নির্দেশমতো মেনে চলে অর্থাৎ নিরামিষ খাদ্য গ্রহণ করে, অতিরিক্ত ঝাল-মশলা-তেল না খায়, প্রতিদিন কোষ্ঠ পরিষ্কার রাখার ব্যবস্থা করে এবং অত্যধিক শারীরিক বা মানসিক শ্রম না করে বা অধিক রাত্রি জাগরণ না করে—তাহলে আর কখনোই তাকে এই problem-এ পড়তেই হবে না। অন্যথায় যে সমস্ত রোগীর একবার এই রোগ দেখা দিয়েছে—তার সম্ভাবনা থাকছে পুনরায় এর দ্বারা আক্রান্ত হবার। এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের সন্তান-সন্ততিদের মধ্যেও সিজোফ্রেনিক প্রবণতা থাকতে দেখা যায় ৷ তাই একবার মানসিকভাবে অসুস্থ রোগীদের আহার এবং বিহার অর্থাৎ food habit and life style ঠিক করতেই হবে _নাহলে সে তো ভুগবেন, তার next generation-কেও ভুগতে হবে।।