গুরুমহারাজ:—যে কোনো রোগ যখন শরীরে সংক্রামিত হয়, তখন তার জন্য যেমন কিছু বাইরের কারণ দায়ী থাকে, তেমনি আভ্যন্তরীণ কারণও অনেকাংশে দায়ী। যে কোনো acute রোগ সাধারণত বাইরের কারণের জন্য হয়। কিন্তু যেগুলি chronic সেগুলি হয় বংশগতির ধারায়। Genetic disorder অথবা দীর্ঘদিন শারীরিক অত্যাচার বা অসংযমের কারণে শরীরে ঐ ধরণের রোগগুলি স্থান পায়। যে কোনো রোগ সংক্রমণের বাইরের কারণ বলতে বিভিন্ন প্রকারের bacteria বা virus ইত্যাদি । এগুলি সাধারণতঃ শরীরে আসে জল থেকে, খাদ্য থেকে বা বায়ুমণ্ডল থেকে।
কিন্তু Genetic কারণ বলতে — কোনো কোনো জাতক রোগের প্রবণতা নিয়েই জন্মায়। আধুনিক research- এ দেখা যাচ্ছে যে, কোনো জাতকের পিতা-মাতা প্রজনন ক্রিয়া ঘটানোর আগে যদি ক্রোধান্বিত হয় বা বিষাদগ্রস্ত হয়, তাহলে তাদের মধ্যে ঐ বিশেষ স্নায়ুবিক উত্তেজনার vibration শুক্রাণু বা ডিম্বাণুর উপর effect করে, আর ঐ effect প্রায় ৪৮ ঘণ্টা স্থায়ী থাকে। ফলে ঐ সময়ের মধ্যে পিতা-মাতার মিলনের ফলে যদি মা consieve করে তাহলে গর্ভস্থ সন্তানের বিভিন্ন Gland-এ কিছু disorder দেখা দেয়, ফলে ঐ জাতক অসহজ হয় এবং রোগপ্রবণ শরীর নিয়েই জন্মায়। প্রাচীন ভারতবর্ষে সুসন্তান জন্মানোর জন্য যে পুত্রেষ্টি যজ্ঞ(ভারতীয় শাস্ত্রাদিতে এর উল্লেখ রয়েছে)-এর বিধান ছিল, সেখানে দেখা যায় যে, ক্রিয়ার পূর্বদিন থেকেই ব্রত অবলম্বন, শুচিতা ও পবিত্রতা রক্ষা করা ইত্যাদির কথা বলা হয়েছে । এইসব বিধানগুলির প্রত্যেকটিই পুরোপুরি scientific ছিল_সাধারণ মানুষ এর গুরুত্ব বুঝতে না পেরে একে অবহেলা ভরে সড়িয়ে রেখেছে। কিন্তু ভারতীয় প্রাচীন শাস্ত্রে গর্ভধারণের ব্যাপারে ওই ধরণেরই নির্দেশ আছে।
যাইহোক, এটা জেনে রাখবে যে, মাতৃগর্ভে সন্তান থাকাকালীন মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। কারণ এই অবস্থায় মায়ের দৈহিক এবং মানসিক অবস্থার উপর সন্তানের দেহ ও মনের গঠন নির্ভর করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যেমন, এই অবস্থায় মা যদি প্রায় প্রচুর পরিমাণে চোখের জল ফেলে অর্থাৎ কাঁদে, তাহলে সন্তান চোখের দোষ নিয়েই জন্মাবে। এই অবস্থায় মা যদি বার বার ক্রোধান্বিতা হয় বা উত্তেজিতা হয়ে চেঁচামেচি করতে থাকে, তাহলে সন্তান Lung এবং Heart-এর দোষ নিয়ে জন্মাবে। মা যদি অনিয়মিত ও গুরুপাক আহার গ্রহণ করার ফলে indigestion-এ ভোগে, তাহলে সন্তান Liver এর দুর্বলতা নিয়ে জন্মাবে। এইসব আরো অনেক কিছুই বলা যেতে পারে। কিন্তু আসল কথা হোচ্ছে এই যে ভারতীয় ঋষিগণ বিধান দিয়েছিলেন যে, সুস্থ-সবল সুসন্তানলাভের জন্য মিলনের আগেও যেমন পিতা বা মাতা উভয়কেই নিয়ম এবং সংযম পালন করতে হবে, তেমনি সন্তান গর্ভে আসার পর শুধু মায়েরই নয়— গোটা পরিবারকেই দায়িত্ব নিতে হবে শর্তগুলি ঠিক ঠিক পালন করার ব্যাপারে ! কিন্তু বলোতো কয়টা পরিবার আর কয়টা দম্পতি এইসব শাশ্ত্রোক্ত নির্দেশ মেনে চলে ? এইজন্যেই তো আজকাল সমাজ আর সুস্থ, সাবলীল, সহজ ও সুন্দর শিশুদেরকে অতোটা অধিক সংখ্যায় পাচ্ছে না ! এখন যে সমস্ত শিশুরা জন্মাচ্ছে__ তারা প্রায় সকলেই রোগপ্রবণতা নিয়েই শরীর গ্রহণ করছে।
তবে তুমি যেটা বলছিলে, ‘পেটের trouble’ _ ওটার জন্য বাইরের কারণই বেশীর ভাগ দায়ী। কিছুদিন আগে পর্যন্ত বর্তমান age-কে বলা হোতো Plastic age। অতি সম্প্রতি একে বলা হোচ্ছে Synthetic age ! এখন বেশীর ভাগ যে খাদ্য মানুষ খাচ্ছে, তার মধ্যে কোনো না কোনো Synthetic chemical রয়েছে। গুঁড়োমশলাগুলো তো পুরোটাই chemical। এখন Synthetic রসগোল্লা, বোঁদে, আচার, জ্যাম, জেলি স্কোয়াশ ইত্যাদিতে বাজার ছেয়ে গেছে। ফলে এই Synthetic গুলি মানব শরীরের Liver-এর বারোটা বাজাচ্ছে।
বড় বড় কোম্পানিগুলি এইসব মাল তৈরী করছে—দামেও সস্তা, তাই মানুষ এগুলিই গ্রহণ করছে ! এর ফলে শরীরের খুবই ক্ষতি হোচ্ছে। দ্যাখো, মানুষের শরীর সহজভাবে প্রস্তুত খাদ্যগ্রহণ এবং সেটিকে শরীরে হজম করিয়ে তার থেকে পুষ্টিগ্রহণ করার জন্য উপযোগী _ কৃত্রিমভাবে প্রস্তুত খাদ্যের জন্য তো নয় ! সাধারণত যে কোনো খাদ্য শরীরে প্রবেশের সময় Liver-কে এবং বেরিয়ে যাবার সময় Kidney-কে কাজে লাগায়। এবার Synthetic খাদ্য খেলে ওর chemical-গুলি খাদ্যরস গ্রহণের সময় Liver-কে এবং বেরিয়ে যাবার সময় Kidney-কে ক্ষতিগ্রস্ত করে থাকে। তুমি ‘জণ্ডিস’ রোগের কথা বলছিলে, এই রোগে দেখবে এই দুটো যন্ত্র অর্থাৎ Liver আর Kidney-ই affected হয়ে থাকে।
এইসব রোগগুলি থেকে মুক্তি পেতে গেলে বাড়িতে আবার বাঁটা- মশলার ব্যবহার শুরু করতে হবে, আর Synthetic খাদ্য একদম বর্জন করতে হবে। তাছাড়া Liver-কে strong রাখতে প্রতিদিন সকালে খালিপেটে অর্ধ অঙ্গুলি পরিমাণ কাঁচা হলুদ, মধু অথবা ঝোলা গুড় দিয়ে খেতে হবে। এছাড়া জণ্ডিস বা ন্যাবা রোগে কাঁচা-হলুদের রস দু-চার ফোঁটা মধু দিয়ে দিনে কয়েকবার খেলে ভাল ফল পাওয়া যায়—এমনকি অব্যর্থও বলতে পারো। শ্বেতীরোগ (Leucoderma), মুখে সাদা বা কালো ছোপ এগুলির কারণও লিভারের দুর্বলতা। বর্তমান মানুষের মুখগুলোই কেমন যেন হয়ে গেছে_ আর সেই হাসি-খুশি, প্রাণচঞ্চল ভাবটাই নেই! এর একটা অন্যতম কারণ বেশীর ভাগ মানুষেরই Liver দুর্বল!
মুখ দেখে মানুষের শরীরের আভ্যন্তরীণ যন্ত্রসমূহের অর্থাৎ Liver, Kidney, Lung, Heart ইত্যাদির সুস্থতা বা অসুস্থতা বোঝা যায়। এর একটা বিজ্ঞান আছে। গুরুপরম্পরার(ওদের পারিবারিক গুরু যিনি সন্ন্যাসী ছিলেন।)কাছ থেকে ডাঃ বিধান চন্দ্র রায় এই বিদ্যা শিখেছিলেন। আর মুখ দেখে মন বা মানসিকতা তো বোঝা যায়-ই। এই জন্য ইংরাজীতে বলা হয়— Face is the reflexion of mind । তৃতীয় বিশ্বের বেশীর ভাগ দেশেরই এই একই অবস্থা। বিশেষতঃ ভারতবর্ষের জাতীয়স্বাস্থ্য এখন যেন প্রায় একেবারে ভেঙে পড়েছে। বীর্যবান পিতা আর ক’জন বলো ? Conception-এর পর বেশীর ভাগ মা ঠিকমতো Nutrious food পায় না, ফলে গিরগিটির মতো শিশু জন্মাচ্ছে। এরপর দাঁত বেরোতে না বেরোতে মা তাকে জোর করে ভাত খাওয়াতে শেখায়- ব্যস, ওতেই Liver-এর বারোটা ঐখানেই বেজে যেতে থাকলো। শিশুদের অন্ততঃ পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত liquid পুষ্টিকর খাদ্য খাওয়ানোটাই স্বাস্থ্যসম্মত —তা বেশীর ভাগ বাবা-মায়ের পক্ষে সেটা জোগান দেওয়া সম্ভব হয় না। এইবার এই হাড় জিরজিরে শিশু ভাত খেয়ে বড় হয়, ভাল কিছু খাওয়াবার সাধ থাকলেও তাদের মা-বাবার সাধ্য থাকে না। তারপর যখন এই শিশুরা বড় হয় অর্থাৎ যৌবনোদ্গম ঘটে, তখন তাদের শরীরের বিভিন্ন হরমোন নিঃসরণকারী গ্রন্থির পূর্ণতা আসে এবং শরীর পুষ্ট হয়। তখন দেখে আপাতভাবে মনে হয় যে, ছেলে বা মেয়েটির বোধয় স্বাভাবিক স্বাস্থ্য ফিরে এসেছে। কিন্তু এই সময় যেহেতু সে রোজগার করতে শেখে তাই তাদের বেশিরভাগই উচ্ছৃঙ্খল জীবন-যাপন করে। ছোটবেলাকার অতৃপ্ত বাসনা মেটানোর জন্য খাদ্যের ব্যাপারে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে তারা প্রচন্ড অসংযমী হয়। আর এর ফলেই তাদের স্বাস্থ্যের হানি ঘটতে শুরু করে।
আমি যেমনটা বলছি _এই ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে পারা যায় ব্যক্তিটির ৪৫ বছর বয়সের পর থেকে। তখন থেকেই তার শরীর দ্রুত ভাঙতে থাকে। বুকে যন্ত্রণা, পেটে Gastric ইত্যাদি নানান ব্যাধিতে ঐ ধরণের মানুষেরা আক্রান্ত হয়।
গোটা ভারতবর্ষের সাধারণ নিম্নবিত্ত বা তার নিচে বসবাসকারী মানুষের এই রকমই অবস্থা ! তাই বলছিলাম _ এই দেশের জাতীয়স্বাস্থ্য দ্রুত ভেঙে পড়ছে। একটা দেশের সর্বাঙ্গীণ উন্নয়নের ক্ষেত্রে এটা কিন্তু একটা অন্যতম প্রধান দৃষ্টি আকর্ষণকারী বিষয়! ভারতীয় রাষ্ট্রনায়কদের এখনই এ ব্যাপারে জনসাধারণকে সচেতন করার প্রয়াসী হোতে হবে এবং সেই সঙ্গে দেশবাসী যাতে দারিদ্রসীমা থেকে উপরে উঠে আসতে পারে_ সে ব্যাপারে ব্যাপক পদক্ষেপ নিতে হবে। এককথায় সমাজের নেতৃস্থানীয়দেরকে সমাজের এই দুরূহ সমস্যা দূর করার জন্য এখন অনেক কিছুই করতে হবে। কিন্তু দুঃখের বিষয় হচ্ছে এই যে, তারা অতিমাত্রায় আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়ায়, দেশের চরম সমস্যাগুলির দিক থেকে আশ্চর্যজনকভাবে মুখ ফিরিয়ে রেখেছে।।
