জিজ্ঞাসু:—কিন্তু সাপের বিষের প্রতিষেধক anti-venom তো মানুষের পক্ষে মঙ্গলজনক ?

গুরুমহারাজ:—ওটাকে তো vaccine বলা হয় না ! শরীরে সাপের কামড়ে বিষক্রিয়া হোলে তখন anti venom শরীরে প্রবেশ করানো হয়, যাতে এটা সাপের বিষকে resist করে এবং তাকে ধীরে ধীরে নিষ্ক্রিয় করে দিতে পারে।

vaccination-এর ব্যাপারটা সম্পূর্ণ‌ই আলাদা। যাইহোক, anti venom কিভাবে প্রথম আবিষ্কার হয়েছিল জানো তো— আচ্ছা আমি বলছি শোনো। ইউরোপে অবস্থিত ইউরাল পর্বতমালায় প্রচুর ঘাসবন রয়েছে, ফলে তৃণভোজী প্রাণীদের বেশীর ভাগ প্রজাতি ঐ অঞ্চলে বসবাস করে। কিন্তু কথাতেই আছে Cobra in the grass-bed অর্থাৎ ঘাসের জঙ্গলে বিষধর সাপেরাও বেশী বাস করে। এর কারণ ঘাসবনে কীট-পতঙ্গের সংখ্যার আধিক্য। এই কারণে ঐ অঞ্চলে তৃণভোজী প্রাণীরা প্রচুর সাপের কামড়ে মারা যায়। মানুষ তো সবসময় নতুন নতুন আবিষ্কারের জন্য বনে-জঙ্গলে-পাহাড়ে- সমুদ্রে ইত্যাদি নানান স্থানে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং সবকিছুর মধ্যেই কিছু না কিছু আবিস্কার করা যায় কিনা_ তা লক্ষ্য রাখছে। এইরকমই একদল বিজ্ঞানীর নজরে এলো একটা মজার ব্যাপার ! তারা দেখলো যে, ঘাসের জঙ্গলে অন্যান্য তৃণভোজীদের মতো পাল পাল ঘোড়ারাও ঘুরে বেড়ায় কিন্তু সাপের কামড়ে একটাও ঘোড়া মারা যায় না । তারা এটাও লক্ষ্য করলো যে, বরং ঐ অঞ্চলের ঘোড়ারা অন্যান্য অঞ্চলের ঘোড়া অপেক্ষা যথেষ্ট মজবুত চেহারার । এই ব্যাপারটা ওদেরকে ভাবালো। তারপর তারা ভালো করে অনুসন্ধান করে ওরা দেখলো যে , ঘোড়াদেরকেও সাপে কামড়াচ্ছে কিন্তু ঘোড়ারা শুধু পা টা একবার ঝেড়ে দিয়ে আবার নিশ্চিন্ত মনে ঘাস খাচ্ছে। এইটা দেখে বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে জানতে পারলো যে, সাপের বিষের যে composition তা ঘোড়ার শরীরে ঢুকে protein এর কাজ করছে। অন্যান্য প্রাণীর শরীরেও হয়তো সাপের বিষ protein হিসাবেই যায় কিন্তু সেই সব প্রাণীরা তা গ্রহণ করতে পারে না । বিষের ক্রিয়ায় রক্তের composition ভেঙে যাওয়ায় অন্যান্য প্রাণীরা মারা যায় কিন্তু ঘোড়ারা মারা যায় না। ফলে যত বেশী সংখ্যক সাপে ঘোড়াকে কামড়াচ্ছে ততো বেশী ঘোড়াটি সতেজ হোচ্ছে।

এইবার শুরু হোলো মানুষের নিজের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে ঘোড়ার এই বিশেষ গুণটির জন্য তাকে exploit করার কাজ ! একটা সুস্থ সবল ঘোড়ার শরীরে ৫০ থেকে ১০০ গ্রাম সাপের বিষ inject করে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, এমনিতে ঘোড়া নির্দিষ্ট সময় অন্তর কিছু পরিমাণ সাপের বিষকে digest করতে পারে কিন্তু একসঙ্গে অতটা বিষ তো পারে না। ফলে ঐ বিষ শরীরে ঢোকার পর প্রথমে ঘোড়াটির শরীরে প্রচণ্ড জ্বর আসে এবং তার সারা শরীর কাঁপতে থাকে। তার রক্তের T-cell গুলো দ্রুত B-cell-এ রূপান্তরিত হয়ে যায়। আর ঠিক তখনই ঐ ঘোড়াটির শরীরের সমস্ত রক্ত ইনজেকশন-এর সাহায্যে বের করে নেওয়া হয়। এর ফলে ঘোড়াটি তো অবশ্যই মারা যায় কিন্তু তার দেহের সমগ্র রক্তটাই তখন হয়ে যায় anti-venom ।

এইভাবে একটি ঘোড়া নিজের জীবনকে উৎসর্গ করে শত শত মানুষের জীবনদান করে যায়। যেহেতু সাপের বিষের anti-venom অন্য কোনোভাবে আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি, তাই ঐ সমস্ত ঔষধ অত্যন্ত জরুরি হওয়া সত্ত্বেও _এর control সরকার নিজের হাতেই রেখেছে। কোনো কোম্পানির হাতে দিয়ে দিলে তারা ঐ ধরণের ওষুধের জোগান এতো বাড়িয় দিতো যে , তখন দেখা যেতো প্রত্যেকের বাড়িতেই একশিশি anti-venom রাখা আছে ! আর এই কাজ করতে গিয়ে দেখা যেতো __হয়তো ঘোড়া প্রজাতিটাই শেষ হয়ে যেতো !

তবে দ্যাখো__ আমাদের পৌরাণিক উপাখ্যানে রয়েছে সূর্যের বাহন ঘোড়া। আর এই ঘোড়াগুলির বর্ণ কালো না সাদা_ এই নিয়ে একবার কশ্যপমুনির দুই স্ত্রী কদ্রু ও বিনতার মধ্যে বিতর্ক হয়েছিল। কদ্রু হোচ্ছেন সর্পমাতা এবং বিনতা হোচ্ছেন গরুড় জননী। সাপেরা তার মাকে জেতাবার জন্য সূর্যের বাহন সাদা ঘোড়াগুলির সর্বাঙ্গে এমনভাবে জড়িয়েছিল যাতে দূর থেকে দেখে মনে হয় যে, সূর্যের বাহন ঘোড়া গুলির রং কালো। কিন্তু বিনতা-নন্দন গরুড় আবার সাপেদের শত্রু, তাই সে ওখানে যেতেই তার ভয়ে সাপেরা চলে গেল এবং সাদা ঘোড়া সাদা হিসাবেই পরিলক্ষিত হোলো।

এই হোলো গল্পটা ! কিন্তু এইসব গল্পের মধ্যে অনেক বৈজ্ঞানিক গবেষণার সূত্র লুকিয়ে রয়েছে। পুরাণে রয়েছে কশ্যপ মুনির ৮টি স্ত্রী(কদ্রু-বিণতা…. ইত্যাদি )! শাশ্ত্রে আদিপিতা বলা হয়েছে কশ্যপকে। এখানে দ্যাখো, এই গল্পের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণীকে বিভাজন করা হয়েছে ! যেমন কদ্রু—সৰ্প প্রজাতি, বিনতা—পক্ষী প্রজাতি। আবার মানুষের বিভিন্ন শ্রেণী বোঝাতে দিতির গর্ভজাতরা দৈত্য, অদিতির গর্ভজাতরা দেবতা, দনুর গর্ভজাতরা দানব, সুরমার গর্ভজাতরা রাক্ষস ইত্যাদি। এখানে ‘জাতি’ বলতে প্রকৃতি বা স্বভাবকে বোঝানো হয়েছে। ‘অসুর’ স্বভাবের মানুষ প্রচণ্ড স্বার্থপর, হিংসুটে ! নিজের স্বার্থপূরণের জন্য ওরা যা কিছু করতে পারে ! ‘দানব’ স্বভাবের মানুষ বলতে যারা শরীরে বিশাল, প্রভূত কর্মঠ কিন্তু অসুরের ন্যায় গুণবিশিষ্ট ! ‘রাক্ষস’ বলতে সেই স্বভাবের মানুষ_ যারা বিভিন্ন গুণসম্পন্ন হওয়া সত্ত্বেও অপরের ধন-সম্পত্তি জোর করে অধিগ্রহণ করতে চায়।

যাইহোক, এখানে সাপের বিষের প্রভাবের কথা বলা হোচ্ছিলো_আমরা সেই প্রসঙ্গে ফিরে যাই। সাপের বিষের প্রভাবে বেশিরভাগ প্রাণীদের শরীর নীল বা কালো হয়ে যায় কিন্তু ঘোড়ার যেহেতু তা হয় না, তাই কদ্রু ও বিনতার গল্পে হয়তো ঘোড়া ও সাপের ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছিল।

বর্তমানে প্রথম বিশ্বের দেশগুলি ভারতের প্রাচীন শাস্ত্র বিশেষতঃ বেদ-পুরাণের বিভিন্ন আখ্যানগুলির উপর research করছে। আমি যখন ইউরোপের বিভিন্ন উন্নত দেশগুলি ঘুরছিলাম __তখন দেখেছিলাম প্রায় সমস্ত university-তেই ‘indology-section’ রয়েছে এবং সেখানে ছাত্ররা ছাড়াও বিভিন্ন গবেষণাকারীরাও যোগদান করে। তাছাড়া ওরা বিশেষ বিশেষ ভারতীয় যোগী বা অধ্যাত্ম জগতের মানুষদেরকে আমন্ত্রণ করে ওদের দেশে নিয়ে যায় । তাদের বক্তব্য বা বিভিন্ন বৈদিক সূত্রের ব্যাখ্যা ওরা গভীর মনোযোগের সঙ্গে শোনে এবং লিপিবদ্ধ করে রাখে। আর ইউরোপীয়দের একটা বিশেষ গুণ দেখেছিলাম যে, ওরা যেসব শিক্ষা গ্রহণ করে, তা নিজের জীবনে যোজনা করার চেষ্টা করে অথবা সেইটা নিয়ে গবেষণা করতে লেগে যায়।

যাইহোক, এবার তোমার জিজ্ঞাসার প্রসঙ্গে ফিরে আসি—তুমি যে টিকা বা vaccine-এর কথা বলছিলে ওটার theory আলাদা। ফ্রান্সের Dr. জেনার প্রথম গরুর দেহ থেকে বসন্ত রোগের টিকা আবিষ্কার করেছিলেন। এক্ষেত্রে করা হয় কি জানো __যে রোগের vaccine তৈরী করা হবে, প্রথমে সেই রোগের germ গরু-ভেড়া বা নিম্নতর কোনো প্রাণীর শরীরে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। তারপর সেই প্রাণীটি প্রথমে ঐ রোগে আক্রান্ত হয়, এরপর তার সেই অসুস্থ শরীরের germ সংগ্রহ করে রাখা হয়। ঐটিই প্রয়োজনমতো বা পরিমাণমতো মানুষের শরীরে antigen হিসাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যা শরীরে গিয়ে antibody তৈরি করে এবং শরীরে ঐ রোগ-প্রতিষেধক ক্ষমতা বা immunity বাড়িয়ে তোলে। এটাই বিজ্ঞান _বুঝতে পারলে কি ব্যাপারটা!!!