গুরুমহারাজ:—তা আবার চড়বো না কেন ? এ জন্মে হয়তো আনুষ্ঠানিকভাবে সেভাবে ঘোড়ায় চড়া শেখা হয়নি কিন্তু আমার তো পূর্ব পূর্ব জন্মের ঘোড়ায় চাপার সংস্কার রয়েছে, ফলে এই শরীরে প্রথম যখন ঘোড়ায় চড়লাম কোনো অসুবিধাই হয় নি। একটা মজার ঘটনা ঘটেছিল অমরনাথ যাত্রার সময়। সেবার আমাদের সাথে উত্তরভারতের কিছু ভক্ত ছিল। অমরনাথ যাত্রা যথেষ্ট tough journey –তাছাড়া সঙ্গের লোকেরা বেশিরভাগই বয়স্ক, তাই ঘোড়া ভাড়া করা হোলো ! আমরা পড়ে যেতে পারি—এই ভয়ে ঘোড়ার মালিকেরা তো ঘোড়ার সামনে লাগাম ধরে ধরে ঘোড়াকে হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে যেতে শুরু করলো। আর আমাদের মধ্যে যিনি সব চাইতে বয়স্কা মাতাজী ছিলেন—সেইটাতে মালিক নিজেও চাপলো, যাতে মাতাজীকে নিরাপত্তার কোনো খামতি না হয়। কিন্তু হোলো কি জানো__কিছুক্ষণ চলার পরেই কোনো অজ্ঞাত কারণে ওরা দুজনেই ঘোড়া থেকে একেবারে মাটিতে পড়ে গেল ! এতে মাতাজী কিছুটা আঘাতও পেয়েছিলেন। এরপরে অবশ্য আর কোনরকম অঘটন ঘটে নি।
অমরনাথ দর্শন করে ফেরার পথে আমি মালিকের সাথে নানান প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করে দিলাম। একথা ওকথা বলতে বলতেই ওর ঘোড়াগুলির মধ্যে যেটা সবচাইতে ভালো__ সড়াক্ করে লাফ দিয়ে সেই ঘোড়াটার পিঠে বসেই লাগামের বাড়ী সাঁই সাঁই করে দু-ঘা লাগিয়ে দিলাম ঘোড়াটার শরীরে ! আর যায় কোথায় !! আচমকা ঘা খেয়েই ঘোড়া তো তীরবেগে ছুটতে লাগলো সামনের দিকে !
পাহাড়ি দুর্গম পথ আর তার উপর আনাড়ী সওয়ার__ সওয়ারের যা হয় হোক, ঘোড়ার কথা ভেবে সেই ঘোড়ার মালিকের তখন কি সঙ্গিন অবস্থা হয়েছিল ভাবো একবার ! সেদিন পুরো রাস্তা ঘোড়া ছুটিয়ে নিচে নেমে এসেছিলাম । ওদের আস্তানায় পৌঁছানোর বেশ কয়েক ঘণ্টা পর তবে বাকিরা সেখানে এসে পৌঁছেছিলো।
যেহেতু আমি পুরো রাস্তাটা ঐ ঘোড়াকে ছুটিয়ে নিয়ে এসেছিলাম_ তাই ও এসে ঘোড়াটাকে আগে ভালো করে পর্যবেক্ষন করে দেখতে লাগলো। আসলে ঐ ঘোড়াটির মুখ থেকে প্রচণ্ডভাবে ফেনা ঝরার চিহ্ন ছিল __সেটা ও ধরে ফেললো। তারপর লোকটি ঘোড়াটির কতো বড় ক্ষতি হোতে পারতো_সেটা নিয়ে আমাকে দু-চার কথা শুনিয়েও দিয়েছিল।
আমাদের আশ্রমের ভক্তরা(যারা সেই দিন অমরনাথের যাত্রি ছিল)আমাকে ভালোমতোই চেনে, তবু ওরাও এক অজানা আশঙ্কার মধ্যে ছিল_’গুরুজীর আবার কিছু বিপদ হয়ে গেল না তো !’। সকলে ফেরার পর আমাকে সুস্থ দেখে ওরাও আশ্বস্ত হয়েছিল।
ঘোড়া ছোটানোর বিভিন্ন কৌশল রয়েছে। শুধু লাগাম আর চাবুকের উপর ঘোড়া ছোটানো নির্ভর করে না। এক এক রকম ঘোড়া ছোটানোর এক এক রকম কায়দা আছে। ঘোড়া ‘কদমে’ ছুটতে পারে, ‘গ্যালপ’ করতে পারে, আবার রেসের ঘোড়ার মত প্রচণ্ড গতিবেগেও ছুটতে পারে। সওয়ার কেমন ভাবে যেতে চায় সেই অনুযায়ী ঘোড়াকে treat করতে হবে—অন্যথায় ঘোড়া confused হয়ে যাবে। ঘোড়ার বেশী speed আনতে চাইলে পায়ের গোড়ালিদুটো দিয়ে দুদিকের পেটে ঘন ঘন টোকা মারতে হয়। আর সওয়ারিকে মেরুদও ঝুঁকিয়ে ঘোড়ার পিঠের সঙ্গে নিজের বুক লাগিয়ে দিতে হয় তাহলেই ঘোড়া বুঝতে পেরে high speed তোলে। ওস্তাদ সওয়ার যারা, তারা ঘোড়াকে নিজের মতো করে তৈরী করে নেয়। শিবাজীর ঘোড়া বা রাণা প্রতাপ সিংহে-র ঘোড়াকে নিয়ে কত গল্প তৈরী হয়েছে। ইতিহাসে সেসব কথা লিপিবদ্ধ রয়েছে। যাই হোক, আর এই প্রসঙ্গে আর কথা হবে না। ‘অথ ঘোটক প্রসঙ্গ’— সমাপ্ত।।
