[ রামায়ণের কাহিনী নিয়ে আলোচনা হোচ্ছিলো, আজ সেই আলোচনার শেষাংশ]

…. যুক্তিভিত্তিক, বৈজ্ঞানিক এবং বিচারভিত্তিক যে কোনো গবেষণায় রামায়ণের সকল ঘটনারই সত্যতা প্রমাণ করা যায়। এখন(১৯৯০-৯১সাল) T.V-তে. রামায়ণ খুব জনপ্রিয় serial হওয়ায় রামায়ণ নিয়ে অনেকেই জিজ্ঞাসা করছে ! দেখছি তো মানুষের মধ্যে রামায়ণের খুবই প্রভাব পড়েছে । বিশেষতঃ ছোটো ছোটো বাচ্ছাদের মধ্যে হনুমানের প্রভাব পড়েছে বেশী। এদিকে দ্যাখো ব্যবসাদারদের বুদ্ধি—তারা বাচ্ছাদের সাইকোলজি বুঝে ব্যাপকভাবে প্লাষ্টিকের গদার production শুরু করে দিয়েছে ! আর শিশুরা কিনছেও খুব, শহরে তুমি এমন শিশু পাবে না যার একটা বা দুটো গদা নাই !

রামের “হরধনু” ভঙ্গ নিয়েও খুব বিতর্ক হোচ্ছে আজকাল__’হরধনুর এমন কি রহস্য যে, তৎকালীন অত বড় বড় বীরেরা ঐ জিনিসটা তুলতেই পারলো না এবং যা রামচন্দ্র এক হাতে তুলে নিলেন ! আর শুধু তুলেই নিলেন না, আবার তা অনায়াসে ভেঙেও ফেললেন !

এখানে রহস্যটা কি জানোতো—রাজা জনক তৎকালীন বিজ্ঞানীদের সহায়তায় একটা শক্তিশালী magnetic field-এর উপর ইস্পাতের ধনুকাকৃতি দণ্ডটি স্থাপন করেছিলেন। মানুষের শক্তি বা সামর্থ্য maximum যতটা হোতে পারে, তার থেকেও ঐ strong magnetic field-এর শক্তি অনেক বেশী ছিল। ফলে, কোনো মানুষের পক্ষেই সরাসরি টান মেরে ধনুকটি তোলা সম্ভব ছিল না। শ্রীরামচন্দ্র ধনুক স্থাপনের এই বিজ্ঞানটা বিশ্বামিত্রের কাছ থেকে জেনে নিয়েছিলেন। তারপর উনি ধনুকটিকে সরাসরি না তোলার চেষ্টা না করে_ ওইটা যে field বরাবর রাখা ছিল সেই সেই direction টা প্রথমে ঘুরিয়ে দিলেন। এর ফলে কি হোলো__ঐ ধনুকটির উপরে magnetic force আর ক্রিয়াশীল থাকলো না ! তখন রাম অনায়াসে বাঁ হাতে ধনুকটি তুলে উপরে তুলে ধরতে পেরেছিলেন।

পরশুরামের সঙ্গেও রামচন্দ্রের ধনুক নিয়ে এইরকমই একটা scientific ঘটনার মোকাবিলা হয়েছিল–সেখানেও রামচন্দ্র ই জয়লাভ করেছিলেন। আসলে ব্যাপারটা কি জানো __রামায়ণে রয়েছে পরশুরামের মধ্যে ১২ কলার প্রকাশ ছিল কিন্তু রামচন্দ্র ছিলেন ১৪ কলায় প্রকাশিত ! ফলে জ্ঞান-বিজ্ঞানসহ যে কোনো কলাশক্তির প্রকাশ পরশুরামের থেকেও রামচন্দ্রের মধ্যে অধিকতর প্রকাশ ছিল।

লক্ষ্মণও বিভিন্ন রকমের field তৈরীর বিজ্ঞান জানতেন। মারীচের মায়াবী মায়ায় সোনার হরিণ ধরার জন্য রামচন্দ্র জঙ্গলে গিয়ে ফিরতে দেরি করছিলেন দেখে সীতার অন্তরে স্বামীর জন্য আশঙ্কা জেগেছিল। তাঁর কাতর অনুনয়ে লক্ষ্মণ যখন সীতাকে একা রেখে দণ্ডকারণ্যের জঙ্গলে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন সীতার চারিদিকে তিনি এমন এক গণ্ডী(field)দিয়েছিলেন যেটার মধ্যে থেকে বেরোনো যায় কিন্তু ঢোকা যায় না ! হিমালয়ে এমন ৭টা point আছে যেখানে এখনও এইরূপ field রয়েছে ! ঐসব স্থানে কখনোই কোনো সাধারণ মানুষ প্রবেশ করতে পারবে না ! কিন্তু যারা এই field-এর অভ্যন্তরে রয়েছে,ন তাঁরা ইচ্ছামতো বাইরে বেরিয়ে আসতে পারবেন। বর্তমানে আমেরিকা বা ইউরোপের উন্নত দেশগুলি বিভিন্ন security-র ক্ষেত্রে এইধরণের system চালু করার চেষ্টা করছে।

রামচন্দ্রের চার ভাই-এর জন্মের মূলে ছিল ছিল যজ্ঞের চরু। এটা একটা উন্নত মন্ত্ৰ-বিজ্ঞান, যেখানে কয়েকজন ঋষি সংকল্প করে কয়েকদিন ধরে হবন করেছিলেন এবং যজ্ঞ থেকে উদ্ভূত চরু(এক ধরণের মন্ড জাতীয় খাদ্য) রাণীদের দু’ভাগ করে খেতে দিয়েছিলেন। এইবার ঘটনা ঘটেছিল কি__ ওই দুইভাগ চরু কৌশল্যা ও কৈকেয়ী সমান ভাবে না খেয়ে ওঁরা আবার নিজেদের ভাগ থেকে একটু একটু করে সুমিত্রাকে দিয়েছিলেন। ফলে কৌশল্যা ও কৈকেয়ীর একটি করে সন্তান হয়েছিল কিন্তু সুমিত্রার সন্তান হয়েছিল দুটি। আরও মজার ব্যাপার হোলো এই যে, ছেলেরা বড় হবার পরই লক্ষ্মণ রামের অনুগত হোলো এবং শত্রুঘ্ন হোলো ভরতের অনুগত। লক্ষ্মণ অগ্রজ রামের এতোই অনুগত ছিলেন যে, জীবনে কখোনই ভ্রাতৃ-আজ্ঞা লঙ্ঘন করেননি। শুধু একবারই করেছিলেন–ঐ যে বলছিলাম সীতাহরণের সময় ! তাও সীতার কাতর অনুনয়ে বা বলা যায় তার বাক্যবাণে অতিষ্ঠ হয়ে_তাঁকে এই কাজ করতে হয়েছিল। শাশ্ত্রে একে ‘স্ত্রী হঠ’ বলা হয়েছে । যোগের ভাষায়- ‘বাল হঠ’, ‘স্ত্রী হঠ’ এবং ‘রাজ হঠ’ নামে তিন প্রকার হঠ রয়েছে। এর মধ্যে ‘স্ত্রী হঠ’ বড় সাংঘাতিক। নারীর যদি একবার জিদ চাপে তো সেকাজ না করে সে ছাড়বে না। ছলে-বলে-কৌশলে সেই কাজ করবেই করবে। কোনো স্ত্রীলোক হয়তো joint family-তে থাকার সময় কুঁড়ের মতো সময় কাটাতো, সংসারের কাজ করতেই চাইতো না__ শরীর খারাপের অজুহাতে রান্না-বান্না ইত্যাদি কোনোরূপ গৃহকর্ম‌ই করতো না। সেই স্ত্রী-ই স্বামীকে জপিয়ে-যাপিয়ে সংসার থেকে যখন পৃথক হয়ে গেল _তখন দেখা যায় যে, নতুন সংসারের সব কাজ ঐ মেয়েটি নিজের হাতে করছে ! স্বামী হয়তো কাজের লোক-রান্নার লোক রাখতে চাইছে কিন্তু বাজে খরচ বাঁচাতে ঐ স্ত্রীই সব কাজ একা হাতে করছে —সারাদিনে দশ-বারো ঘণ্টা খাটছে ! এমন বহু নিদর্শন খুঁজলে তোমরা সমাজে হামেশাই দেখতে পাবে।
যাইহোক, বনবাসকালে সীতাকে সাথে নিয়ে গিয়ে রামচন্দ্রকে নানান ঝামেলায় পড়তে হয়েছিল বলেই প্রবাদবাক্য তৈরী হয়েছে— “পথে নারী বিবর্জিতা”। এখন অবশ্য দিনকাল বদলেছে, মেয়েরা কর্মক্ষেত্রে পুরুষের সঙ্গে সমান তালে এগিয়ে এসেছে, ফলে এখন আর এসব প্রবাদবাক্য অচল। তবু প্রাচীনকালে এইসব অনেক কান্ড ঘটেছিল–তাই বিভিন্ন প্রবাদবাক্য তৈরি হয়েছিল।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া বিশাল বিশাল যুদ্ধ বা শহর-নগর ধ্বংসের পিছনে নেপথ্যচারিণী হিসাবে রয়ে গিয়েছে কোনো না কোনো নারী ! রামায়ণের কাহিনীতে দেখা যায়__ সীতার জন্য‌ই লঙ্কাকাণ্ড হয়ে গেল ! কত লোক মারা পড়লো, সোনার লঙ্কাপুরী শ্মশানে পরিণত হোলো। মহাভারতের যুদ্ধ বা কুরুক্ষেত্র হবার পিছনেও ছিল দ্রৌপদীর ‘স্ত্রী হঠ’। গ্রীক পুরাণ ইলিয়াড-ওডিসি অনুযায়ী পাওয়া যায় Helen of Troy-এর কাহিনী ! ঐ মহাকাব্যের নায়িকা ছিল ‘হেলেন’–যাকে কেন্দ্র করেই ট্রয়ের যুদ্ধ হয়েছিল। ইসলাম ধর্মে মুসলমানরা যে ‘মহরম’ অনুষ্ঠান পালন করে কারবালার যুদ্ধকে স্মরণ করে—তারও নেপথ্যে ছিল এক নারী। আলির বংশধর এজিদ এবং হজরতের আদরের নাতি ছিল হাসান ও হোসেন ! এইবার এদের মধ্যে খলিফার পদ বা আরব দুনিয়ার শাসনকর্তা কে হবে এই নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দিয়েছিল। বংশানুক্রমিকভাবে আলির পর এজিদের রাজা হবার কথা, কিন্তু হজরতের কোলে-পিঠে মানুষ হওয়া হাসান বা হোসেনের প্রতিও ওখানকার তৎকালীন মানুষের দুর্বলতা কম ছিল না। এদিকে একটি নারীকে এজিদ এবং হাসান উভয়েই সমানভাবে ভালোবাসতো। হাসান রাজা হয়েই সেই নারীটিকে বিবাহ করে বসলো ! ব্যস্- ষড়যন্ত্রের বীজ তখন থেকেই বপন হয়ে গেল ! কিছুদিনের মধ্যেই সেই নারীর দ্বারা বিষপ্রয়োগে হাসানের মৃত্যু হয়েছিলো। আর হোসেনকে সুযোগ বুঝে কারবালার মরুপ্রান্তরে ১৪ দিন অবরোধ করে রেখেছিল এজিদ ! নিদারুণ জলকষ্টে সবান্ধবে মারা গিয়েছিল হোসেন। কথিত আছে শেষ মুহূর্তে নদীর পানি স্পর্শ করতে পেরেছিল হোসেন এবং জলের মধ্যেই হোসেন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছিল।