জিজ্ঞাসু:—খাদ্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে আমিষ ও নিরামিষ খাদ্যের বিচার কিভাবে হবে ?

গুরুমহারাজ:—দ্যাখো, ভারতবর্ষে ‘আমিষ’ ও ‘নিরামিষ’–এই শব্দদুটি ব্যবহার হোচ্ছে মহাবীর জৈন-এর পর থেকে। ‘আমিষ’- অর্থে প্রাণিজ খাদ্য অর্থাৎ অ্যাসিড প্রধান খাদ্য এবং ‘নিরামিষ’- অর্থে উদ্ভিজ্জ খাদ্য অর্থাৎ ক্ষারপ্রধান খাদ্য। বিভিন্ন ফল-মূলে যে মৃদু অ্যাসিড রয়েছে সেগুলো মানবশরীরে ক্ষতি না করে বরং উপকার করে । তাই এগুলি নিরামিষ খাদ্য হিসাবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু প্রাণিজ খাদ্যে Uric acid থাকায় তা মানব শরীরে খুবই ক্ষতিসাধন করে।

বৈদিক চিন্তা বা খাদ্য সম্বন্ধে আর্য ঋষিদের চিন্তা ছিল আরও ব্যাপক এবং বিজ্ঞানসম্মত। তাঁরা মানুষের গ্রহণযোগ্য খাদ্যবস্তুকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছিলেন – সাত্ত্বিক, রাজসিক ও তামসিক খাদ্য। যে কোনো খাদ্য —তার বর্ণ, স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে গ্রহণ করা গেলে তাকেই বলা যায় সাত্ত্বিক খাদ্য। যদি সেই খাদ্যের সাথে এক বা একাধিক reagent(অর্থাৎ তেল,ঝাল, মশলা, মিষ্টি ইত্যাদি)যখন মেশানো হয় এবং খাদ্যকে উগ্র করা হয় তখন তাকে বলা হয় রাজসিক খাদ্য। আর কোনো খাদ্যকে পচা, বাসী করে বা বিকৃত করে খেলে—তাকে বলা হয় তামসিক খাদ্য। উদাহরণ হিসাবে বলা যায় যেমন __ভাত সাত্ত্বিক খাদ্য, পরমান্ন বা পায়েস রাজসিক খাদ্য আর পান্তাভাত তামসিক খাদ্য।

প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিতে সবকিছুই তিন প্রকার(সত্ত্ব,রজঃ,তমঃ)-এর হয়ে থাকে। সেই অর্থে মানুষও তিন প্রকারের রয়েছে—সাত্ত্বিক প্রকৃতির, রাজসিক প্রকৃতির ও তামসিক প্রকৃতির মানুষ। সাত্ত্বিক প্রকৃতির মানুষ সাত্ত্বিক আহার গ্রহণ করলে তবেই তার পক্ষে মঙ্গল হবে। রাজসিক প্রকৃতির মানুষের রাজসিক প্রকৃতির আহার গ্রহণ করার প্রবণতা থাকলেও_ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে যদি সাত্ত্বিক প্রকৃতির আহার গ্রহণ করে তবে তার শরীর ঠিক থাকবে। তামসিক প্রকৃতির লোকেরা তামসিক প্রকৃতির খাদ্যই পছন্দ করে বেশী, কিন্তু তাদেরও স্বভাব বা প্রকৃতি পরিবর্তন কোরে খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন করতে হবে, না হোলে প্রৌঢ় থেকে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত নানান ক্ষয়জাতীয় ব্যাধি অর্থাৎ যক্ষ্মা, কুষ্ঠ,ক্যান্সার ইত্যাদিতে ভূগতে হবে।

কথা হোচ্ছে এক-একটা দেশের আবহাওয়া বা জলবায়ু এবং সেই দেশের উৎপন্ন ফসল অনুযায়ী সেই দেশের খাদ্য নির্ধারিত হয়ে থাকে। ভারতবর্ষ হোচ্ছে Tropical country বা উষ্ণপ্রধান দেশ। তাই এই দেশের সাধারণ খাদ্য হওয়া উচিত সাত্ত্বিক প্রকৃতির। এতে দেশবাসীর শরীর যেমন সুস্থ থাকবে তেমনি মনও শুদ্ধ চিন্তার অধিকারী হবে। শারীরিক এবং মানসিকভাবে সুস্থ মানুষকে নিয়ে যে সমাজ গঠিত হয় সেই সমাজের অগ্রগতি কোনোদিন কেউ রুদ্ধ করতে পারে না।
মাছ, মাংস ইত্যাদি খাদ্য নিয়ে সমাজে কচকচি হয় সবচেয়ে বেশী। যে কোনো সাত্ত্বিক মানুষ প্রয়োজন অনুযায়ী মাংস খেতে পারে, তবে দেখতে হবে মাংস যেন সুসিদ্ধ হয় কারণ যে কোনো প্রোটিনজাতীয় খাদ্য সুসিদ্ধ না হোলে তার উপাদানগুলো শরীর নিতে পারে না। এইজন্য ডালজাতীয় খাদ্যকেও সুসিদ্ধ করে তবেই খেতে হয়। কারণ ডালজাতীয় শস্য সুসিদ্ধ বা অঙ্কুরিত করে না খেলে_শরীর এর থেকে প্রোটিন গ্রহণ করতে পারে না _পায়খানার সাথে বেড়িয়ে যায়।

যাই হোক, মাংসের বর্ণ-স্বাদ ও পুষ্টিগুণ অক্ষুণ্ণ রেখে রান্না করে খেলে শরীরের ক্ষতি হয় না। মাংস রান্না করার আগে দই বা কাঁচা পেঁপেবাঁটা ১৫/২০ মিনিট এর সঙ্গে মাখিয়ে রেখে দিলে মাংসের Uric acid নষ্ট হয়ে যায়, ফলে ঐ মাংস রান্না করে খেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তবে তেল, ঝাল, মশলাযুক্ত করে মুখের স্বাদ করতে গিয়ে মাংসের বর্ণ, স্বাদ, পুষ্টিগুণ নষ্ট করে ফেললে পুরো খাদ্যটাই তখন অখাদ্য ও শরীরের পক্ষে ক্ষতিকারক হয়ে যায়। মাছ রান্না করলে কাটা মাছের সঙ্গে নুন আর হলুদ ১৫/২০ মিনিট মাখিয়ে রাখতে হয়, তাহলেই মাছের Uric acid-এর অনেকাংশ নষ্ট হয়ে যায়‌। এরপর ঐ মাছ রান্না করে খেলে শরীরের বিশেষ ক্ষতি হয় না। ডিমের Uric – acid নষ্ট করে দুধ। তাই ডিম খেলে দুধ খেতে হয় । তবে রাত্রে ডিম, মাছ, মাংস_এসব না খাওয়াই ভালো। তবে সাত্ত্বিক স্বভাবের মানুষ বা যারা শারীরিক পরিশ্রম কম করে শুধু মস্তিষ্কেরই কাজ বেশী করে, তারা সর্বদা সাত্ত্বিক খাবার খাবে—এতেই তাদের মঙ্গল। তাদের প্রাণিজ প্রোটিন গ্রহণের কোনো প্রয়োজন নাই। যারা শারীরিক পরিশ্রম বেশী করে তারা প্রাণিজ প্রোটিন ও উদ্ভিজ্জ প্রোটিন উভয়ই গ্রহণ করতে পারে কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে _যেন প্রস্তুতির পদ্ধতিটি ঠিক থাকে। তামসিক খাদ্যের মধ্যে একমাত্র দইটি ব্যতিক্রমী, এটা সকলপ্রকার মানুষ খেতে পারে(অবশ্যই শরীরে সহ্য হোলে) কারণ এটি সকল প্রকার খাদ্যের balance রাখে। তাছাড়া মস্তিষ্ককোষের উপর দ‌ই-এর একটি বিশেষ ক্রিয়া আছে যা অন্য কোনো খাদ্যে নেই। এটি বুদ্ধি বিকাশে সাহায্য করে, তাই ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য দই মঙ্গলজনক। দই-এর অভাবে কপালে দই-এর ফোঁটা দেবার বিধি হয়ত এইজন্যই কোনো সময় আমাদের চালু হয়েছিল।

খাদ্যের ব্যাপারে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বা স্বামী বিবেকানন্দের কোনো সংস্কার ছিল না, আমারও নেই। যার যা প্রকৃতি আর সর্বোপরি যার পেটে যা সয় তার পক্ষে সেই খাদ্য গ্রহণ করাই ভালো_এটা আমি জানি। জোর করে খাদ্যের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করতে গিয়ে দেখা যায় আখেরে সুফল না হয়ে কুফলই হয়ে থাকে। আজকাল বাজারে নিরামিষ চপ, কাটলেট পাওয়া যাচ্ছে। এগুলি আমিষ আহারের নকল নয়কি ? এসব করার চেয়ে সত্যিকারের চপ-কাটলেট খেয়ে শখটা মিটিয়ে নেওয়া ভালো। তারপর নাহয় খাদ্যে সংযম দেখানো যাবে !

তবে সব চাইতে মজার ব্যাপার কি জানো __অনেকে আছে যারা এই জন্মে নিরামিষাশী হয়ে আমিষাশীদের নিন্দা করছে— হয়তো নিরামিষের সপক্ষে lecture দিচ্ছে _article লিখছে ! সেই ব্যক্তিই হয়তো আবার পরের জন্মে খুব করে আমিষ খাবে, আমিষের সপক্ষে কথা বলছে __অজ্ঞান অন্ধকারে থাকা মানবের এ কি দুর্ভোগ বলোতো ?

মানবজীবনে অগ্রগতির অন্যতম উদ্দেশ্য হোলো আহার এবং বিহারে সংযম আনা । কিন্তু সেইটার জন্য অপরের সাথে বিরোধ করতে হবে কেন ? সাধন-ভজনের দ্বারা যখন মানবের চেতনা উন্নত হবে, সে আপনা-আপনিই খাদ্যের ব্যাপারে সংযত হবে।

উন্নত মানব _যেন গাছের পাকা ফলটি ! সুপক্ক ফল বৃক্ষ থেকে আপনিই খসে পড়ে যায়–জোর করে ছিঁড়তে হয় না! তেমনি জোর করে কারুকেই জ্ঞানী বা যোগী করা যায় না । সেইজন্যই আমি তোমাদেরকে বলি _ মানুষের মধ্যে কি ঢুকছে সেটা বড় কথা নয়, তার মধ্যে থেকে কি বেরোচ্ছে সেটাই বড় কথা।

গরু-শুয়োর খেয়েও যদি কেউ সৎ-সুন্দর,-নিষ্কপট হয়, মানবসমাজে সেই ধন্য, সেই গ্রহণীয়। কিন্তু যদি কারও হবিষ্যান্ন খেয়েও কাম-কাঞ্চনে সর্বদা মতি থাকে, কি করে অপরের ক্ষতি করবে এই চিন্তায় মত্ত থাকে__ কি হবে তেমন কোনো ব্যক্তিকে নিয়ে? নরেন্দ্রনাথ তৎকালে পীর মহম্মদের দোকানে খাওয়া-দাওয়া করতে যেতো। কেউ কেউ এই নিয়ে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে complain করেছিল। তার উত্তরে ঠাকুর বলেছিলেন, “দ্যাখ্, চড়াই পাখি কলাই-কাঁকর খায় কিন্তু দিনে ৮০ বার রমণ করে, আর সিংহ মাংস খেয়েই জীবনধারণ করে কিন্তু ১২ বছরে একবার রমণ করে।” অনেকে নিরামিষাশীর শক্তি বোঝাতে হাতি-ঘোড়ার উদাহরণ টানেন কিন্তু এটা ঠিক নয়। কারণ মানুষের সাথে কোনো পশু-পাখীর তুলনা চলে না। মানুষের তুলনা করা যেতে পারে অন্য কোনো মানুষের সঙ্গে। মানুষ অন্যান্য পশু-পাখীর কাছ থেকে শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে, কিন্তু তাদের সাথে তুলনীয় হোতে পারে না। তাছাড়া গায়ের জোর দিয়ে মানুষের কোনো ভালো দিকেরই বিচার হয় না। উন্নত ঘোড়া বলতে শক্তিশালী, টগবগে ঘোড়াকে বোঝায়। কিন্তু উন্নত মানুষ বলতে কখনোই কোনো শক্তিশালী, তাগড়াই চেহারার মানুষকে বোঝায় না। মানুষ উন্নত হয় তার উন্নত চিন্তার জন্য— গায়ের শক্তির জন্য নয়। সুতরাং খাদ্যগ্রহণ বা অন্যান্য ক্ষেত্রে কোনো পশুর সঙ্গে মানুষের মিলবে না। মানুষ তার উন্নত চিন্তার সহায়ক বা উন্নত জীবন-যাপনের সহায়ক – সর্বোপরি তার স্বাস্থ্যের সহায়ক যে কোনো খাদ্যই সঠিকভাবে processing (প্রক্রিয়াকরণ) করে খাক না _তাতে কোন ক্ষতি নাই।।