গুরুমহারাজ:–দ্যাখো, এগুলো সামাজিক সমস্যা ! আর পৃথিবী সমস্যামুক্ত কখনোই হবে না। এমনটা যদি হয়ও কখনো, তখন দেখা যাবে পৃথিবীর ১০০ ভাগ মানুষই আধ্যাত্মিক হয়ে গেছে। আধ্যাত্মিক দৃষ্টিতে নারী-পুরুষ কেন, কোনো কিছুরই ভেদ-বোধ থাকে না ! ফলে এইসব অত্যাচার-অনাচারের কোনো প্রশ্নই সেখানে আসে না। কিন্তু সমাজের সাধারণ মানুষের কাছে এগুলো সমস্যা।
ইংরাজীতে একটা কথা আছে Might is right বা “বীর ভোগ্যা বসুন্ধরা”। প্রাকৃতিকভাবেই নারীরা পুরুষের থেকে পেশীগতভাবে শক্তির দিক থেকে দুর্বল, অন্যান্য সমস্ত ব্যাপারে কিন্তু নারীরা পুরুষের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। একটা কথা প্রত্যেকটা নারীই জানে__আর সেটা হোলো ‘পুরুষের কোথায় দুর্বলতা’ ! কিন্তু শারীরিক-বল(শক্তি)কম হওয়ার জন্যই প্রায় সমস্ত দেশের নারীরাই পুরুষদের দ্বারা dominated হয়েছে। ইউরোপ বা আমেরিকার আইন-ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় নারীরা স্বাধীনতা অনেক বেশী পায়, তাই বলে মনে করো না ওখানেও নারীরা পুরুষের সমান অধিকার পায়–তা পায় না।
যাই হোক, তুমি যে বলছিলে_ আজকাল সমাজে নারীরা নির্যাতিত হয় বেশী__ এই তথ্য ভুল! আজকের সমাজেই শুধু নয়, বহুকাল পূর্ব থেকেই সমাজে নারীরা অত্যাচারিত হয়ে আসছে। হয়তো আগেকার দিনে media কম ছিল, যোগাযোগ ব্যবস্থা ঠিকমতো ছিল না অর্থাৎ সমস্ত ঘটনা সমাজের সকলের চোখে তুলে ধরার উন্নত ব্যবস্থা ছিল না_ তাই মানুষ অসংখ্য ঘটনা জানতে পারতো না। এখন বিভিন্ন সংবাদপত্রের রিপোর্টাররা ক্যামেরা নিয়ে গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়, বস্তিতে, জলে-জঙ্গলে হাজির হয়ে যাচ্ছে। লক্ষ লক্ষ মানুষ এখন এইসব media-র পরিষেবার অন্তর্গত হয়ে গেছে। এক অর্থে গোটা পৃথিবীর মানুষই cable TV পরিষেবা বা Internet পরিষেবার সুযোগ-সুবিধা প্রাপ্ত হোচ্ছে। তাই তোমরা ভাবছো হয়তো এইসব অপরাধমূলক কাজ আজকাল বেশী হোচ্ছে। কিন্তু তা নয়। পূর্বেও খুবই হয়েছে কিন্তু সব ঘটনা মানুষের গোচরীভূত হয়নি—এই যা তফাৎ !
তবে আমি কিন্তু সমাজে দুটি চিত্রই দেখতে পাই, শুধু যে পুরুষদের দ্বারা নারী-নির্যাতন হয় তা নয়, স্ত্রীদের দ্বারা পুরুষরাও নির্যাতিত কম কিছু হয় না। এই তো কিছুদিন আগে দিল্লীর বোটক্লাবে এই নিয়ে ‘পত্নী-নির্যাতন-সমিতি’ একটা সমাবেশ করেছিল। ওদের সদস্যসংখ্যাও নাকি অনেক, তাই গত সন্মেলনে ওরা এটাই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, আগামীতে যাতে আরও বাড়ে তার জন্য ওরা আরও মিটিং- মিছিল ইত্যাদি করবে এবং পত্নীদের বিরুদ্ধে আরও কড়া আইনি ব্যবস্থা যাতে নিতে পারে তার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে দরবার করবে। আসলে এইসব ব্যাপারগুলো কি বলোতো—সমাজের বেশিরভাগ মানুষ(পুরুষ এবং নারী)-ই তো অসহজ বা বিকৃত। এইবার এই বিকৃত পুরুষেরা কোথাও নারীদের উপর নির্যাতন চালায়, আবার বিকৃত নারীরা কোথাও সুযোগমতো অসহায়-দুর্বল-বৃদ্ধ-বেকার স্বামীদের উপর উৎপীড়ন-অত্যাচার করে থাকে।
তাহলে এই সবের প্রতিবিধান কি আন্দোলন করে কখনই সম্ভব হবে ! এর প্রতিবিধান ঘটবে একমাত্র সকল মানুষের বিবেকের জাগরণ ঘটলে। বিবেক জাগ্রত হোলে নারী-পুরুষ কেউ কখনই অত্যাচারিত হবে না। একের অসম্পূর্ণতা-অক্ষমতা অন্যজন মেনে নেবে, হজম করে নেবে কিন্তু কখনোই অশান্তি করবে না।
তবে faminist-রা বা নারীদের দ্বারা অত্যাচারিত পুরুষেরা আন্দোলন করে তাদের নিজ নিজ সংগঠনের সদস্যসংখ্যা যদি প্রচুর বাড়াতে পারে _তাহলে কোনো না কোনো Political party (রাজনৈতিক দল) এদের take up করার চেষ্টা করবে। প্রথমে তারা এদেরকে মদত দেবে তারপর তাদের দলের একটা wing হিসাবে এদেরকে কাজে লাগাবে–এইভাবেই নেতারা বিভিন্ন ছোটো ছোটো সংগঠনকে কাজে লাগায় । বর্তমান রাজনৈতিক নেতাদের তো প্রয়োজন ভোট, কাজেই কোন আন্দোলন নৈতিক আর কোনটা অনৈতিক _ এটা ওরা দেখে না। যেখানে বিশাল জন সমর্থন রয়েছে ওরা সেটাকেই support করে।
যাই হোক, অত্যাচারিত পুরুষদের কথা যা বলছিলাম __বেকার-অসুস্থ-অসমর্থ স্বামীরা অনেক ক্ষেত্রেই স্ত্রীদের দ্বারা লাঞ্ছিত হয়। তাছাড়া প্রকৃতি অনুযায়ী বেশীর ভাগ স্ত্রীলোকই ঈর্ষাপরায়ণ হয়। অপর একটি নারীর স্বামী কতো বেশী রোজগার করে, সে তার বউ-এর জন্য কত দামী কাপড়-গয়না-আসবাব কিনে দেয়, তাদের কত status —এই সব নানান গঞ্জনা উঠতে-বসতে শুনতে হয় একটু কম রোজগার করা স্বামীদের! একথাটা কিন্তু তোমরা অস্বীকার করতে পারবে না, কথাটা অপ্রিয় হোলেও সামাজিকভাবে সত্য। প্রতিদিন এই একই অত্যাচার চলতে থাকলে
পরবর্তীকালে এটাই অসহ্য হয়ে ওঠে সেই স্বামীর পক্ষে । আর তখনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে লেগে যায় “তেরে কেটে তাক্”। ‘নারীরা সাধারণতঃ ঈর্ষাপরায়ণ হয়’– বললাম বলে এখানে উপস্থিত থাকা মেয়েরা কিছু মনে কোরো না ! দ্যাখো,আমি নারীবিদ্বেষী নই বরং আমি অধিকাংশ ক্ষেত্রে নারীর পক্ষেই কথা বলি। কিন্তু সমাজে যা ঘটছে চোখের সামনে সেটাকে বলবো নাই বা কেন ? সত্যকে কি করে অস্বীকার করি বলো ! তাছাড়া প্রতিনিয়তই তো মানুষ এইসব সমস্যা নিয়েই আমার কাছে আসছে, তাই জানতেও পারছি অনেক কিছু। আমি দেখেছি বেশির ভাগ নারীই অন্য কোনো নারীর প্রশংসা সহ্য করতে পারে না ! তাতে সেই নারী যতোই ভালো বা মহীয়সীই হোক না কেন। দ্যাখো, ইতিহাস বলছে – সমাজে নারীর মহিমা কখনোই নারীদের দ্বারা প্রতিষ্ঠা পায়নি, পুরুষের দ্বারাই পেয়েছে। আরও ভালোভাবে বলতে গেলে বলা যায়_ সন্তানই দিয়েছে মায়ের মর্যাদা। ‘পুরুষের দ্বারা’ নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা পেয়েছে বললে একটু ত্রুটি থেকে যায় _তাই ‘সন্তানের দ্বারা’ বলা হোলো। আবার দেখবে কোনো একান্নবর্তী পরিবার ভাঙার মূলে নারীরা রয়েছে। বেশিরভাগ পরিবারেই দেখা যায় _হয় শাশুড়ি বৌমাকে সহ্য করতে পারছে না অথবা বৌমা শাশুড়িকে সহ্য করতে পারে না। আবার দেখা যায় যে সংসারে শাশুড়ি নাই সেখানে একাধিক ভাই থাকলে তাদের বউৱাই পরস্পরকে সহ্য করতে পারছে না, ফলে ঝগড়াঝাঁটি করছে এবং ফলে পরিবারটি ভেঙে যাচ্ছে।
নারীর এই ধরণের প্রকৃতি হোলেও সামাজিকভাবে এবং আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে কিন্তু নারীর প্রগতি পুরুষদের চেয়ে অনেক গুণ বেশী। তাই কোনো নারী যদি সাংসারের চার দেওয়ালের গন্ডি ছেড়ে একবার বাইরে বেরিয়ে আসতে পারে, তাহলে তার দ্রুত উন্নতি হোতে থাকে। এখানেও কাজ করছে নারীর প্রকৃতি। সাধারণতঃ দেখা যায় পুরুষের থেকে নারী খুব দ্রুত অন্তর্মুখী হোতে পারে।
সুতরাং সমাজে নারী-পুরুষের সমানাধিকার নিয়ে যে সব আন্দোলন হোচ্ছে__ এগুলি হাস্যকর! প্রাকৃতিক নিয়মের অন্তর্গত সবাই। প্রাকৃতিক নিয়মেই নারীর শারীরিক গঠন পুরুষের থেকে ভিন্ন, তেমনি প্রাকৃতিক কারণেই নারীর মানসিক গঠন পুরুষের থেকে আলাদা। নারীর প্রকৃতিতে রয়েছে ঈর্ষাপরায়ণতা, আর পুরুষের প্রকৃতিতে রয়েছে দম্ভ প্রকাশের প্রবণতা। নারী ঈর্ষামুক্ত হোলেই “দেবী” পদবাচ্য হয়ে যাবে। পৃথিবীতে যত মহীয়সী নারীর উল্লেখ পাবে, জানবে এরা সবাই ঈর্ষামুক্ত।
সুতরাং ঈর্ষামুক্ত হওয়াই নারীর সাধনা হোক, তাহলে সব নারীই মহীয়সী হতে পারবে ! বর্তমান যুগের নারীদের আদর্শ সারদা-মা । সারদা মা সহজভাবে সরল কথায় সকলকে উপদেশ দিতেন। তিনি একবার নারীদেরকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “মা ! যদি শান্তি পেতে চাও তো কারও দোষ দেখো না।” ঈর্ষামুক্ত হবার এর থেকে সহজ উপায় আর কি আছে ? তোমরা(মেয়েরা) বিশ্বজননী মা সারদার কথা মেনে চলে নিজেদের জীবনকে সুন্দর ও সহজ করে গড়ে তোলো।।
