জিজ্ঞাসু:

—আমি ক্রিয়াযোগ(যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী প্রবর্তিত)করি—গীতায় বর্ণিত কর্মযোগের সঙ্গে এর কি কোনো সম্পর্ক আছে ?

গুরুমহারাজ :—গীতার অষ্টাদশ অধ্যায়ের মধ্যে ‘কর্মযোগ’ একটি অধ্যায়। ওখানে শিষ্যরূপী অর্জুন জিজ্ঞাসা করছেন এবং গুরুরূপী ভগবান শ্রীকৃষ্ণ তার উত্তর দিচ্ছেন। ভগবান শ্রীকৃষ্ণ শিষ্য অর্জুনকে বলেছিলেন, “যোগস্থঃ কুরু কর্মাণি”–হে অর্জুন যোগযুক্ত হয়ে কর্ম করো। ঈশ্বরপ্রীত্যর্থে কর্ম করাই যোগযুক্ত কর্ম করা, বাকি সমস্ত কার্য ইন্দ্রিয়-সুখের জন্য করা হয়। তাই ওসব অকাজ । প্রকৃত যোগীর কর্মে অকর্ম হয়। অর্থাৎ তাদের কর্মফলের প্রতি আসক্তি না থাকায় তাদের আর কর্মবন্ধন হয় না, নতুন কোনো কর্মফলও তাদের উপর বর্তায় না। দেখুন__ ভগবানকে অথবা ইষ্টকে চূড়ান্তভাবে ভালবাসাই হোচ্ছে শেষ কথা। ধ্যানী, জ্ঞানী, প্রেমী, যোগী—যে কোনো সাধনপ্রণালী অবলম্বনকারীই হোক না কেন, তাদের চরম বা পরম অবস্থা কি জানেন তো ! সেটা হোলো _”ঘনীভূত প্রেমের অবস্থা”। “আত্মজ্ঞানপ্রাপ্ত প্রেমিক ব্যক্তিই তো পারেন জগতের প্রকৃত কল্যাণ করতে। জগতকে ভালোবেসে নিজের জীবনকে উৎসর্গ করাই বহুজন হিতায় ও বহুজন সুখায় কর্ম করা। এই অবস্থাতেই একমাত্র নিষ্কামকর্ম হয়, বাকী সবই সকামকর্ম। গীতায় ভগবান নিষ্কামকর্ম করাকেই কর্মযোগ বলেছেন।

আর আপনি যে ক্রিয়াযোগের কথা বললেন অর্থাৎ যেটা আপনি করেন, ঐগুলি যোগী শ্যামাচরণ লাহিড়ী মহাশয় সমাজে সাধারণের মঙ্গলের জন্য পরম্পরাগতভাবে শিক্ষা দিয়ে গিয়েছিলেন। ওনার পর থেকেই গৃহী-পরম্পরাতে এই যোগ ব্যাপকতা লাভ করেছিল। সন্ন্যাসী- পরম্পরাতেও ক্রিয়াযোগ রয়েছে ! যুক্তেশ্বর গিরি, স্বামী যোগানন্দ পরম্পরায়, তবে ওখানে গৃহীদের ! থেকে আরও কিছু বেশী ‘যোগ’ রয়েছে। এখন কথা হচ্ছে—যে কোনো যোগই পথ। কিন্তু ঠিক ঠিক ধারণা এবং প্রক্রিয়ার যথার্থ প্রয়োগ—দুটোই আত্মিক উন্নতির পথে একান্ত প্রয়োজনীয়। আমি অনেককেই দেখেছি ‘ক্রিয়াযোগ’ সম্বন্ধেই ধারণা নেই কিন্তু নিজেকে ‘ক্রিয়াযোগী’ বলে পরিচয় দেয়। কলকাতায় আপনাদের যে গৃহী-পরম্পরায় শাখা রয়েছে—ওখানকার প্রধান ছিলেন তখন আদ্যনাথ রায়। ওনার সাথে আমার একবার পরিচয় হয়েছিল। আমি ওনাকে জিজ্ঞাসা করছিলাম যে, ক্রিয়া বা কর্মতে তো শক্তির ক্ষয় হয়, তবে ক্রিয়াযোগে শক্তিলাভ কি করে সম্ভব ? উনি উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকলেন। ব্যাপারটা হোচ্ছে, ‘ক্রিয়াযোগ’ মানে প্রাণক্রিয়ার সাম্যতা আনা, অর্থাৎ প্রধান ব্যাপারটা প্রাণারাম বা প্রাণায়াম, এতে তো শক্তিলাভই হবে। মন সর্বদাই ক্রিয়াশীল—যেন ছুটে বেড়াচ্ছে বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে। প্রাণ শান্ত হোলে তবে মন বশে আসে, একাগ্র হয়। এইভাবে প্রাণ শান্ত হোলে মনের বিশ্রাম হয়, যেমন মানুষ ঘুমালে শরীরের বিশ্রাম হয় এবং ক্লান্ত-শরীর ঘুমের পর আবার কার্যোপযুক্ত হয় ! তেমনি মনের বিশ্রাম অবস্থা এলে তবেই উন্নত মনের অধিকারী হওয়া যায়, মনে শক্তিসঞ্চার হয়। মনকে স্বাধীন করতে পারলে, উন্মুক্ত আকাশে পিঞ্জরাবদ্ধ পাখিকে ছেড়ে দিলে যেমন খুশিতে উড়ে যায় তারপর সে আবার একজায়গায় শান্ত হয়ে বসে, এখানে ঠিক তেমনটা হয়। এই অবস্থাকে শাস্ত্রে বলা হয়েছে, “প্রযত্নশৈথিল্য”। এই অবস্থায় প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ হু-হু করে শরীরে প্রবেশ করে। আর এর পরেই “অনন্ত সমাপত্তি মনঃ”। মনকে বশে এনে অনন্তের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া হয়। একে “আত্মনারায়ণ” অবস্থাও বলা হয়। এই অবস্থায় সাধকের যোগনিদ্রার মত একটা ভাব আসে, এটা সাধারণ নিদ্রা নয়। এটা যেন Observation stage যা ‘দ্রষ্টাবৎ’, এই stage-এর পর আসে Witness stage অর্থাৎ সাক্ষীস্বরূপ। এটাই চূড়ান্ত অবস্থা।

বাবাজী মহারাজ, যিনি যোগী শ্যামাচরণের গুরু, তিনি হাজার হাজার বছর ধরে একই শরীরে অবস্থান করছেন— জগৎকল্যাণকল্পে। তাঁর শরীরের বয়সের কোন পরিবর্তন হয়নি। ইচ্ছামাত্রই তিনি যে কোন স্থানে আবির্ভূত হয়ে স্থূলরূপ পরিগ্রহ করতে পারেন। কৈলাস মানস সরোবর যাবার পথে এক গুহায় তাঁর সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল। কিছু ব্যক্তিগত কথাও হয়েছিল। উনি অর্থাৎ বাবাজী মহারাজ যোগ- সাধনায় সু-উন্নত অবস্থায় রয়েছেন, যার ফলে এইভাবে শরীর রাখা বা একই অবস্থায় থেকে যাওয়া অথবা যেখানে-সেখানে প্রকট হওয়া সম্ভব হয়। কিভাবে এটা করা যায় একবার ভেবে দেখেছেন কি ? তবু আপনি ‘ক্রিয়াযোগ’ করছেন, সে তো ভালোকথা। গুরুতে ও ইষ্টে নিষ্ঠা রেখে প্রক্রিয়াগুলি সঠিকভাবে করুন, নিশ্চয়ই ভগবৎ-অনুগ্রহ লাভ করবেন, তবে সাবধান ! কখনই ‘মতুয়ার বুদ্ধি’-সম্পন্ন হবেন না। কখনই ভাববেন না আপনার মতটাই শ্রেষ্ঠ আর বাকী সব মতবাদ নিকৃষ্ট, তাহলে কিন্তু অধঃপতন হবে।