গুরুমহারাজ:—দ্যাখো, বুদ্ধিমান মানুষ বুদ্ধিকে কাজে লাগিয়ে নানান কিছু বলতে পারে, কিন্তু আমি সেই ভাবে কথা বলতে পারি না ! আমি তো তোমাদের আগেই বলেছি যে, ‘আধ্যাত্মিক মানুষই সভ্য’ ! আর বাকি যারা রয়েছে _তাদের তুমি শিক্ষিত, পণ্ডিত, ধনী, শক্তিমান, সাধারণ মানুষ বা আম-জনতা ইত্যাদি নানা ধরণের বিশেষণে বিশেষিত করতে পারো কিন্তু সেইসব মানুষেরা ‘সভ্য’ কোথায় ? বর্তমানে সারা বিশ্বজুড়ে materialistic উন্নতির জোয়ার চলছে। In- tellectual, Academic, Qualified-দের ছড়াছড়ি! তবু শোষণ, নির্যাতন, সাম্রাজ্যবাদ, যুদ্ধ, রক্তক্ষয় বন্ধ হয়েছে কি ? কারা করছে এইসব ? অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত সাধারণ মানুষ বা চাষী-ভুষিরা নিশ্চয় নয় অথবা কুলি-মজুর _ যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দু’বেলা দু’মুঠো খাবারের জোগাড় করতেই হিমশিম্ হয়ে যাচ্ছে —নিশ্চয়ই তারা নয়! তাহলে ঐ বাকি বিশেষণযুক্তরাই এগুলো করে থাকে! তাহলে তাদের তুমি ‘সভ্য’ কি করে বলবে ?
আর কুসংস্কারের কথা যা বলছো–সেক্ষেত্রেও আধ্যাত্মিক মানুষেরাই ঠিক ঠিক কুসংস্কারমুক্ত হয়, বাকিদের সকলেরই কিছু না কিছু কুসংস্কার থেকেই যায়। সংস্কার সকলেরই থাকে _কিন্তু তা মানবতাবিরোধী হোলেই তাকে কুসংস্কার বলা হয়ে থাকে।আধুনিক-মনস্ক শিক্ষিত মানুষের হয়তো religious কুসংস্কার নাই, কিন্তু scientific কুসংস্কার যথেষ্ট রয়েছে। এখনকার ছেলে-মেয়েদেরকে দেখবে _তারা বারবেলা-কালবেলা ইত্যাদি ছোটোখাটো সংস্কার মানে না কিন্তু বিশেষ পোশাক বা জার্সী, বিশেষ লকেট বা কলম অথবা বিশেষ গাড়িকে তার কৃতকার্যতার জন্য সৌভাগ্যের সহায়ক বলে মনে করে এবং বারবার সেটাকে ব্যবহার করতে চায়–এটাকে সংস্কার ছাড়া কি বলবে ? হাজার হাজার শিক্ষিত মানুষ আজ astrology-র দিকে প্রচণ্ডভাবে ঝুঁকছে— একথা অস্বীকার করতে পারবে না।
জানো __চন্দ্র অভিযানে গিয়ে চাঁদে পা রাখার পর নীল আর্মষ্টং-এর কানে একটা অদ্ভুত আওয়াজের অনুভূতি জন্মেছিল। পরে পৃথিবীতে ফিরে এসেও ঐ অদ্ভুত সুর তার কানে বাজতো। অতো বড় একটা অভিযান সফল হওয়ায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সরকার ওকে সমগ্র বিশ্ব পরিভ্রমণ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। পরিভ্রমণকালে আরবের মরুভূমিতে কোনো এক জায়গায় চন্দ্রালোকিত রাতে হঠাৎ করে সে সেই একই ধরণের আওয়াজ শুনতে পেয়েছিল ! তখন আর্মষ্টং ওর সহকারী(স্থানীয় গাইড)-কে জিজ্ঞাসা করে জানতে পারে যে, ওটা সান্ধ্যকালীন ‘আজানে’র আওয়াজ ! মরুভূমিতে রাত্রির আওয়াজ বহুদূর(বেশ কয়েক কিলোমিটার)থেকে শুনতে পাওয়া যায়। ফলে দূরবর্তী কোনো শহরের মসজিদে তখন ‘আজান’ ধ্বনি দেওয়া হচ্ছিলো আর সেটাই ও শুনেছিল ! ব্যস্ _ নীল আর্মষ্টং মুসলমানধর্ম গ্রহণ করে ফেললো। এটাকে কি বলবে সংস্কার না কুসংস্কার ?
রাশিয়ানরা নীল আর্মষ্টং-এর এই ব্যাপারটা নিয়ে খুব গবেষণা করেছিল ।
ওরা ভারতবর্ষের রাকেশ শর্মাকে কয়েকজনের সঙ্গে মহাকাশে পাঠিয়েছিল। রাকেশ শর্মার selection হবার পিছনে ওর শিক্ষাগত ও পেশাগত যোগ্যতা ছাড়াও যে বিশেষ qualityটি দেখা হয়েছিল, তা হোলো রাকেশ ছিল একটি গোঁড়া মৌলবাদী পরিবারের ছেলে এবং প্রচণ্ড সংস্কারযুক্ত। মিলিটারীতে চাকরী করা সত্ত্বেও সে ত্রিসন্ধ্যা আহ্নিক করতো। মহাকাশে ওর উপর কোনো প্রতিক্রিয়া হয় কিনা এইটা দেখাও__ ওদের গবেষণার একটা অন্যতম বিষয় ছিল ! রাশিয়ানরা দক্ষিণের সব চেয়ে গোঁড়া নাম্বুদরিপাদ পরিবারের ছেলেকে এইভাবেই ধীরে ধীরে experimentally কমিউনিষ্ট বানিয়েছিল। যাই হোক _রাকেশকে এইজন্যই মহাকাশে প্রাণায়াম-যোগ ইত্যাদি করানো হোতো। বিভিন্ন পরীক্ষার পরে দেখা গিয়েছিল যে, বৈজ্ঞানিকই হোক আর অন্য কেউ হোক –মানুষ তো মানুষই ! সে একটা বিশেষ staze পর্যন্ত শরীরে বা মনে load নিতে পারে, তারপর আর পারে না! এই অবস্থায় তার শরীরে-মনে নানান effect হয়ে যেতে পারে ! তার অনেক অদ্ভুত কিছু দর্শন হয়ে যেতে পারে, অনেক অদ্ভুত কিছু সে শুনতে পারে—নীল আর্মষ্টং এর ক্ষেত্রে এইরকমই কিছু একটা হয়েছিল।
সাধারণত ব্রহ্মচর্য পালন ব্যতিরেকে আধ্যাত্মিক শক্তির প্রকাশ ঘটানো যায় না ! শারীরবিজ্ঞান দিয়ে বলতে গেলে বলা যায়_ শরীরের যে সাতটি চক্র বা গ্রন্থি রয়েছে এর মধ্যে সহস্রার যেন ‘ডায়নামো’ আর মূলাধার যেন ‘চার্জার’। সাধারণ মানবের শরীরে দু’রকম Energy বা শক্তির ক্রিয়া হয়—একটা Potential energy এবং অপরটা Functional energy। আধ্যাত্মিক শক্তিলাভ বলতে Potential energy-র বৃদ্ধির কথা বলা হয় যেটা লাভ করার একমাত্র উপায় “ব্রহ্মচর্যের সাধন” ! আর এই Potential energy সংকটকালে শরীরকে Functional energy জোগায়। সাধারণ মানুষকে এমনি দেখলে মনে হয় বেশ যেন সুস্থ-সবল। কারণ যতদিন মানুষের শরীরে যৌবন রয়েছে– শরীরের যন্ত্রগুলি সক্রিয় রয়েছে, ততদিন খাদ্য থেকে প্রচুর পরিমাণে Functional energy শরীরে supply আসে। ফলে ঐ শরীর দেখে সুস্থ-সবল মনে হয়। কিন্তু বয়সকালে শরীরের পৌষ্টিক গ্রন্থির ক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে খাদ্য আর সেভাবে হজম হয় না। গ্যাস-অম্বলজনিত কারণে শরীরে Functional energy-র supply যেই কমে যায় অমনি সেই মানুষটি ধীরে ধীরে অচল হয়ে যেতে শুরু করে। তখন তার শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সমূহ ঠিকমতো কাজ করে না, তার মাথাও আগের মতো আর কাজ করে না। সাধারণতঃ মানবশরীরে খাদ্যরস থেকে হয় রক্ত, রক্ত থেকে মাংস, মাংস থেকে বসা বা চর্বি, চর্বি থেকে অস্থি, অস্থি থেকে মজ্জা, মজ্জা থেকে বীর্য, বীর্য থেকে মেধা। তাহলে যে ব্যক্তি অস্খলিত ব্রহ্মচর্যের অধিকারী, তার শরীরে Functional energy ই Potential energy-তে রূপান্তরিত হয়ে শরীরে সঞ্চিত হয়ে থাকে। এরা অসাধারণ মেধার অধিকারী হয়। ফলে হর্ষ-বিষাদ-ভয় ইত্যাদি কোনো কিছুতেই এরা বিচলিত হয় না বা এদের দেহ বা মন সহসা দুর্বল হয় না। ফলে কোনোরকম সংস্কারই সেখানে কার্যকরী হয় না। আধ্যাত্মিক জীবনের এটাই রহস্য।
অখণ্ড ব্রহ্মচর্য পালন করতে পারলে মানুষ Dynamic হয়ে পড়ে। এই রকম কোনো Dynamic মানুষ যদি সদগুরুর সান্নিধ্য পায়, তাহলে তার দ্বারা জগতের কল্যাণে প্রচণ্ড constructive কাজ হয়ে থাকে । সেই রূপ ব্যক্তি জাতি- ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মঙ্গলের জন্য কাজ করে জগতে একটা দাগ রাখবেই।
এইজন্যই বলছিলাম যে ,আধ্যাত্মিক ব্যক্তিরাই সম্পূর্ণরূপে কুসংস্কারমুক্ত হোতে পারে অন্যরা কখনই তা পারে না ! একটু না একটু সংস্কার তাদের মধ্যে থেকেই যায় _ব্যাপারটা বুঝতে পারলে কি !!
