জিজ্ঞাসু:—ভারতবর্ষের উন্নতির কথা আপনি বলেন কিন্তু আমরা তো দেখতে পাচ্ছি __এই দেশের দারিদ্র্য এবং অশিক্ষাজনিত সমস্যা রয়েই যাচ্ছে, কিছুতেই ঘুচছে না !!

গুরুমহারাজ:— স্বামী বিবেকানন্দের শরীর ধারণের আগে পর্যন্ত তামসিকতায় ভারতবর্ষ নামক দেশটা একেবারে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল। দীর্ঘদিন ধরে বিদেশীদের দাসত্ব করতে করতে ভারত যেন ঘুমিয়ে পড়েছিল। স্বামীজী এসে এক ধাক্কায় দেশটার ঘুম ভাঙিয়ে দিয়েছেন ! এখন ভারতবাসীর অবস্থা যেন সদ্য ঘুমভাঙা মানুষের মতো। ঘুম ভেঙেছে কিন্তু উঠে কাজ শুরু করতে পারেনি !

তবে অচিরেই এই চিত্র পাল্টে যাবে। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ভবিষ্যৎ ভারতের সমস্যার কথা ভেবে জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে বারবার সতর্ক করে দিয়েছিলেন। মানুষ কি মহাপুরুষের শিক্ষা নিয়েছে ? বর্তমানে ভারতের প্রধান সমস্যা জনসংখ্যা। যেখানে ২০টি ইঁদুরের স্থান হয়, সেখানে ৪০০টি ইঁদুর রাখা হোলে যে অবস্থা হয়, ভারতের এখন সেই অবস্থা। ঠাকুর তাঁর গৃহী ভক্তদের উদ্দেশ্য করে বারবার বলতেন—একটা-দুটো সন্তানের পর স্বামী-স্ত্রী ভাই-বোনের মত থাকবে অর্থাৎ জন্ম-নিয়ন্ত্রণের সহজ ও সবচাইতে সুন্দর উপায়ের কথা উনি বলে গিয়েছিলেন। কিন্তু কে শুনলো তাঁর কথা ? ভারতের স্বাধীনতা- লাভের পর গৃহীত সরকারী Project সমূহ failure হোলেও, সন্তান উৎপাদনের Project-টা ভারতবর্ষে successful !

এখনকার যুবক-ভক্তদের উদ্দেশ্যে কোনো কথা বলতে গেলে বলতে হয়__ ‘তারা যদি যথার্থ দেশপ্রেমিক হয়, তাহলে তাদের বিবাহ না করা উচিত বা বিবাহ করলেও সন্তান গ্রহণ না করা উচিত। ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে যারা ভাবে, তারা অন্তত এইটা পালন করুক ! কিন্তু ক’জন পারবে বলো একথা মানতে ? মহাপুরুষদের ভাব বা আদর্শ জীবনে আচরণ না করলেই দুর্গতি হয়, ঠিক ঠিক সেগুলি জীবনে গ্রহণ ও পালন করতে পারলে দেশকে কোনোদিন দুর্দশায় পড়তে হয় না।

জিজ্ঞাসু :— আচ্ছা গুরুজী –সাধুরা গাঁজা খায় কেন ?

গুরুমহারাজ:—এই রকম বলছিস কেন ? স্বামী বিবেকানন্দ বা তাঁরা গুরুভ্রাতারা কি গাঁজা খেতেন নাকি ? অথবা এখনও বিভিন্ন মঠ- মিশনের সন্ন্যাসীরা কি সবাই গাঁজা খায় ? কোনো কোনো পরম্পরায় সাধুদের মধ্যে গাঁজা খাবার ব্যাপারটা রয়েছে। কিন্তু ওরা গাঁজা খেয়ে ধ্যান-জপ করে—এটা খারাপ কি ? আমি বিভিন্ন স্থানে এইরকম সাধুদের মণ্ডলেশ্বরকে গাঁজা নিয়ে সৎসঙ্গ করতে শুনেছি। আর উপবিষ্ট সাধুরা গাঁজা খেতে খেতে গাঁজার মহিমা শ্রবণ করছেন। এই রকম সৎসঙ্গের বিষয়বস্তু হোলো— ‘সমুদ্র মন্থনকালে হলাহল পান করে শিব যখন অচৈতন্য হয়ে পড়লেন, তখন মা জগদম্বা শিবকে স্তন্যপান করালেন। দুগ্ধরূপ অমৃত পান করতেই মহাদেবের মুখ থেকে তখন অমৃত ও বিষ মিশে গ্যাঁজলার আকারে বেরোতে লাগলো এবং ধীরে ধীরে তিনি সুস্থ হোতে লাগলেন। শিবের মুখ থেকে বেরোনো বিষ এবং অমৃত-মিশ্রিত গ্যাঁজলা পৃথিবীর বুকে যেখানে যেখানে পড়ল সেখানেই জন্মালো গাঁজাগাছ !’

মওলেশ্বর বলে চলেছেন—’আমরা সাধুরা সেই বিষ-অমৃতরূপ গাঁজার অমৃতটা গ্রহণ করি আর বিষটা ছাই করে ফেলে দিই।’ প্রবচন শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘ব্যোম ভোলে হর হর মহাদেব’, ‘পাবর্তীপতয়ে নমঃ’ ইত্যাদি আওয়াজ তুলে সমবেত সাধুরা গাঁজার কল্কেতে প্রাণপণ টান লাগাতে শুরু করেন, এর পর সবাই আপন আপন ধ্যানে বসে যান।

প্রকৃতপক্ষে ব্যাখাটি কিন্তু অন্যরকম ! জ্ঞানী সাধুরা এই ব্যাপারটিকে যেভাবে ব্যাখা করেন–সেইটা বলছি শোনো! তাঁরা বলেন _’এই পৃথিবী যেন কল্কে-স্বরূপ। পৃথিবীতে ‘মহামায়ার জগৎরূপ-বিষ’ এবং ‘যোগমায়ার জগৎরূপ অমৃত’ দুই-ই রয়েছে—এটাই গাঁজার রূপক। এইবার যদি সাধক তীব্র সাধনার সাহায্যে জ্ঞানাগ্নি প্রজ্বলিত করতে পারে _তাহলেই তার অন্তঃকরণের অজ্ঞানতা পুড়ে ছাই হয়। গাঁজাকে কল্কেয় ঠাসার আগে গাঁজা আটকানোর জন্য একটা গোল পাথর ফুটোর মুখে আটকাতে হয়, একে ‘ঠিকরে’ বলে ! সংযমরূপ ঐ ঠিকরে দিয়ে জগৎ-জ্ঞানকে সর্বদা আগলে রাখতে হয়। নাহলে সামান্য ফাঁক পেলেই মায়া-মোহাদিরূপ বিষ প্রবেশ করে যাবে। তারপরেও থাকে ছাঁকনি বা সাপি, এখানে বিবেকরূপ ছাঁকনি দিয়ে ছেঁকে ধোঁয়ারূপ অমৃততত্ত্বকে গ্রহণ করতে পারলে তবেই ছাই পড়ে থাকে অর্থাৎ সংসারের অসার তত্ত্বের ঠিক ঠিক বোধ হয়। এইটাই হোলো জ্ঞানমার্গীদের ব্যাখা।।