……. তবে এর আগেও আমি দীক্ষা দিয়েছিলাম, ‘বুনদিদি’কে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘কমললতা’ চরিত্রটা যাকে নিয়ে লেখা সেই বৈষ্ণবীকেই আমরা ‘বুনদিদি’ বলতাম। বৈষ্ণবী বৃদ্ধা হোলেও খুব সুদর্শনা আর সুকণ্ঠি ছিলো। আমার মায়ের সাথে ওর খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। মা ওকে বলতেন ‘দিদি’ আর ও আমার মাকে বলতো ‘বুন’ অর্থাৎ বোন। আমরা ভাই-বোনেরা এই দুটোকে একজায়গা করে বলতাম ‘বুনদিদি’। বোষ্টমদের ভিক্ষা করাটা হোলো বৃত্তি, তাই বুনদিদিও ভিক্ষা করতে মাঝে মাঝেই আমাদের পাড়ায় আসতো। ও পাড়ায় পাড়ায় ভিক্ষা সেরে আমাদের বাড়ীতে এসে দুপুরে খাওয়া-দাওয়া করতো এবং মায়ের কাছে সারা দুপুর বিশ্রাম নিয়ে বিকালবেলায় ওর নিজের আখড়ায় ফিরে যেতো।
ঐ অঞ্চলের নন্দগ্রামে বৈষ্ণবদের আখড়া ছিল। শরৎবাবু(কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়) এইসব অঞ্চলে খুবই আসতেন—উনি আমার বাবার সাথেও গান-বাজনা করেছেন, এটা বাবার মুখে শুনেছিলাম। উনি বাঘনাপাড়া ষ্টেশনে নেমে একটা গরুর গাড়ী ভাড়া করে হারমোনিয়াম বাজাতে বাজাতে নন্দগ্রাম, পার্বতীপুর ইত্যাদি অঞ্চলে বোষ্টম_আখড়ায় যেতেন। এর ফলে যৌবন বয়সের বৈষ্ণবী কমললতার সঙ্গে তাঁর সেই সময়েই আলাপ-পরিচয় হয়েছিল। আর তাকেই character করে উপন্যাস লিখেছিলেন।
যাইহোক, বুনদিদি আমাদের বাড়ী এলে আমাদের ভাই-বোনদের খুব আনন্দ হোতো। কারণ বুনদিদি খাওয়া-দাওয়ার পর বিশ্রাম নিয়ে যাবার আগে কয়েকখানা গান গাইতো। বুনদিদির কণ্ঠে কীর্তনের সুরে পালাগান শুনতে শুনতে আমার মনটা কেমন যেন উদাস হয়ে যেতো ! আর কেন জানিনা, সেই ছোটোবেলাতেই আমার দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল গড়াতো ! বুনদিদিও গান গাইতে গাইতে কাঁদতো, আর গান শেষ হোলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে খুব আদর করতো। বুনদিদি মাকে বলতো, ‘এ হোলো গোপাল, এ শুধু তোমার ছেলে নয় বুন_ এ আমাদের ছেলে! এ ছেলে তোমার ঘরে বেশিদিন থাকবে না!’
বুনদিদি লুকিয়ে লুকিয়ে নানান নাড়ু, মিষ্টি, আঁচলে বেঁধে নিয়ে আসতো আমার জন্য, আর সুযোগ পেলেই নিজের হাতে আমাকে খাইয়ে দিতো।
ছোটবেলায় ফড়িং ধরে পিছনে সুতো বেঁধে ওড়ানো একটা ভাল খেলা ছিল আমাদের। একদিন হয়েছে কি, আমি আমাদের বাড়ির পাশের বাঁশবাগানে কচুপাতা তুলে ন্যাংটো হয়ে ফড়িং ধরছিলাম। দু’হাতে দুটো কচুপাতা নিয়ে ফড়িংকে চাপা দিলেই চট্ করে ফড়িং ধরা পড়ে যায়। আর ন্যাংটো হয়ে ধরছিলাম—কারণ, মা বলে দিতেন—বাঁশবাগানে লোকে পায়খানা করে, ওখানে জামা-প্যান্ট পরে গেলে সব ‘আকাচা’ হয়ে যায়_ বাড়িতে এসে ঐ জামা-প্যান্ট না কেচে (জল দিয়ে ধোওয়া) ঘরে ঢোকা বারণ। তাই প্যান্টটা রাস্তায় খুলে রেখে ন্যাংটো হয়ে ফড়িং ধরছিলাম। ঐ বাঁশবাগানের পাশ দিয়েই একটা সরুমতো রাস্তা ছিল আমাদের পাড়ায় ঢোকার। আমি একবার দেখলাম যে, দুর থেকে ঐ রাস্তা ধরেই ‘বুনদিদি’ আসছে। মনটা ক্ষণেকের জন্য আনন্দিতও হোলো। তারপর আবার মত্ত হয়ে গেছি ফড়িং ধরায়। ইতিমধ্যে কখন যে বুনদিদি সেখানে এসে একদৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়ে রয়েছে __সেটা আমার নজরে পড়লো অনেক পরে। ওকে দেখামাত্রই ছুটে গিয়ে ধরতেই ওর সম্বিৎ ফিরে এলো। আমাকে ধরে ওখানেই বসে পড়লো, আর তারপরই কান্নায় ভেঙে পড়লো ! আমি হতবাক হয়ে ওর দিকে চেয়ে আছি, আর ও বলে চলেছে— ‘গোপাল তুমি এই বেশে এখানে আছো ! আমি সারাজীবন তোমাকে কত খুঁজেছি, কত ডেকেছি, এতদিনে জীবনের এই অন্তিম লগ্নে দেখা দিলে ! বেশ– দেখা যখন দিলে তখন পরকালের পথ করে দাও ।’
ও কথাগুলো যখন বলছিলো, তখনই আমার অন্তর থেকে প্রেরণা এলো—’ও আর বেশীদিন বাঁচবে না, ওকে দীক্ষা দাও!’ আমার একহাতে কচুর পাতা, ন্যাংটো অবস্থাতেই ওখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ওর মাথাটা ডানহাতে টেনে নিয়ে ওকে আমি দীক্ষা দিলাম। ওর ছোটবেলায় যে গুরুদেব বুনদিদিকে দীক্ষা দিয়েছিলেন, তিনি বলে দিয়েছিলেন—’যে মন্ত্রে তোমাকে দীক্ষা দিলাম, পরবর্তীতে যিনি এই মন্ত্রে তোমায় দীক্ষা দেবেন __তিনি সাক্ষাৎ ভগবান!’
দীক্ষা নেবার কিছুদিন পরেই বুনদিদি শরীর ছেড়েছিল। তবে জানো, বুনদিদি আবার শরীর নিয়েছে! এখানে অর্থাৎ এই বনগ্রাম আশ্রমে আসে_ দেখবে ছোটো শিশু হোলেও আমি ওকে ‘দিদি’ বলেই সম্বোধন করি।
যাইহোক, কৃষ্ণদেবপুরের আরও তিনজনকে বিভিন্ন ঘটনাচক্রে সেই বয়সেই দীক্ষা দিয়েছিলাম। এদেরকে দীক্ষা দেবার সময়ও অন্তরের অনুপ্রেরণা ও ✓রী মায়ের নির্দেশ পেয়েছিলাম ৷৷
