গুরুমহারাজ :— তোমাদেরটা মেলে বুঝি ? যাই হোক, আমার ক্ষেত্রে এমনটা হবার একটা কারণ আমি বলতে পারি, আর সেটা হোলো__ আমি আর পাঁচজনের মতো কৃত্রিম হোতে পারি না। আমি যখন যা– তখন ১০০ ভাগ তাই! এর ফলে আমার যখন যে ‘ভাব’ থাকে তখন সেই ভাব-শরীরের ছায়াচিত্র(ফোটো) তোমরা দ্যাখো ! তাই ঐ ফোটোগুলি এক একসময় এক-একরকম মনে হয়।
“বৈদিক ভারত” বলে একটা বই আছে – লেখক শৈলেন্দ্রনারায়ণ ঘোষাল শাস্ত্রী(যিনি “তপোভূমি নর্মদা” লিখে বিখ্যাত হয়েছিলেন)। তিনি বিভিন্ন সাধু-মহাত্মাদের কাছে শুনে ঐ গ্রন্থে একজন ‘সদগুরু’-র লক্ষণসমূহ নির্দেশ করেছেন! সেগুলির মধ্যে একটি হোলো যে, ‘সদগুরু’-র একটি ফটো অপরটির সাথে মেলে না!
জিজ্ঞাসু :– আপনার চাকুরী জীবনে(গুরুজী ২বছর ৭মাস মতো চাকুরী করেছিলেন)-ও এই ধরণের উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনা ঘটেছিল কি ?
গুরু মহারাজ:—হ্যাঁ, ঘটেছিল। আমি তখন বীরভূমের ওদিকে সিমেন্স কোম্পানির হয়ে কতকগুলো যুবক ছেলেদের নিয়ে রুরাল ইলেকট্রিফিকেশনের কাজ করছিলাম। তখন আমাদের সবার ক্যাম্প-লাইফ, ক্যাম্পেই আমাদের খাওয়া দাওয়া এবং রাত্রির বিশ্রাম। সারাদিন ঐ ছেলেদের নিয়ে মাঠে মাঠে Electrification-এর কাজ করতে হোতো। ঐ সময় ওখানে পুরন্দরপুর বলে একটা গ্রামের পাশে অবস্থিত একটা জীর্ণ শিবমন্দিরে আমি রোজ ধ্যান করতে যেতাম। মন্দিরটা গ্রাম থেকে একটু দূরে। পুরোহিতমশায় ছিল এক ভট্টচার্য, সে মন্দিরটা পরিষ্কারও করতো না—শিবলিঙ্গটিরও যত্ন নিতো না। সুতরাং পূজাপাঠ ও যে কেমন হোতো _তা সহজেই অনুমেয় !
বোধহয় মন্দিরের নামে যা দেবোত্তর সম্পত্তি ছিল, সেগুলিও নষ্ট করে ফেলেছিল, তাই অমনি দায়সারা করে নিত্যপুজোটা সারতো। তখন ঐ জায়গাটা একটু জঙ্গলমতো ছিল, সাপ-খোপ ও ভূত-প্রেতের আখড়া বলে __দেবতার সন্ধ্যার শীতলভোগ সন্ধ্যায় না দিয়ে দিনের আলো থাকতে-থাকতেই দিয়ে পালাতো ! গ্রামের অন্য কোনো মানুষ এদিকে বড় একটা আসতো না। ফলে সন্ধ্যা থেকে আমি নির্ঝঞ্ঝাটে ওখানে রাতটা কাটাতে পারতাম ! জানো তো __শিবমন্দির হোচ্ছে সাধু-সন্তদের জন্য নিরাপদ জায়গা, আর শুধু সাধু-সন্তই বা কেন –জীবজন্তু, মানুষ (শরীরি-অশরীরি) সকলেরই। কারণ শিবই একমাত্র দেবতা—যাকে বলা হয়েছে ‘আশুতোষ’ অর্থাৎ অল্পে সন্তুষ্ট, ‘ভূতনাথ’ অর্থাৎ ভূত-প্রেতদের নাথ _তাই তাঁর কাছে তাদের অবাধ গতি, তিনি ‘পশুপতি’ সুতরাং পশুরাও সেখানে যেতে পারে, এইভাবে তিনি লোকনাথ আবার তিনিই দেবাদিদেব। তাই যে কোনো ব্যক্তি যে কোনো সময় শিবমন্দিরে যেতে পারে, প্রয়োজনে শিবকে ছুঁতেও পারে। ছোটোবেলায় ভ্রমণকালীন সময়ে আমি বহু সাধুকে দেখেছি রাত্রে কোনো শিবমন্দিরে শিবলিঙ্গকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকতে! তবে একটা ব্যাপারে সাবধান থাকতে হয়, কারণ সাপেরাও শিবলিঙ্গ জড়িয়ে থাকতে ভালবাসে ! এর কারণ শিবলিঙ্গ খুব ঠাণ্ডা হয়, আর শিবমন্দির সাধারণতঃ জানালাহীন ছোটো দরজা-বিশিষ্ট হয়ে থাকে। এরফলে ভিতরটায় আলো-আঁধারি একটা ভাব থাকে। আর এই ধরণের স্থানই সাপেদের বসবাসের প্রকৃষ্ট জায়গা ।
যাই হোক, ঐ যে মন্দিরের ভিতর এবং এর চারপাশটা নোংরা হয়ে ছিল, আমি প্রথম দিন ওখানে গিয়েই ঝাঁট-পাট দিয়ে বেশ খানিকটা পরিষ্কার করেছিলাম। পুজারী ভট্টাচার্য পরের দিন পুজো করতে এসে সেটা দেখেছিল। পরের দিন আমি আরও খানিকটা অংশ পরিষ্কার করেছিলাম—মন্দিরের ভিতরটা চামচিকের পায়খানায় ভর্তি হয়ে ছিল, সেগুলোও ধুয়ে-মুছে সাফ করেছিলাম। দু’চার দিন পর সবকিছু ঝকঝকে পরিষ্কার হয়ে গেছে দেখে পূজারীজী পাড়ায় খবর নিয়ে জানতে পেরেছিল যে, প্রতি রাত্রিতে একটা ছেলে এসে মন্দিরে থাকে এবং সে-ই এই কাজ গুলো করেছে !
এইটা শুনে এক রাত্রিতে সে পাড়ার দু’চার জন ছেলে জুটিয়ে এনে আমাকে মন্দির থেকে বের করে দেবার মতলব করলো। আমিও নন্দীভাব ধারণ করে বললাম, ‘ব্যাটাকে ঘাড় ধরে ছুঁড়ে ফেলে দেবো, বেরো, নইলে তোর চরম অনর্থ ঘটাবো !’ ও কি বুঝল কে জানে—পালালো ৷
পরের রাত্রিতে ঘটলো এর ঠিক উল্টো ঘটনা ! আমার সাথে ঝামেলা করে যাবার পরে রাত্রিতে ঘুমন্ত অবস্থায় ওর দর্শন হয়েছিল যে, ওর আরাধ্য দেবতা ‘শিব’ ওর উপর চরম অসন্তুষ্ট হয়েছে। ফলে পরদিন সেই ভট্রাচার্য, তার গিন্নি সহ আরও অনেক গ্রামবাসীদেরকে সঙ্গে জুটিয়ে– ফল-ফুল দিয়ে ডালা সাজিয়ে তোড়জোড় করে ভক্তিভরে শিবের পুজো করেছিল এবং সন্ধ্যার পর পর্যন্ত বসে ছিল আমার সাথে দেখা করার জন্য।
সমস্ত কাজ সেরে সন্ধ্যার পর আমি ঐ মন্দিরে গিয়ে পৌঁছাতেই ভট্টাচার্য এবং অন্যান্যরা(যারা তখনও পর্যন্ত ওখানে ছিল)প্রণাম-ট্রণাম করে একেবারে অস্থির! ভট্রাচার্য মশাই আমাকে কাতর কন্ঠে বললো, ‘বাবা, তোমাকে আগামীকাল আমার বাড়ীতে গিয়ে দুপুরের খাবার খেতেই হবে –নাহলে আমার পাপের প্রায়শ্চিত্ত হবে না!
কি আর করা যায়_বয়স্ক ব্রাহ্মনের কথার মর্যাদা রক্ষার জন্য পরের দিন তার বাড়ী গিয়েছিলাম । গিয়ে দেখলাম—চরম দুরবস্থা ভট্চাযের ! ঐসব দেখে আমি তাকে বললাম, ‘দ্যাখো, তুমি দেবাদিদেব মহাদেবের পূজারী। আর তোমার এই দুরবস্থা ! তাহলে লোকে মহাদেবকে কি মানবে ? তোমাকে দেখেই তো ঠাকুরের প্রতি মানুষের ভক্তি ছুটে যাবে !!
তোমার এই দুর্দশা কেন বলতো__ তুমি ভক্তিভরে পূজা করো না ! পূজায় তোমার চরম অনীহা, তাই দেবতা তোমার উপর চরম রুষ্ট ! মা লক্ষ্মী হোলেন মহাদেবের কন্যা, তিনি কি করে তোমার উপরে সদয় হবেন ! জানো তো _কলির ব্রাহ্মণের উপরে সীতার অভিশাপ আছে! এবার থেকে ভক্তিভরে শিবপূজা করো, মন্দিরটা পরিষ্কার রেখো, শিবলিঙ্গকে যত্ন করো। মানুষের মনে শিব সম্বন্ধে শ্রদ্ধার ভাব সৃষ্টি করো, দেখবে তোমার সমস্ত অভাব দূর হয়ে যাবে।’
সব শুনে ভট্টাচার্য বললো – -“কিন্তু সন্ধ্যায় ওই মন্দিরে নানারকম ভৌতিক ক্রিয়া হয়, তুমি ওখানে একা থাকো কি করে ?’ আমি বললাম, ‘আমি আরও বড় ভূত-প্রেত, আমাকে দেখে ছোটো ভূতেরা এখন পালিয়ে গেছে—তোমার আর কোনো অসুবিধা নাই। এবার থেকে সন্ধ্যার সময়ই মন্দিরে যাবে, শীতল দেবে, আরতি করবে, এরপর থেকে আর কোনো অসুবিধা হবে না।’……. (ক্রমশঃ)
