….. ঘটনাটা কিছুটা সত্যিই ছিল, কিছু অপদেবতার বাস ছিল ওখানে ! তাছাড়া সাধারণ মানুষের ভয়ের কারণ আরও যেটা ওখানে ছিল সেটা হোচ্ছে__ঐ মন্দিরকে কেন্দ্র করে হোতো দুষ্কৃতীদের নৈশ-আড্ডা। তারাও তো জনহীন পরিত্যক্ত জায়গাই পছন্দ করে। এইসব কারণে হয়তো কোনো সাধু-সন্ত-ফকির অথবা কোনো পথশ্রমে ক্লান্ত পথিক রাত্রিতে ঐ মন্দিরে থাকতে চেয়েছে__তাদেরকে ওরাই উৎপাত করতো। আর এইটাকেই ‘ভৌতিক ক্রিয়া’ বলে দীর্ঘদিন ধরে চালিয়ে আসছিল ঐ দুস্কৃতিরাই।
যাইহোক, এরপর থেকে ওখানে আমি রাত্রিতে থাকতে পেয়েছিলাম ঠিকই কিন্তু নির্বিঘ্নে থাকতে পারিনি ! কারণ গ্রামের সাধারণ মানুষ ঐ ঘটনার পর থেকেই আমাকে অসাধারণ কিছু একটা ভেবে নিয়ে __মাঝে মাঝেই নানা কারণে উৎপাত করতো।
অবশ্য এ সব সত্ত্বেও আমার সাধন-ভজনের খুব একটা ব্যাঘাত ঘটতো না ! ওই মন্দিরের শিবকে দেখে কেবল আমার মনে হোতো—’এই শিবলিঙ্গ যেমন শান্ত-সমাহিত-ধ্যানমগ্ন, আমাকেও এইরকমই শিবের মতো ধ্যানমগ্ন হোতে হবে। বীরভূমের পুরন্দরপুরের যেখানে আমাদের ক্যাম্প ছিল, তার কাছেই একটা শ্মশান ছিল, আমি মাঝে মাঝে ওখানে গিয়েও ধ্যান করতাম। এক রাত্রিতে ঐ শ্মশানে গিয়ে সংকল্প করলাম, ‘আজ ধ্যানের গভীরে ঢুকে দেখবো কি আছে, তাতে যদি আমার মস্তিষ্কের স্নায়ুসমূহ ছিঁড়ে যায় তো যাবে_ তবু ধ্যান ছেড়ে সহজে উঠবো না’।
ধ্যানে বসে অন্তর্মুখী হোতেই আমার অন্তরচেতনা একমুখী হয়ে আমাকে ‘হু হু’ করে কোথায় যেন ভাসিয়ে নিয়ে চলে যেতে লাগলো ! তারপর পরিদৃশ্যমান হোলো, সমুদ্রের মতো এক বিশাল ও উজ্জ্বল জ্যোতিঃসমুদ্র—যেন চতুর্দিক একেবারে থকথক্ করছে ! দেখে মনে হোচ্ছে একদম শান্ত-নিস্তরঙ্গ কিন্তু প্রচন্ড dynamic -এটাকেই মনে হচ্ছিলো যেন থকথক্ করছে!
এই দৃশ্যের মধ্যে কিছুক্ষণ থাকার পর দেখলাম যে, সেই জ্যোতির রাজ্যে আমি রয়েছি এবং ষোলজন চতুর্ভুজ বিষ্ণুমূর্তি আমার চতুর্দিকে বেষ্টন করে রয়েছেন। এই দর্শন কিছুক্ষণ চলার পরে দেখলাম__ ধীরে ধীরে ঐ মূর্তিগুলি আমার শরীরে মিশে গেল ! এর খানিকক্ষণ পরে দেখলাম, সেই জ্যোতিঃসমুদ্র থেকে একে একে তরঙ্গ উঠে আসছে, ছোটো তরঙ্গ-বড় তরঙ্গ আর তাদের সাথে অসংখ্য বুদ্বুদ। তারপর দেখলাম সেই বড় বড় তরঙ্গগুলি বিশাল হোতে হোতে এক-একটা মানবীয় রূপ পরিগ্রহ করলো—একটা হোলো ভগবান শ্রীকৃষ্ণ, একটা ভগবান শ্রীরামচন্দ্র, একটা যীশু, একটা শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু–এইভাবে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ, স্বামী বিবেকানন্দ ! এই দর্শনগুলি চলতেই থাকলো ! আর সত্যি সত্যিই ঐ সময়ে আমার মস্তিষ্ককোষগুলোর উপর এত চাপ পড়েছিল যে, বেশ কয়েকদিন স্থুলজগতের কোনো ব্যাপারেই আমার মাথা কাজ করছিল না। ফলে এরপর থেকে ক্যাম্পের নতুন ছেলেরা আমাকে খ্যাপা-পাগল মনে করতে লাগলো(পুরোনোরা গুরুজীর মধ্যে যে ভগবৎ-সত্তা রয়েছে,তা জানতো)৷
দক্ষিণ ভারতের দেবেন্দ্রনাথ(পরবর্তীর স্বামী বিশুদ্ধানন্দ)তখন ওখানে গিয়েছিল। ও সমস্ত শাস্ত্ৰ -পুরাণ ঘাঁটতো এবং বিভিন্ন সাধুসঙ্গ করে বিভিন্ন আধ্যাত্মিক লক্ষণের বিচার করতে পারতো। আমি ওকে আমার দর্শনের কথাটা বললাম, ও বলল ‘কোনো শাস্ত্রে তো এই ধরণের দর্শনের কথা পাইনি, তবে আমার সাথে অনেক মহাত্মার যোগাযোগ রয়েছে _আমি খোঁজ নিয়ে শীঘ্রই জানাবো।’ এই বলে দেবেন্দ্রনাথ ওখান থেকে চলে গেল এবং ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন মহাত্মাকে ঐ দর্শনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করেছিল। তবে তাদের কেউই বিশেষ কিছু বলতে পারেনি!
শেষে উত্তরকাশীর ধর্মবতী মা(যিনি পরম গুরুজী রামানন্দ অবধূতজীর কুঠিয়ার একটু উপরের দিকে থাকতেন)-কে এই দর্শনের কথা বলতেই, উনি বলেছিলেন, ‘যাঁর এইরূপ দর্শন হয়েছে_ তিনি সাক্ষাৎ পুরুষোত্তম, পঞ্চভূতের শরীর নিয়েছেন বলে নিজেকে প্রচ্ছন্ন রেখেছেন। তাঁকে ষোলজন বিষ্ণু চারিদিকে বেষ্টন করে রয়েছেন অর্থাৎ তিনি ষোলকলায় প্রকাশিত। আর প্রত্যেক বিষ্ণু চতুর্হস্ত হওয়ায়—৪×১৬=৬৪ কলা বা ৬৪ সিদ্ধিই তাঁর করায়ত্ত । এইরূপ মহামানবের দর্শন করাও বহু ভাগ্যের কথা। তোমার সাথে দেখা হলে এই মায়ের কথা তাঁকে বোলো।’
এই ঘটনার বহু পরে আমি যখন উত্তরকাশীতে গুরুদেব রামানন্দ অবধূতজীর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তখনই ওনার সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। ওই মায়ের পাঞ্জাবী শরীর ছিল। উচ্চকোটীর সাধিকা ছিলেন। ওনার পূর্ণ জ্ঞান হয়েছিল। আমাকে পুত্রবৎ স্নেহ করতেন। গুরুদেব(রামানন্দ অবধূতজী)-এর আশ্রমে গেলে গুরুদেবই আমাকে পাঠাতেন ওনার কাছে। ওনার কুঠিয়ায় গেলেই উনি আমাকে কাছে নিয়ে খুব আনন্দ করতেন। এইভাবে বেশ কয়েকবার ওনার সাথে আমার যোগাযোগ হয়েছিল। ওই মায়ের কাছে গেলেই উনি নিজের হাতে রান্না করে আমাকে খাওয়াতেন। আমিও একবার রান্না করে ওনাকে খাইয়েছিলাম ৷৷
