জিজ্ঞাসু :— গুরুমহারাজ! এতক্ষণ অনেক এমন প্রসঙ্গ হোলো, যা শুনে মনে হোচ্ছে যেন আমাদের চেতনার জগতে নতুন দিগন্ত খুলে গেল। কিন্তু আমরা আপনার বাল্যজীবনের ঘটনা থেকে একটু দূরে সরে এসেছি, আপনি হিমালয় ভ্রমণের কথা – সেই কিমিয়াবিদ্যা জানা সাধুটার কথা বলছিলেন। তারপর আপনি কোথায় গিয়েছিলেন ? ঐরকম আরো দু-একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা যদি অনুগ্রহ করে বলেন তো কৃতার্থ হই ।
গুরুমহারাজ :— দ্যাখো, পৃথিবীগ্রহের বিভিন্ন স্থানে ঘোরার সময় আমার এইটা জানা হয়েছে যে, সবসময় ✓রী মা জগদম্বা যেন আমার হাত ধরে ধরে নিয়ে যেতেন। আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা কেমন ঘটে জানো তো _এমন কোনো পরিস্থিতিতে পড়ে গেলাম যেখানে হয়তো মনে হোচ্ছে সেখান থেকে বেরোনো খুবই কঠিন, ঠিক সেইসময়ই দেখা যায় এমন কেউ এসে সমস্যার সমাধান করে দিলেন কিংবা সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন ! শরণাগত হয়ে থাকার এইটা একটা ফল–এমনটা বলতে পারো! এমনটা তোমরাও তোমাদের জীবনে পেতে পারো যদি ঠিক ঠিক শরণাগত হও।
তোমরা সহজ-সরল-নিষ্কপট হও। তবে এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলা যায়_ এই যে অনেকে উদাহরণ দেয় ‘শিশুর মতো সরল হতে হবে’। আমি বলি না—শিশুর মধ্যেও অসহজতা থাকে। কোনো জিনিস তার হাতে থাকলে অন্যকে চট্ করে দিতে চায় না, ভালো খাদ্য বা প্রিয় খেলার জিনিস ভাগ করে নিতে চায় না ! তাই শিশুর মতো সরল হোলেও ঈশ্বরলাভ হবে না ! কারণ এটা ঠিক ঠিক শরণাগতি হওয়া হোলো না। তাই ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরবর্তীকালের শিশু নয় __’গর্ভস্থ শিশু’-র ন্যায় হোতে হবে ! এইখানেই পরিপূর্ণ Surrender !! এই অবস্থায় স্বাধীন কোনো ইচ্ছাই নাই—নাই কোনো কর্ম-প্রবণতা, এমনকি শরীর রক্ষার জন্যও নিজস্ব কোনো তাগিদ থাকে না ! তাইতো ঐ অবস্থায় পৌঁছালে জগন্মাতা সন্তানের সম্পূর্ণ ভার নেন। তার বুদ্ধি-বিকাশ, খাদ্যগ্রহণ, শ্বাস-প্রশ্বাস, রেচন— সমস্তই সেই মহাপ্রকৃতির নিয়ন্ত্রণে হয়ে থাকে। এটাই ঠিক ঠিক শরণাগতি অবস্থার উদাহরণ।
তবে তোমাদের আমি আগেও বলেছি যে, আধ্যাত্মিক জগতের কোনো কিছুই জাগতিক অন্য কিছু দিয়ে উদাহরণ দেওয়া যায় না, তবু যাদের একেবারেই ধারণা নেই_ তাদের মোটামুটি ধারণা দেবার জন্যই উদাহরণ টানতে হয় ! আর সেই উদাহরণটি যতটা সম্ভব appropriate করার চেষ্টা করতে হয়।
যাইহোক, আগের কথায় ফিরে আসি। আমি যখন হিমালয়ের গভীরে প্রবেশ করলাম, তখনই চিন্তা হোলো—তাইতো এই বিশাল হিমালয় পর্বতমালা, যার কয়েক হাজার চূড়া, কোথায় কি আছে তার কিছুই জানা নাই, তাহলে কিভাবে সব স্থান ঘোরা যাবে !! আমার তো পৃথিবীগ্রহের শরীর, ফলে তার যা ধর্ম সেটাকে তো লঙ্ঘন করা যাবে না ! হয়তো কোনো কোনো ক্ষেত্রে ✓রী মা তাও করেছেন, কিন্তু সেগুলো আমার ইচ্ছায় হয়নি। যাইহোক আমার যখন ঐ ধরণের চিন্তা মাথায় আসছিল, তখনই দু’জন নাগা সন্ন্যাসীর যেন হঠাৎ আবির্ভাব হয়েছিল। এঁদের একজন দীর্ঘদেহী বিরাট চেহারার, অন্যজন একটু খর্বকায়। তাঁরা আমাকে বললেন—তাঁদের উপর নাকি আদেশ আছে আমাকে হিমালয় ঘোরাবার। ফলে আমার আর কোনো চিন্তাই রইলো না! হিমালয়ের সমস্ত কিছুই তাঁদের নখদর্পণে। কিছুদিনের মধ্যেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম—তাঁরা নানান যোগবিভূতির অধিকারী এবং সর্ব বিদ্যায় পারদর্শী ! বিশেষতঃ চিকিৎসাবিদ্যার চমকপ্রদ নিদর্শন তাঁদের কাছে দেখেছিলাম। পরে অবশ্য জেনেছিলাম যে, তাঁরা শিবস্বরূপ মহাত্মা, বিভিন্ন সাধুদের রক্ষা করাই তাঁদের কাজ। পরবর্তীকালে বনগ্রামে বা অন্য কোথাও আমার শরীরে কিছু সমস্যা দেখা দিলে গভীর রাত্রে তাঁরা আবির্ভূত হয়ে সবকিছু ঠিকঠাক করে দিতেন। ন’কাকা, তৃষাণ এদের সামনেও অনেকবার এইরকম ঘটনা ঘটেছে।……. (ক্ৰমশঃ)
