[ গুরু মহারাজের ছোটোবয়সের হিমালয় পরিভ্রমণ সংক্রান্ত আলোচনার পরবর্ত্তী অংশ]
……. যাইহোক, তাঁরা অদ্ভুত কৌশলে আমাকে হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতে লাগলেন। কোথাও পাহাড়ের অভ্যন্তরে গুহার ভিতর দিয়ে রাস্তা, কোথাও ঝরনার ভিতর দিয়ে রাস্তা, কোথাও পাথরের চাঁই সরিয়ে গুহা আবিষ্কার করে তার মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলার রাস্তা এইভাবে তাঁরা আমাকে হিমালয়ের চূড়ার পর চূড়া অতিক্রম করে করে এগিয়ে নিয়ে যেতে লাগলেন। পথে যখনই আমার ঐ ছোটোবয়সের শরীরটার কোনো সমস্যা হয়েছে সাথে সাথেই তাঁরা কোনো না কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করে আমাকে সুস্থ করে তুলতেন। প্রকৃতপক্ষে ওনারা সর্ববিদ্যায় পারদর্শী শিবস্থিতির উচ্চ কোটির সাধক ছিলেন।
একবারের ঘটনা তোমাদের বলছি শোনো __! দীর্ঘদিন ধরে ওনাদের সাথে বরফের উপর দিয়ে চলতে চলতে আমার কম বয়সের অপটু শরীর হঠাৎ করে collapse হয়ে গিয়েছিল। ফলে আমি ঐখানেই পড়ে গিয়েছিলাম। এইটা দেখেই ওনারা ওখানেই বরফের উপর বসে হাতের চিমটা দিয়ে বরফ খুঁড়তে শুরু করে দিয়েছিলেন। তারপর সেখান থেকে এক ধরণের মূল বের করে এনে আমার জিভের তলায় দিয়ে দিয়েছিলেন। এইটা দেবার অল্পক্ষণের মধ্যেই আমার শরীর গরম হোতে শুরু করেছিল, এমনকি আমার শরীরে ঘাম ঝরছিল এবং আমি ঝেরেমেরে উঠে পড়েছিলাম।
ঐ মূলটার নাম হোলো “কূট” ! এখানকার অর্থাৎ বনগ্রামের মতো সমভূমি অঞ্চলের তাপমাত্রায় থেকে যদি কোনো মানুষকে মসুরদানার মতো পরিমাণ “কূট” খাওয়ানো যায় তাহলে সে হয়তো মারাই পড়ে যাবে।
আরো একবার বরফের উপর দিয়ে মাসের পর মাস চলার সময় আমার শরীরের ঐ একই রকম দশা হয়েছিল _ সেবার ওনারা আমাকে একটা বিশেষ আসনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখলো, কিচ্ছুক্ষণের মধ্যেই আমার শরীরে ঘাম দেখা দিয়েছিল(ঐরকম মাইনাস ২০° তাপমাত্রায়)।
জানো, হিমালয়ের একটা নির্দিষ্ট উচ্চতা পর্যন্ত বড়বড় গাছপালা জন্মায়তারপর আর বৃক্ষ জাতীয় উদ্ভিদ দেখা যায় না। তখন শুধু বরফ আর বরফ ! মাঝে মাঝে দু-একটা ঝোপঝাড় দেখা যায়। আসলে সেগুলো ফুলগাছএইসব ফুলগুলোর যেমন বর্ণবৈচিত্র তেমনি সুগন্ধযুক্ত।। সমভূমির মতো ওখানে সাদা ফুলের আধিক্য দেখা যায় না, অধিক উচ্চতায় নানা বর্ণের ফুলের সমারোহ। ১২০০০-ফুটের অধিক উচ্চতায় বেশিরভাগ ফুলের রঙ হয় বেগুনি অথবা নীল। ওখানে লাল ফুল, সাদা ফুল নাই বললেই চলে।। এর কারণ _ওখানে ঐ অধিক উচ্চতায় সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি বা ultra-violet ray তীব্র ক্রিয়াশীল, ফলে গাছগুলো ঐ রশ্মি বেশি বেশি শোষণ করতে বাধ্য হয়। হিমালয়ের এই ধরণের গাছগুলোর ঔষধি গুণ অত্যন্ত বেশি। বিভিন্ন জীবনদায়ী ঔষধ তৈরি হোতে পারে –ঐসব গাছ-গাছড়া থেকে। সমভূমি অঞ্চলেও নীল বা বেগুনি রঙের ফুলের মধ্যে ঔষধিগুণ বেশি হয়ে থাকে।।
কিন্তু অবাক হওয়ার মতো ব্যাপার কি জানো তো ঐ যে বলা হোলো ১২০০০-ফুটের অধিক উচ্চতায় যেখানে মাইলের পর মাইল অসমতল ভাবে বিন্যস্ত শুধু বরফ আর বরফ, সেখানে কোথাও হয়তো বেশ কিছুটা স্থান সমতল এবং সেখানে ছোটো ছোটো ঝোপঝাড়ের মতো ফুলের গাছ রয়েছে। যে কেউ দেখলে মনে করবে বোধয় এগুলিকে যত্ন করে সারিবদ্ধভাবে লাগানো হয়েছে। আর ঐ গাছগুলিতে থরেথরে ধরে রয়েছে বাহারী বর্ণযুক্ত ফুল ! ঐ অপূর্ব সুন্দর দৃশ্য দেখে আমাদের কি আনন্দ যে হোতো! আর ঈশ্বরের মহিমার কথা স্মরণ করে কৃতজ্ঞতায় শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসতো ! ঐ নির্জনে নিভৃতে যেখানে কখনোই কোনো মানুষের পদচিহ্ন পড়ার আশাই নাই সেখানেও এইরূপ অপূর্ব সৃষ্টি!! আর শুধু তাই নয় _কেমন সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো – যেন সত্যিই মনে হোতো এক কল্পরাজ্যে এসে পড়েছি আমরা! জানো, ঐসব দেখে ঈশ্বরের প্রতি এতো অনুরাগ ও কৃতজ্ঞতাবোধ জাগতো এবং মনে এতো আনন্দ হোতো যে, আমরা বরফের উপর কয়েকজন উলঙ্গ মানব নৃত্য করতে শুরু করতাম!! ভাবো, যদিও সেখানে আমাদের নাচ দেখার জন্য অন্য কোনো লোক ছিল না কিন্তু কোনো গ্রহ বা উপগ্রহ (Satellite) থেকে যদি কেউ ওটা দেখতো তাহলে কি তারা আমাদের ঐ আনন্দের কারণটি কি তা অনুধাবন করতে পারতো? কখনোই পারতো না ! ওটি ছিল আমাদের নিজস্ব বোধ! ওটি ছিল আমাদের ভিতরকার আনন্দ প্রকাশের সহজাত অভিব্যক্তি !!
