জিজ্ঞাসু: ~ আপনারা ঐরকম বরফের রাজ্যে থেকেও সকলেই উলঙ্গ ছিলেন?

গুরুমহারাজ : ~ ওখানে পোশাক পাবো কোথায়? আমি যখন বাড়ী থেকে বেরোই তখন আমার পরনে ছিল একটা খাঁকি প্যান্ট আর একটা সাদা হাফশার্ট। কিন্তু সেগুলো আর কতদিন টিকবে? রাস্তায় যে পোশাক পাইনি তা নয়, অনেক আখড়ায় কম্বল দিতো। কিন্তু হিমালয়ের ঐ সমস্ত অঞ্চলে যাঁদের সঙ্গে ঘুরছিলাম এবং যে ভাবে তাঁরা আমাকে নিয়ে এক-একটা চূড়া অতিক্রম করছিলেন, সেই উচ্চতায় ঐ ছেঁড়া জামায়(ততদিনে জামাটি জীর্ণ হয়ে গা থেকে আপনিই খুলে গিয়েছিল)এক-আধটা কম্বলে কি শীত ভাঙতো ? সেইজন্যেই হয়তো ওনারা(নাঙা সাধুরা)জন্মলগ্নের পোশাকটা(উলঙ্গ হয়ে থাকাটা)-ই ঠিক বলে মনে করেছিলেন।

হ্যাঁ, যা বলছিলামহিমালয়ের ঐ অঞ্চলে প্রায় ১৪০০০ ফুট উঁচুতে যে ফুলগাছগুলির কথা বলছিলাম_ সেগুলি যেমন অতীব সুন্দর ঠিক তেমনই এগুলি প্রাণঘাতীও বটে ! সাধুদের মধ্যে একটা চলতি কথা আছে “শিবক্ষেত্র হিমালয়”। তাই ওরা জানে যে, শিবজী(শিবস্থিতির বা উচ্চ কোটির সাধক) ছাড়া অন্য কেউ ঐ ফুলগাছে হাত দিতে পারে না অথবা ঐ সমস্ত ফুল তুলতে পারে না। সত্যিই ওই গাছগুলিতে হাত দেওয়া মারাত্মক বিপদ ! এর বিজ্ঞানটা কি জানো তো— সূর্যের অতি বেগুনী রশ্মির প্রভাবে বরফের উপর সঞ্চিত জলকণাতে তড়িৎ বিশ্লেষণ ঘটে যায়। ফলে একধরণের electricity তৈরি হয়। এবার গাছগুলোও বরফাচ্ছন্ন থাকে, দিনের দিকে রোদ্দুরে গলে যায় বরফ। এই সময়ই ঐরকম electricity তৈরি হয়। ওই স্থানে সৃষ্ট electricity-র ঠিক মতো earth connection হয় না, ফলে একটা high voltage electricity ঐ সারি সারি গাছগুলোয় সবসময় থেকে যায়। বুঝে বা না বুঝে কেউ হাত দিলেই মৃত্যু অথবা একটা বড় ধরণের accident ঘটে যেতে পারে!

আমি ওখানে থাকাকালীন নিজের চোখে দেখেছিলাম একজন সাধুকে আবেগের বশবর্তী হয়ে ঐ গাছগুলিতে হাত দিতে ! আর হাত দেবার সাথে সাথেই গোটা হাতটা বেগুন পোড়ার মত পুড়ে গিয়েছিল। তবে কি আশ্চর্য জানো সাধুটি ঐ অবস্থাতেই প্রায় ১ মাস ঘোরার পর তবে হরিদ্বারে ফিরে চিকিৎসার ব্যবস্থা করে। তখন অবশ্য জায়গাটায় গ্যাংগ্রীন হয়ে গিয়েছিল—শুধু হাড় ছাড়া আর কোনো মাংস‌ই ছিল না। কি অসাধারণ ধৈর্য এবং সহ্য ক্ষমতা ঐ যোগীর _তা ভাবো একবার ! অবশ্য ঐরকম (১২০০০-১৪০০০ফুট) উচ্চতায় থাকার ফলে অত্যধিক কম তাপমাত্রায় দ্রুত পচন হোতে পারেনি। তাহলেও শুধু সংকল্প রক্ষা(হিমালয়ের নির্দিষ্ট অংশ পরিক্রমা)-র জন্য অত কষ্ট সহ্য করার মতো মানুষ কজন আছে ?

যাইহোক, আমি এই ধরণের ঘটনা ঘটতে দেখেছিলাম, আবার সহযাত্রী সাধুদের কাছ থেকে শুনেছিলামও এই ধরণের অনেক ঘটনা। ঘটনার সত্যতা পরীক্ষা করার জন্য আমি নিজেও ঐ গাছগুলিতে দিলাম হাত__ কিন্তু কি আশ্চর্য! আমার কিছুই হোলোনা। এইটা দেখে সঙ্গের সাধুরা বললো –হয়তো কোনো কারণে ঐ সময় electricity neutralise(আর্থিং) হয়ে গিয়েছিল, তাই আমি রক্ষা পেয়েছিলাম !

এই ধরণের বিপদ ছাড়াও, ওখানে দিনের বেলায় চলার সময় সামনের দিকে সোজাসুজি তাকিয়ে চলাও খুব বিপজ্জনক। ঐ সব স্থানে চলাচলের জন্য ‘ত্রাটক বিদ্যা’ বলে এক ধরণের যোগ শিখতে হয়। আর তাছাড়া চোখকে হাতে করে বেঁকিয়ে ৯০° কোণ করে রেখে সামনে তাকাতে হয়, নাহলে বরফের উপর আলোর radiation সরাসরি চোখে পড়ে চোখের কর্ণিয়া নষ্ট হয়ে যাবে এবং ব্যক্তিটি একেবারে অন্ধ হয়ে যাবে। দেখবে পর্বতারোহীরাও এই বিপদ থেকে বাঁচতে বিশেষ ভাবে প্রস্তুত এক ধরণের Sunglass ব্যবহার করে। কিন্তু সাধু-সন্তরা ওইসব পাবে কোথায় ? তাই তারা আত্মরক্ষার উপায় নিজেরাই বের করে নিয়েছে। এছাড়া ওখানে সবসময় ঝুরঝুর করে বরফ ঝরে চলেছে, ফলে চোখের পাতায় বরফগুঁড়ো জমে যায় । তাছাড়া অতিরিক্ত ঠাণ্ডায় তুমি চোখের পেশীর শক্তিতে বেশিক্ষণ চোখ খুলে রাখতেও পারবে না, হাতে করেই চোখকে খুলে রাখতে হয়।

ত্রাটক বিদ্যা” জানা থাকার ফলে একবার দৃষ্টিপাত করলেই বহুদূর পর্যন্ত দেখা যায়—এমনকি পথ উঁচু-নীচু হলেও দেখা যায়। ব্যাপারটা কি রকম জানো তো—আমাদের দৃষ্টি সাধারণভাবে অপসারি হয়ে সরাসরি সামনের দিকে যায় অর্থাৎ চোখের দৃষ্টি যতদূরে যায় তত ছড়িয়ে যায়। কিন্তু ত্রাটক বিদ্যায় এইটাকে করা হয় অভিসারী অর্থাৎ দূরের বস্তুর দিকে একাগ্র ভাবে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলে সেটাকে আরও নিখুঁত এবং স্পষ্ট দেখা যাবে ! শকুন তো এই পদ্ধতিই অবলম্বন করে। ওরা ঘুরে ঘুরে অনেক উঁচুতে ওঠে এবং মৃত জীবজন্তু খুঁজে বেড়ায় আর ঐরকম অভিসারী দৃষ্টির সাহায্যে দেহটাকে বিশাল এবং স্পষ্ট দেখে ! এর ফলে ওরা পড়ে থাকা জীবদেহটা মৃত না জীবিত তা নিখুঁতভাবে বুঝতে পেরে তবেই নীচে নেমে আসে।

অবধূত(অবধূতাচার্য দত্তাত্রেয় বিভিন্ন পশু-পাখি, মানুষ ইত্যাদিদের কাছ থেকে ২৪-টি শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। তাই অবধূতের ২৪-টি গুরু ছিল)শকুনের কাছ থেকে এই বিদ্যা শিখে পরম্পরাগতভাবে পরবর্তীকালে তা চালু করেছিলেন।

লোকনাথ ব্রহ্মচারী মহাযোগী ছিলেন। তাঁর ত্রাটক সহ বহু যোগ করায়ত্ত ছিল। তাঁর জীবনে একবার একটা ঘটনা ঘটেছিল, সেটাই বলছি শোনো। প্রারব্ধবশতঃ কোনো কারণে ওনাকে একবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে হয়েছিল। উনি আদালতে সাক্ষ্য দেবার সময় কোর্টে উপবিষ্ট তৎকালীন ইংরেজ অফিসার বা জজসাহেবের সামনে তাঁর দূরদৃষ্টি(ত্রাটক বিদ্যার প্রয়োগ) ক্ষমতার দ্বারা বলে দিয়েছিলেন যে, সেখান থেকে কয়েক মাইল দূরে একটা গাছের কাণ্ড বেয়ে পিঁপড়ের সারি খাদ্য মুখে নিয়ে উঠছে। সাহেবরা ঘটনার সত্যতা প্রমাণের জন্য ঘোড়সওয়ার পাঠিয়ে দেন এবং তারা গিয়ে দেখে লোকনাথবাবা যা বলেছিলেন তা নিখুঁতভাবে সত্য !

লোকনাথবাবাও তো হিমালয়ে দীর্ঘদিন ছিলেন। উনি বরফের রাজত্বে কয়েকবছর কাটিয়েছিলেন। ওনার সাথে ত্রৈলঙ্গ স্বামী এবং ইরাকের বিখ্যাত সুফীসাধক আব্দুল কাদিরও (যিনি সুফী সম্প্রদায়ের একজন অন্যতম প্রবক্তা) ছিলেন। এমনও শোনা যায় যে, ওনারা তিব্বত হয়ে, সাইবেরিয়ার উপর দিয়ে আলাস্কা রেঞ্জ পার হয়ে, নরওয়ে হয়ে উত্তর মেরু পর্যন্ত গিয়েছিলেন ৷৷