জিজ্ঞাসু :— “৬৪ কলা সিদ্ধি”_ বলতে ঠিক ব্যাপারটি কি বোঝায় মহারাজ ?
গুরুমহারাজ :— কলা জানোনা – Art ! যেমন গীত, বাদ্য, নৃত্য, চিত্র ইত্যাদি এক-একটি Art বা কলা। বহু সাধক আছেন এইরূপ এক-একটি কলাসিদ্ধ, কেউ কেউ আবার একাধিক কলায় সিদ্ধ । ওঁকারনাথ ছিলেন সঙ্গীতে সিদ্ধ, বর্তমানের রবিশঙ্কর সেতারবাদনে সিদ্ধ। সাধনা করতে করতে এক-একটা কলায় বা এক-একটা ক্ষেত্রে কারও Perfection এসে গেলেই সেই ব্যক্তি সেই ক্ষেত্রে সিদ্ধ হ’ন। কিন্তু শিব এবং বিষ্ণু অর্থাৎ নটরাজ এবং নটবর একসাথে ৬৪ কলাতেই সিদ্ধ ছিলেন।
নৃত্যকলায় সিদ্ধ_এমন কারুকে তোমরা হয়তো দেখোনি কিন্তু হিমালয়ে একটা এমন সন্ন্যাসী পরম্পরা রয়েছে, যাঁরা নৃত্যে সিদ্ধ আর তাঁদের সাধনা-আরাধনা- নিবেদন-বক্তব্য—সবই চলে নৃত্যের ভঙ্গিমায় এবং মুদ্রার মাধ্যমে। বৈখরীতে কোনো কথা তাঁরা বলেন না।
আমি সন্ন্যাস নেবার পর(১৯৮১/৮২) কিছুদিন হৃষীকেশে কৈলাস আশ্রমে ছিলাম। ওখানে তখন অনেক সন্ন্যাসী- ব্রহ্মচারীরা থাকতো। তার মধ্যে সচ্চিদানন্দ ব্রহ্মচারী নামে একজনের সাথে আমার খুবই বন্ধুত্ব ছিল। কোনো একদিন নেপালের মহারাণীর দেওয়া ভাণ্ডারায় ঋষিকেশের ছোটো বড়ো সমস্ত আশ্ৰম নিমন্ত্রিত হয়েছিল, আর কৈলাস আশ্রমের তো কথায় নেই—যেন তার উপরই সমস্ত ভার !
যাইহোক, ঐ আশ্রমের অধ্যক্ষ মহারাজের নির্দেশমতো আমরা সকল নবীন সন্ন্যাসী ও ব্রহ্মচারীরাও গেছিলাম ঐ ভাণ্ডারায় যোগ দিতে। Senior সন্ন্যাসীরা আমাদের গাইড করে নিয়ে গিয়েছিলেন।
ওখানে শুধু খাওয়া-দাওয়াই নয়—ধর্ম আলোচনার জন্য বিরাট Stage হয়েছিল, যেখানে বিভিন্ন আশ্রমের মণ্ডলেশ্বররা বসার সুযোগ পেয়েছিলেন এবং তাঁরা আধ্যাত্মিক তত্ত্বের উপর নানান বক্তব্য রাখছিলেন। আমাদের মতো অনেকে,প্রায় হাজার কয়েক শ্রোতা নীচে বসে বসে তাঁদের বক্তব্য শুনছিলাম। নিচে হাজার হাজার শ্রোতা, আর বড় স্টেজে মণ্ডলেশ্বরেরা বা Senior সন্ন্যাসীরা বসে রয়েছেন। ঋষিকেশ কৈলাস আশ্রমের Senior মহারাজরাও স্টেজে রয়েছেন। তাঁদের মধ্যেও কেউ কেউ বক্তব্য রাখছিলেন। হঠাৎ একজন উলঙ্গ সন্ন্যাসী ডমরু বাজাতে বাজাতে সেখানে হাজির হলেন। দীর্ঘদেহ, ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া জটা আর হাতে ডমরু, যেন মনে হচ্ছে স্বয়ং শিব । তিনি কি করলেন জানো—একলাফে Stage-এ উঠেই ডমরুর তালে তালে নৃত্য শুরু করে দিলেন। কি অপূর্ব সেই নৃত্য !! যেমন নৃত্যের ছন্দ, তেমনি তাল, তেমনি মুদ্রা এবং কি অপূর্ব মনোমুগ্ধকর ভঙ্গিমা!! তাঁর মুদ্রা, তাঁর সমস্ত অঙ্গ- প্রত্যঙ্গের অভিব্যক্তি যেন স্পষ্টভাবে কথা বলে দিচ্ছিলো ! বক্তাগণ যাঁরা স্টেজে ছিলেন, তাঁরাও বিহ্বল হয়ে সেই অদ্ভুত নাচ দেখছিলেন। সেই সময় একজন প্রবীন সন্ন্যাসী মাইক্রোফনে বক্তব্য রাখছিলেন, তিনিও মাইক ছেড়ে দূরে দাঁড়িয়ে এই অপূর্ব দৃশ্য দেখছিলেন।
ঐ দিনের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন নেপালের মহারাণী। ফলে এলাহি ব্যাপার ! যেমন খাওয়া দাওয়া, তেমনি সাধু-সন্তদের উপঢৌকন, আর তেমনি বিরাট স্টেজ নির্মাণ করা হয়েছিলযাতে অনেক senior সাধু একসাথে বসতে পারেন। কিন্তু সেই শিবকল্প সন্ন্যাসীর পা নৃত্যের ছন্দে ছন্দে এতো দ্রুত- লয়ে সমস্ত স্টেজ-ব্যেপে বিচরণ করছিল_ যেন মনে হচ্ছিলো মেঘের মধ্যে বিদ্যুতের চমক খেলে যাচ্ছে।
আমি ঐ অদ্ভুত সাধুটির নৃত্যের ভঙ্গিমায় বলে দেওয়া সমস্ত কথা বুঝতে পারছিলাম, উপস্থিত জনেদের মধ্যে আরও হয়তো দু-একজন বুঝেছিলেন__ তবে সকলের পক্ষে ঐ নৃত্যের অর্থ বোঝা সম্ভব হচ্ছিলো না। আমি সচ্চিদানন্দ মহারাজকে আস্তে আস্তে উনি কি বলতে চাইছেন তা বলে দিচ্ছিলাম। সচ্চিদানন্দও মাঝে মাঝেই সাধুটির নাচের ভঙ্গিমার অর্থ আমার কাছে জিজ্ঞাসা করে জেনে নিচ্ছিলেন, আমাদের কথোপকথনের জন্য পাশের সাধুরা বিরক্ত হোচ্ছিলেন–প্রত্যেকের এতোটাই সেই অদ্ভুত নাচের প্রতি একাগ্রতা কাজ করছিল।
একজন তো বলেই বসলেন, ‘এইযে! তুমি একটু চুপ করো, তুমি খুব বোঝো_ আজেবাজে যা তা বলে চালিয়ে দিচ্ছো। আমরা কি আর এসব বুঝি না!’ একথা শুনে একজন প্রবীণ সন্ন্যাসী তাঁদেরকে ধমকে দিয়ে বললেন —”:ঐ ছেলেটি ঠিকই বলছে—নৃত্যের মাধ্যমে ঐ সাধুটি এই কথাগুলিই বলছেন”।
ঐ যে একটু আগে বলছিলাম আড়াই হাজার বছর বয়সী সাধুবাবার কাছ থেকে প্রাপ্ত বিদ্যার কথা, ঐ বিদ্যা আমার করায়ত্ত থাকায় আমার তো নৃত্যকলার অর্থ বুঝতে কোনো অসুবিধাই হচ্ছিলো না। কিন্তু যাঁরা এই বিদ্যা জানেন না__ তাঁদেরকে বোঝাই কি করে বলো দেখি!!
