জিজ্ঞাসু :— তাহলে পৌরাণিক যুগের কথিত যে ক’জন এখনও বেঁচে আছেন, যেমন হনুমান বা অশ্বত্থামা__ইত্যাদিদের সাথে হিমালয় ভ্রমণকালে আপনার সাক্ষাৎ হয়নি ?
গুরুমহারাজ :— শাস্ত্রে রয়েছে সাতজন ব্যক্তি(হনুমান,বিভীষণ,অশ্বত্থামা,ব্যাসদেব,কৃপাচার্য,বলি, পরশুরাম)নাকি আজও শরীর ধারণ করে রয়েছেন। বিভিন্ন সাধু পরম্পরাতেও দেখেছি ওনারা একথা বিশ্বাস করেন যে, বিশাল শরীরধারী অশ্বত্থামা বা বিভীষণকে নাকি মাঝে মাঝে চাক্ষুষ করা যায় ! অনেকেই আমাকে বলেছেন_ ‘পূর্ণকুম্ভে নাকি ওঁরা স্নান করতেও আসেন। কয়েক হাজার বছরের ব্যবধানে ওনাদের শরীরগতভাবে অনেক পরিবর্তনও হয়েছে’– ইত্যাদি সব কথা প্রচলিত রয়েছে।
আমি হিমালয়ের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরার সময় অনেক পার্বত্য উপজাতিদের গ্রামে যখন যেতাম, তখন ঐসব গ্রামবাসীদের অনেককে বলতে শুনেছি যে, তারা অশ্বত্থামাকে দেখেছে ! এমনকি কোনো কোনো গৃহের আঙিনায় হঠাৎ করে আবির্ভূত হয়ে ‘তেল দাও’ বলে সে দাঁড়িয়ে পড়ে! গৃহীরা একটু সরষের তেল তার হাতে দিলেই তাড়াতাড়ি মাথার তালুতে দেয় এবং সঙ্গে সঙ্গে অদৃশ্য হয়ে যায়। অশ্বত্থামার মাথার ঘা নাকি আজও রয়েছে এবং এইজন্য তার গা দিয়ে একটা উৎকট গন্ধ বেরোয় ৷
একজন গ্রামবাসী আমায় বলেছিল যে, বহুপূর্বে সে একবার গভীর জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে পথ হারিয়েছিল। পথের সন্ধানে উল্টোদিকে হেঁটে সে বহুদূরে চলে গিয়েছিল এবং সন্ধ্যা পর্যন্ত পথ খুঁজে পায় নি। রাত্রিটা একটা গাছে কোনোরকমে কাটিয়ে পরদিন সে আবার হাঁটা শুরু করে একটা এমন জায়গায় গিয়ে পৌঁছেছিল_ যেখান থেকে সে বুঝতে পারছিল যে, তার পক্ষে আর পথ চিনে তার নিজের গ্রামে ফেরা সম্ভব নয়। তখন অনন্যোপায় হয়ে সে আকুলপ্রাণে জোরে জোরে সাহায্যের জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা জানাতে শুরু করেছিল ।হঠাৎ সে দেখে দীর্ঘদেহী একজন পুরুষ, যার মাথায় দগদগে ঘা সেখানে উপস্থিত হোলো। কাঠুরিয়াটির কান্নার কারণ কি সব শুনে সে বলেছিল, “ঠিক আছে, তুমি এখন চোখ বন্ধ করো”। কাঠুরিয়াটি চোখ বন্ধ করতেই দীর্ঘদেহী লোকটি তার হাত চেপে ধরেছিল। এবার লোকটির মনে হয়েছিল কিছুক্ষণ যাবৎ যেন একটা প্রচণ্ড কম্পনশীল অবস্থার মধ্যে দিয়ে তারা উড়ে চলেছে। অল্পক্ষণের মধ্যেই সেই অদ্ভুত দীর্ঘদেহী ব্যক্তিটি তাকে চোখ খুলতে বলেছিল। চোখ খুলতেই দেখা গেল কাঠুরিয়াটি একেবারে তার গ্রামে বাড়ীর সামনে দাঁড়িয়ে আছে, আর তারপরেই সেই মানুষটিও অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল!
তা ঐ কাঠুরিয়াটি আমাকে নিজে এই ঘটনাটি বলেছিল এবং সে এটাও বলেছিল যে, ওদের গ্রামগুলিতে সবাই পুরুষানুক্রমে জানে যে_ বনে জঙ্গলে গিয়ে বিপদে পড়লে অশ্বত্থামাকে আহ্বান করলেই তার সাহায্য পাওয়া যায়।
দ্যাখো, আমার নিজের সাথে অশ্বত্থামার সাক্ষাতের ব্যাপারটা আলাদা রকম ভাবে হয়েছিল কিন্তু সাধারণ মানুষ আজও তার দেখা পায় এবং তার দ্বারা আজও তারা উপকৃত হয়ে চলেছে।
এইভাবেই “হিমালয়” সাধারণ মানুষের কাছে দুর্জ্ঞেয় এবং রহস্যাবৃত হয়েই থেকেছে — আর থাকবেও চিরকাল! ওখানে এইরকম কত রহস্য যে লুকিয়ে আছে, যা সাধারণ মানুষ বুদ্ধি দিয়ে কখনোই ব্যাখ্যা করতে পারবে না ৷৷
