(গুরু মহারাজের ছোটোবেলায় হিমালয়ের গভীরতম প্রদেশে ভ্রমণকালীন সময়ের কথা এখানে আলোচনা করা হচ্ছিলো। এখন পরম গুরুদেব রামানন্দ অবধূতের সাথে ওনার সাক্ষাৎ-এর কথা হচ্ছিলো।। আজ পরবর্তী অংশ…..)
……বেশ কিছুদিন হয়ে গেল—উনি আমাকে নীচে ফিরে আসার অনুমতি দিচ্ছেন না দেখে আমি একদিন ফিরে আসার কথা পাড়লাম! উনি আমাকে শেষ পরীক্ষা করার জন্য একটা গল্পের অবতারণা করলেন। গল্পটা হোচ্ছে_ অরণ্য সংলগ্ন এক পর্বতের গুহায় একটি সাধু বাস করতেন। সাধনায় নিমগ্ন সাধুটির পূর্ণত্ব প্রাপ্তির জন্য যেটুকু সাধনা বাকী ছিল, তা ঐ জন্মেই তাঁর শেষ করার সংকল্প ছিল এবং হয়তো হয়েও যেতো। কিন্তু মাঝখান থেকে একদিন এমন একটা ঘটনা ঘটে গেল যে , সব গোলমাল হয়ে গেল! কান্ডটা হোলো কি—একদিন একটি ক্ষুধার্ত বাঘ একটা হরিণকে তাড়া করতে করতে একেবারে ঐ সাধুটির গুহার কাছে এসে হাজির হয়েছিল। প্রাণভয়ে ভীত হরিণ সাধুটির দিকে করুণ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে একবার তাকিয়েই তার গুহার মধ্যে আশ্রয় নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বাঘটিও সেখানে এসে হাজির হোলো। বাঘ সাধুবাবাকে জিজ্ঞাসা করলো_ ‘হরিণটা কোথায় ?’ আশ্রিতকে আশ্রয় দেওয়া বা রক্ষা করা সাধুর কর্তব্য, অতএব সন্ন্যাসী বলে দিলেন তিনি হরিণের কথা কিছুই জানেন না। সাধুর কথা বিশ্বাস করে বাঘটি স্থানত্যাগ করে চলে গেল। হরিণটিও বাঘের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে আনন্দ করতে করতে জঙ্গলে চলে গেল।
এদিকে সাধুবাবা জীবনের বাকী কটা দিন সাধনার গভীরে ডুব দিয়ে তার অন্তিম দিনের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলেন। অবশেষে সেই দিন এসে গেল কিন্তু তাঁর মৃত্যুর সময় তাঁকে নিতে এলো যমদূত। সাধুটি বললেনতিনি একজন সিদ্ধ যোগী, তাঁর তো এইজন্মেই মুক্তি হবার কথা, আর তো তাঁর জন্ম হবার কথা নয় ! তাহলে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর সময় যেমন যমদূত তাকে নিতে আসে– তেমনটা হবে কেন ? উত্তরে যমদূত বললো “সাধুবাবা ! আমার উপর যমরাজের যা আদেশ ছিল, আমি তাই পালন করছি—আপনার যা বলার সেখানেই বলবেন” এই বলে তাঁকে ধরে নিয়ে গেল যমরাজের কাছে। সেখানে সাধুটি তাঁকেও যমালয়ে তাকে নিয়ে আসার কারণ জিজ্ঞাসা করায় ধর্মরাজ তাকে ঐ দিনটির কথা স্মরণ করালেন। সাধু বললেন তিনি তো কোনো অন্যায় করেননি কারণ তার আশ্রয়ে শরণাগত হরিণ তো রক্ষা পেয়েছে—কাজেই ধৰ্মতঃ ঠিক কাজই হয়েছে! উত্তরে ধর্মরাজ বললেন, ‘হরিণ রক্ষা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু বাঘটির মৃত্যু ঘটেছে, কারণ ঈশ্বরের নিয়মে ঐ দিন ঐ হরিণটিই ছিল বাঘটির ভক্ষ্য, তাকে তুমি লুকিয়ে রেখেছিলে, এতে ঈশ্বরের বিধান লঙ্ঘন করা হয়েছে_ তাছাড়া বাঘটির সঙ্গে মিথ্যাচার করা হয়েছে। এতগুলো অন্যায় কর্মের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য তাঁকে আবার শরীর নিতে হবে এবং পুনরায় সাধনা করতে হবে।’
ফলস্বরূপ সাধুটির আবার নতুন শরীর হোলো, কালের নিয়মে সেই জীবনেও তিনি সন্ন্যাসী হয়ে ঐ একই গুহায় ধ্যান, জপ করে সাধুজীবন কাটাতে লাগলেন। তারপর একদিন ঠিক আগের মতোই একটা ক্ষুধার্ত বাঘ একটা হরিণকে তাড়া করে গুহার সামনে এলো। হরিণ আশ্রয় ভিক্ষা করে ঐ গুহার অভ্যন্তরে ঢুকে পড়লো এবং একটু পরেই বাঘ এসে একই রকম ভাবে হরিণের সন্ধান চাইলো। এবার কিন্তু সাধুবাবা বাঘটিকে হরিণের সংবাদ বলে দিলেন, ফলে মহানন্দে বাঘ হরিণটিকে মেরে মুখে করে নিয়ে আনন্দ করতে করতে চলে গেল। সেবারও সাধুবাবার মৃত্যুর পর সেই যমদূত আবার এসে উপস্থিত এবং কোনো কথা না শুনে একেবারে ধর্মরাজের কাছে নিয়ে হাজির করলেন সাধুটিকে। সাধুটি এবারেও যমরাজের কাছে তাঁকে সেখানে আনার কারণ জানতে চাইলো ! এবার ধর্মরাজ উত্তর দিলেন, ‘আশ্রিতকে সাধুর রক্ষা করা কর্তব্য, কিন্তু তা না করায় একটা নিরীহ হরিণের প্রাণনাশ হয়েছে—সেই কর্মফল মেটাতে আবার সাধুটিকে শরীর নিতে হবে।’
সুতরাং আবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ফিরে গিয়ে সাধুটিকে পুনরায় নতুন শরীর নিতে হোলো এবং শৈশব, বাল্য, কৈশোর কাটিয়ে সন্ন্যাসধর্ম অবলম্বন করে ‘কার্যকারণ’ সূত্রে এবারেও সেই একই গুহায় সাধনা করতে শুরু করলো। জীবন-সায়াহ্নে এসে পূর্ব পূর্ব জীবনের ন্যায় এবারেও সেই একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো। এবার কিন্তু সাধুটি হরিণকেও কিছু বললেন না, বাঘকেও কিছু বললেন না-- নিজের ভাবে থেকে চোখ বন্ধ করে নিজের সাধনায় মগ্ন থাকলেন। ফলে এবার আর তার কোনো কর্মফল হোলো না এবং সাধুটির মুক্তি ঘটলো।
এই গল্পটা বলার পর গুরুদেব আমাকে বললেন, 'দেখলে তো বৎস! কি সাংঘাতিক এই কর্মফলের ব্যাপার! কতো তুচ্ছ ঘটনার কতো বড়ো মাশুল দিতে হোলো সাধুটিকে! এইভাবে সাধকের শত শত জন্ম লেগে যায় কর্মফল মেটাতে। সুতরাং এইতো জগৎ—কি আছে এতে ? তোমার আর ফিরে গিয়ে কাজ নাই_তুমি এখানেই আমার কাছে থেকে যাও।' আমি কোনো উত্তর না দিয়ে নীরবে বসে বসে তাঁর সেবা করে যেতে লাগলাম । অনেকক্ষণ পর উনি আবার জিজ্ঞাসা করলেন—'কিছু উত্তর দিচ্ছো না যে!' আমি বললাম, _"ভগবন্! আপনি জ্ঞানী সুতরাং এই জগতে আপনারই বা কি ভূমিকা আর আমারই বা কি ভূমিকা_সেই সম্বন্ধে আপনি সম্পূর্ণরূপে জ্ঞাত আছেন ! তবু যখন আপনি জানতে চাইছেন তাই আমি ঐ গল্পের ঘটনাতেই ফিরে যাবো। আপনার গল্পের সন্ন্যাসীটির স্থানে যদি আমি থাকতাম, তাহলে প্রথমবার যখন হরিণটি প্রাণভয়ে গুহায় আশ্রয় নিতে এসেছিল _আমি তখন তাকে সেখানেই আশ্রয় দিতাম এবং ক্ষুধার্ত বাঘটি যখন হরিণকে খুঁজতে এসেছিল তখন তাকে সত্য কথা বলতাম আর নিজেকে বাঘের কাছে নিবেদন করে দিতাম অর্থাৎ বাঘকে বলতাম হরিণের প্রাণভিক্ষা দাও আর আমার দেহের মাংস গ্রহণ করে তোমার ক্ষুন্নিবৃত্তি করো!!"
আমার মুখ থেকে এই কথাগুলি শুনে পরমজ্ঞানী হয়েও গুরুদেব কাঁদতে লাগলেন ! তাঁর শুস্ক জ্ঞানের মোড়ক খসে গিয়ে প্রেমসত্তা ক্রিয়াশীল হয়ে গেল ! তিনি তাঁর শরীরের সমস্ত জড়তা ঝেড়ে ফেলে একলাফে বিছানা থেকে উঠে পড়ে আমাকে বহুক্ষণ ধরে আলিঙ্গন করে রাখলেন ! তারপর আমার মস্তক চুম্বন করে মাথায় হাত দিয়ে আমাকে আশীর্বাদ করে বললেন, ''এই হোচ্ছে বিশুদ্ধ বাউল ভাব ! যাও — এই ভাব অবলম্বন করে সমাজে ফিরে যাও এবং সকলের মঙ্গলের জন্য কাজ করো। তোমার এই শরীর দিয়ে হাজার হাজার মানুষের কল্যাণ হবে, সমাজের সর্বাঙ্গীণ মঙ্গল হবে। গুরুকুল তোমার সহায় থাকবেন।'' আমাকে এইভাবে আশীর্বাদ করে উনি যেন শক্তিহীন হয়ে গিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন। আমি ঐ অবস্থাতেই ওনাকে প্রণাম করে বিদায় নিয়ে বনগ্রামে ফিরে এসেছিলাম এবং এরপর থেকেই এই আশ্রমের কাজ দ্রুত লয়ে শুরু হয়েছিল এবং এখন(১৯৯২/৯৩) এই পর্যন্ত এসে পৌঁছেছে। তবে জানো __একটা ব্যাপার খেয়াল করে দেখেছি যে, উনি(রামানন্দজী)কথার খেলাপ করেননি, যখনই আমি কোনো অসুবিধায় পড়ই বা সমস্যায় পড়ি—আমার গুরুদেব স্থুলে প্রকট হয়ে আমাকে পরামর্শ দিয়ে সমস্যার সমাধান করে দেন। অনেক সময় ওনার সঙ্গী-সাথীদের সাথে করে নিয়ে আসেন অর্থাৎ গুরুকুলের অন্য সদস্যরাও ওনার সাথে থাকে। কিছুক্ষণ কাটানোর পর তাঁরা আবার তাঁদের নিজ নিজ স্থানে চলে যান।।