[হিমালয়ের যোগীদের সাথে সাক্ষাৎ এবং তাঁদের সঙ্গে ওনার আলোচনার পরবর্তী অংশ]
…….যাইহোক ওনার কাছে আমার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা ছিল— ‘আমরা যে পথে যাচ্ছি—এই পথেই কি ফিরবো ?’ উনি বলেছিলেন_ ‘না’। সত্যি সত্যিই আমরা ঐ পথে ফিরতেও পারিনি। কৈলাস থেকে ফেরার পথে আমরা তিব্বতে চীনা সৈন্যদের হাতে আটকা পড়ে গেলাম, তারাই আমাদেরকে অন্য দিকে যেতে বাধ্য করেছিল। আর ওনার কাছে আমার তৃতীয় জিজ্ঞাসাটা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, সেটা তোমাদের বলছি না।
যাই হোক যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছিলো আমরা সেখানেই ফিরে আসি। কিশোর বয়সে প্রতিটি ব্যক্তিরই গর্ভধারিণী মাতা এবং মাতৃভূমির প্রতি একটা মমতা এবং কর্তব্যবোধ বা কিছু ন্যায়-নীতিবোধ ইত্যাদি থাকে। রাজনীতির লোকেরা অর্থাৎ নেতারা এটা জানে, আর তরুণ যুব সমাজের এই আবেগটাকেই তারা কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। পৃথিবীতে যতো আন্দোলন হয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করো_ দেখবে সব জায়গাতেই এই তরুণ-যুব সম্প্রদায়কেই কাজে লাগানো হয়েছে।
তবে আমার ক্ষেত্রে আমি দেখেছি—যে কোনো বয়সেই মাতৃভূমি বলে ভারতবর্ষের প্রতি আমার আলাদা কোনো আকর্ষণ বা আবেগ তৈরি হয়নি। আমার এটা প্রথম থেকেই জানা ছিল যে, ভারতবর্ষ যেহেতু পৃথিবী গ্রহের মাথা তাই এর উন্নতি হোলেই পৃথিবী গ্রহের মঙ্গল। গোটা পৃথিবীটাই আমার আপন, এদেশ-ওদেশ মনে হয় যেন এঘর-ওঘর। যখন ইউরোপের দেশগুলোয় যাই, অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে—‘আপনি বিদেশ গিয়েছিলেন?’ তখন এই ‘বিদেশ’ শব্দটা আমার ভাল লাগে না। ‘বিদেশ’ বা ‘বিদেশী’ কেন ? সকলেই তো আমার একান্ত আপনার, সবই তো আমার স্বদেশ! তবু বলার জন্য অনেক সময় হয়তো এইসব শব্দ ব্যবহার করতে হয়। আমি তোমাদের এইজন্যেই তো বলি যে, এখানে শরীরধারণ করে অনেক সংস্কার আমাকে শিখতে হয়েছে। মানুষের সঙ্গে Communication করার জন্য এসবের প্রয়োজন রয়েছে। দ্যাখো না, আমি যদি তোমাদের ‘কেমন আছো’, ‘কখন এলে’, ‘খেয়েছো তো’–এসব কথা না বলি, যদি চুপচাপ বসে থাকি_ তাহলে কি তোমাদের ভাল লাগবে ? এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েই বলবে, ‘গুরুদেব এখন অন্যরকম হয়ে গেছেন আর আগের মতো নেই !’ তারপর হয়তো আরও দু-একবার আসবে এখানে, তখনও যদি আমার আচরণ একইরকম থাকে অর্থাৎ তোমাদের সাথে কুশল বিনিময় না করি তাহলে তোমাদের অনেকে আসাই বন্ধ করে দেবে। কিন্তু এইরকম পরিস্থিতি হোকসেটা আমি চাই না। কারণ আমি জানি সকল জীবকে ভালোবাসার জন্যই আমার আসা। আমি জানি _ভালোবাসা হোলো সম্রাট, ভালোবাসাই পারে মানুষের স্বভাবকে বদলে দিতে। স্বভাবের পরিবর্তনের ফলে মানুষ তার অন্তর্জগতের পশুভাব, অসুরভাব, দানবভাব, রাক্ষসভাব ইত্যাদি ত্যাগ করে মানুষভাবে আসতে পারবে। তারপর সেখান থেকে পরিবর্তিত হয়ে আবার দেবভাব বা ঋষিভাবে উন্নীত হবে। এই যে ক্রমের কথা বললাম এটাই মানবের অগ্রগতির চিরন্তন ক্রম। কোনো কোনো সময় এই ক্রমের গতি মন্থর হয়। তখনই কোনো না কোনো মহাপুরুষ শরীরধারণ করে আবার ঐ গতিকে ত্বরান্বিত করে দিয়ে যান।
মহাপুরুষদের প্রকৃত কাজ বা কাজের কাজ এটাই। ত্রিতাপক্লিষ্ট মানুষ—মায়া-মোহে আচ্ছন্ন মানুষের সাধ্য কি নিজের চেষ্টায় মহামায়ার বাঁধন কাটতে পারে ! ঈশ্বরেরই শক্তি সদগুরুরূপে ধরায় নেমে এসে মানবকে হাত ধরে মহামায়ার মায়াজাল ছিন্ন করতে সামর্থ্য প্রদান করেন। তাই প্রকৃত গুরু শিষ্যের জন্য যে কি করেন, তা শিষ্য কোনদিনই জানতে পারবে না। জন্ম- জন্মান্তরের ভোগ-ভোগান্তি এক-দুই জন্মে, বড়জোর তিনজন্মেই শেষ করে দেওয়া—একি সোজা ব্যাপার ! যে কোনো একটা বিষয় থেকে উদ্ধার পেলেই উদ্ধারকারীর প্রতি মানুষ কৃতজ্ঞ থাকে বা উদ্ধারকারীও কৃতজ্ঞতা আশা করে । আর এখানে ৮৪ লক্ষ জন্মের কতো সহস্র সহস্র সংস্কার! তার
মধ্যে এখন এই বর্তমান জীবন, এর আগে কতবার মানবজন্মের পূঞ্জীভূত সংস্কার ও কর্মফলের ভোগ-ভোগান্তি থেকে জীবকে উদ্ধার করা কি মুখের কথা ! এই জন্যই গুরুকে মর্ত্যের ভগবান বলা হয়েছে। ভারতীয় আর্যচিন্তায় এইজন্যই দেখা যায় যে, কোনো দেব-দেবীর থেকেও গুরুকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে ।।