গুরুমহারাজ :–আপনি ৬/৭ ঘণ্টা নাম জপ করেন বা ঈশ্বরকে স্মরণ-মননও করেন__ এতো খুবই ভালো কথা ! তবে তার সঙ্গে সংসারের অশান্তির কথা টেনে আনছেন কেন ? সংসারে অশান্তি তো থাকবেই। আপনি শুধু আপনার পারিবারিক জীবনটা দিয়ে বিচার করছেন বলে ভাবছেন শুধু আপনারই অশান্তি কিন্তু তা ঠিক নয় ! এই পার্থিব জগতে শরীর ধারণ করে প্রত্যেকেই কিছু না কিছু অশান্তি ভোগ করে থাকে। এখানে একমাত্র ব্যতিক্রমী তাঁরাই হবেন, যাঁরা কখনই স্ব-স্বভাবের পরিপন্থী হ’ন না।
সংসারে শান্তিতে থাকতে গেলে মাখনের ন্যায় হয়ে যেতে হবে। মাখন জলে মেশে না, জলের উপর ভাসে কিন্তু দুধ জলে মিশে যায়। দুধকে মন্থন করে করে মাখন তুলতে হয়। আবার দেখা গেছে, দুধ কেটে গেলে বা নষ্ট হয়ে গেলে আর মাখন তোলা যায় না। সাধারণ মানুষ যেন ঐরূপ কাটা দুধ_ অনেক সময় মন্থন করেও(সাধন ভজন করিয়ে) মাখন পাওয়া যায় না। আমি অনেককে দেখেছি যতক্ষণ এখানে থাকে, ততক্ষণ বেশ মনে শান্তি পায় কারণ এখানকার আধ্যাত্মিক পরিবেশে তার মনোজগতে অবস্থিত অশান্তি বা ঝামেলার বিষয়গুলো সে সাময়িকভাবে ঝেড়ে ফেলে দিতে পারে।
আশ্রমের পরিবেশ বা সৎসঙ্গের প্রভাব তাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করে। কিন্তু যেই ঐ ব্যক্তিটি এই সার্কেলের(বনগ্রাম আশ্রমের )বাইরে যায়, অমনি তার পূর্বের বিষয়বুদ্ধি মনকে গ্রাস করে ফেলে!!
ঐ অবস্থায় এখানকার শিক্ষা, এই আধ্যাত্মিক কেন্দ্রের vibration ইত্যাদি ম্লান হয়ে যায় ! ফলে আবার সে নতুন নতুন অশান্তি ভোগ করতে থাকে। আশ্রমে আমার সামনে এলেই যে কোনো ধরনের মানুষের মনে কাম-ক্রোধাদি রিপু মাথা তুলতে পারে না। যেমন ওস্তাদ বেদের সামনে সাপ মাথা নত করতে বাধ্য হয়, এখানেও তেমনি হয়।
যাইহোক, আপনার কথার উত্তরে ফিরে আসি_ আচ্ছা বলুন তো __শান্তি কোথায় আছে ?? শান্তি পাওয়া যায় কোথায়?? পারবেন না তো, তাহলে আমি বলছি শুনুন __যিনি শান্তির সন্ধান পেয়েছেন, যিনি নিজে ‘সর্বতোভাবে’ শান্ত হয়েছেন _একমাত্র এইরূপ মানুষের সংস্পর্শে এলে সাধারণতঃ মানুষ শান্তির স্পর্শ পায়। কিন্তু তবুও ঐ আনন্দ বা শান্তি খুবই ক্ষণস্থায়ী ! চিরস্থায়ী শান্তি পেতে হোলে আপনাকেই তা অনুসন্ধান করে খুঁজে পেতে হবে। ডুব দিতে হবে ধ্যানের গভীরে, জ্ঞানের গভীরে অথবা প্রেমের গভীরে।।
ঈশ্বরদর্শন বা আত্মসাক্ষাৎকারই সাধকের জীবনের একমাত্র উদ্দেশ্য। কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় নিয়ম করে জপ-ধ্যান করতে হয়—কারণ এতে চিত্ত শুদ্ধ ও নির্মল হয়। সুতোয় আঁশ থাকলে তা ছুঁচের ছিদ্রে ঢুকতে চায় না, তাই সুতোর প্রান্তভাগটা পাকিয়ে পাকিয়ে Plain করতে হয়। জপ করা যেন সুতোটাকে Plain করা। এটা না করলে ধ্যানে মন বসে না। ধ্যান-জপ নিশ্চয়ই করতে হবে কিন্তু মনে রাখতে হবে যে, জপ-ধ্যানের প্রকৃত উদ্দেশ্য আত্মসাক্ষাৎকার বা সচ্চিদানন্দস্বরূপ আত্মাকে বোধেবোধ করা। আর এই উদ্দেশ্য সফল হোলে তখনই সাধক বোধ করে যে, সমগ্র বিশ্বসংসার জুড়ে শুধু শান্তিই বিরাজমান রয়েছে, শুধু আনন্দই রয়েছে, শুধু প্রেম-ই রয়েছে। আপনি সনাতন ধর্মের অন্তর্গত হ'ন বা যে কোন মতেরই হোন না কেন—সব মতেরই চূড়ান্ত লক্ষ্য সচ্চিদানন্দস্বরূপের বোধ। এই বোধেই পরম শান্তি লাভ হয়।দেখুন, শান্তি বাইরের কোনো বস্তু নয় যে, কিছু মূল্য দিয়ে দু'চার লিটার বা দু'চার কেজি সংসারের জন্য কিনে নিয়ে যাবেন। ওটা একান্তই আপনার নিজস্ব, আপনার খুব নিকটে রয়েছে _একেবারে অন্তরের অন্তস্তলে রয়েছে, তাকে খুঁজে বের করে আনতে গেলে নিজের মধ্যেই নিজেকে ডুব দিতে হয়।
হিমালয়ের এক সাধু আমাকে বলেছিলেন, ‘তোমার সবচাইতে কাছে কি আছে ?' আমি বলেছিলাম—‘অন্তঃকরণ'। উনি বলেছিলেন 'ওখানেই খোঁজ।' বহুদূর যেতে হবে না—গিরি, গুহা, জঙ্গল, প্রান্তর পার হোতে হবে না।
‘ডুব ডুব ডুব রূপসাগরে আমার মন।
তলাতল পাতাল খুঁজলে পাবিরে প্রেম রত্নধন।’ __এই সাগর বাইরে কোথাও নয়, সমুদ্রমন্থনও অন্তর জগতের ব্যাপার। আজও মন্থন করলে তলদেশ থেকে একে একে উচ্চৈঃশ্রবা, লক্ষ্মী, গরল, অমৃত সবই উঠে আসে। যার যেটা দরকার সে সেইটা গ্রহণ করে। “ভাণ্ডেই ব্রহ্মাণ্ডতত্ত্ব” রয়েছে। Micro জানলেই Macro জানা যায়। এইজন্যই শাস্ত্রে বলেছে আত্মসাক্ষাৎকার হোলে ব্রহ্মসাক্ষাৎকার হয়।
সেবা ও সাধনা অর্থাৎ শিবজ্ঞানে জীবসেবা এবং অন্তর্মুখীনতাই বর্তমান যুগধর্ম। তাই শান্তি পেতে হলে বর্তমানের মানবকে এ দুটোর মধ্যে অন্তত একটাকে একান্তভাবে অবলম্বন করতে হবে। ঈশ্বরপ্রীত্যর্থে কর্ম বলতে বহুজনহিতায় নিষ্কাম কর্মকেই বোঝায়, ফুল-বেলপাতা দিয়ে পূজা করাকে বোঝায় না। থিওরিটিক্যাল্ অনেক হয়েছে, এখন দরকার প্র্যাকটিক্যাল। মূর্তিরূপী ঈশ্বরের পূজা না করে অবহেলিত, বঞ্চিত, অনাথ, আতুররূপী ঈশ্বরের পূজা শুরু হোক। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের এই শিক্ষাকেই স্বামীজী নিজের জীবন দিয়ে পালন করে গেলেন এবং নিজে করে পরবর্তী প্রজন্মকে তা শিখিয়ে গেলেন।
আত্মসুখের বাসনা যত কমবে, আসক্তি যত ত্যাগ হবে ততই মানুষ শান্তির স্পর্শ পাবে। আর চিরন্তন শান্তি বা Eternal Peace হচ্ছে জীবের পরম প্রাপ্তি—যা একমাত্র আত্মসাক্ষাৎকার হোলেই সম্ভব। যা পেলে আর কোন চাওয়া বা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে না।
সুতরাং আপনি যদি অন্তরে শান্তি চান, তাহলে আপনি বিবেকযুক্ত বুদ্ধির দ্বারা বিচার করে তা প্রাপ্তির জন্য লেগে পড়ুন !! আপনার জীবনের উদ্দেশ্য হোক—'আত্মনো মোক্ষার্থং জগদ্ধিতায় চ।’ হয় আপনি প্রাণপন প্রচেষ্টায় সাধনার দ্বারা আত্মমোক্ষের দিকে অগ্রসর হ'ন অথবা আত্মসুখের ইচ্ছা বিসর্জন দিয়ে সেবাকার্যে আপনার জীবনকে উৎসর্গ করুন। অবশ্যই আপনি আপনার এই জীবনেই শান্তির সন্ধান পাবেন।।
