জিজ্ঞাসু : আপনি জীবনে তিনবার ভয় পেয়েছিলেন—সেগুলি কি ছোটবেলাতেই ঘটেছিল ?

গুরুমহারাজ : হ্যাঁ, ছোটবেলাতেই বলতে পারো। আমি তোমাদের বলি না মাঝে মাঝে শুধু ধ্যান-জপ, সাধন-ভজন বা যোগাভ্যাসেই যে কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ ঘটে তা নয়, অতি ভয়ে, অতি আনন্দে, অতি আবেগে ইত্যাদি যে কোন ব্যাপারে ‘অতি’ হলেই কুলকুণ্ডলিনীর জাগরণ ঘটতে পারে। একথা তোমাদের বলার কারণ হচ্ছে, ওটা আমার জীবনে প্রত্যক্ষ হয়েছে যে, তাই ঘটনাগুলো বলছি শোন, শুনলেই তোমরা ধারণা করতে পারবে।

প্রথমবারের ঘটনাটা ঘটেছিল যখন, তখন আমি খুবই ছোট। মা উনুনের সামনে বসে পিঠে তৈরি করছিলেন। টগ্ করে ওগুলো ফুটছে, মা ঘুমন্ত অবস্থাতেই হোক আর অন্যভাবেই হোক হুমড়ি খেয়ে ঐ ফুটন্ত দুধের মধ্যে পড়ে যান। গলা থেকে বুক-পেট পুরো অংশটাই একেবারে ঝলসে গিয়েছিল। ঐ বয়সেই আমি মাকে চুল ধরে টেনে তুলেছিলাম। কিন্তু মায়ের অবস্থা দেখে ভয়ে সংজ্ঞা হারাই। ঐ সময়েই মায়ের যাবতীয় কষ্ট নিজের শরীরে নেবার চেষ্টা করতেই দেখলাম কুলকুণ্ডলিনী থেকে শক্তি বিচ্ছুরিত হয়ে শরীরটাকে ঠিক রাখল এবং আমি ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠলাম। অবশ্য মায়ের ঘা সারতে বেশ সময় লেগেছিল।

দ্বিতীয় ঘটনাটা ঘটেছিল যখন, তখন আমার ৪/৫ বছর বয়স। একদিন গভীর রাত্রে বাড়ী হতে আমি বাঘনাপাড়া ষ্টেশন থেকে একটু দূরে যে কালভাটটা আছে, ওখানে বসে আছি। আমি তখনও জানতাম না যে, ঐ জায়গাতেই যত মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে, এমনকি যারা suicide করে তারাও ওখানেই মরে। যাইহোক রাত্রির আকাশের দিকে চেয়ে আমার সময় কাটতো তখন, নানারকম experiment চলতো নিজেকে নিয়ে। সেদিন হল কি, হঠাৎ একটা ট্রেন-আসার শব্দে আমি সচকিত হয়ে গেলাম এবং ট্রেনটা চলে যাবার পর একটা আওয়াজ পাচ্ছিলাম ঠিক অনেকটা সাইরেনের মতো, যেন দূর থেকে ভেসে আসছে ওঁ-ও-ও-ও। ধীরে ধীরে শুনতে পেলাম আওয়াজটা নিকট থেকে নিকটতর হচ্ছে। প্রথমে ভাবলাম ট্রলি, কিন্তু কিছুক্ষণ পর বুঝলাম ট্রলিও নয় কারণ দূর থেকে দেখা যাচ্ছে উঁচু মতন একটা আসছে আর ওঁ-ও-ও-ও আওয়াজের সঙ্গে একটা ধপ-ধপ্‌ আওয়াজ যুক্ত হচ্ছে। ব্যাপারটা কি হতে পারে—ভাবতে ভাবতেই ওটা একেবারে আমার সামনে এসে পড়ল। আর তাকে দেখেই আমার রক্ত যেন হিম হয়ে গেল !

জিনিসটা কি ছিল বল তো—একটা কবন্ধ। দীর্ঘ দেহী আলখাল্লা মতো পরা, শুধু ধড়টা ধপ-ধপ্ করতে করতে রেললাইন বরাবর এগিয়ে যাচ্ছে আর কাটা মুণ্ডটা রেললাইনের ঠিক মাঝখান বরাবর ড্রপ খেতে খেতে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে চলেছে, সেইটা ওঁ-ও-ও-ও করে শব্দ হচ্ছে। আর কবন্ধটা দু’হাত বাড়িয়ে মাথাটা ধরার চেষ্টা করছে আর বিফল হয়ে হাতদুটো বুকে চটাস চটাস্ করে মারছে, কারণ ধরতে গেলেই কাটা মুণ্ডুটা ড্রপ খেয়ে ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে যাচ্ছে। আর কবন্ধটাও তাকে ধরার জন্য আরও একপা করে এগোচ্ছে। যাইহোক চোখের সামনে এই দৃশ্যটা দেখে আমি দেখলাম আমার মস্তিষ্ক থেকে একটা হিমশীতলতা ধীরে ধীরে নীচের দিকে নেমে আসছে। একেই মৃত্যুর তুহিনশীতল স্পর্শ বলে। আমি প্রতি মুহূর্তেই মৃত্যুর পদধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম। কেমন করে আমার বাক্ বন্ধ হল, আমার হাত-পা সব জমে যাবার মতো হল। আমি সব বুঝতে পারছি।

চেঁচাতে চাইছি, পালাতে চাইছি কিন্তু কিছুই করতে পারছি না। বুঝতে পারলাম এইভাবেই অত্যন্ত ভয় পেলে মানুষের কি অবস্থা হয় এবং হার্টফেল করে কেন মারা যায়। কিন্তু তখনই দেখলাম আমার কুলকুণ্ডলিনী থেকে বিপরীতমুখী একটা উষ্ণপ্রবাহ ঐ শীতলতাকে resist (প্রতিরোধ) করতে করতে ওকে over come (অতিক্রম) করল। আমার শরীরের সাড়া ফিরে এল —আমার বাগেন্দ্রিয়, মস্তিষ্ক সবই ক্রিয়াশীল হয়ে উঠল। আমি এক লাফে ওখান থেকে নেমে দে দৌড়। এক দৌড়ে একেবারে ঘরে ঢুকেই বাবার বুকের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লাম। বাবা ঘুম থেকে উঠেই জিজ্ঞাসা করলেন—’কিরে কি হয়েছে, আমি তখন প্রচণ্ড হাঁপাচ্ছি। একটু সুস্থ হয়ে বাবাকে সব কথা খুলে বলতেই বাবা বললেন, ‘আর কখনও ওখানে যেয়ো না। বহুকাল থেকেই ওখানে অনেকজন লাইনে মাথা দিয়ে আত্মহত্যা করেছে ও ট্রেনে কাটা পড়েছে। তাই খ্যানে- অখ্যানে ওখানে নানারকম অশরীরী—প্রেতাত্মা দেখতে পাওয়া যায়, অনেকেই দ্যাখে। আমিও দেখেছি।’ এরপর বাবা আমাকে একটা শিবের কবজ তৈরি করে দিয়েছিলেন। অনেকদিন সেটা হাতে ছিল। তারপর বাবার মৃত্যুর পর ওটা কোথায় খুলে পড়ে গেছে।

তৃতীয় ভয় পাওয়ার ঘটনাটা ঘটেছিল হিমালয়ে গোমুখ যাবার পথে। একদল যাত্রীর সাথেই যাচ্ছিলাম। মাঝরাস্তায় বৃষ্টি হয়ে গেল, বরফাকীর্ণ পাহাড়ি পথ, আমার বয়সও তখন খুব বেশী নয়, ১১/১২ হবে। কাজেই একটু পিছিয়ে পড়েছিলাম। সঙ্গীরা কোথায় থাকবে তা জানিয়ে এগিয়ে চলে গেল। এবার সন্ধ্যার মধ্যে সেখানে পৌঁছতে হবে নাহলে পথে ভালুকের ভয়, কাজেই যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি আমি যাচ্ছিলাম। আমার হাতে একটা ডালের লাঠি ছিল। চড়াই-উতরাই ভেঙে চলেছি। ঠিক সন্ধ্যার প্রাক্কালে একটা মোড় ঘুরতেই একেবারে সামনে হিমালয়ান বিয়ার – মস্ত এক ভল্লুক। তখন পিছুবার উপায় নেই, কারণ ঢালে নেমেছি—উঠার উপায় নেই সামনে ভল্লুক, আর পিছিয়ে পালাবার তেমন ক্ষমতাও নেই কারণ কয়েকদিন ধরে হাঁটা-শরীর ক্লান্তও ছিল। এক পাশে খাদ আর এক পাশে খাড়া পাহাড় । এ অবস্থায় ভল্লুকের হাতে আত্মসমর্পণ করা ছাড়া আর কি উপায় থাকতে পারে । আমি তখনও কিছু উপায় মাথায় আনতে পারছিলাম না। ফলে ঐ একই রকম অবস্থা হল এবং একই রকমভাবে কুলকুণ্ডলিনী থেকে শক্তি সঞ্চারিত হয়ে শরীরকে শক্তও করল। আমি ঐ যে অতক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়েছিলাম ভল্লুকটাও দাঁড়িয়েছিল। তারপর লাঠিটাকে দু’হাতে আড়াআড়ি ধরে আমি ভল্লুকটার দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেলাম, ভল্লুকটাও কয়েক পা এগিয়ে এসে লাঠিটাকে দু’হাতে ধরে ফেলল। আমি ওটাকে একটু পিছনে ঠেলার চেষ্টা করলাম, ও-ও আমাকে পিছনে ঠেলার চেষ্টা করলো। এই ভাবে একটু ঠেলাঠেলি করেই আমি ওর পায়ের ফাঁক দিয়ে সোজা দৌড়ে উপরে উঠে চলে এলাম। অনেকটা উঠে এসে দেখছি ও তখনও দু’হাতে লাঠিটা ধরে কারোকে যেন ঠেলছে। আমি আর সময় নষ্ট না করে উপরে উঠতে লাগলাম এবং আমাদের যেখানে রাত্রে থাকার কথা সেখানে গিয়ে উঠলাম।