জিজ্ঞাসু : অপূর্ব লাগল শুনতে, ঐ ব্যাপারে আরও জিজ্ঞাসা রয়েছে কিন্তু সেগুলো এখন থাক্, আপনার কি গর্ভ অবস্থার কিছু স্মৃতি আছে ?

গুরুমহরাজ : হ্যাঁ রয়েছে। জাগ্রত, স্বপ্ন, সুষুপ্তি—এই তিন অবস্থাতেই আমি সদাজাগ্রত। সাধারণত গর্ভে থাকাকালীন মানুষের স্মৃতি থাকে না, কারণ মানুষের চেতনা তখন স্বপ্ন ও সুষুপ্তি এই দুই অবস্থায় থাকে। আর জাগ্রত অবস্থাতেই কত ঘটনার স্মৃতি নষ্ট হয়ে যায় মানুষের, তা আবার স্বপ্ন বা সুষুপ্তি অবস্থার স্মৃতিচারণ ! তিনিই পারেন সবদিক মনে রাখতে যিনি এই তিন অবস্থাকে অতিক্রম করেছেন অর্থাৎ যিনি তুরীয় স্থিতিতে রয়েছেন। সে যাইহোক্ মা জগদম্বার ইচ্ছায় আমার গর্ভকালীন স্মৃতি রয়েছে।

চারা গর্ভে থাকাকালীন আমি বুঝেছি–কেন মা জগদম্বা সাধারণ মানুষের চেতনা অবলুপ্ত করে রাখেন ঐ সময়ে । কারণ গর্ভের আঁধার আর গরম এবং শরীর-অভ্যন্তরের গন্ধ সহ্য করে থাকা খুবই কষ্টকর। এমনও অনেক হয়েছে যে, কোন মহাপুরুষের বা মানবের হয়তো ঐ সময় স্বপ্নাবস্থা কেটে গেছে—জাগ্রত অবস্থায় ফিরে এসেছেন আর তাঁর মৃত্যু হয়েছে—সহ্য করতে পারেননি। তোমাদের ডাক্তাররা যাই ব্যাখ্যা দিক—এটা ঘটনা জানবে। তবে গর্ভ অবস্থায় আমি মায়ের সাথে একাত্ম হয়ে মায়ের চোখ দিয়ে জগৎ দেখতাম। মায়ের মুখ দিয়ে অনেক সময় অনেক কথা বলে দিতাম। মায়ের চিন্তার সঙ্গে নিজের চিন্তা মিলিয়ে মাকে অন্য চিন্তা থেকে সরিয়ে এনে ভগবৎমুখী। করে রাখতাম। এমনও হয়েছিল- ল—মায়ের চোখের ভাষা যে অন্যরকম তা বাবা বুঝতে পেরে কিছুদিনের জন্য ঘর ছেড়েছিলেন।

তখন আমার সময় কাটাতে অসুবিধা হত না। কারণ মানুষের শরীরে রক্ত চলাচলের যে শব্দ তার এক অপূর্ব ছন্দ (Rhythm) রয়েছে, যা ওস্তাদের বীণাবাদনের তানের মতো, সেই দ্রিম দ্রিম ধ্বনির Rhythm আর তার সঙ্গে মায়ের হৃৎপিণ্ডের লাক ডুব যেন তবলার তাল—এই অদ্ভুত সুর-মূর্ছনায় আমি মগ্ন হয়ে থাকতাম। তন্ময় হয়ে যেতাম। এইভাবে কতসময় অতিবাহিত হয়ে যেত। জন্মের পর পরবর্তীকালে আমি মায়ের বুকে কান পেতে ঐ শব্দ শোনার চেষ্টা করতাম—পেতামও। আরও পরে যখন অনেকটা বড় হলাম বা আমার পরবর্তী ভাই-বোনেরা মাকে দখল করল তখন নিজের মধ্যেই আত্মস্থ হয়ে ঐ রক্ত-সঞ্চালন-ধ্বনি আর হৃৎপিণ্ডের সুর মূর্ছনাকে শোনার চেষ্টা করতাম। দ্যাখো মানুষের শরীরে কত অপূর্ব জিনিস রয়েছে। কত রহস্য লুকিয়ে আছে সারাজীবনে তা আর জেনে ওঠা হয় না। বাইরের জগৎ জানতে গিয়েই এই অবস্থা, না ঘরকা না ঘাটকা I তাক
যাইহোক ৯ মাস ১০ দিন কেটে গেল কিন্তু কাল পূর্ণ না হলে তো প্রসব হবে না। সবাই বলে ১১০ মাস ১০ দিন, কিন্তু ডাক্তারী মতে ৯ মাস ১০ দিনে সাধারণত বাচ্ছা প্রসব হয়। আমার প্রসব হতে প্রায় ১২ মাস লেগেছিল। সবাই বলতো পেটে ছেলে নেই, হয়তো Tumour হয়েছে। মা কিন্তু এতে বিচলিত হননি। কারণ আমি গর্ভে আসার পর থেকে মা এতকিছু দেখেছিলেন বা শুনেছিলেন জাগ্রত অবস্থায় বা স্বপ্ন অবস্থায়, সেগুলি যদি তিনি শিক্ষিতা হতেন বা লিখে রাখতে পারতেন, তাহলে তোমাদের কাছে এক অমূল্য দলিল হতে পারতো। মা স্বপ্নাবস্থায় পৃথিবীর কোথায় না গেছেন আর কত মহাপুরুষ, দেবদেবীর যে দর্শন পেয়েছেন তার ইয়ত্তা নেই ৷

যাইহোক, প্রসবকালে মায়েদের প্রসব বেদনার কথা সবাই জানে যেহেতু তারা বলতে পারে বা expression দেখে বোঝা যায়, কিন্তু প্রসবকালে সন্তান যে কি কষ্ট পায় তা সেই সন্তানই জানে যার পূর্ণজ্ঞানে প্রসব হয়। যতক্ষণ মাতৃগর্ভে থাকে শিশু, ততক্ষণ তার খাওয়া, নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস, রেচন সবই মাতৃঅঙ্গেই বিশেষ বিশেষ ব্যবস্থার সাহায্যে হয়ে চলে। কিন্তু রক্ত চলাচল আর হৃৎপিণ্ডের কাজ গর্ভস্থ সন্তানের মধ্যেই চলতে থাকে। প্রসবকালে এত Pres sure পড়ে ঐ হৃৎপিণ্ডে এবং মস্তিষ্কে যে, সেই সময় মনে হয় প্রাণান্ত হয়ে যাবে। এখন ‘সিজারিয়ান বেবী’-রা জানতে পারছে না যে, Normal প্রসবে মায়ের সাথে সাথে সন্তানের কি প্রচণ্ড কষ্ট হয়। তবে আমার কি মনে হয় জানো, Normal প্রসবের সঙ্গে শরীরের কোন কাজের বা প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে ওঠার সম্পর্ক আছে। হয়তো পরবর্তীকালে বিজ্ঞানীরা এটা গবেষণা করে কোন সিদ্ধান্তে আসবেন।