জিজ্ঞাসু : ঐভাবে ঘুরতে গেলে খাদ্য না পেলেও পানীয় তো দরকার, জলের সংস্থান নিশ্চয়ই রয়েছে হিমালয়ে ?
গুরুমহারাজ : আসলে তোমাদের তো সঠিক ধারণা নেই –তাই আজেবাজে জিজ্ঞাসা করছো। হিমালয়ের বেশী উচ্চতায় সবই তো বরফ, তাপমাত্রা ধরে নাও মাইনাস – 40° c, যেখানে 0-তে জল জমে বরফ হয় সেখানে মাইনাস চল্লিশ, বুঝতে পারছো ব্যাপারটা ! ওখানে মূত্র ত্যাগ করলেও বরফ হয়ে যাবে। তবে নীচের দিকে প্রচুর ঝরনা রয়েছে, বিভিন্ন উৎসমুখ রয়েছে—সেখানে জল পাওয়া যায়। আর বিভিন্ন সাধুর গুম্ফায় যেখানে ধুনি জ্বালানোর ব্যবস্থা আছে সেখানে তুমি জল পাবে, কারণ সাধুরা ঐ ধুনির পাশেই পাথরের গর্তে বরফ তুলে এনে রেখে দেয়, আগুনের তাপে বরফ গলে জল হয়ে থাকে।
তবে ঈশ্বরের মহিমার প্রকটরূপ দেখতে গেলে যে কোন মানুষকে হিমালয়ে যেতে হবে। এত বৈচিত্র্য আর এত সৌন্দর্য হিমালয় ছাড়া পৃথিবীগ্রহে আর কোথায় আছে ! ওখানে ঐ বরফের মধ্যেও আমি উষ্ণ প্রস্রবণ দেখেছি, যেখান থেকে বেরিয়ে আসে জলের ধারা। ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী সাধুদের কাছে বা জীবজন্তুর কাছে যা অমৃততুল্য। তবে এমনও অনেক সাধু রয়েছেন যাঁরা প্রয়োজনে জল কেন, ইচ্ছামাত্র যে কোন জিনিস তোমাকে তৈরি করে দিতে পারেন। আমার সাথে ঐরকমই একজনের দেখা হয়েছিল। ঘটনাটা বলছি শোন।
তখন আমি একাই ঘুরছি। একদিন একটা সরু পথ ধরে হাঁটতে হাঁটতে এগিয়ে চলেছি। হঠাৎ একটা কালো কালিতে লেখা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল, “উপর আনা মানা হ্যায়।”আমিতো অবাক্ –এই নির্জন প্রান্তরে জঙ্গলাকীর্ণ স্থানে কে এই নিষেধাজ্ঞা জারি করল। দেখতে হবে তো । এগিয়ে চললাম, চড়াই ভেঙে ভেঙে উপরে উঠতে লাগলাম। পার্বত্য পথে চড়াই-এ ওঠা যে কি পরিশ্রমের কাজ, তা যে না উঠেছে সে জানে না – —একটুকু উঁচুতে উপরে উঠতেই তুমি গলদঘর্ম হয়ে যাবে। তার ওপর তখন আমার ঠিকমতো আহার ছিল না পেটে–আর আহার বলতে গাছের ফল, ঝরনার জল।
যাইহোক বহুক্ষণ হাঁটার পর সন্ধ্যার প্রাক্কালে আমি যখন উপরে উঠলাম, দেখি একটা সমতল মতো জায়গা আর একটা গুহা। কিন্তু হাঁপাতে হাঁপাতে ক্লান্ত দেহটা টেনে টেনে একটু এগিয়ে নিয়ে আসতেই একটা চিৎকারে আমার শরীর ঠাণ্ডা হতে শুরু করল ! দেখি কি একটা আলকাতরার মতো কালো, কঙ্কালের মত দেহবিশিষ্ট, না জটা-দাড়ি-সর্বস্ব পুরুষ যাঁর চোখ দুটো কোঠরগত, একটা ত্রিশূল নিয়ে চিৎকার করতে করতে আমার দিকে তেড়ে আসছেন। আমার আর কোন ক্ষমতাই ছিলনা পালানোর। ফলে আমি ওঁর রুদ্রমূর্তি দেখেও ভয় না পেয়ে দু’হাত উঁচু করে প্রণাম করে একেবারে শরণাগত ভঙ্গিতে মাটিতে উপুড় হয়ে শুয়ে পড়লাম৷
উনি আর কি করেন, কাছে এসে দাঁড়িয়ে পড়লেন—মারলেন না, কিন্তু চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলেন, “দেখা নেহি লিখা হ্যায় কি উপর আনা মানা হ্যায়, তো কিউ আয়া ?” আমি শুয়ে শুয়েই বললাম, “ইসি লিয়ে তো আয়া হু ভগবন্ ।’ উনিও আর কিছু বললেন না, ফিরে ফিরে গিয়ে গুহায় ঢুকে পড়লেন। আমি বরফের উপর আর কতক্ষণ শুয়ে থাকবো ! তাছাড়া রাত্রি নেমে আসছে, ঠাণ্ডা বাড়বে, একটু পরেই তুষার ঝরতে শুরু করবে। এই অবস্থায় বাইরে বেশীক্ষণ থাকাও অসম্ভব। কিন্তু সাধুবাবা সেই যে গুহার ভিতরে ঢুকে গেলেন, আমাকে আর কিছু বললেন না। আর আমার শরীরের যা অবস্থা তাতে করে নীচে ফিরে যাওয়া অসম্ভব ! আবার সাধুবাবা না বললে তাঁর গুহায় ঢুকতেও পারি না, উভয় সঙ্কটে পড়ে গেলাম আমি ! যাইহোক নীচে যখন নামতে পারবো না, তখন সাধুবাবার সাথেই আলাপ করতে হবে, এই উদ্দেশে আমি ধীরে ধীরে সাধুবাবার গুহার সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। দেখি কি গুহার ভিতরে ধুনি জ্বলছে, সাধুবাবা চুপটি করে বসে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। বহুক্ষণ ঐ একইভাবে কেটে যাচ্ছে, সাধুবাবা তাকিয়েই আছেন কিন্তু কিছু বলছেন না। এদিকে রাত্রির আঁধার ঘনিয়ে আসছে—বাইরে থাকাও অসম্ভব হয়ে পড়েছে। এইসব বিবেচনা করে আমি কাতরকণ্ঠে অনুনয় করলাম –“ভগবন্ কেয়া ম্যায় অন্দর আ সকতা হুঁ ?” আমি কি ভিতরে যাবো? তিনি সম্মতি দিলেন।
ভিতরে ঢুকে গুহার মুখের পাথরটা চাপা দিয়ে ধুনির সামনে বসে হাত-পা একটু সেঁকতেই শরীরে জোর পেলাম। সাধুবাবার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, উনি প্রসন্ন দৃষ্টিতে, হাসি হাসি মুখে আমার কাণ্ডকারখানা দেখছেন। আমি ভাবলাম—আশ্চর্য তো, যে মানুষটাকে প্রচণ্ড কঠোর মনে হচ্ছিল, তাঁর অন্তঃকরণটা এত নরম ! ভাবতে- ভাবতেই উনি আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘ভুখা হো ? কুছ পিয়োগে ?’ আমি বললাম—হ্যাঁ। উনি একটা পাত্র দিলেন, তাতে কয়েক টুকরো বরফ দিয়ে ধুনির পাশে রাখতেই কিছুক্ষণের মধ্যে একপাত্র জল হয়ে গেল। এবার বললেন, “ইসে দুধ বা দু ?” আমি বললাম, “হ্যাঁ জী, বনা দিজিয়ে।’ উনি নিজের হাতটা ঐ না জলের পাত্রে কিছুক্ষণ রাখতেই আমার চোখের সামনে জলটা দুধ হয়ে গেল –একদম ফেনা সমেত দুধ। আমি বদমাইশি করে বললাম, ‘থোড়া মিঠা হো যায়ে তো, আচ্ছা হোগা।” উনি বললেন, “বাঙালী হো, ইসি লিয়ে মিঠা জ্যাদা পসন্দ করতা না ?” “ঠিক হ্যায় দো।” পাত্রটা আবার হাতে নিয়ে উনি ওর মধ্যে হাত ঢুকিয়ে আবার আমাকে ফেরত দিয়ে বললেন, ‘মিঠা হো গয়া সব পি লো।’ আমি খেয়ে দেখলাম ঠিকই, দুধে মিষ্টি মেশালে যেমন হয়, তেমনই খেতে।
এরপর সারারাত ধরে তাঁর সঙ্গে নানারকম কথা হয়েছিল –সেসব তোমাদের এখন বলা যাবে না। যাইহোক, সকালে যখন আমি চলে আসছি, তখন আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন, ‘যো দেখা হ্যায় ও শিখনে কে লিয়ে বাসনা নেহী’। আমি বললাম, ‘উনসে ঈশ্বরলাভ হোগা কেয়া ?’ উনি বললেন, ‘নেহী’। আমি তখন বললাম, ‘যিসে ঈশ্বর নেহী মিলতা, হমারে লিয়ে ওয়হ বেকার হ্যায়—ম্যায় চলতা হুঁ’। এই বলে আমি চলে গেলাম। কিন্তু বহুদূর পর্যন্ত দেখলাম, উনি প্রসন্ন দৃষ্টিতে আমার দিকে চেয়েছিলেন। পরে আমার মনে হয়েছে, ওঁর ঐ সব নানাবিধ বিদ্যা আমার মধ্যে চলে এসেছিল। এ ছাড়াও আমি লক্ষ্য করেছিলাম—ঐ ঘটনার পর দীর্ঘ অনাহারেও আমার কোন অসুবিধা হত না আবার প্রচণ্ড পরিশ্রম বা হাঁটা-হাঁটি করলেও আমার শরীর চট্ করে ক্লান্ত হত না।
