জিজ্ঞাসু : যে কথা কখনো জানতে পারবো ভাবিনি তা আপনার কাছে জানলাম। এখন আপনার ছোটবেলার কিছু ঘটনা —যা কৃষ্ণদেবপুরে ঘটেছিল সেগুলো যদি বলেন ।
গুরুমহারাজ : আমি যখন খুবই শিশু তখন থেকেই অনেক সাধু-সন্ন্যাসী, বৈষ্ণব-বাউল এরা আসত আমাদের বাড়ীতে, আমাকে কোলে নিতে চাইতো—আদর করতে চাইতো। কিন্তু মায়ের ভয় হত—কেউ হয়তো কিছু মন্দ করবে, তাই সচরাচর কাউকে কোলে নিতে দিতেন না। আর আমিও এমন ছিলাম যাকে আমার পছন্দ নয় তার কোলে বেশীক্ষণ থাকতামও না। শিশুদের অস্ত্র কি বলতো- কান্না। পছন্দ না হলেই এমন তেড়ে কান্না জুড়ে দিতাম যে, সে আমাকে মায়ের কোলে ফেরত দিতে বাধ্য হত।
আমার মা এমনিতেই খুব অতিথিবৎসলা এবং ধর্মপরায়ণা ছিলেন। তাছাড়া আমাদের ঐ সব অঞ্চল গঙ্গাতীরবর্তী স্থান আর নবদ্বীপ-কালনার সন্নিকটে। ফলে বহু বাউল, বৈষ্ণব, সাধু-সন্তদের আখড়া, আশ্রম রয়েছে। তারা মাধুকরীর জন্য প্রায় সব গৃহেই যায়, আমাদের বাড়ীতেও আসতো। মায়ের ব্যবহারে খুশি হয়ে তাদের অনেকেই ওখানে খেতো কিংবা দুপুরটা কাটিয়ে যেতো। আমি যখন মায়ের গর্ভে ছিলাম তখন মায়ের এমন সুন্দর রূপ হয়েছিল যে, ত ওদের অনেকেই মাকে বলেছিল যে, তোমার পেটে কোন মহাপুরুষের আবির্ভাব হয়েছে। এরপর যখন আমার জন্ম হল, ওদের সবার একটা কৌতূহল তো ছিলই, ফলে সবাই ঘনঘন আসতো আবার ওদের মুখে শুনে অন্যরাও আসতো। চা চামচ
একবার, আমার বয়স তখন ১ বছরও হয়নি, প্রচণ্ড জ্বর গায়ে। ৩/৪ দিন ধরে বেহুঁশ অবস্থা। বাবা বাড়ীতে নেই, কোথায় ৭ দিন ধরে হরিনাম-সংকীর্তন চলছে, সেখানে বাঁশী বাজাতে গেছেন। বাবা ঐরকম করতেন, কেউ না বললেও যদি শুনেছেন যে, অমুক জায়গায় হরিনাম বা হরিবাসর হচ্ছে, তো বাঁশী নিয়ে সেখানে চলে গেছেন। যাইহোক, মা দারুণ চিন্তিত ছেলে বোধহয় বাঁচবে না টাকাও নেই হাতে, কি করেন ? কাছেই মামার বাড়ী বিজাড়া গ্রামে মায়ের বাবা-মা তখনও বেঁচে, ফলে অনন্যোপায় হয়ে মা আমাকে কাথায় ভালো করে মুড়ে নিয়ে একজন মহিলাকে সঙ্গে করে ছুটতে ছুটতে চলেছেন বিজাড়া। এক-একবার দেখছেন আমি তখনও বেঁচে আছি কিনা আবার ছুটছেন। বিজাড়া যাবার পথে একটা সাঁকো” পার হতে হয়। ওপারে একটা বড় গাছ ছিল। তার ছায়ায় দু’দণ্ড দাড়িয়ে বিশ্রাম করবেন ভাবছেন, এমন সময় হঠাৎ সেখানে একজন জটাজুটধারী সন্ন্যাসী এবং একজন সন্ন্যাসিনীর আবির্ভাব ঘটল। তাঁরাই বেহুঁশ হয়ে মাকে জিজ্ঞাসা করলেন, মা, কি হয়েছে তোমার ছেলের মা বললেন, “দ্যাখো বাবা! ছেলে আজ ৩/৪ দিন ধরে জ্বরে পড়েছে, তাই বাপের বাড়ী যাচ্ছি চিকিৎসার জন্য। সন্ন্যাসী ও সন্ন্যাসিনী বললেন, “কই দাও তো দেখি তোমার ছেলেকে একবার আমাদের কোলে, তোমার ছেলের কি হয়েছে দেখি । মা প্রথমটায়। একটু ইতস্তত করছিলেন, তারপর সন্তানের মঙ্গল কামনায় দিয়ে দিলেন তাঁদের কোলে ।
পরম স্নেহে তাঁরা দু’জনে আমাকে কোলে নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ আদর করার পর মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে দিতে বললেন, “কই তোমার ছেলে তো দিব্যি সুস্থ আছে, এইতো চোখ মেলে চাইছে।” একথা শুনে মা তাড়াতাড়ি তাঁদের কাছ থেকে আমাকে নিয়ে মুখে দুধ ধরাতেই আমি খেতে শুরু করলাম। মাও আ আনন্দে অধীর। কিন্তু ধন্যবাদ জানাতে গিয়ে পিছন ফিরে দেখেন—সন্ন্যাসীও নেই, সন্ন্যাসিনীও নেইার পরে আমি চিন্তা করে দেখেছি ওঁরা সাক্ষাৎ হর-পার্বতী ছিলেন। তখন আমার এমন কিছু হয়েছিল যা সাধারণ বৈদ্যের পক্ষে আরোগ্য করে তোলা অসাধ্য ছিল। তাই বৈদ্যনাথ নিজে এসে তার প্রতিবিধান করে দিয়েছিলেন।
