জিজ্ঞাসু : সত্যিই গুরুমহারাজ! অদ্ভুত জীবন আপনার, আর ততোধিক অদ্ভুত আপনার জীবনকাহিনী। যতই শোনা হচ্ছে, যেন মনে হচ্ছে গল্পকথা ! কিন্তু আপনাকে সাক্ষাৎ দেখছি, তাই অবিশ্বাস করার প্রশ্নই উঠছে না। তবে পরবর্তীকালের মানুষ হয়তো এগুলোকে গল্পকথা বা অতিরঞ্জিত ভাববে। যাইহোক আপনার অপূর্ব জীবনকথা আরও কিছু জানতে ইচ্ছা করছে। অনুগ্রহ করে আপনার হিমালয়ে একা একা ঘোরার সময় যেসব উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছিল সেগুলো যদি বলেন ?

গুরুমহারাজ : ঠিকই বলেছ ! সত্যিই বিচিত্র আমার জীবন ! সাধারণ কোন মানুষের সঙ্গে তা কখনই মেলাতে পারবে না। আমার সবকিছুই এত fast বা দ্রুত যে, আমার জীবনের কোন ক্ষেত্রেই তোমরা হিসাব দিয়ে মেলাতে পারবে না—গণ্ডগোলে পড়ে যাবে। বর্তমানে আমি যেন ঝড়ের মুখে থাকা শুকনো পাতা। ঝড় যখন যে দিকে নিয়ে যায়, সেই দিকেই যাই। আমার “চলা পা” আর “বলা মুখ”। হিমালয়ে যখন আমি একা একা চলতাম ওখানে সবাই বলতো, “তোমার শিবচলন”। কেউ হেঁটে আমার সাথে যেতে পারতো না। এখানেও হয়তো লক্ষ্য করেছ যখন আমি নিজের ভাবে হাঁটি, আমার সঙ্গের লোকেরা আমাকে ছুটেও ধরতে পারে না। তবে বেশীর ভাগ সময়ে সঙ্গের লোকদের সঙ্গে নিয়েই যায়। কিন্তু কোথাও যাবার জন্য কথা দেওয়া থাকলে আমি আর Slow হতে পারি না । “সাধুকা বাত” হাতিকা দাঁত।” সাধুরা কথা দিলে যে কোন মূল্যে তা রক্ষা করা কর্তব্য। ফলে ঐ সময় যদি আমার বেরোতে দেরী হয় তাহলে আমি ব্যস্ত হয়ে পড়ি এবং অযথা দেরী হলে বা যান Slow হলে আমি চেতনার জগতে সেখানে আগেই পৌঁছে যায়। সেখানকার লোকেরা আমাকে হয়তো দেখতে পায় না, কিন্তু আমি সব দেখি—যে তারা আমার আগমনের জন্য কতরকম ব্যবস্থা করছে ইত্যাদি। যাইহোক ঐ যে কথাটি ‘শিবচলন’, এটা এল কোথা থেকে! আমার মনে হয় ‘শিব’ অর্থাৎ সদাশিব যখন শরীর নিয়ে লীলা করেছিলেন তখন তাঁর যে চলার ভঙ্গিমা ছিল সেটা ছিল খুবই দ্রুত অর্থাৎ তিনি তিব্বত থেকে হিমালয়ের বিভিন্ন অংশে এইভাবেই যাতায়াত করতেন। তবে তিনি চমর (তিব্বতীয় গরু)-কে বাহন হিসাবে ব্যবহার করতেন মনে হয়। এই জন্যই শিবের বাহনকে ষাঁড় করা হয়েছে।

যাইহোক হিমালয়ে আমার যতটা সময় কেটেছে তার সবটা কখনই বলা যাবে না, ফলে তা তোমরা কখনও জানতেও পারবে না। তবে স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী এখানে জিজ্ঞাসা হয় আর আমি সেই অনুযায়ীই উত্তর দিয়ে থাকি। যার জন্য দেখবে একই জিজ্ঞাসার উত্তরে আমার বক্তব্যের অনেক সময় পার্থক্য দেখা যায়। আবার অনেক সময় তেমন জিজ্ঞাসা না থাকলেও দেখবে আমি নিজেই কোন কথার অবতারণা করে নিয়ে বলতে শুরু করে দিই। হিমালয়ের কথা বা গুহ্য কথা বলার সময় স্থান-কাল-পাত্রের উপযুক্ততার প্রয়োজন হয়। তবে বেশীর ভাগ শ্রোতারই সে উপযুক্ততা থাকে না তবু অনেক সময় আমি যখনই অনেক গুহ্য কথা বলতে মনঃস্থ করি বা হয়তো শুরুও করি—তখন সূক্ষ্মভাবে গুরুকুল আমাকে নিষেধ করেন, বলেন ‘কাদের কি বলছ, ওদের তো ধারণাই তৈরি হয়নি। ‘

আমি তাঁদের বোঝাই—“দেখুন প্রেমে ছোট বড় নেই, এরা সবাই আমার প্রিয়, তাছাড়া এসব কথা যখন আমি বলি তখন ওদের অধিকাংশের চেতনার Level-কে আমি ঊর্ধ্বে তুলে রাখি, যাতে কথাগুলো শোনার পর যদি মনন বা নিদিধ্যাসন হয় তাহলে এইজন্মেই ফল পাবে অথবা পরজন্মেও এই স্মৃতি থেকে যাবে এবং ধারণা করতে পারবে। এই চেষ্টা বিফল হবে না।” এসব শুনে ওরা আর কিছু বলেন না কিন্তু লক্ষ্য রাখেন। তবে দেখেছি এইসব আলোচনা শুরু হলেই বেশীরভাগ মানুষের ব্রেনসেল নিতে পারে না ফলে ঘুমিয়ে যায়। আবার অনেক সময় অনেকে এমন disturb করে যে, কথা বন্ধ করে দিতে বাধ্য হই। সঙ্গে সঙ্গে গুরুকুল বলেন—’দেখলে তো তোমার ভক্তদের অবস্থা। সমাজ এখনও তেমন উন্নত হয়নি যে, আরণ্যক বা অরণ্যের নিভৃত কথা সমাজে বলা যায়।” আমি আবার যে ব্যক্তিটি disturb করেছে তারজন্য মাপ চেয়ে নিই। বলি ‘আহা, ওর দোষ নেই, বেচারা অবোধ, ওর অপরাধ আপনারা ধরবেন না।’

যারা ডিষ্টার্ব করল তারা জানতেও পারলো না যে, অলক্ষ্যে কত বড় বিপর্যয় থেকে তারা রক্ষা পেল। কারণ ঐ গুরুকুল যদি কারও উপর রোষদৃষ্টি করেন, তার যে কি ক্ষতি বা সর্বনাশ হতে পারে, তা চিন্তাতেও আনতে পারবে না। কয়েক জন্মের বিবর্তন পিছিয়ে যেতে পারে, যে কোন ইতরযোনিতে জন্ম হতে পারে। আবার দেখেছি যদি কোন ব্যক্তি প্রত্যাশাবিহীনভাবে বহুজন হিতায় বা বহুজন সুখায় কাজ করে তাহলে ওনারা তার উপর প্রসন্ন হ’ন এবং তাকে সাহস ও শক্তি জুগিয়ে সহযোগিতা করেন, ছোট-খাট বিপদ-আপদ বা দুর্বিপাক থেকে তাকে রক্ষাও করেন অর্থাৎ তাঁরা সর্বদা দৃষ্টি রাখেন যাতে ব্যক্তিটির কোন অনিষ্ট না হয়। এসব কথা তোমাদের বলার উদ্দেশ্য এই যে, তোমরা যাতে কখনও কোন সাধুসঙ্গ বা সৎসঙ্গে গিয়ে কাউকে কখনও অমর্যাদা না করো। কারণ সাধু হচ্ছে কেউটে সাপ, লেজে পা পড়লেই দেবে ছুবলে। টোড়া-ঢ্যামনা হলে অবশ্য অতটা ভয় নেই কিন্তু গুরুকুল আশ্রিত প্রকৃত সাধু হলেই সর্বনাশ ! এছাড়া শক্তিসাধনাকারী বা সিদ্ধিপ্রাপ্ত সাধুরাও কোন মানুষের ভাল করতে না পারলেও নানান অভিচার ক্রিয়ার মাধ্যমে চরম ক্ষতি করে দিতে পারে। তবে প্রকৃত সাধু রুষ্ট হলে যা ক্ষতি হয় তা পূরণ করতে ৭ জন্ম লেগে যায়। তাই সাধু সাবধান শুধু নয়, ‘সাধু হতে সাবধান’। আবার কোথাও যদি প্রেমিক সাধু পাও, তাহলে কোন ভয় বা সংকোচ থাকে না, কারণ তিনি কারও দোষ দেখেন না —তাঁর অন্তঃকরণে কোনই reaction নেই। তাই তাঁর দ্বারা কারও কখনই কোন অমঙ্গল হয় না। তিনি সদা শিবস্বরূপ—কিন্তু সে তো কোটিতে গুটি।

আবার হিমালয়ের কথায় ফিরে আসি। দুৰ্জ্জেয়, দুর্লঙ্ঘ্য হিমালয়ের বিভিন্ন প্রান্তে, চূড়ায়, গিরি-কন্দরে ঘুরে বেড়ানোর আমার একটাই উদ্দেশ্য ছিল—সত্যলাভ। কারণ আমি শুনেছিলাম যে, হিমালয়ের গিরি-গুহা-অরণ্যে রয়েছেন সত্যদ্রষ্টা মহাত্মারা, যাঁরা সত্যের সন্ধান জানেন এবং তা জানাতেও পারেন। এসব কথার সত্যতা যাচাই করার জন্যই আমার তখন শুধু চলা আর চলা। এইরকম চলার পথে একবার কয়েকটা হনুমানে আমাকে ভীষণ মেরেছিল। কোন জন্মে কিছু হনুমান এবং হাতির দলকে আমি ব্রহ্মচর্য দীক্ষা দিয়ে একটা পরম্পরা চালু করেছিলাম। সেই পরম্পরাগুলো অবশ্য এখনও রয়েছে। এখানে কি ব্যাপার হল কে জানে, ঐ হনুমানগুলো আমাকে লেজে করে মারতে লাগলো। যখন মারছিল তখন মনে হচ্ছিল যেন লাঠির ঘা । তবে বিভিন্ন জন্তু-জানোয়ারের হাত থেকে কিভাবে রক্ষা পেতে হয়, সেগুলো সাধুরা আগেই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন। ফলে হনুর দলের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলাম। হনুতে এ্যাটাক করলে কি করতে হয় বলো তো ! দু’হাত উঁচু করে তুলে প্রণামের ভঙ্গিতে শরণাগত মুদ্রায় উপুড় হয়ে শুয়ে পড়তে হয়। ব্যস, তাহলেই হনুর দল ঠাণ্ডা । কিন্তু হাতির দলের সামনে যখন পড়েছিলাম তখন কিন্তু অন্য কায়দায় বেরিয়ে আসতে হয়েছিল। ওখানে শরণাগত মুদ্রা দেখালে কয়েকশ’ হাতির পায়ে পিষ্ঠ হয়ে শরীরটা চিঁড়ের মতো চ্যাপ্টা হয়ে যাবে।