জিজ্ঞাসু : অপূর্ব ঘটনা—এরকম আরও দু-একটা ঘটনা বলুন না ?
গুরুমহারাজ : আমার যখন বছর দেড়েক বয়েস, তখন একবার আমি জলে ডুবে গিয়েছিলাম। ঘটনা ঘটেছিল কি—আমি তখন সবে হাঁটতে শিখেছি, দিদিদের কাছেই বেশী থাকতাম, কারণ মা সংসারের নানা কাজে ব্যস্ত থাকতেন। দিদি একদিন থালাবাসন ধোবার জন্য আমাদের বাড়ীর পাশের ডোবায় যাচ্ছে, আমিও দিদির পিছন পিছন টলমল করতে করতে চলেছি। মা দেখেছিলেন, কিন্তু নিশ্চিন্ত ছিলেন এই ভেবে যে, দিদির সঙ্গে যাচ্ছে আর চিন্তা কি ? এখন হয়েছে কি, দিদি তো আমাকে খেয়াল করেনি। দিদি সোজা জলে নেমেছে, বাসনগুলো রেখেছে আর তখন আমি দিদির ঠিক পিছনেই। এবার যেই দিদি ঘুরেছে, অমনি আমিও পিছন থেকে গিয়েই সোজা জলে নেমে পড়েছি। দিদির মুখ তখন পাড়ের দিকে, ফলে আমাকে একেবারেই দেখতে পায়নি। এবার দিদি নিজের কাজ সেরে যখন উঠে গেছে, তখন প্রায় আধঘণ্টা বা তারও বেশী সময় কেটে গেছে। আর আমি এদিকে সোজা জলের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একেবারে জলের তলায়।
এমনিতে ছোটবেলা থেকেই হোতো কি জানো তো, আমার মায়ের শরীরের গন্ধ আমি মাটির গন্ধে পেতাম । আর মায়ের শরীরের শীতলতা অনুভব করতাম জলের স্পর্শে। তাই ছোটবেলা থেকেই জল আর মাটির স্পর্শ আমার মায়ের স্পর্শ মনে হত। পরবর্তী জীবনেও আমার কখনই ‘ইঁট, কাঠ বা কোন কৃত্রিম শয্যা ব্যবহার করতে ভাল লাগত না, তবে এখন সবকিছুই adjust করে নিই।’ যাইহোক জলের মধ্যে ঐভাবে ঢুকে পড়তে আমার মোটেই কোন ভয় বা অসুবিধা হয়নি। এরও কারণ আছে। কারণটা হচ্ছে, ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত আমার লজ্জা, ঘৃণা, ভয় ইত্যাদি যে অষ্টপাশ রয়েছে—এগুলো স্বাভাবিকভাবেই ছিল না। আমি সারাজীবনে তিনবার প্রচণ্ড ভয় পেয়েছি আর তিনবারই কুল-কুণ্ডলিনী ক্রিয়ার কার্যকারিতা শরীরে experiment হয়েছে। সারাজীবনে মাত্র তিনটে স্বপ্ন দেখেছি। মা জগদম্বা আমার এই শরীরটাকে দিয়ে নানারকম experiment করিয়ে নিয়ে চলেছেন।
হ্যাঁ, যা বলছিলাম, জলের মধ্যে যখন ঢুকে পড়লাম তখন জানো তো সে এক অবাক করা দৃশ্য! দেখি কি, সাপের মতো বিচিত্র- বর্ণের দেহধারী সব প্রাচীন বৃদ্ধেরা, যাদের মুখগুলো সরু সরু কিন্তু মানুষেরই মতো লম্বা লম্বা দাড়ি রয়েছে—তারা আমাকে সাদরে অভ্যর্থনা জানাল। আমাকে পেয়ে বিচিত্র ভাষায় গান গেয়ে গেয়ে তাদের সে কি নৃত্য ! আমাকে ঘিরে ঘিরে তাদের নৃত্যগীত এক অদ্ভুত আনন্দমুখর পরিবেশ সৃষ্টি করল। আমিও তাদের আনন্দের অংশীদার হয়ে গেলাম । এক অদ্ভুত আনন্দময় রেশের মধ্যে কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না, হঠাৎ আমার সম্বিৎ ফিরল, তখন দেখি আমাকে পাড়ে নিয়ে এসে ঝাঁকাচ্ছে। আমি আনন্দের রেশ কেটে যাওয়ায় কেঁদে উঠলাম।
এদিকে হয়েছিল কি ? দিদি বাড়ী ফিরতেই তো মা জিজ্ঞাসা করেছেন, ‘হ্যাঁরে রবি কোথায় ?’ দিদি বলেছে, ‘রবি তো আমার সাথে যায়নি।’ অমনি মা ছুটে বেরিয়ে পড়েছেন একথা বলতে বলতে “সে কিরে ! রবি তো তোর পিছু-পিছুই গেল, তাহলে বোধ হয় জলে পড়ে গেছেরে, যা !” মায়ের আর দিদির চিৎকারে গোটা পাড়ার লোক ছুটে পুকুরের জলে নেমে আমাকে খুঁজে যখন পাড়ে তুলল, তখন ওরা দেখল যে, আমার নাক, কান এবং মুখ কাদা দিয়ে বন্ধ। ভিতরে একটু জল ঢোকেনি, কাদাগুলো সরিয়ে দিতেই আমি কেঁদে উঠেছিলাম।
