জিজ্ঞাসু : গুরুমহারাজ, আপনার যে কোন আলোচনাই আমাদের কাছে অমূল্য সম্পদ, বিশেষ করে আপনার নিজের জীবনকাহিনী আপনার মুখে শোনার আলাদা একটা স্বাদ আছে। অনুগ্রহ করে আপনার হিমালয়-ভ্রমণের প্রসঙ্গটিতে যদি আবার ফিরে যান তাহলে বড়ই কৃতার্থ হই ?

গুরুমহারাজ : হ্যাঁ, তোমাদের বলছিলাম যে, ৬৪ কলাসিদ্ধ যোগীর কাছ থেকে ফিরে নীচে নামতেই নাঙাবাবাদ্বয়ের সাথে আবার দেখা হয়ে গেল। ওঁরা আমাকে বললেন, ‘তোমাকে কৈলাস ও মানস সরোবরে নিয়ে যাব।’ আমি তো সঙ্গে সঙ্গে রাজি। এবার ওনারা আমাকে বললেন যে, “হাঁটাপথে পাহাড়-পর্বত, চড়াই-উৎরাই ভেঙে যদি যাও তো কৈলাস যেতে প্রায় তিনমাস লেগে যাবে আর সংক্ষিপ্ত পথে যদি যাও তো ৭ দিনে পৌঁছাবে, কিন্তু সে পথ খুবই দুর্গম—কি করবে তাড়াতাড়ি সিদ্ধান্ত নিয়ে আমাদের বলো ?’ আমি সময় না নিয়েই বলেছিলাম ‘সংক্ষিপ্ত পথেই যাবো’। ওঁরা আর কথা না বাড়িয়ে হাঁটা শুরু করলেন, আমিও ওঁদের অনুসরণ করতে লাগলাম। এইবার ওঁরা হাঁটতে হাঁটতে আমাকে নিয়ে এসে পৌঁছালেন উঁচু থেকে পড়া এক ঝরনার ধারে । আমি ভাবলাম স্নান করবেন বোধ হয় – ওমা, ওঁরা ঝরনার ধারা ভেদ করে এগিয়ে যেতে লাগলেন পর্বতের গায়ের দিকে। সেখানে ঝরনার ধারার আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে জলের আঘাতে আঘাতে নানারকম ছোট-বড় খাল বা গুহার মতো গর্ত তৈরি হয়ে আছে। সেগুলো শেওলা জমে যেমন পিছল তেমনি ভিতরগুলো স্যাঁতসেঁতে ও অন্ধকার। সেইরকম একটা গুহার মতো ছোট গর্তমুখে হামাগুড়ি দিয়ে ঢুকে পড়লেন আর আমাকেও অনুসরণ করতে বললেন। সাধারণ মানুষ এগুলো দেখতেই পায় না আর পেলেও ধারণা করতে পারে না যে, এগুলো সুড়ঙ্গ বা এর মধ্যে দিয়ে যাওয়া যায়। যাইহোক সেই ঘন অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে আঁকাবাঁকা ঐটুকু উঁচু সুড়ঙ্গ পথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটু গেড়ে গেড়ে এগিয়ে যাওয়া যে একি কষ্টকর, তা ভাষায় বর্ণনা করা যায় না। বার বার মাথা ঠুকে যাচ্ছে, হাঁটু ক্ষত- বিক্ষত হচ্ছে, তাছাড়া কত সরীসৃপের বাস ওর মধ্যে যে, তার ইয়ত্তা নেই ! মনে মনে বুঝলাম কেন ওঁরা পর্বতের উপর দিয়ে তিনমাস হাঁটা পথের কথা বলেছিলেন ! যাইহোক বেশ কয়েকঘণ্টা ওভাবে চলার পর সুড়ঙ্গটা একটু প্রশস্ত হল। আরও কয়েকঘণ্টা হেঁট হয়ে চলতে চলতে সুড়ঙ্গ আরও প্রশস্ত হল। এইভাবে একটু একটু করে প্রশস্ত হ’তে হ’তে আমরা হঠাৎ এমন এক জায়গায় এসে হাজির হ’লাম যাতে করে মনে হচ্ছিল যেন সেটা একটা প্রকাণ্ড হলঘর। আর আশ্চর্যের বিষয় এই যে, সেখানে সর্বদাই এক স্নিগ্ধ আলো জ্বলছে। ঠিক যেন মোমবাতির মতো বরফের সাদা সাদা স্টিক এবং তার মাথা থেকে আপনা-আপনি এক স্নিগ্ধ আলোর শিখা বেরিয়ে আসছে। এক অনুপম দৃশ্য ! সেই হলঘরের মতো জায়গাটির চারিদিকে চোখ বুলাতে গিয়ে দেখি দেওয়ালের গায়ে গায়ে অনেক মূর্তি রয়েছে, সবগুলিই যেন ধ্যানস্থ সাধুদের মূর্তি। নাঙাবাবারা আমাকে ঐগুলির মধ্যে একজনকে দেখিয়ে দিয়ে বললেন, ‘এঁকে জানো ইনি বাবাজী মহারাজ।” আমি তাকিয়ে দেখলাম মাটি থেকে প্রায় ৩/৪ ফুট উঁচুতে একজন পাথরের দেওয়ালের সঙ্গে যেন লেগে ধ্যানস্থ অবস্থায় বরফের ন্যায় রয়েছেন। দেখে মনে হচ্ছিল না এঁদের কারও শরীরে প্রাণস্পন্দন রয়েছে। নাঙাদের মধ্যে একজন আমাকে বললেন, “ওনার সাথে Communication করো”, আমি বললাম, ‘কিভাবে !’ ওনারা বললেন “ওনার সামনে বসে মনঃসংযোগ কর তাহলেই Communication হবে।” কিছুক্ষণ ঐভাবে করার পরই দেখলাম ওনার শরীরে চেতনা ফিরে এ’ল এবং উনি প্রসন্ন দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। আমি তিনটে জিজ্ঞাসা করলাম ওনাকে, অবশ্য জিজ্ঞাসাগুলো একটাও বৈখরীতে হয়নি, পশ্যন্তিতে হচ্ছিল। আমি প্রথমে জিজ্ঞাসা করলাম, ‘ভারতবর্ষের পরিস্থিতি বড়ই খারাপ, নানারকম অসুবিধা, অশান্তি, নানান সমস্যা লেগেই রয়েছে—তা এসব থেকে ভারতবর্ষ করে মুক্তি পাচ্ছে ?’ উনি উত্তর দিলেন “২০০২ সাল থেকে ভারতবর্ষ স্বাধীন হবে—তারপর থেকে ভারতবর্ষের উন্নতি শুরু হবে।” পরে আমি চিন্তা করে দেখেছি উনি ঠিকই বলেছেন কারণ হঠাৎ শুনে হয়তো মনে হচ্ছে ‘ভারত স্বাধীন হবে’ তাহলে এখন কি ভারত পরাধীন। হয়তো সরাসরি বিদেশী শাসনাধীনে নয় ভারতবর্ষ ঠিকই, কিন্তু নানারকম চুক্তির বন্ধনে আবদ্ধ ভারত। বিভিন্ন দেশের সাথে ১৯৫২ সালে সংবিধান শুরু হওয়ার পর থেকে অর্থাৎ প্রজাতান্ত্রিক ভারতবর্ষ যখন থেকে declare হল তখন থেকেই অর্থনৈতিক চুক্তি, প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তি, বাণিজ্য চুক্তি ইত্যাদি নানা-চুক্তিতে নানান দেশের সঙ্গে আবদ্ধ ভারত। অর্থাৎ ২০০২ সালে এগুলোর অনেক ফাঁস কেটে যাবে। এমনিতেই ৫০ বছর পর ভারতীয় তরুণ বা যুবকেরা বহির্বিশ্বে শিক্ষায়, বিজ্ঞানে ও প্রযুক্তিতে দ্রুত এগিয়ে আসছে। যাইহোক মহাপুরুষের কথা তো মিথ্যা হবার নয়, সেই অনুযায়ী ২০০২ সাল থেকেই ভারতের উন্নতি শুরু হবে।” আর ২০০৭-৮ সাল নাগাদ ভারতবর্ষের বেশ সুদিন বলা যেতে পারে —তোমরা যারা বেঁচে থাকবে তারা দেখতে পাবে। আর সুবর্ণ যুগ আসবে প্রায় ২০৫০ সাল নাগাদ । ভারতবর্ষে তো সুবর্ণযুগ বা স্বর্ণযুগ এখনও আসেনি—ঐ সময় থেকে আসবে। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের সময়কে সুবর্ণযুগ বলা হচ্ছে কিন্তু ওটা ঠিক ঠিক ভারতের সুবর্ণযুগ নয়। কারণ বিক্রমাদিত্যের সময় অখণ্ড ভারত ছিল না, আর বহির্বিশ্বে ভারতের তখন কতটা মর্যাদা ছিল তাও জানা যায় না। কিন্তু এবার তা হবে, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক নানান দিকের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ভারতের হাতে আসবে। আর তা এলেই গোটা পৃথিবীরও মঙ্গল হবে।

যাইহোক ওনার কাছে আমার দ্বিতীয় জিজ্ঞাসা ছিল— ‘আমরা যে পথে যাচ্ছি—এই পথেই ফিরবো ?’ উনি বললেন, ‘না’। ফিরতেও পারিনি। কৈলাস থেকে ফেরার পথে আমরা তিব্বতে চীনা সৈন্যদের হাতে আটকা পড়ে গেলাম কিছুদিন, তারা আমাদের অন্য দিকে যেতে বাধ্য করেছিল। আর আমার তৃতীয় জিজ্ঞাসাটা ছিল একান্ত ব্যক্তিগত, ওটা তোমাদের বলছি না।
কিশোর বয়সে প্রতিটি ব্যক্তিরই গর্ভধারিণী মাতা এবং মাতৃভূমির প্রতি একটা মমতা এবং কর্তব্যবোধ বা কিছু ন্যায়-নীতিবোধ ইত্যাদি থাকে। রাজনীতির লোকেরা অর্থাৎ নেতারা এটা জানে, আর তরুণ যুব সমাজের এই আবেগটাকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। পৃথিবীতে যত আন্দোলন হয়েছে, সেগুলোর ইতিহাস পর্যালোচনা করো, দেখবে সব জায়গাতেই এই তরুণ-যুব সম্প্রদায়কেই কাজে লাগানো হয়েছে।

তবে আমার ক্ষেত্রে আমি দেখেছি—যে কোন বয়সেই মাতৃভূমি বলে ভারতবর্ষের প্রতি আমার আলাদা কোন আকর্ষণ বা আবেগ তৈরি হয়নি। আমার এটা প্রথম থেকেই জানা ছিল যে, ভারতবর্ষ যেহেতু পৃথিবী গ্রহের মাথা তাই এর উন্নতি হলেই পৃথিবী গ্রহের মঙ্গল। গোটা পৃথিবীটাই আমার আপন, এদেশ-ওদেশ মনে হয় যেন এঘর-ওঘর। যখন ইউরোপের দেশগুলোয় যাই, অনেকে আমাকে জিজ্ঞাসা করে—‘বিদেশ যাবেন বা বিদেশ গিয়েছিলেন।’ তখন এই বিদেশ শব্দটা ভাল লাগে না। বিদেশ বা বিদেশী কেন ? সকলেই তো আমার একান্ত আপনার, সবই তো আমার স্বদেশ। তবু বলার জন্য অনেক সময় হয়তো এসব শব্দ ব্যবহার করতে হয়। আমি তোমাদের বলিনা যে, এখানে শরীরধারণ করে অনেক সংস্কার আমাকে শিখতে হয়েছে। মানুষের সঙ্গে Communication করার জন্য এসবের প্রয়োজন রয়েছে। দেখোনা আমি যদি তোমাদের ‘কেমন আছো’, ‘কখন এলে’, ‘খেয়েছ তো’–এসব কথা না বলি যদি চুপচাপ বসে থাকি, তাহলে কি তোমাদের ভাল লাগবে ? এখান থেকে বেরিয়ে গিয়েই বলবে, ‘গুরুদেব এখন অন্যরকম হয়ে গেছেন আর আগের মতো নেই !’ তারপর হয়তো আরও দু-একবার আসবে এখানে, তখনও যদি আমার আচরণ একইরকম হয় তাহলে তোমাদের অনেকে আসাই বন্ধ করে দেবে। কিন্তু এরকম হোক আমি চাই না। কারণ আমি জানি জীবকে ভালোবাসার জন্যই আমার আসা। ভালোবাসা সম্রাট—ভালোবাসাই পারে মানুষের স্বভাবকে বদলে দিতে। স্বভাবের পরিবর্তনের ফলে মানুষ পশুভাব, অসুরভাব, দানবভাব, রাক্ষসভাব ত্যাগ করে মানুষভাবে আসবে। তারপর সেখান থেকে পরিবর্তিত হয়ে আবার দেবভাব বা ঋষিভাবে উন্নীত হবে। এই যে ক্রমের কথা বললাম এটা চিরন্তন ক্রম। কোন কোন সময় এই ক্রমের গতি মন্থর হয়। তখন কোন না কোন মহাপুরুষ শরীরধারণ করে আবার ঐ গতিকে ত্বরান্বিত করে দিয়ে যান। মহাপুরুষদের প্রকৃত কাজ বা কাজের কাজ এটাই। ত্রিতাপক্লিষ্ট—মায়া-মোহে আচ্ছন্ন জীবের সাধ্য কি মহামায়ার বাঁধন কাটতে পারে ! ঈশ্বরেরই শক্তি সদগুরুরূপে ধরায় নেমে এসে জীবকে হাত ধরে মহামায়ার মায়াজাল ছিন্ন করতে সামর্থ্য প্রদান করেন। তাই প্রকৃত গুরু শিষ্যের জন্য যে কি করেন, তা শিষ্য কোনদিনই জানতে পারবে না। জন্ম- জন্মান্তরের ভোগ-ভোগান্তি এক-দুই জন্মে—বড়জোর তিনজন্মেই শেষ করে দেওয়া—একি সোজা কথা ! যে কোন একটা বিষয় থেকে উদ্ধার পেলেই উদ্ধারকারীর প্রতি মানুষ কৃতজ্ঞ থাকে বা উদ্ধারকারীও কৃতজ্ঞতা আশা করে আর এখানে ৮৪ লক্ষ জন্ম এবং তারপরে আরও কতবার মানবজন্মের পূঞ্জীভূত সংস্কার ও কর্মফলের ভোগ-ভোগান্তি থেকে জীবকে উদ্ধার করা কি মুখের কথা ! এই জন্যই গুরুকে মর্ত্যের ভগবান বলা হয়েছে। দেখবে যে, এইজন্যই কোন দেব-দেবীর থেকেও গুরুকে ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়েছে।