জিজ্ঞাসু : গুরুমহারাজ ! হিমালয় পর্বতের অভ্যন্তরে ঐ রকম অদ্ভুত এক এক গুহায় এই ধরণের মহাত্মাদের দর্শন করে বা তাঁদের সাথে যোগাযোগ করার পর আপনি কি করলেন ?

গুরুমহারাজ : মনটা অদ্ভুত এক আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গেল। ভারতবর্ষের মহিমা হিমালয় যে কিভাবে আঁচল চাপা দিয়ে ধরে রেখেছে, তা দেখে তার প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নোয়ালাম। তারপর আবার চলা শুরু হল শিবভূমি কৈলাসের উদ্দেশে। শৈব সাধুদের কাছে শুনেছিলাম আজ থেকে বহু হাজার বছর আগে মহাদেব শিব শরীরধারণ করেছিলেন পৃথিবীগ্রহে সদাশিবরূপে। তাঁর তিব্বতীয় শরীর ছিল। পশ্চিমে আফগানিস্থান, কাফিরীস্থান ও জম্মু-কাশ্মীরের অমরনাথ সহ বিভিন্ন অঞ্চল এবং হিমালয়ের বিভিন্ন স্থানে সদাশিবের লীলার বিভিন্ন নিদর্শন আজও সাধুসমাজে পরম্পরাগতভাবে রয়ে গিয়েছে—যেগুলো আজও প্রমাণ করে যে, কোন সময় তিনি শরীরে ছিলেন। জয়দেব মুখোপাধ্যায় নামে একজন গবেষক ও লেখক গবেষণা লব্ধ তথ্য দিয়ে তাঁর ‘খ্যাপা খুঁজে ফেরে’ বলে বই-এ তিনি যে সব তথ্য উল্লেখ করেছেন, সেগুলো সবটা ওনার নিজের নয়, নিশ্চয় কোন উচ্চকোটী মহাত্মা কৃপা করে ওনার কাছে ঐসব তথ্য প্রকাশ করেছেন। তা না হলে সাধারণ মানুষ সদাশিবের মহিমা কি করে জানবে ! যে সমস্ত অঞ্চলে সদাশিবের ব্যবহৃত জিনিসপত্র আজও সযত্নে রক্ষিত আছে, সেখানে জীব পৌঁছাতে পারে না ।
কথাটা হয়তো বুঝতে পারলে না—এখানে জীব অর্থে জীবভাব। কামনা- বাসনার দাসত্ব করে অষ্টপ্পাশে আবদ্ধ থাকাটাই জীবভাব। আর সাধনার গভীরতায়, বৈরাগ্যের অনলে একে একে সমস্ত পাপমুক্ত হওয়াই শিবত্ব। এখান থেকে আর কামনা-বাসনার দাসত্ব করতে হয় না। প্রকৃতির অধীনে নয়—সাধক তখন মহাপ্রকৃতির অধীন। এই শিবভাবে উন্নীত সাধকই পারেন হিমালয়ের বিভিন্ন গুপ্ত স্থানগুলিতে যেতে। পৃথিবীতে ঐ রকম সাতটি পয়েন্ট আছে। আমাকে মা সবগুলিতেই নিয়ে গিয়েছিল। তা ওখানকার বিশেষত্ব দেখেছিলাম—ওখানে এমনই ম্যাগনেটিক ফিল্ড তৈরি হয়ে আছে যে, যোগসিদ্ধ শরীর ছাড়া যে কোনভাবেই মানুষ যেতে ইচ্ছা করুক না কেন—শরীরপাত হয়ে যাবে। সেইজন্যই ঐ বিশেষ স্থানগুলি এখনও মানুষের নাগালের বাইরে রয়েছে। তিব্বত অধিগ্রহণ করার পর চীনা সরকার সাধু পরম্পরায় শোনা ঐ বিশেষ পয়েন্টগুলি খুঁজতে প্রচুর অভিযান চালিয়েছে কিন্তু পায়নি। প্রথমে ওরা কৈলাস ও মানসসরোবরে সাধারণের জন্য যাত্রা বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু পরে ওরা চিন্তা করে দেখেছে যে, ভারতীয় সাধু-সন্ন্যাসীরাও তো যাত্রীদের সঙ্গে কৈলাস, মানস সরোবর দেখতে যান, তা ওঁদের মধ্যে যদি কেউ ঐ স্থানগুলো খুঁজে পান তাহলে তখন তাঁদের হটিয়ে ওরা ঐ স্থান দখল করবে। এই ভেবে ফের ভারতীয়দের জন্য ওরা ঐ তীর্থ দর্শনের অনুমতি দিল। তবে সাধুরা যেতেন অন্য পথে, ওঁদের আটকাতে পারেনি। আর ভারতীয় গুরু-পরম্পরাকেও ওরা চেনেনা, যে গুরুকুল রক্ষা করছে ঐ Point- গুলি। মানুষ কখনও যদি যায়ও সেখানে, পথ-বিভ্রান্ত হয়ে অন্য দিকে চলে যাবে, তবু খুঁজে পাবেনা পয়েন্টগুলি আর নির্দিষ্ট এলাকায় পৌঁছালেই মৃত্যু হবে এমনই ফিল্ড !

যাইহোক আমার ওখানে অর্থাৎ কৈলাসে শিব-পার্বতীর দর্শন হয়েছিল স্থূল চোখে। দেখলাম কৈলাসে শিব-পাবর্তী নিত্য বিরাজিত আর ওখানে যে সমস্ত সিদ্ধ শিব-যোগীরা রয়েছেন, তাঁরাও এক- একটা সচল শিব। ওখানে দেখেছিলাম সদাশিবের ব্যবহৃত খড়ম, কমণ্ডলু, ত্রিশূল আজও সযত্নে রক্ষিত আছে। কৈলাস থেকে নেমে মানস সরোবর দেখলাম। মানুষের কল্পনায় স্বর্গীয় সৌন্দর্য সুষমামণ্ডিত মানস সরোবরের যে ধারণা রয়েছে তার সঙ্গে বাস্তবের কিন্তু মিল নেই, ওখানে স্লেট পাথরে তৈরি পর্বতমালাই বেশী। ফলে চারিদিকে তুষারধবল শৃঙ্গের মাঝখানে বিশাল জলাশয়ের সৌন্দর্য রয়েছে ঠিকই কিন্তু জল স্বচ্ছ হলেও স্লেট পাথরের কষ রয়েছে। আর যে ধারণা রয়েছে—সেখানে বড় বড় নীলপদ্ম ফোটে, সব পদ্মের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বিষাক্ত ফণীরা, এসব নিছক কল্পনা, ওখানে ওসব কিছুই নেই।

নাঙাদের জিজ্ঞাসা করতে ওনারা বললেন—এটা স্থূল মানস সরোবর। যা আছে ব্ৰহ্মাণ্ডে তাই আছে দেহভাণ্ডে। শাস্ত্রে যে মানস সরোবরের কথা রয়েছে সেটা হচ্ছে শরীর মধ্যে অবস্থিত অনাহত চক্র। শরীরে চারটি Main point রয়েছে –স্বাধিষ্ঠান চক্রে কাম সরোবর, অনাহতে মানস সরোবর, আজ্ঞাচক্রে প্রেম সরোবর এবং সহস্রারে অক্ষয় সরোবর। সহস্রারে সহস্রদল পদ্ম আর কুলকুণ্ডলিনীকে সর্পের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। জ্ঞানসূর্যের উদয় হলে এই পদ্ম প্রস্ফুটিত হয়।
যাইহোক ওখান থেকে বেরিয়ে জম্মু-কাশ্মীরের ভিতর দিয়ে আমরা ভারতের পশ্চিম প্রান্তে চলে এলাম। ওখানে আমাদের পাকিস্তানী সীমান্তরক্ষীরা আটকাল।