জিজ্ঞাসা : ~ বেদ_ই তো ভারতবর্ষের সবচাইতে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ ? শুধু ভারতবর্ষ কেন সমগ্র বিশ্বের সবচাইতে প্রাচীন ধর্মগ্রন্থ বলা যায় !
কিন্তু বেদে তো সন্ন্যাসী পরম্পরার কথা নেই – বরং ব্রাহ্মণ পরম্পরার কথা আছে । এই বিবর্তন কিভাবে এলো ?
গুরু মহারাজ : ~ বেদকে ধর্মগ্রন্থ বলছো – তা বলতে পারো ! হ্যাঁ, লিখিত বেদের উপনিষদ অংশকে বলতে পারো শ্রেষ্ঠ সনাতন ধর্মগ্রন্থ (শ্রীমদ্ভগবদগীতাকেও উপনিষদ-সার বলা হয়)। গুরু-শিষ্যের জিজ্ঞাসা-উত্তরের মাধ্যমে সর্বকালের সর্বস্থানের মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ জীবন জিজ্ঞাসা ও তার সমাধান রয়েছে উপনিষদে ।
দ্যাখো, আমরা বেদ বেদান্তকে গ্রন্থাকারে পেয়েছি সংস্কৃত ভাষায় । কিন্তু পাণিনির আগে বর্তমানের সংস্কৃত তো ছিল না ! যার জন্য বেদের সুক্তগুলি বর্তমানের সংস্কৃত ব্যাকরণ দিয়ে অর্থ করা যায় না!
প্রাকৃতিক কারণেই অঞ্চলভেদে কথ্য ভাষা পৃথক পৃথক হয়ে যায় । প্রাচীন কালের ভারতীয় প্রধান ভাষা(যেখান থেকে পালি বা বর্তমান সংস্কৃত এসেছে)_টিকে পাণিনি সংস্কার করে বর্তমান রূপ দিয়েছিলেন তাই নাম হয়েছিলো “সংস্কৃত” । প্রকৃতপক্ষে সংস্কৃতকে দেবভাষা বলা হয়েছে । পূর্বে সংস্কৃত পণ্ডিতদের এবং অভিজাতদের ভাষা ছিল ৷ সাধারণ মানুষেরা প্রাকৃত ভাষায় কথা বলতো ৷ বুদ্ধদেবের সময় পালি ভাষা ছিল , যেমন কর্মকার > কম্মার ; স্বর্ণকার > সোনার । রাজাদের আন্তঃরাজ্য বিবাহ হোত ! যেমন কাশীরাজের সাথে বিদেহ রাজকন্যা , হস্তিনাপুরের রাজপরিবারে গান্ধারী অর্থাৎ কান্দাহার রাজকন্যা বা কুন্তী ভোজরাজ (গুজরাট) কন্যার বিবাহ হয়েছিল । এগুলি আমাদের প্রাচীন গ্রন্থাদি থেকে পাওয়া যায় ৷ রাজন্যবর্গের সাধারণ ভাষা যেহেতু দেবভাষা ছিল – তাই বৈবাহিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভাষাজনিত কোনো অসুবিধা হোতো না । এখন যেমন ইংরেজি আন্তর্জাতিক ভাষাগুলির একটি , ফলে বিভিন্ন দেশের নেতৃবর্গের কমিউনিকেশন ইংরেজিতে করতে যেমন কোনো অসুবিধা হয় না___ তেমনি বহু পূর্বে ভারতবর্ষের নেতৃবর্গের বা রাজন্যবর্গের সাধারণ ভাষা একই হ‌ওয়ায় কমিউনিকেশন বা রিলেশনশিপ করতে ভাষা কোনো সমস্যা সৃষ্টি করতো না ৷
আমি বর্তমানের ইংরেজিকে আন্তর্জাতিক ভাষা বললাম কিন্তু বিশ্বের বহু দেশ ইংরেজি ভাষাকে পাত্তাই দেয় না – এটাও জেনে রাখা ভালো ৷ সেখানকার নেতৃবর্গ ইংরেজি শেখে না বা বলতে পারে না – যেমন রাশিয়া , চীন ইত্যাদি । কিন্তু যে কোনো বিশ্ব সম্মেলনে বা আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে তাদের এর জন্য কোনো অসুবিধাও হয় না ! কারণ দোভাষীর সাহায্যে তাদের নিজের ভাষায় বলা বিবৃতি __ইংরেজিতে বা অন্য কোনো ভাষায় অনুবাদ করে দেওয়া হয় ৷
প্রাচীন ভারতবর্ষে শিক্ষা দিতেন যাঁরা, তাঁদের বলা হোত আচার্য্য ! এঁরা বেশিরভাগ‌ই ছিলেন ঋষিস্থিতির মানুষ ৷ তখন সমাজে গুরুকুল প্রথা চালু ছিল ৷ শিক্ষা ছিল আরণ্যক ৷ অরণ্য বলতে বনজঙ্গল ভেবো না ! রাজধানী বা নগর কোলাহল থেকে দূরে শিক্ষালয় বা বিদ্যালয় নির্মাণ করা হোতো ৷ ছোট ছোট কুটীর টাইপের ঘর , আর তার চারিপাশে প্রচুর ফুল বা ফলের গাছ থাকতো ৷ গাছ-গাছালি দিয়ে ঘেরা, বনানীর ছায়ায় ঢাকা এই শিক্ষা কেন্দ্রগুলিকে দূর থেকে অরণ্য মনে হোতো – তাই ‘আরণ্যক’ শব্দটি ব্যবহার হোতো ৷ কোনো না কোনো ঋষি সমাজকল্যাণের নিমিত্ত বা সমাজ সেবার জন্য শিক্ষাদানের কাজে ব্রতী হয়ে এইরূপ শিক্ষাকেন্দ্র তৈরি করতেন। পরে আরও আচার্য্যরা এসে সেখানে যোগদান করতেন ।
তিনি প্রথমে নগর থেকে দূরে , শান্ত পরিবেশে , কোনো স্বচ্ছ সলিলা নদীর তীরে কুটীর বা আশ্রম বানাতেন । প্রথমে দুটো-চারটে ছাত্র নিয়ে তৈরি হোতো এইরূপ শিক্ষালয় ৷ একে একে রিটায়ার্ড রাজ কর্মচারীরা বা শিক্ষাবিদরা নিঃস্বার্থ শিক্ষাদানের মানসিকতা নিয়ে এখানে এসে আবাসিক হিসাবে থাকতে শুরু করতেন । শিক্ষকের সংখ্যা বাড়তে থাকলে ছাত্র সংখ্যাও বাড়তে থাকতো ৷ আবাসিকদের থাকার গৃহ বা পাঠদানের কক্ষ সংখ্যাও বাড়তে থাকতো !
এইভাবেই সেযুগের বিদ্যালয় , মহাবিদ্যালয় বা বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতো!
বৈদিক যুগে বা তার পরবর্তীতে সমাজে একটা কথা চালু ছিল “পঞ্চাশোর্ধে বনং ব্রজেত্ “। তবে এটা সবার জন্য নয় – যারা সাধন-ভজনের দ্বারা জীবনের শেষ কটা দিন কাটাতে চাইতো বা যারা ওই ধরনের বিদ্যায়তনের সাথে যুক্ত হতে চাইতো – তারাই পরিবার ছেড়ে দিয়ে বনে বা অরন্যে অর্থাৎ কোনো নির্জন স্থানে কুটীর বানাতেন অথবা ঐ ধরনের কোনো শিক্ষাকেন্দ্রে শিক্ষাদানের নিমিত্ত যোগদান করতেন ।
এইসব শিক্ষাকেন্দ্রে যারা পড়তে আসতো – তাদের অভিভাবকরাই শিক্ষকদের থাকা খাওয়া বা বিল্ডিং নির্মাণের খরচের ভার বহন করতো । আসলে শিক্ষা গ্রহণের জন্য বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজের উচ্চবর্ণের ছেলেমেয়েরাই আসতো অথবা রাজন্যবর্গের সন্তান , রাজকর্মচারীদের সন্তান , অভিজাতদের সন্তানরাই শিক্ষার সাথে যুক্ত হোত । ফলে সেইসব ছাত্রদের অভিভাবকরাও অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ছিল – তাই এইসব ব্যাপারে কোনো অসুবিধা হোত না ৷
তাছাড়া অনেক ক্ষেত্রে ওই আশ্রমের যিনি প্রতিষ্ঠাতা তিনি ঋষি বা উন্নত অবস্থার যোগী-পুরুষ হওয়ায় প্রায়শঃই তিনিই হোতেন রাজগুরু বা রাজন্যবর্গের গুরু ! ‘গুরুমশায়’ – নামটি এখনো সমাজে চালু রয়েছে ! যদিও বলা যায়, শিক্ষা দেন – সেই অর্থে শিক্ষা গুরু । কিন্তু প্রকৃতপক্ষে “গুরু”-র অর্থ আলাদা । বিদ্যা শিক্ষার দ্বারা ছাত্র অন্ধকার থেকে আলোয় আসে না – অশিক্ষিত থেকে শিক্ষিত হয় । জগতে যত বড় বড় ক্রিমিনাল , অনিষ্টকারী , মানবতাবিরোধী তাদের অধিকাংশই শিক্ষিত । অশিক্ষিত মানুষেরা__ শিক্ষিত অপরাধীদের ন্যায় সমাজের অতো বেশি কোনো মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে না । …[এই আলোচনাটি দীর্ঘ, তাই ৩/৪-টি এপিসোড ধরে চলবে] (ক্রমশঃ)