জিজ্ঞাসু (বিদেশী অর্থাৎ একজন ইউরোপীয় ভক্ত) : ~ ‘Faith’ আর ‘Trust’ কি এক ?
গুরু মহারাজ : ~ Faith , belief এগুলো ঠুনকো ৷ দীর্ঘদিন কোনো মানুষের সাথে মেলামেশা করছো বা কোনো আদর্শকে ধরে আছো কিন্তু দেখা গেল_ সামান্য আচরণ বৈষম্যে সেই ব্যক্তিটিকে আর তোমার মনের মতো মনে হোচ্ছে না, তার সঙ্গে মিশে তোমার স্বার্থ বিঘ্নিত হোচ্ছে _বলে বোধ হচ্ছে ! যে আদর্শকে তুমি দীর্ঘদিন মেনে এসেছো _ সেই একই আদর্শ পালনকারী অন্যান্যদের আচরণ তোমাকে ব্যথিত করছে , ব্যস ! দেখবে তোমার মধ্যে এসে গেল _ unfaith , unbelieve ! এরকম কত উদাহরণ দেখতে পাবে সমাজে !
দুটো পুরুষ মানুষের বন্ধুত্ব , মেলামেশা এতো ঘনিষ্ঠ যে, সংসারের লোকেরা, পাড়া-পড়শি অথবা সমাজের সদস্যরাও সেই নিয়ে আলোচনা করে ! গলায় গলায় বন্ধুত্ব থেকে যাচ্ছে —-দশ বছর , পনেরো বছর , কুড়ি বছর ! এর মধ্যে কোনো একটা সামান্য কারণে লাগলো_ যে কোনো একজনের sentiment-এ ঘা ! আর যায় কোথায়_ লেগে গেল “তেরে কেটে তাক্” ! এতো দিনের মধূর সম্পর্কও এক লহমায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে । আবার এমনও হয় – একেবারে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ! ভাবো একবার !
দুটি কিশোরী মেয়ের বন্ধুত্বও প্রায়শঃই এরকমই হয় ৷ এক রঙের জামা পড়েছে , এক সাথে থাকছে , খাচ্ছে , ঘুমোচ্ছে ৷ বাড়ির লোকেরাও অবাক হয়ে যায় – কি ব্যাপার ! বাড়ির মেম্বারদের থেকেও তোর সই-এর(বন্ধুর) প্রতি এতো টান ! কিছুদিন পরে যেই ওই মেয়ে দুটির মধ্যে, যে কোনো একটির জীবনে একজন পুরুষ এসে যায় — সঙ্গে সঙ্গেই সম্পর্ক শেষ !
এই যে উদাহরণগুলি দিলাম __এই সম্পর্কগুলি পারস্পরিক বিশ্বাস বা belief থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকে ৷ আপাতভাবে দেখে মনে হয় ‘বিশ্বাস’ খুব দৃঢ় _ তাই দু’জনের ভালোবাসা এত গাঢ় ! কিন্তু তা নয় , _ ঠুনকো ! সামান্য কারণে চিড় ধরে , ফাটল ধরে – হয়তো সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে যায় ।
কোনো আদর্শের(পার্টি-পলিটিক্স, ধর্মীয় ইত্যাদি) প্রতি ও সাধারণ মানুষের এই ধরনের belief বা faith অর্থাৎ বিশ্বাস বা আনুগত্য থাকে । কিন্তু সেটা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির মেলামেশার থেকে আরও একটু দৃঢ় মনে হোলেও – সুদৃঢ় নয় ৷ দ্যাখো , মানুষ সাধারণত: imotional বা আবেগপ্রবণ বা ভাবপ্রবণ বলতে পারো । তাই সে যখন যেটাকে গ্রহণ করে সেটাতেই সে এতো আবেগ বা ভাব আরোপ করে বসে যে, কোথায় যেন সে ভেসে যায় ! তবে, সবাই এই দলে পড়ে না – কিন্তু বেশিরভাগ মানুষেরই এই স্বভাব ! তারপর যখন সেখান থেকে ঐ ব্যক্তি কোনো ঘা খায়, তখন আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরতে তার খুবই কষ্ট হয় ! কারণ, আবার তো উজানে সাঁতার কেটে ওই পথেই ফিরে আসতে হবে – তাই এই কষ্ট ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অনুরাগীদের একটা শিক্ষা রয়েছে , ” পাখি তুই ঠিক বসে থাক , ঠিক বসে থাক , ঠিক বসে থাক রে , রামকৃষ্ণের মাস্তুলে ৷” কিন্তু ক’জন তা পারে ! আমরা তো ভেসে যেতেই ভালোবাসি ! আবার যে উজানে সাঁতার কেটে কেটে সেখানেই(যেখান থেকে শুরু করা হয়েছিল) ফিরে আসতে হবে – সে কথা কি সাধারণ মানুষের মনে থাকে ? বিস্মৃতির করাল গ্রাসে সব ভুলে বসে যায় মানুষ ! সেই কথা মনে পাড়াতেই মহাপুরুষদের আসা ! এইজন্যেই তো ভগবানের অবতরণ !
যাই হোক , আর একটা ‘শব্দ’ যে তুমি বলছিলে Trust ! এটা belife বা faith -এর মতো ঠুনকো নয় ৷ এটা দৃঢ় ! আর দৃঢ়ই শুধু নয়_এটা এতোটাই সুদৃঢ় যে, সেই ব্যক্তি মরে যাবে কিন্তু তার Trust হারাবে না ! এইতো একটু আগেই বলছিলাম হজরত মনসুরের-এর কথা ! ‘আয়নুল হক’ বলার জন্য বাদশা তার জিভ কেটে দিল । পরে শরীর টুকরো টুকরো করা হোলো , খণ্ডগুলোও বলছে ‘আয়নুল হক’ ! বিল্বমঙ্গল বালকবেশী কৃষ্ণকে বলল , ” হৃদয় থেকে ছেড়ে যেতে পারলে বুঝব তোমার ক্ষমতা !” এইগুলোই Trust-এর উদাহরণ ।
তবে হ্যাঁ , এগুলো যেন ক্রম ! belief –> faith –> Trust । এই ক্রম ধরে ধরে আগাতে হবে ৷ কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন হয় সদ্-গুরুর ! যিনি তোমার অজ্ঞানতা কাটিয়ে তোমার চেতনার উত্তরন ঘটাবেন ।
এতোটা পর্যন্ত পৌঁছে গেলে _এবার শুধু বাকি থাকে গুরুর নির্দেশ মেনে জীবন পথে এগিয়ে চলা ! অর্থাৎ সাধন-ভজন করা ! আর এটা ঠিকমতো করতে পারলেই— ‘চরৈবেতি’-র চিকণ পথটি ধরে _সাধক ঠিক অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে ৷(ক্রমশঃ)
গুরু মহারাজ : ~ Faith , belief এগুলো ঠুনকো ৷ দীর্ঘদিন কোনো মানুষের সাথে মেলামেশা করছো বা কোনো আদর্শকে ধরে আছো কিন্তু দেখা গেল_ সামান্য আচরণ বৈষম্যে সেই ব্যক্তিটিকে আর তোমার মনের মতো মনে হোচ্ছে না, তার সঙ্গে মিশে তোমার স্বার্থ বিঘ্নিত হোচ্ছে _বলে বোধ হচ্ছে ! যে আদর্শকে তুমি দীর্ঘদিন মেনে এসেছো _ সেই একই আদর্শ পালনকারী অন্যান্যদের আচরণ তোমাকে ব্যথিত করছে , ব্যস ! দেখবে তোমার মধ্যে এসে গেল _ unfaith , unbelieve ! এরকম কত উদাহরণ দেখতে পাবে সমাজে !
দুটো পুরুষ মানুষের বন্ধুত্ব , মেলামেশা এতো ঘনিষ্ঠ যে, সংসারের লোকেরা, পাড়া-পড়শি অথবা সমাজের সদস্যরাও সেই নিয়ে আলোচনা করে ! গলায় গলায় বন্ধুত্ব থেকে যাচ্ছে —-দশ বছর , পনেরো বছর , কুড়ি বছর ! এর মধ্যে কোনো একটা সামান্য কারণে লাগলো_ যে কোনো একজনের sentiment-এ ঘা ! আর যায় কোথায়_ লেগে গেল “তেরে কেটে তাক্” ! এতো দিনের মধূর সম্পর্কও এক লহমায় নষ্ট হয়ে যেতে পারে । আবার এমনও হয় – একেবারে মুখ দেখাদেখিও বন্ধ ! ভাবো একবার !
দুটি কিশোরী মেয়ের বন্ধুত্বও প্রায়শঃই এরকমই হয় ৷ এক রঙের জামা পড়েছে , এক সাথে থাকছে , খাচ্ছে , ঘুমোচ্ছে ৷ বাড়ির লোকেরাও অবাক হয়ে যায় – কি ব্যাপার ! বাড়ির মেম্বারদের থেকেও তোর সই-এর(বন্ধুর) প্রতি এতো টান ! কিছুদিন পরে যেই ওই মেয়ে দুটির মধ্যে, যে কোনো একটির জীবনে একজন পুরুষ এসে যায় — সঙ্গে সঙ্গেই সম্পর্ক শেষ !
এই যে উদাহরণগুলি দিলাম __এই সম্পর্কগুলি পারস্পরিক বিশ্বাস বা belief থেকে সৃষ্টি হয়ে থাকে ৷ আপাতভাবে দেখে মনে হয় ‘বিশ্বাস’ খুব দৃঢ় _ তাই দু’জনের ভালোবাসা এত গাঢ় ! কিন্তু তা নয় , _ ঠুনকো ! সামান্য কারণে চিড় ধরে , ফাটল ধরে – হয়তো সম্পর্কটাই নষ্ট হয়ে যায় ।
কোনো আদর্শের(পার্টি-পলিটিক্স, ধর্মীয় ইত্যাদি) প্রতি ও সাধারণ মানুষের এই ধরনের belief বা faith অর্থাৎ বিশ্বাস বা আনুগত্য থাকে । কিন্তু সেটা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির মেলামেশার থেকে আরও একটু দৃঢ় মনে হোলেও – সুদৃঢ় নয় ৷ দ্যাখো , মানুষ সাধারণত: imotional বা আবেগপ্রবণ বা ভাবপ্রবণ বলতে পারো । তাই সে যখন যেটাকে গ্রহণ করে সেটাতেই সে এতো আবেগ বা ভাব আরোপ করে বসে যে, কোথায় যেন সে ভেসে যায় ! তবে, সবাই এই দলে পড়ে না – কিন্তু বেশিরভাগ মানুষেরই এই স্বভাব ! তারপর যখন সেখান থেকে ঐ ব্যক্তি কোনো ঘা খায়, তখন আবার পূর্বের অবস্থায় ফিরতে তার খুবই কষ্ট হয় ! কারণ, আবার তো উজানে সাঁতার কেটে ওই পথেই ফিরে আসতে হবে – তাই এই কষ্ট ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ অনুরাগীদের একটা শিক্ষা রয়েছে , ” পাখি তুই ঠিক বসে থাক , ঠিক বসে থাক , ঠিক বসে থাক রে , রামকৃষ্ণের মাস্তুলে ৷” কিন্তু ক’জন তা পারে ! আমরা তো ভেসে যেতেই ভালোবাসি ! আবার যে উজানে সাঁতার কেটে কেটে সেখানেই(যেখান থেকে শুরু করা হয়েছিল) ফিরে আসতে হবে – সে কথা কি সাধারণ মানুষের মনে থাকে ? বিস্মৃতির করাল গ্রাসে সব ভুলে বসে যায় মানুষ ! সেই কথা মনে পাড়াতেই মহাপুরুষদের আসা ! এইজন্যেই তো ভগবানের অবতরণ !
যাই হোক , আর একটা ‘শব্দ’ যে তুমি বলছিলে Trust ! এটা belife বা faith -এর মতো ঠুনকো নয় ৷ এটা দৃঢ় ! আর দৃঢ়ই শুধু নয়_এটা এতোটাই সুদৃঢ় যে, সেই ব্যক্তি মরে যাবে কিন্তু তার Trust হারাবে না ! এইতো একটু আগেই বলছিলাম হজরত মনসুরের-এর কথা ! ‘আয়নুল হক’ বলার জন্য বাদশা তার জিভ কেটে দিল । পরে শরীর টুকরো টুকরো করা হোলো , খণ্ডগুলোও বলছে ‘আয়নুল হক’ ! বিল্বমঙ্গল বালকবেশী কৃষ্ণকে বলল , ” হৃদয় থেকে ছেড়ে যেতে পারলে বুঝব তোমার ক্ষমতা !” এইগুলোই Trust-এর উদাহরণ ।
তবে হ্যাঁ , এগুলো যেন ক্রম ! belief –> faith –> Trust । এই ক্রম ধরে ধরে আগাতে হবে ৷ কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন হয় সদ্-গুরুর ! যিনি তোমার অজ্ঞানতা কাটিয়ে তোমার চেতনার উত্তরন ঘটাবেন ।
এতোটা পর্যন্ত পৌঁছে গেলে _এবার শুধু বাকি থাকে গুরুর নির্দেশ মেনে জীবন পথে এগিয়ে চলা ! অর্থাৎ সাধন-ভজন করা ! আর এটা ঠিকমতো করতে পারলেই— ‘চরৈবেতি’-র চিকণ পথটি ধরে _সাধক ঠিক অন্তিম লক্ষ্যে পৌঁছে যাবে ৷(ক্রমশঃ)
