[আগের দিন আমরা দেখেছিলাম একজন মুসলিম সম্প্রদায়ের স্কুল শিক্ষকের ধর্ম-সম্বন্ধীয় জিজ্ঞাসার উত্তর দিচ্ছিলেন গুরু মহারাজ। আজ তার পরবর্তী অংশ]
….. আত্মজ্ঞানী মহাপুরুষরা এটা কখনো করেননি –তাঁরা স্থান-কাল-পাত্র অনুযায়ী কাজ করেছেন ! পরবর্তীতে তাঁদের followers-রা এইসব করেছে ৷ ওই যে বললাম ‘ধর্ম’ সনাতন , ‘সত্য’ সনাতন ৷ যে কোনো দেশের , যে কোনো কালের , যে কোনো মহাপুরুষরাই এটি জানেন । আল্লাহ , হরি , গড , ভগবান , ঈশ্বর এগুলি বিশেষণ ! এগুলির মাধ্যমে সেই Supreme(সর্বশক্তিমান পরমেশ্বর)-কেই বিশেষিত করার চেষ্টা করা হয় । এই শব্দগুলির ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ করে বড় বড় আর্টিকেল বা গ্রন্থ রচনা করা যায় ৷ হিন্দুদের শাস্ত্রে যেমন কৃষ্ণের অষ্টোত্তর শতনাম (১o৮) রয়েছে তেমনি ইসলামী শাস্ত্রাদিতেও আল্লাহ-র ১০৮ টি নাম রয়েছে । ‘আল কোরান’ প্রথমে আরবী ভাষায় লিখিত হয়েছিল, পরবর্তীতে বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ হয়েছে! আর ঐ অনুবাদেই যত গোলমাল! ইসলামীয় শাশ্ত্রে আল্লাহ-র ১০৮ টি নামের মধ্যে__ অনেক নামের-ই আরবীতে সন্ধি করা যায় ! আবার অনেক শব্দ রয়েছে যেগুলির স্ত্রীলিঙ্গ করা যায় , অনেকগুলোর অবশ্য করা যায় না । কি বলতে চাইছি_বুঝতে পারছেন মাষ্টারমশাই! এমনিতে ‘এক এবং অদ্বিতীয়’ বলা হোলেও বিকল্পের ভাবনা থেকেই যাচ্ছে_তাই না?
মুসলমানেরা ভারতবর্ষে বসবাস শুরু করার বহু বছর আগেই ভারতীয় শাস্ত্রাদি (বেদ , উপনিষদ , পুরাণ , মহাকাব্য ইত্যাদি)রচিত হয়েছিল। অষ্টাদশ পুরাণের মধ্যে সবচাইতে নবীনতম হিসাবে ঐতিহাসিকরা নির্ধারণ করেছে পদ্মপুরাণকে , যেটিকে বলা হয়েছে নন্দ বংশের প্রতিষ্ঠাতা মহাপদ্ম নন্দের সময়ে রচিত । তার মানে প্রায় খ্রিস্টপূর্ব চার’শ বছর বা আজ থেকে ২৪০০ বছর আগে লেখা ৷ আর হজরত মুহাম্মদ মাত্র চৌদ্দ’শ (১৪০০) বছর বা তার কিছু বেশি সময় আগে জন্মেছিলেন ৷ আর ভারতবর্ষে ইসলামীয়রা( স্থায়ীভাবে) প্রবেশ করতে শুরু করেছে ১১৯১/৯২ খ্রিস্টাব্দ থেকে অর্থাৎ মাত্র ৮০০ বছর আগে ৷
মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন অনুন্নত জনজাতির ভারতবর্ষে এই মাইগ্রেশন-এর ফলেই নানা গন্ডগোলও শুরু হয়েছে । মাইগ্রেশন প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যেই পড়ে কিন্তু সেটা বিশেষ পরিস্থিতিতে । প্রাকৃতিক কারণে (যুদ্ধ, মহামারী,ভুমিকম্প সহ যে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়)এক মহাদেশের প্রাণী বা উদ্ভিদ অন্য মহাদেশে গিয়ে বাঁচতে পারে বা Survive করতে পারে ! কিন্তু সেক্ষেত্রেও ঠিকমতো নতুন পরিবেশকে Adopt করতে সময় লাগে । Adopt করতে পারলে বাঁচে এবং বাড়ে,অন্যথায় টেকে না _অবলুপ্ত হয়ে যায়৷ যেমন ধরো , অস্ট্রেলিয়ার ক্যাঙ্গারু কি সুন্দরবনে Survive করতে পারবে বা সুন্দরবনের রয়েল বেঙ্গল টাইগার কি ওই দেশে বাঁচবে ? মানুষের মতো উন্নত প্রাণী _ যাদের যেকোনো পরিবেশে বাঁচার জন্য নিজস্ব কিছু Technology রয়েছে – তাদেরই কত অসুবিধা হয় হঠাৎ করে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে গেলে – হয় না কি ? তেমনি কোনো স্থানের রাজনীতি অথবা ধর্মনীতি অন্যস্থানে জোর করে চাপাতে গেলে সমস্যা তো হবেই ! কার্ল-মার্কস জার্মানির লোক , Marxist Philosophy লিখলো লন্ডনের লাইব্রেরীতে বসে ৷ রাশিয়ার লেলিন সেই দর্শনকে একরকম ভাবে তার দেশে প্রতিষ্ঠা করল । মাও-জে-দঙ সেই একই দর্শন চীনে অন্যভাবে আনলো ৷ পূর্ব ইউরোপের বেশ কিছু দেশে আবার আলাদা আলাদা ভাবে এলো । ভারতবর্ষে সেই একই দর্শন চালাতে গিয়ে, রাজনীতিবিদরা দর্শনটার‌ই বারোটা বাজালো !
সেই রকম কোনো মহামানব যখন পৃথিবীর কোনো প্রান্তে আবির্ভূত হ’ন, তখন তিনি সেই স্থানের মানুষের মঙ্গলার্থে-ই আসেন । যেখানে অধিক প্রয়োজন – সেখানেই তাঁর আবির্ভাব হয় ৷ পরে তাঁর শিক্ষা , তাঁর আদর্শ প্রয়োজনে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়তেও পারে , আবার কোনো নির্দিষ্ট স্থানে সীমাবদ্ধ‌ও থাকতে পারে! তবে ঠিক ঠিকভাবে মহাপুরুষদের মূল আদর্শ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়লে_ সব জায়গার মানুষ তার essence-টা পায় ।
কিন্তু ‘আমারটাই ঠিক আর বাকিরা সব ভুল – অতএব আমারটা মানো না হয় মরো’ – এটা কোনো মহাপুরুষ বলেননি । ওই যে বলছিলাম এটা Saddist-রা বলেছে, আর যুগে যুগে পৃথিবীকে রক্তস্নাত করেছে । কিন্তু মজার কথা কি জানো ! যাঁর কথা বা যাঁর আদর্শ মানানোর জন্য এরা লড়াই করে , রক্তপাত ঘটায় __সেই মহাশক্তিই আবার নতুন রূপে ,নতুন বেশে শরীর ধারণ করতে বাধ্য হয় – ওই ধর্মান্ধগুলিকে শায়েস্তা করার জন্য !
এই কথাগুলি উল্লেখ করলাম এই জন্য যে, বহুকাল ধরেই পণ্ডিতদের কাছে এই নিয়ে খুবই বিতর্ক চলছে । কোনো ধর্মমতের প্রভাব অন্য ধর্মমতে পড়েছে কিনা এই নিয়ে । এগুলো স্বাভাবিক ব্যাপার ! Adaptation তো প্রকৃতির ধর্ম ! আরবের গাছপালা , পশুপাখি ভারতবর্ষে এসে যদি Survive করতে হয়, তাহলে তাকে এখানকার পরিবেশকে Adapt করতেই হবে ! সেক্ষেত্রে সেই সব উদ্ভিদ বা প্রাণীর শরীরের কোনো অংশের কিছু পরিবর্তনও হয়ে যেতে পারে ৷ সুতরাং মানুষের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়বে _ তার মনোজগতে , প্রাণের জগতে বা অন্ত:জগতেও পরিবর্তন হবে ।
ইসলাম ভারতে প্রবেশ কারার পরই ‘সুফী’ পরম্পরার সৃষ্টি হয়েছিল ৷ এছাড়া ‘বাহাই’ , ‘কাদেরী’ – ইত্যাদি বিভিন্ন উদারপন্থী পরম্পরাও তো রয়েছে ।
দেখুন_ যে কোনো গোঁড়াপন্থী ধর্মাবলম্বীরাই এখন গোটা পৃথিবীর কাছে সমস্যা । গোঁড়াপন্থী মুসলিমরাও এই দলে পড়ে যাবে । পৃথিবীর সকলকেই তাদের স্বমতে আনার প্রবল প্রচেষ্টায় এরা হিংস্র হয়ে উঠেছে – এই লক্ষণ ভালো নয় ।
প্রকৃত আধ্যাত্মিকতা মানুষকে শান্ত করে , ধীর স্থির করে – সকলকে আপন ভাবে । ” বসুধৈব কুটুম্বকম্ ” – এই ধারণা মজবুত হয় । বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথও তার চেতনায় এই ধারণার স্পর্শ পেয়েই লিখেছিলেন ” বিশ্বজগত আমারে মাগিলে কে মোর আত্মপর , / আমার দেবতা আমাতে জাগিলে কোথায় আমার ঘর ।” আধ্যাত্মিক মানুষেরা কখনো ঝগড়া করে না , মারামারি করে না – এমনকি তর্ক-বিতর্কও করে না ৷ কারণ তারা জানে বৈচিত্র্যতাই প্রকৃতির অমোঘ নিয়ম ৷ সুতরাং বৈচিত্র থাকবেই – সকলকে একমতে জোর করে আনা যায় না । শুধু বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যতানটি খুঁজে বের করতে হয়। আর এইটা করতে পারাটাই আধ্যাত্মিকতা ।৷