[গুরু মহারাজ একজনের জিজ্ঞাসার উত্তরে___ বেদাদি শাশ্ত্র, ব্রাহ্মণ পরম্পরা,সন্ন্যাসী পরম্পরা ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করছিলেন। আজ সেই আলোচনার পরবর্তী অংশ।]
যাইহোক , এইভাবেই তখনকার দিনে কোনো ঋষি বা ত্যাগী মহাসাধক অথবা কোনো মহান আদর্শবান মানুষকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠত শিক্ষা কেন্দ্র ৷ এই শিক্ষা কেন্দ্রে এখনকার মতো শুধুই ‘একাডেমিক শিক্ষা’ দেওয়া হোতো না ! যে সমস্ত শিক্ষকেরা স্বেচ্ছায় শিক্ষাদানের জন্য আসতেন, তারা ছিলেন কেউ অর্থ বিশারদ , কেউ স্বাস্থ্য বিশারদ, কেউ শস্ত্র বিশারদ , কেউ শাস্ত্র বিশারদ ইত্যাদি । এই শিক্ষকেরা যিনি যে বিষয়ে বিশারদ _তিনি সেই বিষয়েরই শিক্ষা দিতেন । যেমন হয়তো retired কোনো মন্ত্রী এইরূপ শিক্ষাকেন্দ্রে join করেছেন _ তিনি অর্থমন্ত্রী হোলে ছাত্রদের ইকোনমিক্স শেখাতেন , কৃষি মন্ত্রী হলে এগ্রিকালচার শেখাতেন – এই রকম আর কি ! আবার retired সেনাপতি বা সেনানায়করা শিক্ষক হিসাবে এলে __তাঁরা শস্ত্র বিদ্যা বা সমর বিদ্যা শেখাতেন ৷ এইভাবে বিভিন্ন পেশায় নিযুক্ত এক্সপার্টরা নিজেদের সারাজীবনের theoritical এবং practical অভিজ্ঞতা ছাত্রদের কাছে নিঃস্বার্থে উজাড় করে দিতেন !
এবার শিক্ষাবর্ষের অন্তে যে যে বিভাগের ___যে যে ছাত্ররা সব চাইতে কুশলী হয়ে উঠতো, গুরুমশাই দেশের রাজাকে সেই সেই বিভাগের(department) কৃতি ছাত্রদের অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়ার জন্য সুপারিশ করে পাঠাতেন । যারা অতো মেধাবী নয়, তারা ভালো ভালো ছাত্রদের সহকারী বা সাহায্যকারী হোত বা অন্যান্য কর্মক্ষেত্রে কাজ করতো । আবার অনেকে গুরুগৃহে-ই থেকে গিয়ে গুরুর বিভিন্ন কর্মে সহায়তা করতো । এই ভাবেই তখনকার গুরুকুল প্রথা চালু ছিল ৷ রাজন্য বর্গের সাথে গুরু বা শিক্ষকদের সুন্দর বোঝাপড়া ছিল । তখন শিক্ষা “দান” হোত , শিক্ষা ব্যবসা ছিল না ৷ শিক্ষা ব্যবসা অর্থাৎ যে ইনস্টিটিউশনে fees যত বেশি, সেখানেই ভালো শিক্ষা দেওয়া হয় _এই ব্যাপারটাকে উল্লেখ করার চেষ্টা করছি ! স্কুলের fees অনেক বেশি_এমন সব স্কুলে ছেলেমেয়েদের ভর্তি করার জন্য _বর্তমানে Gurdian-দের যে Craze দেখছি – এটা দেখেই এই কথাগুলো বললাম ৷ এভাবে করলে ছাত্র-ছাত্রীরাও এক একজন ‘শিক্ষা ব্যবসাদার’ তৈরী হবে –প্রকৃতঅর্থে ছাত্র তৈরি হবে কি ? শিক্ষাবিদ হবে কি ?_কোনোদিন‌ই হবে না।
অত্যধিক জনসংখ্যা আর সমাজ নেতাদের আদর্শচ্যুতির ফলেই আজ সমাজের এই অবস্থা ! এখনও বিভিন্ন মঠ-মিশনে শিক্ষা ‘দানে’র চেষ্টাটা চলছে – কিন্তু সেখানে ছাত্রসংখ্যার নিরিখে স্থান এত অপ্রতুল যে, মানুষ বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণে বাধ্য হচ্ছে । বৈদিক যুগে বা ঠিক তার পরবর্তীতেও জনসংখ্যা এতটা সমস্যা ছিল না । ‘গুরুকুল প্রথার শিক্ষা’ বা ‘অরণ্যকেন্দ্রিক শিক্ষা’_ যতদিন ছিল, ততদিন ভারতীয় শিক্ষা ব্যবস্থায় কোনো গলদ ঢোকেনি ৷ যখন থেকে ‘টোল’ চালু হোলো – তখন থেকেই ভারতীয় সনাতন ধারার শিক্ষার বারোটা বাজলো । ‘টোল’ ভারতীয় সমাজকে কি দিয়েছে – গোটা কয়েক উন্নাসিক অন্তঃসারশূন্য পন্ডিতের জন্ম দিয়েছে ! মুখে বড় বড় কথা –আচরণে কিছুই নাই ! সাধারণ লোককে সংস্কৃত বিমুখ –শিক্ষা বিমুখ করেছে ! শুধু বিধান দিয়েছে আর লোক ঠকিয়েছে ! ব্রাহ্মণ ছাড়া শিক্ষা দেওয়া যাবে না , বেদ পাঠ করা যাবেনা , ওঙ্কার মন্ত্র উচ্চারণ করা যাবেনা , গায়ত্রী উচ্চারণ করা যাবে না – পদে পদে নিষেধের অনুশাসনে বেঁধে দিয়েছিল এরা সমাজকে !
দ্যাখো, বহুকাল আগে থেকেই ভারতবর্ষ বিদেশিদের দ্বারা বারবার আক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু তারা ভারতবর্ষে ঢুকে বসবাস করা বা রাজ্য দখল করার সাহস পেয়েছে ওই ব্রাহ্মণ্য প্রথার বাড়াবাড়ির পর থেকে ! যখন থেকে সাধারণ মানুষ , খেটে-খাওয়া মানুষকে সমাজে অবহেলিত , পদদলিত করে রাখার জন্য তথাকথিত ব্রাহ্মনেরা নানারকম বিধি-বিধান সমাজে চালু করলো – তখনই ওই রাস্তাটা খুলে গেল ! বিদেশি আক্রমণকারীরা যখন কোনো রাজ্য আক্রমণ করেছে __তখন রাজা-মন্ত্রী-সেনাপতি আর তার বেতনভোগী সৈন্যরা লড়াই করেছে, সাধারণ মানুষ কখনোই সেই যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেনি তো !
এই রাজ্য আমার — এই দেশ আমার — এই বোধই ছিল না সাধারণ সমাজে ! সেইভাবে সমাজ নেতারা কখনোই সাধারণ মানুষের সাথে Treat করে নি !
সাধারণ মানুষ রাজন্যবর্গের হাতে মার খেয়েছে আবার ব্রাহ্মণ কুলের কাছেও অবহেলা পেয়েছে ! আবার বিদেশী শাসকেরা এসেও ওদেরকে অত্যাচার করেছে । ফলে ভারতীয় সমাজের নিচুশ্রেনীর মানুষের কাছে এদের সবার মূল্য সমান ছিল ৷ রাজন্যবর্গের ছিল অত্যাচার-শোষণ- নির্যাতন, আর ব্রাহ্মণ্যবর্গের ছিল অবহেলা ও অবজ্ঞা ! সাধারণ মানুষ যায় কোথায় বলোতো ? এইজন্যই তো ভারতবর্ষের প্রতি মহাপ্রকৃতি রুষ্ট ! বারবার মহাপুরুষদের এখানে শরীর ধারণ করে balance করতে হচ্ছে !
উন্নাসিক পন্ডিতের দল বলে দিল __”ব্রাহ্মণ ছাড়া শিক্ষাদান নিষিদ্ধ” ৷ আরে – ব্রাহ্মণ বলতে তোরা বুঝিস টা কি ? ব্রাহ্মণের ছেলে ব্রাহ্মণ ? না – তা কখনোই নয় ! বেদেই রয়েছে “জন্মনা জায়তে শূদ্র , সংস্কারাৎ দ্বিজোচ্চতে , বেদভ্যাসে ভবেৎ বিপ্র , ব্রহ্ম জানতি সঃ ব্রাহ্মণঃ৷” প্রকৃতপক্ষে ব্রাহ্মণের কাজ ছিল যজন , যাজন , অধ্যাপনা ৷ এই তিনটি নিয়েই ব্রাহ্মণের জীবনকাল কেটে যেত ৷ ব্রাহ্মণেরা উঞ্ছবৃত্তি করবে কেন –পূর্বের ব্রাহ্মনেরা করেনি তো কখনও ! তার কাজের(যজন,যাজন,অধ্যাপনা) জন্য যখন যে __যা দিয়েছে তাই নিয়েছে ! ব্রাহ্মণ হবার প্রথম শর্ত ছিল ‘উপবীত সংস্কার’ । উপবীত গ্রহণের সময় আচার্য বালকের কাঁধে ভিক্ষার ঝুলি ঝুলিয়ে দিতো । কিছু না জুটলে ভিক্ষাবৃত্তি ! আগেকার দিনে যে কোনো গল্পে ব্রাহ্মণের উল্লেখ থাকলে দেখবে — ‘ব্রাহ্মণ ভিক্ষায় বেরিয়েছে’ – এরূপ উল্লেখ রয়েছে । সুতরাং ব্রাহ্মণ হবে নির্লোভ , স্বার্থশূন্য । এরা সংসার করতো কিন্তু “পুত্রর্থে ক্রিয়তে ভার্যা” । তখনকার দিনে ঋষি বা মুনিদেরও স্ত্রী ছিল । আধ্যাত্মিক উন্নতির পথে বিবাহ কোনোরূপ বাধা ছিল না । ধ্যান , জপ , সাধন-ভজনের দ্বারা বিভিন্ন সিদ্ধি বা ঐশ্বর্য্যের অধিকারী হোতেন এরা । যার ফলে নিজের জন্য সুখ ভোগ যাচ্ঞা না করলেও এরা সব মানুষের কল্যাণে , সমাজের কল্যাণে নানান সিদ্ধির প্রয়োগ ঘটাতে পারতো । এসব কারণেই সমাজের সমস্ত শ্রেণীর মানুষ এই ধরনের ব্রাহ্মণদের গুরুর ন্যায় সম্মান করতো , মাথায় তুলে রাখতো । রাজন্যবর্গও এঁদেরকে গুরুর মর্যাদা দিতো — এঁদের উপদেশ অনুযায়ী রাজ্যচালনা করতো ।
তখনকার যারা ব্রাহ্মণ পদবাচ্য ছিলেন তাঁরা ছিলেন ঋষিকল্প পুরুষ । সারা জীবন ধরে সমাজকে তাঁরা শুধু দিয়েই গেছেন –বিনিময়ে কিছুই প্রত্যাশা করেননি বা কিছুই চাননি ৷ এই জন্যই তো তৎকালীন ব্রাহ্মণদেরকে সমাজ শ্রদ্ধা করতো !
তখনকার যারা সৎ-ব্রাহ্মণ __তাদের বাড়ি থাকতো গ্রামের মধ্যিখানে , যেকোনো প্রয়োজনে গ্রামের বাকিরা তাঁর সুপরামর্শ পেতো ৷
এই ধরনের ব্রাহ্মণেরা যখন কাল প্রভাবে , যুগ প্রভাবে ধীরে ধীরে নীতিভ্রষ্ট হোল, তখন থেকেই প্রয়োজন হয়ে পড়লো সন্ন্যাসী পরম্পরার । প্রথমদিকে রাজ-অনুগ্রহ গ্রহণ করার মানসিকতাই ছিল না ব্রাহ্মণদের ! ছাত্রদের দেওয়া সামান্য বৃত্তি , প্রাকৃতিক ফল-মূল-পাতা-জল আর অভিভাবকদের করে দেওয়া মাটির ঘর, পাতার বা খড়ের ছাউনি – ব্যস্ , এতেই তাঁদের কত তেজ ! জ্ঞান ও ত্যাগের মহিমায় ভাস্বর ! পরবর্তীতে ব্রাহ্মণেরা যজন , যাজন ছেড়ে রাজার দরবারে চাকরি গ্রহণ করলো । চক্রবর্তী , নিয়োগী ইত্যাদি পদবী গ্রহণ করে নিজেদের ঐতিহ্য হারাতে শুরু করেছিলো ৷ … (ক্রমশঃ)