*জিজ্ঞাসু* : ~ শাস্ত্রে ‘কল্কি অবতার’-এর কথা আছে – উনি কবে অবতীর্ণ হবেন ?
*গুরু মহারাজ* : ~ দেখেছো ! আবার সেই পাঁজি-পুঁথির খোঁজখবর !!কবে-কখন-কোথায় ইত্যাদি বা দিন-ক্ষণ-মুহূর্ত ____এই সবগুলি যারা পঞ্জিকা নিয়ে গণনা করে – তাদের অনুসন্ধানের বিষয় । তবে কল্কি অবতার বিষয়ে আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করো__ তাহলে আমি বলবো দশাবতার বা শেষ অবতার বলে কিছু হয় না , জগতে যতদিন প্রয়োজন হবে – ততদিনই অবতরণ হবে । যখন এই পৃথিবী গ্রহের মানুষ চেতনায় উন্নত হয়ে নিজেদের সমস্যা নিজেরাই দূর করতে পারবে – তখন আর এখানে অবতরণের প্রয়োজন হবে না । কিন্তু কিন্তু তখন আবার অন্য কোথাও, অন্য কোনো গ্রহ-নক্ষত্রে প্রয়োজন হবে । এই জন্যই বলা হয় লীলা চিরন্তন ।
ঈশ্বরের লীলার কখনও ছেদ হয় না ৷ এক শেষ হয় – এক শুরু হয় । আমি ‘কল্কি অবতার’ সম্বন্ধে যা বুঝেছি, তা হোল সাদা ঘোড়ায় চেপে উদ্যত তরোয়াল হাতে যুদ্ধবেশী কোন নায়ক নয় – এখানে ‘ছুটন্ত ঘোড়া” হোল গতির প্রতীক ৷ ‘উদ্যত তরোয়াল’ হোল জ্ঞানের প্রতীক । সাদা পোশাক , সাদা ঘোড়া – এই যে সাদা রঙ , এগুলি সত্যের এবং পবিত্রতার প্রতীক ৷ এখানে ‘কল্কি অবতার’ বলতে সেইসব যুগ পুরুষদের বলা হয়েছে যাঁরা নিজেরা সাক্ষাৎ সত্য ও পবিত্রতার প্রতিমূর্তি হবেন , যাদের অপার্থিব জ্ঞান উদ্যত তরোয়ালের মত সদা-সর্বদা মানুষের অজ্ঞানতা খচ্-খচ্ করে কাটার জন্য সদা-সর্বদা উন্মুখ হয়ে থাকবে , আর যার সমগ্র জীবন হবে গতিময় । তিনি পৃথিবীর এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে বিচরণ করে তাঁর আরব্ধ কার্য সম্পন্ন করবেন । এককথায় প্রচন্ড dynamic হবেন তিনি । অতি অল্প সময়ে বৃহৎ কার্য সম্পাদন করে বেরিয়ে যাবেন তিনি ৷ কেউ তাঁর নাগাল পাবে – হয়তো কেউ কেউ পেলোই না । পরে আফসোস করবে – এইরে ! আমাদের এত কাছে উনি ছিলেন !!
শাস্ত্রে প্রথম অবতারের উল্লেখ রয়েছে “নারায়ন” । উনি সত্যযুগে পৃথিবীতে প্রথম অবতীর্ণ হয়েছিলেন ব্রাহ্মণ বেশে , পড়নে ছিল গেরুয়া কাপড় ৷ গুরু পরম্পরায় যে নাম রয়েছে “নারায়ণম্ পদ্মভবম্ ….” সে ‘নারায়ণ’ বৈকুণ্ঠপতি । আর এই নারায়ণের কথা মহাভারতে রয়েছে – যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞের শেষের দিকে এক নকুল যার অর্ধেক শরীর সুবর্ণমন্ডিত সে এসে যজ্ঞভূমে গড়াগড়ি দিয়ে বলল , “এ যজ্ঞ যজ্ঞই নয় !” ৷ সবাই বিস্মিত ! স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ ভগবান যেখানে উপস্থিত , বিশিষ্ট ঋষি-মুনিরা যজ্ঞের হোতা , স্বয়ং ধর্মরাজ যুধিষ্ঠির যেখানে যাজক/যজমান – সেখানে কিনা এই কথা ! সবাই শ্রীকৃষ্ণের মুখের দিকে তাকিয়ে উত্তরের অপেক্ষায় । তখন সেই নকুল সত্য যুগের কাহিনী শুনিয়েছিল , যেখানে এক ব্রাহ্মণ পরিবার অর্থাৎ ব্রাহ্মণ-ব্রাহ্মণী ও তার সন্তানগণ সকলে ওই নারায়নরূপী অতিথির ক্ষুন্নিবৃত্তি করাতে সকলেই অনশনে প্রাণত্যাগ করেছিল এবং তাদের এই পুণ্য আত্মোৎসর্গে ব্রাহ্মণ-নারায়ণরূপী স্বয়ং “নারায়ণ” প্রসন্ন হয়েছিলেন ! আর এর ফলস্বরূপ সেই রাজ্যে দীর্ঘদিনের অনাবৃষ্টির প্রকোপ সরে গিয়ে বর্ষার বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছিল ও দেশটি সুজলা-সুফলা-শস্য-শ্যামলায় পরিণত হয়েছিল ৷
নকুলটি সেই সত্যযুগে স্বচক্ষে এই ঘটনাটি দেখে ব্রাহ্মণ পরিবারের আত্মোৎসর্গের স্থানে অর্থাৎ যেখানে স্বয়ং নারায়ন প্রসাদ গ্রহণ করেছিলেন সেই স্থানে গড়াগড়ি দিয়েছিল আর তাতেই তার শরীরের অর্ধেক অংশ সোনার বরণ হয়ে যায় , এবং সে অমরত্ব লাভ করে । তারপর থেকে যেখানেই কোনো বড় দান-যজ্ঞ ইত্যাদি হোত, নকুলটি সেখানে গিয়েও গড়াগড়ি দিয়ে দেখতো যে, তার বাকি দেহটি সুবর্ণময় হয়ে উঠলো কিনা অর্থাৎ সেই যজ্ঞটি সত্যযুগের ঐ ব্রাহ্মণ পরিবারের আত্মোৎসর্গের যজ্ঞের সমান কিনা ! কিন্তু যেহেতু যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞে গড়াগড়ি দিয়ে নকুলের গায়ের বাকি অর্ধেক সুবর্ণময় হোল না – তাই সে বলেছিল , “এ যজ্ঞ যজ্ঞই নয়”।
যাইহোক , সেই ‘নারায়ণ’ থেকেই অবতরণ শুরু । আর সত্য , ত্রেতা , দ্বাপর পেড়িয়ে এই কলিযুগেও অবতরণ হয়ে চলেছে ৷ ঈশ্বরের অবতরণ__ মহাশক্তির অবতরণ, আর এটা মহাপ্রাকৃতিক নিয়মেই হয়ে চলেছে । জীব সৃষ্টির যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল তা ধীরে ধীরে অভিব্যক্তির সোপান বেয়ে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবার মহাদায়িত্ব পালন করতেই ‘অবতরণ’ ।
আর এটা এখন চলবে ৷ এটা ততদিন চলবে__ যতদিন না এ গ্রহেই উপযুক্ত মানব তৈরি হচ্ছে ! এখান থেকে-ই যখন ঐশ্বরিক ক্ষমতাসম্পন্ন মানবের উদ্ভব হবে, তখন আর অবতরণের প্রয়োজন হবে না । তখন আবার অন্য field-এ কাজ শুরু হবে ৷ এই পৃথিবী নামক গ্রহে “অবতার”-দের কাজ শেষ হবে ।৷